সরকারী প্রতিষ্ঠান "বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন" (বিআরটিসি)'র বিরম্নদ্ধে বাংলাদেশের দৰিণ-পশ্চিমাঞ্চলের 16টি জেলার বাস মালিকরা দস্তুরমত জেহাদ ঘোষণা করেছে। বিআরটিসি বাস সার্ভিস বন্ধের দাবিতে তারা এই এলাকার শতাধিক রম্নটে ইতোমধ্যে দুইদিনের জন্য বাস ধর্মঘটও করেছে। গত শনিবার সকালের পত্র-পত্রিকার খবরে দেখেছি, শুক্রবার সন্ধ্যায় 10টি জেলার বাস মালিকরা তাদের ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছে, তবে বাকী 6টিতে তাদের জেহাদ এখনো জারী আছে।
ঢাকা শহরে এবং ঢাকার বাইরে চলাচল করার জন্য আমাকে এবং আমার স্ত্রীকে বাসের উপরই নির্ভর করতে হয়, কারণ আমাদের কোন গাড়ী নেই। তাই বাস সার্ভিস সেক্টরে কখন কোথায় কি ঘটছে, তাতে ভোক্তা হিসেবে আমাদের আগ্রহতো আছেই; আগ্রহ আছে একজন সমাজ সচেতন নাগরিক হিসেবেও।
প্রাইভেট বাস মালিকদের দাবি বিআরটিসি এখানে-সেখানে কাউন্টার বসিয়ে টিকিট বিক্রি করে, যাত্রী উঠায়, এতে তাদের ব্যবসার ৰতি হচ্ছে, তারা বাস ব্যবসা চালাতে পারছে না, তাদের ব্যবসা বন্ধও হয়ে যাচ্ছে। বাস মালিকদের কথাবার্তায় মনে হয়, তাদের লাভ নিশ্চিত করার জন্য তারা যে কোনকিছু করতে প্রস্তুত। তারা একদিন হয়ত বলে বসবে তাদের বাড়ী বাড়ী গিয়ে তাদের মাসিক টাকা দিয়ে আসতে হবে সরকারকে। কারণ বাস ব্যবসায়ে কত কষ্ট! কত ঝামেলা! কি দরকার এতসব রিস্ক নিয়ে? তাদের হাতে যখন সিন্ডিকেট, সংগঠন আছে, তারা সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করলে, সরকার তাদের বাড়ী বাড়ী গিয়ে মাসিক হারে টাকা দিয়ে আসতেও বাধ্য হবে। বিশেষ করে আর কোন ৰেত্রেও যখন তারা কোন নিয়ম-কানুন মানছে না, এখানেও আইন-কানুন, বিধি-বিধান মেনে এত কষ্ট করে বাস চালানোর দরকারটা কি? তার উপর যোগাযোগ মন্ত্রী নাজমুল হুদা যখন গত সাড়ে চার বছরে তাদের একটা লোমও ছিড়তে পারেননি, বারবার তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছেন, আপোস করেছেন, এখন আর একটু ঠেলা দিলে নাজমুল হুদা আবার তাদের কাছে 'সারেন্ডার' করতে বাধ্য হবেন। মানে বিআরটিসি তুলে নিতেও বাধ্য হবেন। আমরা এই সাড়ে 4 বছরে বারবার দেখেছি যাত্রীদের স্বার্থ রৰা করা নাজমুল হুদার উদ্দেশ্য নয়, তার উদ্দেশ্য বাস মালিকদের দেখ্ভাল করা। তাতে যে তার স্বার্থ রৰা হয়।
প্রাইভেট বাস মালিকদের আবদারটা লৰ্য করম্নন। গ্রামে বাস চালানোর খরচ ডিজেলের পাঁচ ছয়ভাগের একভাগ হলেও সিএনজি বাসওয়ালারা ডিজেলচালিত বাসের ভাড়াই আদায় করছে যাত্রীদের কাছ থেকে। প্রতি মাসে নাজমুল হুদা সিএনজি বাসের ভাড়া কত হওয়া উচিত তা নির্ধারণ করার জন্য তার মন্ত্রণালয়ে একটি সভা ডাকলেন। সিএনজি বেবী ট্যাক্সির মালিকরা নাজমুল হুদার দাওয়াত গ্রাহ্যই করল না। সিএনজি বাস মালিক মরদদের একথা পেট্রোল/ ডিজেলচালিত বাসের চাইতে সিএনজি বাসের ভাড়া কম হতে পারবে না। এই মরদদের যুক্তি, তাদের বাস তাড়াতাড়ি ৰয় হয়ে যায়। বেশীদিন চালানো যায় না, তাই তাদের লাভও হয় না ইত্যাদি। নাজমুল হুদা সেদিন এই মরদদের যুক্তি নামের এইসব আবর্জনা গিলে ফেল্লেন, মানে বৈঠক শেষ করলেন কোন সিদ্ধানত্দ ছাড়াই।
