কূলদীপ নায়ার
ৰমতায় থাকাকালীন বিজেপি জোট গত নির্বাচনে বিএনপি-কে অর্থায়ন করায় আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা কখনো নয়া দিলস্নীকে ৰমা করেনি। এ প্রেৰিতে বিজেপি-এর ব্যাখ্যা হলো : অভিযোগমুক্ত থাকার জন্য তারা উভয় দলকেই অর্থ প্রদান করে। নয়া দিলস্নীর চোখে নির্বাচন-বিজয়ী বিএনপি এতটাই ভারত-বিরোধী যে নয়া দিলস্নী কোন রাজনৈতিক দলকেই কখনো সাহায্য না করতে প্রতিশ্রম্নতিবদ্ধ ছিল।
প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়া ভারত সফরকালীন নিশ্চিতভাবে সেই বিষয়ে পরিষ্কার এবং উচ্চ বার্তা পেয়েছেন। শেখ হাসিনার নেই বিষয়ে পরবর্তী নির্বাচনে কোন দুঃখ থাকবে না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কোন রাজনৈতিক নেতাকে না চিনলেও প্রধান মন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশের অভ্যনত্দরীণ রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চান না।
একই সময়ে তিনি খালেদা জিয়ার কাছে এ বিষয়টা একাধিক উপায়ে স্পষ্ট করতে চান যে বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা মৌলবাদ শুধু সংখ্যালঘুদেরকেই প্রভাবিত করছে না, ভারতের অভ্যনত্দরীণ বিষয়ে হসত্দৰেপ ঘটাচ্ছে। জামাতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপি-এর যূথবদ্ধ হওয়া ভারতের অপছন্দ; ভারত বিশ্বাস করে জোট একদিকে বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদকে এবং অপরদিকে ইসলামী উগ্রবাদকে নতুন মাত্রা প্রদান করেছে। ভারতের সবচেয়ে বড় আশংকা যে পাকিসত্দানের আইএসআই (অওঅ) ভারতে গোলযোগ দানা বাঁধাতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
খালেদা জিয়ার কাছে অভিযোগগুলো নতুন নয়। কৃটনৈতিক সূত্রে তিনি এগুলো পূর্বে অনেকবার শুনেছেন। কিন্তু এগুলোর পুনরাবৃত্তি এবং সন্ত্রাসী ক্যাম্প স্থাপনের বিশদসহ যে দৃঢ়তার সঙ্গে নয়া দিলস্নী তা উপস্থাপন করে , তা বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রীকে অনেক পশ্চাতে নিয়ে যায়। তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু একটা বিষয় তিনি দ্বিমত বা অস্বীকার করেননি, তা হলো ইসলামাবাদের সঙ্গে তাঁর 'দৃঢ় বাঁধন'। এটা একতরফা নয়, সম্পর্ক ও সমীকরণের বিষয়। তাঁর পছন্দের বিষয়ে তিনি নয়া দিলস্নীতে কাউকে আর সন্দেহের মধ্যে রাখেননি।
অবশ্য খালেদা জিয়ার প্রধান প্রসত্দাব ছিল বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্যের শুল্কমুক্ত রফতানীর বিষয়ে। অবশ্য নয়া দিলস্নী শুল্কমুক্ত পন্য তালিকা সম্প্রসারণে ইচ্ছুক ছিল। কিন্তু সার্বিক অনুমোদনদানে 'না' উচ্চারণ করে। যদি বাংলাদেশ ভূখন্ড থেকে আনত্দঃসীমানত্দ সন্ত্রাস চালানো না হয়, এ বিষয়ে ভারতকে আশ্বসত্দ করা যেত, তাহলে ভারত খালেদা জিয়ার প্রসত্দাব গুরম্নত্ব সহকারে নিত (নয়া দিলস্নী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রায় একই ধরণের প্রসত্দাব নিয়ে ঢাকার সাথে আলোচনা করে)। অগ্রাধিকার বিষয় ভিন্ন হওয়ায় বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় কোন নির্দিষ্ট বিষয় ওঠে আসেনি। বাংলাদেশ ব্যবসায়িক বিষয়ে এবং ভারত সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে আলোচনা করতে চায়।
