যখন কোন ঘটনা ঘটে তখন আমরা তার কারণ খুঁজতে চাই। ৰতিয়ে দেখতে চাই ঐসব ঘটনা বা সংঘাতের পেছনে কি কি ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। গত মঙ্গলবার ঢাকা শহরে ভাঙচুরের যে তান্ডব বয়ে গেছে তার কারণ খুঁজতে গিয়ে আমরা হতাশ হয়েছি। রাজনৈতিক কারণে মিছিল, শোভাযাত্রা, ধর্মঘট ইত্যাদি স্বাভাবিক বিষয়। এই স্বাভাবিক বিষয়গুলো থেকে যদি অস্বাভাবিক কিছু ঘটে তাহলে হতাশ হতে হয় বৈকি! যেমনটি আমরা গণমাধ্যমে জেনেছি। সেদিন একটি ন্যায্য গণদাবীর সমর্থনে যুব সংগ্রাম পরিষদ বিদু্যৎ অফিস ঘেরাও-এর ডাক দিয়েছিল। ঐ যুবকেরা নিশ্চয়ই গাড়ি ভাঙচুরের জন্য রাসত্দায় নামেনি। সরকার যেখানে সম্পদ রৰায় সচেষ্ট সেখানে তাদের পৰ থেকে ঐ ঘটনা অসম্ভব। তাহলে এই যুবকেরা কারা? যারা প্রকাশ্য দিবালোকে মহা উৎসবে বেপরোয়াভাবে শত শত গাড়ি ভাঙচুর করেছে। সরকার বা বিরোধীদল কারো পৰেই এই দায় এই দায়িত্ব অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।
এই দেশে স্বাধীনতার তিনযুগ পরেও যখন এই দৃশ্য দেখতে হয় তখন অবশ্যই বুঝতে হবে যে, আমরা স্বাধীনতার মর্মার্থ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি। এই দেশে কিছু লোক মনে করে স্বাধীনতার অর্থই হচ্ছে অবাধে অরাজকতা। এই দেশে ঐসব লোকেরা মনে করে স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে যার যা ইচ্ছা তাই করা। এই দেশে ঐসব লোকদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে প্রত্যৰ ও পরোৰভাবে এই দুবর্ৃত্ত গড়ে উঠেছে। এরা রাজনীতিকে করেছে দুর্বৃত্ত কবলিত, অর্থনীতিকে করেছে লুটপাটের চারণভূমি, সমাজকে করেছে কলুষিত এবং সংস্কৃতিকে বানিয়েছে ভোগবাদের গোলাম। এসব লোকেরা বক্তৃতায় ভাল কথা বলে, গণমাধ্যমে চাতুর্যের সাথে বুদ্ধিজীবীসুলভ কথা বলে আর মাঠে-ময়দানে পেটোয়া বাহিনী পালে। এইসব রাজনীতির কুশীলবরা দায় এড়ানোর জন্য একে অপরের বিরম্নদ্ধে কথা বলে। যখন দায় নিরূপিত হয় তখন কেতাবি বাক্য উচ্চারণ করেঃ 'সর্বৈব মিথ্যা ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত'। গত মঙ্গলবার কি ঘটেছিল? যুব সংগ্রাম পরিষদের পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচী অনুযায়ী বিদু্যতের দাবীতে মতিঝিলের বিদু্যৎ উন্নয়ন বোর্ড অফিস ঘেরাও করতে যায়। এখানে পুলিশের সাথে তাদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ইট-পাটকেল নিৰেপ এবং যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। উলেস্নখ্য যে, সরকার বিরোধী আন্দোলনরত চৌদ্দ দলের যুব ফ্রন্ট হিসেবে আওয়ামী যুবলীগের নেতৃত্বে ঘেরাও কর্মসূচী পালনকালে এইসব ঘটনা ঘটে। যুব সংগ্রাম পরিষদের এই ঘেরাও কর্মসূচি চলাকালে মতিঝিলসহ রাজধানী রীতিমত দুর্বিপাকে নিপতিত হয়।
