।। গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ।।
হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পখাত দেশের একটি সম্ভাবনাময় খাত। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ খাত নীরব ভূমিকা পালন করে চলেছে। স্বল্প পুঁজিতে বেশি লাভ এবং মেধা খাটিয়ে পরিশ্রম করে নিত্য নতুন পণ্য উদ্ভাবনের নেশাকে যারা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে চান তারা এসে এ পেশাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে দেশের প্রায় 3 লাখ যুবকের 6 লাখ হাত এ পেশায় অবদান রেখে চলেছে। তারা বছরে প্রায় 5 হাজার কোটি টাকার মেশিনারী, খুচরা যন্ত্রাংশ, নৌযান, বাস, ট্রাক, সেচযন্ত্রের যন্ত্রাংশসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ উৎপাদন করছে। এর মধ্যে প্রায় 2 হাজার কোটি টাকার আমদানি বিকল্প যন্ত্রাংশ ও মেশিনারী রয়েছে। হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের সাথে জড়িতদের একটাই দুঃখ, তারা এখনো শত বছরের পুরাতন প্রযুক্তির উপর নির্ভল করে যন্ত্রাংশ ও মেশিনারী উৎপাদন করছেন, যা সম্পূর্ণ মানসম্মত হতে পারছে না। জাপান ও কোরিয়ার মত প্রযুক্তি বাংলাদেশের এ খাতে হসত্দানত্দর করা সম্ভব হলে এ খাতের উদ্যোক্তারা বিশ্বমানের খুচরা যন্ত্রাংশ ও মেশিনারী তৈরী করতে পারবে, যা বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে। এ খাতের উদ্যোক্তারা জানান, তারা পুরাতন প্রযুক্তির উপর নির্ভর করেই সি,আই,এসভুক্ত তিনটি দেশে পণ্য রপ্তানি করতে সৰম হয়েছে। তারা আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে বিশ্বমানের জাপানের টয়োটা, জার্মানীর মার্সিডিস, কোরিয়ার হুন্ডাই, সুইডেনের ভলভো গাড়ীর খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও রপ্তানি করতে পারবে।
বর্তমানে দেশের সড়ক ও নৌপথে প্রায় 10 লাখ যানবাহন চলাচল করে। এ সকল যানবাহন কোন না কোনভাবে এ খাতের উপর নির্ভরশীল। এ সকল যানবাহন সড়কপথে কিংবা নৌপথে চলাচলের সময় হঠাৎ বিগড়ে গেলে ভাঙ্গা যন্ত্রাংশ নিয়ে হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের কাছে ছুটে আসে। উক্ত যন্ত্রাংশের অনুরূপ যন্ত্রাংশ তৈরী করে আবার যানবাহনে লাগিয়ে সচল করতে সৰম হয় তারা। বর্তমানে ঢাকার ধোলাইখাল, মদনমোহন বসাক লেন, টিপু সুলতান রোড, ওয়ারী, ফোল্ডার স্ট্রিট, নারিন্দা, কলতাবাজার, তাহেরবাগ, বনগ্রাম, গোয়ালঘাট, লালবাগ, ইসলামপুর, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, যশোর, গাজীপুর, নরসিংদী, কুমিলস্না, চট্টগ্রাম, সিলেট, শ্রীমঙ্গলসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। দেশে শ্যালো ইঞ্জিনের শতকরা 50 ভাগ যন্ত্রাংশ এরাই তৈরী করছে। একই সাথে চা বাগানের যন্ত্রাংশ, পস্নান্টেশন, ফিশিং টলার, ইঞ্জিন চালিত প্রায় 4/5 লাখ নৌযান, জুট ও টেক্সটাইলের অনেক খুচরা যন্ত্রাংশ, জুটের উইন্ডিং মেশিন, ওয়াশিং পস্নান্ট, মোল্ড, শপিং ব্যাগের পস্নান্ট, বাস-ট্রাকের ও ছাপাখানার যন্ত্রাংশ এরাই যোগান দিয়ে যাচ্ছে।
দেশের প্রধান খাত কৃষি হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের উপর নির্ভর করে উৎপাদন বৃদ্ধি করে চলেছে। কৃষির সেচযন্ত্র সচল রেখেছে। অনেক সময় বাকীতে মেরামত করে দিয়ে কৃষকরা ধান উঠলে তারা বিক্রি করে হালকা ইঞ্জিনিয়রিং খাতের পাওনা পরিশোধ করছে।
হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের কাঁচামাল এখন মূলতঃ পুরাতন সমুদ্রগামী জাহাজের উপর নির্ভরশীল স্ক্র্যাপ হিসেবে বাংলাদেশে যে জাহাজ ভাঙ্গা হয় তার একটি বৃহৎ অংশ রিরোলিং মিলে এম,এস রড তৈরীর জন্য চলে যায়। বাকী অংশ লোহা, পিতল, পাইকাসহ অন্য সব খুচরা যন্ত্রাংশ হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য আনা হয়। এই কাঁচামালই কমর্ীর হাতে পড়ে যন্ত্রাংশ হিসেবে তৈরী হয়ে মূল্য সংযোজন করে।
হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রাজ্জাকের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, এ খাতে প্রায় 40 হাজার প্রতিষ্ঠানে প্রায় 3 লাখ উদ্যোক্তা, শ্রমিক, কর্মচারী, মেকানিক জড়িত রয়েছে। এ খাতে ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের প্রায় 4 হাজার কোটি টাকার মূলধন বিনিয়োগ রয়েছে। তিনি বলেন, এ খাতের যেমন প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে তেমনি কিছু সমস্যাও রয়েছে। সরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে আসলে এ খাতের সমস্যার সমাধান সম্ভব। প্রযুক্তি হসত্দানত্দরের পাশাপাশি ভ্যালু চেইন স্থাপনের মাধ্যমে স্বল্পসুদে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিলে এ খাত বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে। এ খাতে এখনো 2শ' টাকার কাঁচামাল ব্যবহার করে 2 হাজার টাকা আয় করা সম্ভব।
এ খাত সম্পর্কে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বাংলাদেশস্থ আবাসিক প্রতিনিধি মিসেস হুয়া দু বলেছেন, পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ যেমন অগ্রগতি লাভ করেছে এই খাতেও তেমনি অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব। তবে তার জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন, যথাযথ বিদু্যৎ সরবরাহসহ ব্যবসার বাসত্দব পরিবেশ তৈরী করা প্রয়োজন ।
ঃঃ দৈনিক ইত্তেফাক ঃ 06.04.2006 ঃঃ
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



