দক্ষিণ এশিয়ায় আনত্দঃআঞ্চলিক বাণিজ্য একতরফাভাবে ভারতের অনুকূলে। আবার বাজার হিসাবেও ভারতই বড় বাজার। এই পরিস্থিতিতে ভারতের বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে বাণিজ্যে লাভবান হওয়ার লক্ষ্যই এ অঞ্চলের অনুন্নত দেশগুলোর প্রধান লক্ষ্য। বাংলাদেশেরও তাই। কিন্তু এই বিশাল বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে না ভারত। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্কোন্নয়নে ভারতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য নিয়েও আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। একইভাবে সার্কের অন্যান্য দেশের সঙ্গেও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য (এফটিএ) চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সাফটা কার্যকর হওয়ার ফলে দ্বিপাক্ষিক এফটিএ'র গতি থমকে গেছে। কিন্তু সাফটার আওতায়ও ভারত যথাযথ উদারীকরণ করেনি। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার আওতায় ভারত-বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে যেসব সুবিধা প্রদানের কথা- সেগুলোও প্রদান করা হয়নি। বরং প্রতিবেশী এ বড় দেশটি শুল্ক বহিভর্ূত নানা বাধা (এনটিবি) আরোপের মাধ্যমে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাধাগ্রসত্দ করেছে। ইংরেজিতে যাকে বলে নন ট্যারিফ ব্যারিয়ার। প্যারা ট্যারিফ ব্যারিয়ারও (পিটিবি) রয়েছে। এর পাশাপাশি কাস্টমস, ব্যাংকিং সমন্বয়, মান উন্নয়ন, অবকাঠামোগত সমস্যা ও রাজ্য সরকারগুলোর পৃথক শুল্ক আরোপজনিত সমস্যাদি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। অবশ্য, সম্প্রতি ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিমন্ত্রী জয়রাম রমেশ ঘোষণা দিয়েছেন, বাংলাদেশী পণ্যের ভারতে প্রবেশে মান পরীক্ষার প্রয়োজন হবে না। বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা তার বক্তব্যকে ইতিবাচক উলেস্নখ করে এর সঠিক বাসত্দবায়ন চেয়েছেন। তারা বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল হলেই হবে না, বাণিজ্য বাড়াতে বিদ্যমান সমস্যাদিও দূরীকরণ করতে হবে।
ভারতের উদাহরণ টেনে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ব্যবধান ব্যাপক। বাংলাদেশের অফিসিয়াল বাণিজ্য ঘাটতি যে পরিমাণ, সেই পরিমাণই আন-অফিসিয়াল বাণিজ্য চলে ভারতের সঙ্গে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ এখন প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের মত। অথচ বাংলাদেশের হাতেগোনা কয়েকটি পণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশের সুবিধা পায়নি। যে কারণে গবেষকরাও বলেছেন, কেবল সরকারি পর্যায়ে আলোচনা-সমঝোতা হলেই লক্ষ্য অর্জন হবে না। এ অঞ্চলে সাফটা থেকে বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর লাভবান হওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে বড় দেশ ভারত তার বাজার কতোটা উন্মুক্ত করবে তার ওপর। গবেষক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের মতে, সাফটার আওতায় আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে ঠিকই। কিন্তু সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করতে না পারলে অর্থবহ অর্জন সম্ভব হবে না। অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ মাহবুব আলী বলেন, সত্যিকার অর্থে সাফটা থেকে অর্জনের জন্য কাস্টমসের প্রক্রিয়াগত সমন্বয়ন সাধন, ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ও সমন্বয় এবং কার্যকর বীমা ব্যবস্থা জরম্নরি। ঋণপত্রের ক্ষেত্রেও এ অঞ্চলের সবার কাছে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি অনুসরণ করা দরকার। সার্ক অঞ্চলে পণ্যের মানের ক্ষেত্রেও একটি সমন্বতি মান উন্নয়ন প্রক্রিয়া গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধন না হলে বাণিজ্য নির্বিঘ্ন হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাফটার প্রস্তুতিগত বিভিন্ন বিষয় থেকে এখনো পিছিয়ে আছে দেশগুলো। যেমন- গত পহেলা জানুয়ারি 06 থেকে সাফটা চুক্তি কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। আবার শুল্ক সুবিধা কার্যকর হয়েছে পহেলা জুলাই 06 থেকে। এই ছয় মাসে বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত জটিলতা দূরীকরণ, অভ্যনত্দরীণ প্রক্রিয়াসমূহ সম্পন্ন করার কথা। সেটাও সবদেশ সমানভাবে করেনি। অথচ সাফটার আওতায় বাণিজ্য পরিচালনায় যেন কোন অসুবিধা না হয়, হলেও তা দ্রম্নততার সঙ্গে যথাযথভাবে নিরসনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাদি গ্রহণ করার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি আবশ্যক। কিন্তু সেদিকটি উপেক্ষিতই লক্ষ্য করা গেছে। আরেকটু পরিষ্কার করে বলা যায়, বাংলাদেশের কোন পণ্য নেপালে রফতানির ক্ষেত্রে যদি সাফটার আওতায় শুল্ক সুবিধা দাবি করে, সেক্ষেত্রে নেপালের অভ্যনত্দরীণ প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো তা প্রদানের জন্যে সক্ষম কিনা-তা দেখতে হবে। অর্থাৎ কোন পণ্য রফতানির পর অব্যবস্থাপনার জন্য যাতে আমদানিকারক দেশের বন্দরে পড়ে না থাকে। পণ্য খালাসের জটিলতা নিরসনের জন্য গত ছয়মাস সময় দেয়া হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য দেশই শুধু নয়, বাংলাদেশও এসব জটিলতা নিরসনের উদ্যোগ নেয়নি। অথচ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানির সিংহভাগ হয়ে থাকে স্থলবন্দরের মাধ্যমে। দেশের অধিকাংশ স্থলবন্দর ভারতীয় সীমানত্দের সঙ্গে। এসব স্থলবন্দরের অবকাঠামোগত সমস্যাদি প্রকট। নানা জটিলতা আর ঘুষ, দুনর্ীতি, হয়রানিতো রয়েছেই। ভারতীয় অংশেরও অনেক স্থলবন্দরের অবকাঠামোগত সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। ব্যবসায়ীরা জানান, ভারতের অসহযোগিতার জন্যই নেপালের সঙ্গে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের মাধ্যমে বাংলাদেশ যথাযথ বাণিজ্য সম্পাদন করতে পারছে না। এফবিসিসিআই সভাপতি মীর নাসির হোসেনের মতে, বাংলাদেশ তার বাণিজ্য যথেষ্ট উদারীকরণ করেছে। কিন্তু জটিল সার্টিফিকেশন নিয়মাবলী, পাটজাত পণ্যের বিশেষ লেবেলিং, রাসায়নিক পরীক্ষা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো সুবিধার কারণে ভারতে বাংলাদেশের রফতানি বাধাগ্রসত্দ হচ্ছে। তিনি মুক্তবাণিজ্য ব্যবস্থায় লাভবান হওয়ার জন্য সরাসরি যোগাযোগ, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা প্রদানের গুরুত্ব রয়েছে বলে উলেস্নখ করেন। শুধু ভারত নয়, সংশিস্নষ্ট সব দেশের জন্যই এটি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। এছাড়া শুধু পণ্যের ক্ষেত্রে হলেও সেবাখাতকে সাফটায় অনত্দভর্ুক্ত করা হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশিস্নষ্টরা। বিনিয়োগ উন্নয়নের বিষয়টিও অনুপস্থিত। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিনিয়োগ না হলে বাণিজ্য ব্যবধান কমানো যাবে না। এক্ষেত্রেও ভারতের উদাহরণ টেনে তারা বলেন, বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা ভারতে ব্যাংক একাউন্ট খুলতে পারে না। বাংলাদেশীদের ভারতে বিনিয়োগ করতে দেয়া হয় না। অথচ বাংলাদেশে ভারতের ব্যবসায়ীরা দুটোই করতে পারেন। তারা জানান, সার্কের অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতেই বাণিজ্য সম্ভাবনা বেশি।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ভারতের সঙ্গে প্রথম বাণিজ্য আলোচনায় বসে। এ সময় বাংলাদেশের রফতানি বাজার সীমিত হওয়ায় বাংলাদেশ পক্ষ শুধু ভারত ও নেপালে বাণিজ্য সুবিধা চেয়েছিল। কিন্তু ভারত শুরু থেকেই সেদেশের স্বার্থ বিবেচনায় রেখে কাজ করেছিল। '72 সালের মার্চ মাসে ভারতের সঙ্গে প্রথম রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাণিজ্য চুক্তি আলোচনায় বসে বাংলাদেশ। এ সময় একটি খসড়া চুক্তিও করা হয়। ঐ আলোচনায় বাংলাদেশের কিছু প্রসত্দাবকে ভারতীয় কতর্ৃপক্ষ অবাসত্দব ও অবানত্দর হিসাবে উলেস্নখ করে। বাংলাদেশ যুদ্ধবিধ্বসত্দ অর্থনীতিকে ইতিবাচক করতে নেপালের সঙ্গে ট্রানজিট সুবিধা দাবি করে। কিন্তু ভারতীয় কতর্ৃপক্ষ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে সেটা প্রত্যাখ্যান করে। একই আলোচনায় ভারত বাংলাদেশের উপর দিয়ে ট্রানজিট সুবিধা চেয়ে চুক্তির খসড়া তৈরি করে। তখন বাংলাদেশ কতর্ৃপক্ষ রাজি হয়নি, তবে উভয়দেশের স্বার্থের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার কথা সুবিবেচনা করতে সম্মত হয়। অবশ্য, পরবতর্ীতে এটা পরিত্যক্ত হয়। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের সঙ্গে প্রথম বাণিজ্য চুক্তি নিষ্ফল হয়ে যায় এভাবেই। আলোচনা শেষে বাংলাদেশ দলের আশা ভঙ্গ হয়। তারপর থেকে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো, দুদেশের বাণিজ্য বৈষম্য কমিয়ে আনতে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গঠিত হয় সচিব পর্যায়ে, ব্যবসায়ী পর্যায়ে একাধিক ফোরাম। তথাপি বিষয়গুলো অমীমাংসিতই থেকে যায়। অবশেষে সাফটার আওতায় ভারত যদি বাংলাদেশকে নূ্যনতম ছাড় দেয় তাহলে বাণিজ্য ব্যবধান অনেকাংশে কমে আসবে। সংশিস্নষ্টদের প্রশ্ন- ভারত এতটা উদার হবে কি?
ঃঃ দৈনিক ইত্তেফাক ঃ 04.07.2006 ঃঃ
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