এই ভয়াবহ যানজটের আরো কারণ রয়েছে। ঐদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিৰুব্ধ ছাত্ররা শাহবাগ মোড়ে ব্যাপক গাড়ি ভাঙচুর করে। বাসের ধাক্কায় আহত ছাত্রের মৃতু্যর গুজব ছড়িয়ে যাওয়ায় ছাত্ররা ঐ লঙ্কাকাণ্ড ঘটায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের আশ্বাসের প্রেৰিতে সাধারণ ছাত্ররা ভাঙচুরে নিবৃত্ত হলেও রাজনৈতিক পরিচয় ধারীরা সন্ধ্যা পর্যনত্দ অবরোধ অব্যাহত রাখে। ঐদিন ঐ সময় আরো একটি ঘটনা ঘটে। মতিঝিলের শাপলা চত্বরে আওয়ামী যুবলীগের আন্দোলন অবরোধের কথা শুনে ৰমতাশীল দলের যুব সংগঠনের নেতা-কমর্ীরা পল্টন মোড়ে বিৰোভ সমাবেশের আয়োজন করে। দৃশ্যত তারা চৌদ্দ দলের প্রতিপৰ হিসেবে আবিভর্ূত হয়। একইদিনে একই সময় নগরীর তিনটি গুরম্নত্বপূর্ণ মোড়ে এইসব ঘটনার প্রেৰিতে নগরীতে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়। জনগণ চরম দুর্ভোগে নিপতিত হয়। দিনে দিনে এমনসব ঘটনায় নগরীতে বসবাস দুঃসহ হয়ে উঠছে।
এমনিতেই আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে অরাজক অবস্থা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তারপর কোন জনপ্রিয় ইসু্যতে জনগণের আবেগ, উচ্ছ্বাস, আশা-আকাঙৰা এবং সেন্টিমেন্টের প্রকাশ সহজ এবং স্বাভাবিক। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে তেল, বিদু্যৎ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর যে আকাশচুম্বী মূল্য তাতে ঐ ধরনের আন্দোলন জনপ্রিয় হওয়াই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব শুধু নিয়মভাঙা নয় নিয়ম রৰাও। তাই এই ভাঙচুরের ঘটনাকে সহজভাবে দেখা যায় না। এসব কর্মকাণ্ডের জন্য পৰ ও বিপৰসহ সকল রাজনৈতিক এলিটদের জবাবদিহি করতে হবে। জনগণ স্বাভাবিকভাবেই ন্যয় বিচার চায়। সহজ জীবন যাত্রা প্রত্যাশা করে। কোন কিছুর জন্য কোন কিছু করতে গিয়ে তারা সমাজের জন্য নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি করতে চায় না। রাজনৈতিক দলের আড়ালে-আবডালে একদল দুবর্ৃত্ত বা সন্ত্রাসী সমসত্দ রাজনৈতিক অঙ্গনকে কলুষিত করে তুলছে।
আজকের এই ঘটনা নতুন নয়। যখন-তখন কারণে এবং অকারণে হরহামেশা এই ঘটনা ঘটছে। গাড়ি ভাঙচুর যেন বাংলাদেশের একটি অনাকাঙ্খিত কালচারে পরিণত হয়েছে। হানিফ সংকেতের মত করে বলা যায়ঃ পরীৰায় ফেল-ভাঙ গাড়ি, চাকরি চাই-ভাঙ গাড়ি, ডাক্তারের অবহেলা-ভাঙ গাড়ি, খেলার মাঠে পরাজয়-ভাঙ গাড়ি, পুলিশি একশন-ভাঙ গাড়ি, কোর্টের রায় পছন্দ হয়নি-ভাঙ গাড়ি, বিদু্যৎ নেই-ভাঙ গাড়ি, সার পাওয়া যায় না-ভাঙ গাড়ি, তেল নিয়ে তেলেসমাতি-ভাঙ গাড়ি, রাজনৈতিক গ্রেফতারি-ভাঙ গাড়ি। এভাবে গাড়ি ভাঙা যেন একটি ৰুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশের বাহনে পরিণত হয়েছে। বিৰুব্ধ লোকেরা আর কিছু পারম্নক আর না পারম্নক নিরীহ গোবেচারী যাত্রী সাধারণের উপর চড়াও হতে মহাওসত্দাদ। বিশেষ করে দামী গাড়িগুলোর প্রতি তাদের বিশেষ বিদ্বেষ। ভাবখানা এই যে এই সব গাড়ি-ঘোড়া না থাকলে তাদের দাবি-দাওয়া সহজেই আদায় হয়ে যেত।
