somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যখন মিটে যায় সব লেনদেন- থাকে শুধু অন্ধকার।

২৬ শে এপ্রিল, ২০১৬ দুপুর ২:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

উনিশ'শ একান্ন-বায়ান্ন সালের দিকে প্রায়ই এক দূর্ধর্ষ চেহারার তরুণ ও এক ছিপছিপে গড়নের কিশোরীকে দ্যাখা যেতো বড়ো সড়কের অদূরে কুঠিবাড়ি'র সিঁথানে শতাব্দী প্রাচীন কোন এক বট অথবা পাকুড় গাছের নিচে। তরুণের হাতে হয়তো দেবীনগর বা নুরুল্লাহপুর মেলা থেকে কেনা লাল রঙের কাঁচের চুড়ি থাকতো অথবা থাকতো না, তবে কিশোরীর হাতে সবসময়ই রঙিন সূতোয় বোনা আগেরবারের'চে ভিন্ন চেহারার হাত-পাখা থাকতো। বট অথবা পাকুড়, যেই গাছের নিচে বসে কিশোরীটি খুঁনসুটিতে মেতে উঠতো অথবা তরুণটি হেঁড়ে গলায় গান গাইতো সেই গাছের অদূরের বড়ো সড়ক ধরে হেটে আসা প্রৌঢ়টি হয়তো তাদের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাতো অথবা গাছের পাশ দিয়ে এগিয়ে চলা গরুর গলায় গিঁট দেয়া দড়ির অপর প্রান্তের বালকটি হয়তো মুখ টিপে হাসতো। কিশোরীটি আর তরুণটি প্রেমিক-প্রেমিকা নাকি ফুপাতো-মামাতো ভাই-বোন, এই নিয়ে হয়তো সন্ধ্যাবেলায় আলোচনাও হতো কুঠিবাড়ি'র আশেপাশের কোন এক কুপি জ্বলা বাড়িতে মহিলাদের আসরে। কেউ জানেনা কে কী ভেবেছিলো।

তবে তা না জানলেও সেই পাকুড় অথবা বট গাছের দক্ষিনের দক্ষিন বাহ্রা থেকে শুরু করে উত্তরের নামে মাত্র সুন্দরীপাড়া পর্যন্ত সবাই জানে যে সেই এলাকার একমাত্র প্রেমিক-প্রেমিকা জুটির কিশোরী বয়সের আর তরুণ কালের প্রেম শেষ পর্যন্ত বিয়েকেও ছাড়িয়ে গত তিন বছর আগপর্যন্ত টিকে ছিলো, এই জগতে।

হয়তো কোন একদিন বাড়ির পাশের চার শতাব্দী প্রাচীন মেলায় কুষ্টিয়া থেকে আসা বাউলের আলখাল্লার সাদা-হয়ে-আসা হলুদ রঙ অথবা মেলা-ময়দানের দক্ষিন-পূর্বে চঁকচকে পদ্মায় জেগে উঠা পলি-মিশ্রিত চরের ঈষৎ হলুদ বালু বৈরাগ্য হয়ে ভর করেছিলো তরুণটির উপর। সদ্য বৈরাগ্য-প্রাপ্ত-প্রেমিক কিশোরীর রঙিন হাতপাখার ঘূর্ণনে বেরিয়ে আসা খিলখিল হাসি অথবা খুঁনসুটির ফলে উৎপন্ন বাতাসে আগ্রহ হারিয়ে অথবা কুঠিবাড়ির পাশের কুপি জ্বলা বাড়ি থেকে ভেসে আসা 'মরদ' শব্দটির যথার্থতা প্রমানে বেরিয়ে পরলো বাড়ি থেকে, কাঁচের চুড়ি'র নগর দেবীনগরে। আর এদিকে আমাদের কিশোরী প্রেমিকা ব্যস্ত তার সদ্য বৈরাগ্য-প্রাপ্ত-প্রেমিকের দেয়া কাঁচের চুড়ি'র উপর পরা তরল বিরহ অথবা মায়ের কাছে বলা কথামতোন চোখে পোঁকা যাওয়ায় বের হওয়া পানিতে তার প্রেমিকের সাতরঙা প্রতিবিম্ব আবিষ্কারে।

কিশোরীটি আবারও তার প্রেমিকের এই রঙিন প্রতিবিম্ব আবিষ্কার করেছে আজ থেকে উনষাট-ষাট বছর আগের কোন এক সন্ধ্যায়, এবার আর তরল বিরহে অথবা পোঁকায়-আনা-চোখের-পানির ফোঁটায় না, প্রেমিকের বাড়িতে চারকোনা আয়নায়। বৈরাগ্যের প্রভাবে হলুদ হয়ে যাওয়া বাউলের আলখাল্লা আর পদ্মার চরের কুমড়োর প্রভাবে হলুদ হয়ে যাওয়া বালুও সেদিন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলো তরুণের চোখ থেকে, লাল শাড়ির প্রভাবে লাল হয়ে যাওয়া চাপা-রঙের কিশোরীর কাছে। পরবর্তী চব্বিশ-পঁচিশ বছর লাল ভিন্ন অন্য কোন রঙ তরুণটি দেখেছে কিনা সন্দেহ।