বাস মালিক মরদরা প্রায়ই তাদের লোকসানের কথা বলে। কিন্তু বছরে কয়টি বাস কোম্পানী লাভ হচ্ছে না বলে বন্ধ হয়ে গেছে, তার সংখ্যা কোনদিনই উলেস্নখ করে না। বরং আমরা উল্টাটাই তো দেখি। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এই ঢাকা শহরেও নতুন নতুন সার্ভিস চালু হচ্ছে। চালু হচ্ছে দেশের প্রায় সব জায়গাতেই। লাভই যদি না হবে, তবে কি দাতব্য চিকিৎসালয়ের মত এইসব বাস সার্ভিসও 'চ্যারিটেবল সার্ভিস'?
'চ্যারিটেবল বাস সার্ভিস' দূরের কথা, সরকার নির্ধারিত ভাড়াতেও এইসব মুনাফাখোরকে বিশ্বাস করে না। যে কোন অজুহাতেই তারা সরকার নির্ধারিত ভাড়ার প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ প্রকাশ করে।, তারা তাদের নিজেদের মত করেই ভাড়া আদায় করে। এই অভিজ্ঞতাটা দেশের প্রতিটি বাস যাত্রীর। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তাদের লাভও বাড়ে। অনুপাতিক হারে ভাড়া না বাড়িয়ে তারা তাদের মত করেই ভাড়া আদায় করে। বাসযাত্রী কেউ প্রতিবাদ করলে সন্ত্রাসী চরিত্রের বাস ড্রাইভার, হেলপার-কনডাকটররা বাস যাত্রীর উপর হামলা করে।
সাধারণ মানুষও যে কোন সুযোগে বাসে আগুন দেয়, প্রাইভেট বাস মালিকরা কখনোই সাধারণ মানুষের সমর্থন পায় না। কারণ সাধারণ মানুষ যে এইসব বাস মালিক, ড্রাইভার, কনডাকটরদের হাতে জিম্মি। এই দেশের মানুষ অসহায়, নিরীহ হতে পারে কিন্তু তারা নির্বোধ তো নয়। তারা দেখছে তাদের চোখের সামনে লাইন্সেসবিহীন বাস কনডাকটরা ড্রাইভারের আসনে বসে গাড়ী চালাতে গিয়ে শিশু-কিশোর বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মারছে, কনডাকটরের কি কেরামতির জোরে বাস মালিক হয়ে পড়েছে। তারপর একদিন 'আলহাজ্ব'ও হয়ে গেছে, তাও এই দেশের মানুষ প্রতিনিয়ত দেখছে।
এইসব 'আলহাজ্ব' বাস মালিক দুই ঈদের সময় বাস ভাড়া 'ডাবল' আদায় করে। তবলীগের বিশ্ব ইজতিমার সময়ও বয়স্ক বাসযাত্রীদের সাথে চরম অসদাচরণ করে, শিশু মহিলাদের প্রতিও এইসব 'ধার্মিক' পুরম্নষদের কোন দয়ামায়া নেই। বাসে যাত্রী তোলার জন্য এরা দুই মিনিটের জায়গায় হয়ত দশ মিনিট অপেৰা করবে, বাসযাত্রীদের তখন তারা বাপচাচাও ডাকে। কিন্তু বাস থেকে নামার জন্য তারা নির্ধারিত স্থানে এক মিনিটও দাঁড়াতে চায় না, পারলে সেই একই কায়দায় আপনাকে তারা গলাধাক্কা দিয়ে চলনত্দ বাস থেকে