somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিজের নোট-১: এবং আমার মা

০৯ ই জুলাই, ২০১৪ ভোর ৬:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার আম্মুর ভাষ্য হচ্ছে, “আমি আমার ৬ ছেলে-মেয়েকে কোনদিন "A,B,C" কিংবা "অ,আ,ই" কিছুই শিখাইনি”।আমার নিজেরও মনে পড়ে না, কে আমাকে এগুলু শিখিয়েছে। এটাই আমার মা, যে কখনই আমাদের সাহায্য ছাড়া ঘরের বাহিরে এক পা দেয়নি। আম্মুর ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পরে অবশ্য মাঝে মাঝে আমার ছোট বোন কিংবা ছোট ভাই আম্মুকে ছাদে নিয়ে যায় হাঁটানোর উদ্দেশে।



আমার আম্মুর জীবনে এমন একটা ঘটনা আছে, যারাই আমার ‘নোট’টা পড়ছেন অন্তত কারো আম্মুর জীবনের সাথে এটা মিলবেনা না। ঘটনাটি সবার পরেই বলছি।



আমার আম্মুকে একজন আদর্শ গৃহিণী বলতে যা বুঝায় পরিপূর্ণভাবে তাহাই বলা যায়। কারণ একমাত্র গৃহস্থালি কাজ ছাড়া অন্য একটা কাজের সাথেও তাঁর কখনই সংযোগ ছিল না।



আমরা ভাইবোনরা খুব সহজে একসাথে হতে পারি না। বছরে হয়তো দুই-একবার ৫ ভাইবোন একসাথে হই(বড় আপু ছাড়া কারণ উনি শ্বশুর বাড়িতে)। আমরা যখন বিভিন্ন বিষয়ে গল্প করি তখন একজন নিরব দর্শক আমাদের মধ্যে থেকে যায়। উনি আর কেউ নন, আমার আম্মু। আমরা যেই কথা বলে উঠি উনি সেই দিকেই তাকাবেন, আবার অন্যজন কথা বলে উঠলে ঐদিকে তাকাবেন। ঠিক একটা বাচ্ছা ছেলে টিভিতে যেভাবে কার্টুন দেখে সেই রকম। কার্টুন কিডসটা যেদিকে যাচ্ছে তাঁর দৃষ্টি যেন সেদিকে চলে যাচ্ছে ঠিক এইরকম। আমাদের সব কথা যে আম্মু বুঝতে পারেন সেটা কিন্তু না। কিন্তু আমরা যখন হেসে উঠি, উনিও আমাদের সাথে বিনা কারণে হেসে উঠেন।



ছোট বোন, ছোট ভাই আম্মুকে নিয়ে প্রায় দুষ্টামি করে বলে, “আমার বাবা ঠকে গেছে, তোমার বাবা-মা আমার বাবাকে কোন ফার্নিচার দেয়নি।এখনি যাও, তোমার বাবার বাড়ী থেকে ফার্নিচার নিয়ে আস”।আমার আম্মু মুস্কি মুস্কি হাসে এবং বলে, “আমার তো বাবা-মা কেউ নাই। কিভাবে নিয়ে আসব। তোমরা আমার বাবা-মা। তোমরাই দিও”। একবার ছোট ভাই আম্মুকে নিয়ে দুষ্টামি করে বলল, “তুমি আর আমাদের কোন কাজেই আসতেছনা। তোমাকে তোমার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেব”। আমার আম্মু মৃদু হেসে বলল, “পাঠিয়ে দাও কিন্তু পাঠানোর সময় আমাকে ২ লক্ষ টাকা দিতে হবে”। কিন্তু আমার আম্মু জানেন না যে এখনকার ২ লক্ষ টাকার অর্থমূল্য কতটা কম।



সরলতার একটা মডেল হিসেবে যদি ধরে নেয়া হয় তাহলে আমার আম্মুকে তাতে প্রতিষ্ঠা করিয়ে দেয়া যাবে। তাঁর পৃথিবী হচ্ছে তাঁর ৬ সন্তান। অন্য কোন আবেগ উচ্চাকাঙ্ক্ষার সাথে উনার কখনো পরিচয়ই ছিল না। আমার আম্মু দান করতে অনেক পচন্দ করেন। আমি চট্রগ্রাম গেলে আমার পকেট থেকে প্রায় টাকা সরান। আমার কোন খবর থাকে না। কিন্তু পরে অবশ্য আমাকে বলে দেন। 



আমার মনে পড়ে, ছোট বেলায় যখন রাতের বেলা ঘুমাতাম অনেক বেশি ইলেক্ট্রিসিটি বিঘ্ন ঘটত। কিন্তু আমি খুব কমেই টের পেতাম কখন ইলেক্ট্রিক পাখাটি বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ স্বয়ংক্রিয় কিন্তু মানব নিয়ন্ত্রিত হাতপাখাটি ঘুরত সারারাত। আমার মনে হত, আম্মু মনে হয় ঘুমের মধ্যেও হাতপাখাটি ঘুরাতে পারতেন সারারাত।



ছোটবেলা মায়ের হাতে মাইর খায়নি এমন কেউ দুর্ভাগা আছে কিনা আমার জানা নাই। কিন্তু আমি সেই দুর্ভাগা এবং আমার কখন মনেই পড়ে না যে, আমার আম্মু হাতে আমাকে মাইর খেতে হয়েছে। দুষ্টামি যে কম করতাম সেটা কিন্তু না। 



প্রথমে যে বলেছিলাম আমার আম্মুর জীবনে এমন একটা ঘটনা আছে যা অন্য কারো মায়ের সাথে মিলবে না। সেটাই বলছি। আমার আম্মুকে লালন পালন করেছেন আম্মুর জেঠাতো বোন। তাকেই তিনি মা বলে জেনেছে্ন। কারণ ‘আমার আম্মুর মা আম্মুকে ১৬ দিন রেখে মারা গেছেন’। সেই ১৬ দিন পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি মা ছাড়া বড় হয়েছেন। উনার বেড়ে উঠতে কোন সমস্যা হয়নি কারণ নানাদের অবস্থা অনেক ভাল ছিল। এই ব্যাপারটা নিয়ে আম্মু অবশ্য খুব বেশি দুঃখ প্রকাশ করেন না। কারণ আম্মু বলেন, “আমি মায়ের আদর পাইনি তো কি হয়েছে, এখন আমার আছে ৬ জন বাবা-মা”। হুম আমরাই সেই বাবা-মা এবং আমাদের প্রতিজ্ঞাও এমন ছিল যে, অন্তত এই মানুষটাকে আমরা কখনই একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাসও ফেলতে দেব না। এখনো পর্যন্ত তাই হয়ে আসছে এবং ভবিষ্যৎ দিনগুলোতে ইন-শা-আল্লাহ তাই হয়ে থাকবে।

(আম্মু যখন একটু অসুস্ত হয়ে যায় তখন আমরা অনেক টেনশানে পড়ে যাই। কারণ আমাদের পৃথিবীটা আম্মুকে মাঝে রেখেই চক্রাকারে ঘুরছে। আমরা খুব ভাল বুঝি, অন্তত এই মানুষটাকে হারানো যাবে না আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে। কারণ এই মানুষটাই আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল।)
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুলাই, ২০১৪ সকাল ৯:০৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×