১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়ের পর বাংলাদেশর ক্রিকেটের গতিপথ হঠাৎ করেই বদলে যায়। এই ট্রফি জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে এবং প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েই স্কটল্যান্ড ও শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে তাদের আগমনী বার্তা ঘোষণা করে। এরপর বাংলাদেশের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০০০ সালের ২৬ জুন আইসিসি বাংলাদেশকে টেস্ট মর্যাদা প্রদান করে এবং এরই ধারাবাহিকতায় ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। সময়ের পরিক্রমায় সেটি আজ এক যুগ হতে চলল। তাই চেষ্টা করেছি এই এক যুগে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাফল্য-ব্যর্থতার একটি হিসাব কষতে।
টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের শুরুটা হয় স্বপ্নের মত। ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর নাইমুর রহমানের অধিনায়কত্বে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে ৪০০ রানের বিশাল স্কোর করে বাংলাদেশ। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয়ের কারণে ৯ উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ। অভিষেকেই ১৪৫ রান করে অস্ট্রেলিয়ার চার্লস ব্যানারম্যান এবং জিম্বাবুয়ের ডেভিড হটনের পাশে নাম লেখান আমিনুল ইসলাম। এই ম্যাচে অধিনায়ক নাইমুর রহমানের ১৩২ রানে ৬ উইকেট অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসে কোন বোলারের সেরা বোলিং। এরপর ২০০১ সালে শ্রীলংকার কলম্বোয় মাত্র ১৭ বছর ৬১ দিন বয়সে সেঞ্চুরি করার রেকর্ড করেন মোহাম্মদ আশরাফুল। বাংলাদেশ প্রথম বারের মত টেস্ট ড্র করে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০০১ সালের ঢাকা টেস্টে। যদিও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঐ ম্যাচে বৃষ্টির কারণে দুই দিন খেলা হয়নি। ২০০৩ সালের মুলতান টেস্টে প্রথম বারের মত প্রথম ইনিংসে লিড নেয় বাংলাদেশ। যদিও ঐ টেস্টে জয়ের দ্বারপ্রান্তে ছিল বাংলাদেশ, কিন্তু ইনজামামের বীরত্বে মাত্র ১ উইকেটে হেরে যায় টাইগাররা। তবে, এখানে একটা কথা থেকেই যায়, রশিদ লতিফ জালিয়াতির আশ্রয় না নিলে ফলাফলটা অন্যরকমও হতে পারত। ঐ সিরিজে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে হ্যাট্রিক করেন অলক কাপালি। রেকর্ড টানা ২১ টেস্ট হারের পর ২০০৪ সালের জিম্বাবুয়ে সফরে হাবিবুল বাশারের নেতৃত্বে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টটি ড্র করে টানা হারের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসে বাংলাদেশ। যদিও বৃষ্টির কারণে উক্ত টেস্টে তিন দিন খেলা বন্ধ ছিল। টাইগাররা নিজেদের কৃতিত্বে প্রথম টেস্ট ড্র করতে সমর্থ হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২০০৪ সালে সেন্ট লুসিয়া টেস্টে। এই টেস্টে বাংলাদেশের তিনজন ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করেন।প্রথম ইনিংসে হাবিবুল বাশার ও মোহাম্মদ রফিক এবং দ্বিতীয় ইনিংসে খালেদ মাসুদ। বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম জয়ের স্বাদ পায় ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টে। দুই ইনিংস মিলিয়ে ১২ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরা হন এনামুল হক জুনিয়র। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টটি ড্র হলে প্রথমবারের মত টেস্ট সিরিজ জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ। ২০০৬ সালে ফতুল্লা টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ১৫৮ রানের লিড নিয়ে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দেয় টাইগাররা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঐ ম্যাচটি ৩ উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ। ২০০৯ সালে এসে প্রথমবারের মত বিদেশের মাটিতে টেস্ট জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সিরিজের দুই ম্যাচের দুইটিতেই হারিয়ে প্রথমবারের মত হোয়াইটওয়াশ করার স্বাদও পায় বাংলাদেশ। উল্লেখ্য করা যেতে পারে, ঐ সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের শীর্ষস্থানীয় খেলোয়াড়েরা ধর্মঘটের কারণে দলের বাইরে ছিল।
এখন পর্যন্ত ২০০৫ সালের চট্টগ্রাম টেস্টে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে করা ৪৮৮ রান বাংলাদেশের দলীয় সর্বোচ্চ রান এবং ২০০৭ সালে কলম্বো টেস্টে শ্রীলংকার বিপক্ষে করা ৬২ রান দলীয় সর্বনিন্ম রান। সর্বমোট ৩০২৬ রান করে বাংলাদেশের পক্ষে টেস্টে সর্বাধিক রান করার রেকর্ডটা হাবিবুল বাশারের। ৫টি সেঞ্চুরি করে সর্বাধিক সেঞ্চুরির পাশাপাশি ১৬ বার শূন্য(০) রানে আউট হয়ে সর্বাধিক শূন্য রানে আউট হওয়ার রেকর্ডটাও মোহাম্মদ আশরাফুলের। ২০০৪ সালে ভারতের বিপক্ষে করা আশরাফুলের অপরাজিত ১৫৮ রানের ইনিংসটাই এখন পর্যন্ত কোন বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। ঠিক ১০০ টি উইকেট নিয়ে সর্বাধিক উইকেট নেওয়ার রেকর্ডটা মোহাম্মদ রফিকের। ২০০৮ সালের চট্টগ্রাম টেস্টে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাকিব আল হাসানের ৩৬ রানে ৭ উইকেট এক ইনিংসে বাংলাদেশের পক্ষে সেরা বোলিং এবং ২০০৫ সালের চট্টগ্রাম টেস্টে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এনামুল হক জুনিয়রের ২০০ রানে ১২ উইকেট এক ম্যাচে বাংলাদেশের পক্ষে সেরা বোলিং। ৫৭ টি ম্যাচ খেলে সর্বাধিক ম্যাচ খেলার রেকর্ডটা মোহাম্মদ আশরাফুলের। এখন পর্যন্ত সর্বমোট আটজন অধিনায়কের অধীনে খেলেছে বাংলাদেশ সর্বাধিক ১৮ টি ম্যাচে অধিনায়ক ছিলেন হাবিবুল বাশার।
এখন পর্যন্ত মোট ৭৩ টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ যার মধ্যে জয় মাত্র ৩ টিতে এবং ড্র ৭ টিতে। বাকী ৬৩ ম্যাচেই হারের স্বাদ পেতে হয়েছে বাংলাদেশকে যার মধ্যে ৩৫ টি আবার ইনিংস ব্যবধানে। ঘরোয়া ক্রিকেটের দুর্বল কাঠামোকেই এর জন্য দায়ী করেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা। মূলত প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট এখানে অবহেলিত, তবে এবারের জাতীয় ক্রিকেট লীগ জাতীয় দলের খেলোয়াড়সহ সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করায় দেশের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে উন্নতির ছাপ আশা করাই যায়, হলেই ভাল।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুন, ২০১৬ রাত ৩:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