রাসত্দাতেই ফেলে দেয়। এইসব বাস মালিক সন্ত্রাসীরা হয়তো এককোটি টাকা খরচ করেই বাস কিনবে, কিন্তু পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে তাদের ড্রাইভার, সুপারভাইজারদের জন্য আদব-কায়দার ট্রেনিং-এর আয়োজন করবে না। লোভ এবং লাভ এইসব বাস মালিক সন্ত্রাসীদের একমাত্র লৰ্য। তাই তারা বিআরটিসি বাস সার্ভিসের বিরম্নদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে। কারণ বিআরটিসি বাস সরকার নির্ধারিত রেটে, দূরত্ব হিসাব করে ভাড়া আদায় করে, ঈদে, ইজতিমায়, বিআরটিসি ভাড়া বাড়ায় না। বিআরটিসির ড্রাইভার, কন্ডাকটাররা সাধারণতঃ যাত্রীদের সাথে অসদাচরণ করে না, কেউ করলে তার বিরম্নদ্ধে বিআরটিসির চেয়ারম্যানের কাছেও অভিযোগ করা যায়। কিন্তু কোন প্রাইভেট বাস তাদের বিরম্নদ্ধে অভিযোগের কোন সুযোগ নেই। বাসের মালিক বা ম্যানেজার কে, তারা কোথায় বসে, তা জানে না যাত্রীরা। 'গেটলক' সাভর্িেস তারা পথে পথে যাত্রী তোলে, 40 জন যাত্রীর বাসে তারা 50 জন যাত্রী উঠায়, দশবছর আগে যে বাস, মিনিবাসকে 'স্ক্রাপ' ঘোষণা করার কথা, রং লাগিয়ে তা চালাচ্ছে এইসব বাস মালিক 'ভাল্চার'। রোড পারমিট সার্টিফিকেটহীন এইসব বাস দুর্ঘটনায় পড়লে যাত্রী মারা যায়, যাত্রী আহত হয়। কিন্তু বাস ড্রাইভার সব সময় পালিয়ে যেতে পারে। বাস মালিকদেরও তাতে তেমন কোন ৰতি নেই, কারণ এক্সিডেন্টে ৰতিগ্রসত্দ বাস-মিনিবাসের জন্য ইনসুরেন্স কোম্পানী থেকে ৰতিপূরণ পাওয়া যায়। বাস মালিকরা কোটি টাকা দিয়ে বাস কিনে ঠিকই, কিন্তু বাস রাখার জন্য কোন গ্যারেজের ব্যবস্থা করে না। সরকারী রাসত্দার উপরই তাদের বাস রাখার ব্যবস্থা। ঢাকার গাবতলী, আমিনবাজার এবং কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিম পাসে রাসত্দার উপর হাজার হাজার ট্রাক পার্ক করা থাকে দিনের যে কোন সময়ে। তাতে অন্যসব যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশ বাস-ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি বগুড়ার জিএম সিরাজ এমপির কিছু যায় আসে না। সরকারী রাসত্দায় বাস-ট্রাক পার্ক করে রাখার জন্য সরকারকে তাদের কোন পার্কিং ফি দিতে হয় না। কারণ তিনি যে, সরকার দলীয় এমপি। সরকার দলীয় এমপিকেও আইন মানতে হবে, এ কেমন কথা?
(দুই)
বিআরটিসির বিরম্নদ্ধে প্রাইভেট বাস মালিকরা জেহাদ ঘোষণা করে চলেছেন কয়েক বছর ধরেই। জেহাদকারী আছে জি এম সিরাজ এমপির নেতৃত্বেই। তবে এইবার সারাদেশে ধর্মঘট না ডেকে শুধু খুলনা ও বরিশাল ডিভিশনে প্রাইভেট বাস মালিকরা কেন ধর্মঘট ডাকল, তা বুঝলাম না। বিআরটিসি তো দেশের আরো আরো জায়গায় চলছে। বিআরটিসি কি শুধু এই খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বাস মালিকদের ব্যবসার ৰতি করছে?
