somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বপ্ন -২

০৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৪:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


প্রফেসর এমিলিয়া গর্ডন।
সুইডেনের উপসালা ইউনিভার্সিটির পলিটিকাল সাইন্স -এর শিক্ষিকা। সুদর্শনা, সুবচনা, ব্যক্তিত্ব সম্পন্না, মনোমুগ্ধকর একজন প্রিয় মানুষ আমার। আজ তাঁর লেকচার আছে সেমিনার রুমে। বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে বেশ কয়েকজন গেস্ট লেকচারার আসবেন তাদের ছাত্র ছাত্রী সহ। তাই মনে মনে কিছুটা শিহরিত আমি। আজ যেন নতুন ভাবে আমার প্রফেসরকে দেখবো। এত বড় মাপের সেমিনারে আজই প্রথম যাচ্ছি।
ক্যাম্পাসের আলো ঝলমলে দিন খুব একটা পাওয়া যায় না। আজ সকালটা যেন অন্যরকম লাগছে। আসলে বসন্তের আগমনে প্রকৃতির চেহারা খুব দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে। মাঠ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটারের রিসেপশান লবিতে প্রবেশ করতেই সাক্ষাত পেলাম এমা-র। এমা প্রফেসর গর্ডনের একমাত্র কন্যা। দশ বছর হলো এবার তার। অথচ আমার সাথে তার ভীষণ ভাব। আর ভাব হবেই না কেন? পড়াশোনার বাইরেও যে আমাদের আরেকটা যোগাযোগ আছে। আমার পিতার চাকরীর সুবাদে আমারা আর এমার পুরো পরিবার ক্যম্পাসের কাছে একই পাড়ায় বসবাস করি। সেদিক থেকে বিচার করলে প্রফেসর এমিলিয়ার পরিবার আর আমার বাবা, মা পারিবারিক ভাবে পরিচিত। আমি যখন হাই স্কুলে সবে উঠেছি, তখন এমা-দের পাশের প্রতিবেশী হয়েছি। এমা তখন ছোট্টটি। তার দুই ঝুটি নিয়ে হাসিমুখে খেলতে আসতো। পাড়ার সকল ছেলে মেয়েরা ঘুরতাম, বেড়াতাম। আমাদের পাড়ার সামনের পার্কে খেলার মাঠে কত আনন্দ আমাদের। তখন থেকেই এমা আর আমি যেন বিশেষ ভাবে কাছের বন্ধু হয়ে গিয়েছি। বয়সের তফাৎ থাকলেও তা কখনো আমার মনে আসেনি। আসলে মনের তো বয়স নেই। অন্য কারো সাথে মনের মিল হওয়াটাই আসল কথা।
সেই ছোট্ট এমা তারপর স্কুলে ভর্তি হলো। দেখতে দেখতে কতকগুলো বছর পার হয়ে গেল। আমি কলেজ পাশ করে সরাসরি ইউনিভার্সিটিতে। ছোট থেকেই এমা-র আম্মুকে আমি আমার প্রিয় ব্যক্তিত্বের তালিকায় রেখেছিলাম।
আর এখন?
এখন তিনি আমার বিভাগে, আমার শিক্ষিকা। বা উলটো ভাবে বললে আমি এখন তাঁর ছাত্রী।