গোয়েন্দা, পুলিশ এবং মিডিয়া সূত্র অনুসারে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রধান লৰ্যে বাংলাদেশে 1989 সাল থেকে প্রায় 30টি ধর্মীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠি কাজ করে যাচ্ছে। তাদের অনেক কর্মীই আফগানিসত্দান এবং ফিলিসত্দিনী যোদ্ধা। 70-এর শেষ দিকে এবং 80 এর শুরম্নর দিকে তাদের প্রায় 7000 কর্মীকে লিবিয়া প্রশিৰণ প্রদান করে বলে জানা যায়। আফগানিসত্দান, ফিলিসত্দীন এবং লেবাননে কার্যক্রম থেমে যাওয়ার পর তারা দেশে প্রত্যাবর্তন করে এবং বাংলাদেশে তাদের নেটওয়ার্কের প্রসার ঘটায় । 13টি ধর্মীয় উগ্র গোষ্ঠির মধ্যে নেতৃস্থানীয় সক্রিয় 7টি হলো ঃ (1) হামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), (2) জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), (3) হরকাতুল জেহাদ, (4) শাহদাত আল হিকমা, (5) হিজবুত তৌহিদ, (6) হিজবুত তাহরির, (7) ইসলামী বিপস্নবী পরিষদ। নয়া দি্লস্নী এই তালিকা প্রণয়ন করে।
সন্ত্রাস বিষয়ে এসব বক্তব্যের পর নয়া দিলস্নী ট্রানজিট বিষয়ে জোরালো আলোচনা রাখে; ভারতের উত্তর-পূর্ব প্রদেশগুলোতে সহজ যাতায়াতের স্বার্থে নয়াদিলস্নী ট্রানজিট বিষয়ে ঢাকাকে অনেক বৎসর যাবত অনুরোধ করে আসছিল। খালেদা জিয়া এসব বিষয়ে কোন আশ্বাস দেন নি। কিন্তু তিনি দুৃদেশের প্রতিনিধি সমণ্বয়ে যুগ্মভাবে সংশোধিত দ্বিপাৰিক বাণিজ্য চুক্তির খসড়া গ্রহণ করেন। এতে উভয় পৰের মুখ রৰা পায়। খসড়ায় বলা হয় পণ্য পরিবহনে উভয় দেশ নিজ নিজ ভূখন্ড ব্যবহার করতে পারবে। এটা এক ধরণের সমঝোতার নির্দেশক, কিন্তু কোন কিছুই ম্যান্ডেটরী বা বাধ্যতামূলক নয়। যদি খালেদা জিয়া ট্রানজিট বিষয়ে আগ্রহ দেখাতেন, তবে ভারত শুল্কমুক্ত রফতানীর বিষয়ে সাড়া দিত।
বাংলাদেশীদের সাধারণ ধারণা এই যে যদি একবার ভারত ট্রানজিট সুবিধা লাভ করে , তবে সার্বভৌমত্ব সীমিত হবে। ঢাকার প্রতিনিধিদল এই বিষয়ে কোন রাখঢাক করেনি। আমার অসংখ্য সফরকালে আমি ঢাকায় দেখেছি : ভারতকে সুবিধা প্রদানের ব্যাপারে ঢাকায় প্রচন্ড বিরম্নদ্ধতা, কারণ ঢাকায় এটাকে বাংলাদেশের প্রতি হুমকি হিসাবে গণ্য করা হয়। এটা হলো স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং অনেক বিএনপি সমর্থকের প্রচারণার ফসল।
যদি আমাকে খালেদা জিয়ার সফর মূল্যায়ন করতে হয়, আমি বলব ঃ এটা অচলাবস্থাও নয়, আবার সরল পথচলাও নয়। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে তিনি ভারত-বিরোধী নন যদিও ভারতের ধারণা তিনি ভারত-বিরোধী। আমি মনে করি সে বিষয়ে তিনি ভারতের ধারণা পাল্টেছেন । প্রধান মন্ত্রী মনমোহন সিং তাঁর সফরের সাফল্য চেয়েছিলেন। কিনত্দ তা হয়নি। ভারত দুটি বিষয়ে জোর দিতে চেয়েছিল ঃ সন্ত্রাসবাদের উত্থান এবং ধর্মীয় কট্টরবাদের বৃদ্ধি। ভারত সৌজন্যের সঙ্গে তা করে। উভয় পৰই মনে যা ছিল তা সফলভাবে উত্থাপন করতে সৰম হয়। ভারত যা বলতে পারেনি তা হলো বাংলাদেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক অসহিষঞতা এবং বিরোধী দলের উপর অত্যাচার। সন্ত্রাসবাদ এবং ধমর্ীয় উগ্রবাদ বিষয়ে তাদের করার ছিল না কিন্তু সে বিষয়ে তারা সাহায্য করতে পারে। এ ধরণের পরিবেশ উভয়ের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য অনুকূল নয়। ঢাকা স্বসত্দি অনুভব করতে পারে যে ঢাকা দিলস্নী থেকে ইসলামাবাদের সনি্নকটে। কিন্তু তা কিভাবে বাংলাদেশকে অন্য বিষয়গুলোর ফয়সালা করতে সাহায্য করবে ?
ভাষানত্দর ঃ ড. ইব্রাহীম মুকুল
লেখক : উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক
ঃঃ দৈনিক ইত্তেফাক ঃ 05.04.2006ঃঃ
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