শুক্রবার সন্ধ্যায় টিভির খবরে দেখলাম, ধর্মঘটী বাস মালিকদের এক সর্দার বিআরটিসির চেয়ারম্যান তৈমুর আলম খোন্দকারের নাম নিয়ে এবং তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে বলেছে, তৈমুর আলম খোন্দকার তার বিআরটিসির বিভিন্ন ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় 'যাত্রী কল্যাণ সমিতি' নামের কতগুলো সংগঠন খাড়া করেছেন। তৈমুর আলম খোন্দকার যদি তা আসলেই করে থাকেন, আলহামদুলিলস্নাহ। বিআরটিসির চেয়ারম্যান সাহেব যদি এমন সংগঠন চালু করতে পারেন তাহলে বাস মালিক সন্ত্রাসীদের মোকাবেলা করার জন্য তা বড় এক সওয়াবের কাজ হবে।
তৈমুর আলম খোন্দকারকে মাঝে মাঝে চ্যানেল আই'র 'তৃতীয় মাত্রা' অনুষ্ঠানে দেখি। প্রাইভেট বাস মালিকদের দৌরাত্ম্য এবং উদ্ভট সব দাবী নিয়ে 'তৃতীয় মাত্রা' একটি আলোচনা অনুষ্ঠান আয়োজন করার জন্য চ্যানেল আইকে অনুরোধ করছি। তৈমুর আলম খোন্দকার এবং বাস মালিকদের শীর্ষ সর্দার কি আলোচনা অনুষ্ঠানে নিজ নিজ পৰে যুক্তি দেবেন এবং দেশের মানুষ তা দেখবে। বাস মালিকদের লাভ বাড়ানোর জন্য কেন বিআরটিসিকে উঠে যেতে হবে, তুলে দিতে হবে, তার পৰের যুক্তিগুলো সর্দারদের মুখ থেকেই শুনতে চাই। সম্ভব হলে শ্রোতা-দর্শক, বাস যাত্রীদের অংশগ্রহণের ব্যবস্থাও রাখা দরকার। আমি প্রতিদিন এতগুলো পত্রিকা পড়ি, এতগুলো প্রাইভেট চ্যানেলের এতগুলো নিউজ বুলেটিন দেখে থাকি। কিন্তু বিআরটিসির বিরম্নদ্ধে এইসব সর্দারের যুক্তি-বক্তব্য কোথাও দেখি না। তবে শুক্রবার ভোরে বিবিসি বাংলার কাদির কলেস্নাল কিছু প্রশ্ন করেছিল এক সর্দারকে। এইসব সর্দারের কথাবার্তা এই দেশের মানুষ আরো আরো শুনতে চাইবে বলে আমার বিশ্বাস।
বাস মালিক সর্দারদের সবশেষে একটি কথা বলি- প্রতিযোগিতা হচ্ছে "ক্যাপিটালিজম"-এর মূলমন্ত্র, মূলকথা। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারলে "গেটলস্ট"। বিআরটিসি উঠিয়ে দিয়ে, প্রতিযোগিতা উঠিয়ে দিয়ে "ভাল্চার ক্যাপিটালিস্ট" বাস মালিকদের বাঁচিয়ে রাখার কোনই দরকার নেই। এই "ভাল্চার ক্যাপিটালিস্টরা" জানে না যে মাত্র 30 বছর আগে যে "প্যান এম" দুনিয়ার এক নম্বর এয়ারলাইন ছিল, প্রতিযোগিতায় টিকতে পারল না বলে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে আরো আরো দুনিয়াখ্যাত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান।
মাত্র নয়শ'র মত বিআরটিসি বাসের বিপরীতে দেশের প্রায় এক লাখ বাস-মিনিবাস যদি প্রতিযোগিতায় ব্যবসা করতে না পারে তাহলে তাদের এই ব্যবসায় থাকার দরকারটা কি?
আমার তো মনে হয়, দেশের মানুষ বিআরটিসির বাস সার্ভিস বন্ধ নয় বরং আরো আরো নতুন রম্নটে বাস সার্ভিস চায়। বিশেষ করে প্রাইভেট বাস-মিনিবাসে সাধারণ বাসযাত্রীরা যখন এতভাবে অপমানিত, নির্যাতিত হচ্ছে, সরকার আশাকরি বিআরটিসির বাস সার্ভিস বাড়ানোর প্রসত্দাবটি "সিরিয়াসলিই" বিবেচনা করে দেখবে।
[মহিউদ্দিন আহমদ ঃ সাবেক সচিব ও কূটনীতিবিদ, কলামিষ্ট]
ঃঃ দৈনিক ইত্তেফাক ঃ 08.05.2006 ঃঃ
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