সকাল বেলাটা একটু ধীর স্থির ছিল আজ। অন্য সকল দিনের চেয়ে আলাদা। কারণ আজ একটাই ক্লাস আর তা হলো সেমিনার অ্যাটেন্ড করা। তাই রিসেপশানের লবি পেরিয়ে একটু আগাতেই দেখি প্রফেসর গর্ডন আর এমা বসে আছে সামনের সোফায়। চারিদিকে কাঁচের দেয়াল ফুঁড়ে আলো এসে পড়ছে সমস্ত সিটিং এরিয়াতে। এমার আম্মুকে ক্যাম্পাসের বাইরে, বাসায় দেখা হলে আন্টি বলে সম্বোধন করি। ডিপার্ট্মেন্টে অবশ্যই না। তবুও এমাকে দেখেই কিনা, ‘আন্টি’ সম্বোধন চলে এলো মুখে। ম্যাডাম দু; সপ্তাহ পরপর হোম ওয়ার্ক দেন তার সকল ছাত্র ছাত্রীদের জন্য। প্রশ্নগুলো এত কঠিন। মনে হচ্ছে পলিটিকাল সাইন্স শুধু নয়, এখানে যেন ইংরেজী সাহিত্যেরও কিছুটা ছোঁয়া আছে। প্রথমটা সংজ্ঞা জানতে চেয়ে একটা প্রশ্ন। দ্বিতীয় প্রশ্নটা বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল আমার।ম্যাডাম শব্দার্থ আলাদা আলাদা করে বুঝিয়ে দিলেন এত সুন্দর করে যে, আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম ম্যাডামের দিকে।
তারপর একটু সরে যেয়ে পাশে এসে এমাকে বললাম, ‘ প্রশ্নগুলো লিখে রাখো প্লিজ। লিখেছ কি?’
কালচে নীল পেলিক্যান কালির ঝর্ণা কলমে গোটা গোটা অক্ষরে প্রশ্নগুলো লিখছে এমা। অক্ষরগুলো সাজিয়েছে এমনভাবে যেন এমার হাত দিয়ে মুক্তো ঝরছে। প্রশ্ন বুঝিয়ে দিতেই সেমিনার হলে প্রবেশ করার সময় হয়ে এলো।
প্রফেসর গর্ডন উঠে দাঁড়ালেন।
সুইডিশ অরিজিন, ৬ ফুট মতন লম্বা, দোহারা গড়ন। আজ তাঁকে কি যে সুন্দর লাগছে। আজ বিশেষ লেকচার –এর দিন বলে নয়। উনি বরাবরই সুরুচিসম্পন্ন। নিখুঁত, পরিপাটি ভাবেই নিজেকে উপস্থাপন করেন। পরণে থাকে কালো ভারী স্যুট, সাথে কোন উজ্জ্বল রঙের শার্ট। আমার সামনা সামনি ঠিক নয়, পাশ দিয়ে যখন দেখলাম উনি সোফা থেকে উঠে রওনা দিয়েছেন সেমিনার রুমের দিকে, তখন যেন তিনি অন্য এক ব্যক্তিত্ব। ধ্যনমগ্ন, চিন্তাশীল। নিজের ভাবনায় ডুবে গেছেন সম্পূর্ণ। চারপাশ তার কাছে এখন অচেনা। আমরা সবাই এখন তার কাছে অদৃশ্য। এক পা এগুতেই দেখলাম আমার প্রিয় আন্টি, আমার শিক্ষক , প্রফেসর এমিলিয়া গর্ডন তাঁর প্রস্তুতকৃত লেকচার পরিবেশন করতে শান্ত ভঙ্গীতে ধীর পদক্ষেপে হেঁটে যাচ্ছেন হলওয়ে ধরে । উনি উঠে দাঁড়াতেই আমি তাঁকে আপাদমস্তক দেখার সুযোগ পেয়েছি। এর পূর্বে তিনি কথার মাঝে উপস্থিত থাকলেও, এত নিখুঁত ভাবে দৃশ্যমান ছিলেন না।
কালো স্যুট আর গাঢ় পারপেল -বেগুণী মিশ্রণের উজ্জ্বল শার্ট পরনে। গৌরবর্ণ, প্রফেসর এমিলিয়া গর্ডন সুষমা মন্ডিত হয়ে প্রবেশ করছেন সেমিনার রুমে। আমি আর এমা থাকবো দর্শকের সারিতে।