বিয়ের পরও তরুণের লাল রঙের ক্ষুধা আর ফুরোয় না, কিশোরীর সাত-রঙা হাত-পাখাও অ্যাখন লাল হয়ে গ্যালো। মন থেকে লাল রঙ তাদের চোখ বেয়ে পরলো গাঁইয়ের উপর, উঠোন জুরে লাল রঙের ছড়াছড়ি তো বটেই, চব্বিশ-পঁচিশ পরে দ্যাখা গ্যালো ঘর জুরেও পাঁচ-পাঁচটি লাল রক্তের মানব-মানবীর অস্তিত্ব। তরুণটি যখন মধ্যবয়স ছাড়িয়ে মধ্য-প্রৌঢ়, আর কিশোরীটি যৌবন পেরিয়ে মধ্যবয়স্কা নারী, তখন লাল রঙের মোহ ছাড়িয়ে হয়তো আবারও বৈরাগ্যে ধরলো তাকে। একদিন ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কিছুদিন পর সে ফিরে এলো, তার পরনে কিশোরীর শাড়ি'র লাল রঙের সাথে বাউলের আলখাল্লার হলুদ রঙ, পদ্মার পানিতে পরা আকাশের রঙ, তার চরে জন্ম নেয়া কুমড়োর প্রায় কমলা রঙ, কুঠিবাড়ির অভ্যন্তরের নীল-বেগুনী রঙ, তার সিঁথানের পাকুড় গাছের পাতার সবুজ রঙ মিশে যেই রঙটি হয়, সেই রঙের পোষাক। সেই রঙের প্রভাবে একসময়ের কিশোরীর পরনের শাড়িও শাদা হয়ে গ্যালো। যার অস্তিত্ব ছিলো তিন বছর আগেও।

কিশোরীটির প্রেম গত শতাব্দীর মধ্যভাগে শুরু হয়ে টিকে ছিলো এই শতাব্দীর প্রথম দশমাংশ পর্যন্ত। সেই তরুণটি'র কথা হয়তো তার মনে ছিলো না, অথবা মনে ছিলো। কে জানে, হয়তো আমাদের দেখে দেখে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঠাট্টার ছলে যখন তার কিশোরী-বেলার কথা বলতেন তখন হয়তো ফিরে যেতেন সেই পাকুড় গাছের নিচে, হাতের পাখা দিয়ে আমাদের বাতাস করতে করতে হয়তো কল্পনায় খুঁনসুটিতে মেতে উঠতেন তরুণটির সাথে।



অতঃপর শেষ হল হল জীবনের সব লেনদেন। থাকে শুধু অন্ধকার।

সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে এপ্রিল, ২০১৬ দুপুর ২:১৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এই সমাজ- ৭২

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৩



দেশের সরকার অযোগ্য অদক্ষ হলে, জনগনের শান্তি থাকে না।
দেশের জনগন সারাদিন কাম কাজ করে। অফিসে নানান রকম যন্ত্রনা পোহায়। নানান জক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়। অফিসে থাকে না... ...বাকিটুকু পড়ুন

তেল গ‍্যাস অনুসন্ধান আর বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে, সুদি মহাজন আর খাম্বা/কার্ড সরকারের মিথ্যাচারের জবাব॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৮



২০০৮-২০২৪ এই ১৬ বছরকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন "chronicle of shoddy gas exploration" - মানে গ্যাস অনুসন্ধানের ধীরগতির ইতিহাস।

২০০৮-২০২৪ এর মূল চিত্র

< Between 2008 and 2024, bureaucratic interference... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবননগর

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৪১



গ্রাম দেখতে কোলাহলের বাইরে গিয়ে দেখি-
কোথাও নেই একরত্তি গ্রাম!
বিলুপ্ত হয়েছে যাবতীয় সবুজ সুন্দর;
সর্বত্র বিস্তার লাভ করেছে কংক্রিটের বন!
ভ্রমণক্লান্তিতে খুব তৃষ্ণার্ত হয়ে-
জলপানাঙ্ক্ষা জানাতেই পেলাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ নেপালের চেয়েও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে।

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:২৬

বাংলাদেশ নেপালের চেয়েও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে।



বাংলাদেশে যদি একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প বা বড় ধরনের নগর দুর্যোগ আঘাত হানে, তাহলে দেশটি নেপালের অভিজ্ঞতার চেয়েও বহুগুণ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাকরির বন্যা আসার আগেই চাকরির বাজারে খরা!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৬



জুলাইয়ের পর বলা হয়েছিল দেশে নাকি চাকরির বন্যা বয়ে যাবে। অর্থনীতি ঘুরে দাড়াবে, ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা অর্থনীতিতে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে যাবো। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিও হবে।

দেশে এমনিতেই কর্মসংস্থানের অবস্থা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×