এমাকে নিয়ে পিছনের দিকে উঁচু চেয়ারগুলোতে বসতে গিয়ে বেশ অবাক হলাম। এমা যেন আরো ছোট্টটি হয়ে গেছে। এখন যেন সেই প্রথম দেখা চার বছরের টুক্টুক পায়ে হাঁটা এমা। এখন দেখছি সেই এমা-কে, যে আমাকে রাস্তার মাঝ দিয়ে হাঁটতে গেলে হাত ধরে টেনে কিনারায় নিয়ে আসতো আর বলতো, ‘বারবার রাস্তার মাঝে চলে যান কেন? রাস্তার মাঝ দিয়ে হাঁটতে হয় না তো।‘
আর আমি বুঝেই পেতাম না, খালি রাস্তার মাঝ দিয়ে হাঁটলে অসুবিধা কোথায়!
আজও বুঝি না।
বুঝতে যে চাইও না।
আমি চাই সেই ছোট্ট এমা আমাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেক আমার চলার পথ। সারাটা জীবন যেন সে আমার চলার পথের সংগী হয়ে থাক। আর আন্টির প্রতিভা হবে আমাদের পাথেয় । ছোটদের স্নেহ করে কাছে টেনে নেয়া, অপরের প্রতি যত্নশীল হওয়া, আদর, ভালবাসা দিয়ে, বিপদে পাশে এসে সাহায্য করা – এই সব গুণের অনন্য দৃষ্টান্ত আমার আন্টি, আমার প্রফেসর।
প্রফেসর এমিলিয়া গর্ডন।
ওনার ব্যক্তিত্ব আমাদের কাছে আমাদের সমগ্র জীবনের একটা দিক নির্দেশনা। আমি ব্রত গ্রহণ করেছি এই আলোক উজ্জ্বল দিনে যে মহিমান্বিত রূপে আমি তাঁকে দেখেছি তেমনটাই যেন হতে পারি আমার জীবনে। কবে থেকে আন্টির সাথে আমার পরিচয়ের শুরু আমি জানি না। কারণ শুরু যখন আদি হয়ে দেখা দেয়, তাকে কোন সময় দিয়ে বাঁধা যায় না।
আমার স্বপ্নে আসা প্রফেসর এমিলিয়া গর্ডন আমার প্রিয় আন্টি, আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব।
এমার জীবনে তিনিই এমা-র অস্তিত্ব। কারণ এমার অস্তিত্বের সূচনা তার মাঝ দিয়েই। আর আমার অস্তিত্ব তাঁর আলোকচ্ছ্বটায় ।
এমা তাঁর সন্তান।
আমি তাঁর সন্তানতুল্য ।
এই জীবনের শুরুতে আমাদের চলার পথে তাঁকে পেয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে আমরা বিনীত ভাবে কৃতজ্ঞ।
.।.।.।.।

স্বপ্নের সময়ঃ ৬ই মে ২০২৬
সময় বিকাল সাড়ে তিনটা

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মানুষ মারা যাবার পর আবার পৃথিবীতে আসবে?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১০



আমার মনে হয়, আমরা শেষ জামানায় পৌছে গেছি।
পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে খুব শ্রীঘই। চারিদিকে অনাচার হচ্ছে। মানুষের শরম লজ্জা নাই হয়ে গেছে। পতিতারা সামনে এসে, সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিজ্ঞানীরাও একেশ্বরবাদী হতে পারেন - আইজ্যাক নিউটন তা প্রমাণ করে গিয়েছেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৯ ই মে, ২০২৬ রাত ৯:৪০



প্রত্যেক মহান বিজ্ঞানীই নিজের জীবনে ধর্ম নিয়ে গবেষনা করে গিয়েছেন। এমনটাই আমার বিশ্বাস ছিলো। সামুতে আমি এই নিয়ে আগেও লিখেছি। তারপরও, কয়েক দিন স্টাডি করার পরে বুঝতে পারলাম-... ...বাকিটুকু পড়ুন

মত প্রকাশের স্বাধীনতা

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৮



আমাদের দেশের সাধারণ ও অসাধারণ জনগণ সহ সকল প্রকার সংবাদ মাধ্যম “মত প্রকাশের স্বাধীনতা”র জন্য প্রায় যুদ্ধ করছেন। মত প্রকাশের সামান্য নমুনাচিত্র হিসেবে একটি সংবাদের ভিডিও চিত্র তুলে ধরছি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের "ইসলামী" বই - নমুনা ! আলেমদের দায়িত্ব

লিখেছেন ঢাকার লোক, ১০ ই মে, ২০২৬ সকাল ৮:৪৭

আমাদের দেশের বিখ্যাত চরমোনাইয়ের প্রাক্তন পীর সাহেব, মাওলানা ইসহাক, যিনি বর্তমান পীর রেজাউল করিম সাহেবের দাদা, এর লেখা একটা বই , "ভেদে মারেফাত বা ইয়াদে খোদা"। এ বইটার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম কর্ম

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১০ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:১৩



আপনার দিনের পর দিন ধর্মীয় লেখা পোস্ট করার কারণে -
হয়তো, আপনার কম্পিউটারটি স্বর্গে যেতে পারে।
কিন্তু, আপনার নিজে স্বর্গে যেতে হলে -
আপনার নিজের ধর্ম কর্ম করতে হবে।


ঠাকুরমাহমুদ
ঢাকা, বাংলাদেশ



...বাকিটুকু পড়ুন

×