এই গাড়ি ভাঙ্গা রোগ এক মনোসত্দাত্তি্বক ব্যাধি। এই মনোসত্দাত্তি্বক ব্যাধিটি দীর্ঘকাল ধরে আমাদের রাজনৈতিক এলিটরা লালন-পালন করেছেন। দুধ, কলা দিয়ে সাপ পোষার মত। এটা এখন আমাদেরকে দংশন করতে শুরম্ন করেছে। বৃটিশ আমলে রাজনৈতিক এলিটরা শিখিয়েছেন- 'কোম্পানীকা মাল দরিয়ামে ঢাল'। পাকিসত্দান আমলে শুনেছি-'সরকারকা মাল দরিয়ামে ঢাল'। এখন দেশটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম। বৃটিশ বা পাকিসত্দান আমলের শেস্নাগান এখন আর কার্যকর নয়। কারণ গাড়িগুলো এখন এই দেশের জনগণের সম্পদ। সরকারি গাড়ির মালিকতো জনগণই। জনগণের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা এবং কষ্ট করে দেয় ট্যাক্স-এর টাকায় কেনা হয় ঐসব গাড়ি। যেসব গাড়ি এইসব লোকেরা ভাঙ্গছে তার কোনটি হয়ত হাসপাতালের, আবার কোনটিবা শিৰা অফিসের অথবা জরম্নরি রপ্তানি কাজে নিয়োজিত। তাহলে সেই গল্পের মত- 'যে ডালে বসে আছে সে ডালই কাটছে'। নিজেরাই নিজেদের ৰতি সাধন করছে। ঐসব অর্বাচিন যুবকদেরকে একথাটি বলবার মত, এসব বিষয় বোঝাবার মত কেউ কি এদেশে নেই? এদেশে একটি সুশীল সমাজের আবির্ভাব লৰ্য করা যাচ্ছে। তারা সভা-সমিতিতে বড় বড় কথা বলছেন, ভাল ভাল কথা লিখছেন, এই গাড়ি ভাংচুরের ঘটনার পর জনগণ তাদের কোন আহা-উহু লৰ্য করেনি। আর রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের প্রতিবাদ তো দূরাশামাত্র। আমরা দীর্ঘ বিগত তিন যুগেও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পৰ থেকে এই ধরনের নির্বিচার গাড়ি ভাংচুরের ঘটনার নিন্দা লৰ্য করিনি। রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে একথা একটি অপ্রিয় সত্য। অবশ্য সরকারে গেলে তাদের ভাষা পাল্টে যায়। তারা জনগণকে দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। যখন বিরোধী দলে থাকেন তখন দায়িত্বের কথা মনে থাকে না। প্রতিটি রাজনৈতিক দল এবং অঙ্গ সংগঠনের সূচনা শেস্নাগান হচ্ছেঃ 'একশন একশন ডাইরেক্ট একশন'। 'জ্বালাও জ্বালাও আগুন জ্বালাও'। এই একশন এবং আগুন কার বিরম্নদ্ধে কিসের জন্য তারাও হয়ত তা জানে না। সরকার এবং বিরোধী দল উভয়েরই একই শেস্নাগান। তাহলে বুঝতে হবে একটি মারমুখো চরমপন্থী, অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি সিন্দাবাদের দৈত্যের মত আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। একটি গণতান্ত্রিক সহিষ্ণু সংস্কৃতি গড়বার জন্য কোন উদ্যোগ রাজনৈতিক এলিটদের পৰ থেকে লৰ্য করিনি। একজন রাজনেতিক নেতার উপর ব্যক্তিগত আক্রমণ হলেও উদারভাবে তার প্রতিপৰ থেকে প্রতিবাদ লৰ্য করা যায়নি। এটা দুঃখজনক। গাড়ি ভাংচুরের মত অসহিষ্ণুতা উক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক এলিটরা এর দায়-দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন না।
এই ধরনের প্রবণতা প্রতিরোধে দেশে কঠোর আইন হওয়া উচিত। যে দল, গ্রম্নপ বা গোষ্ঠীর তরফ থেকে এই ধরনের ভাংচুর ঘটবে আইন করে তাদেরকেই দায়-দায়িত্ব বহনে বাধ্য করতে হবে। প্রাথমিকভাবে এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে রাজনৈতিক ঐক্যমত সৃষ্টি হতে হবে। দ্বিতীয়ত সরকার এবং সামাজিক গোষ্ঠী তথা সাধারণ মানুষের পৰ থেকে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, রেডিও টেলিভিশন তথা সমসত্দ গণমাধ্যমে এই ধরনের ন্যক্কারজনক কার্যক্রমের নিন্দা প্রচার করতে হবে। এ সম্পর্কে ইতিবাচক প্রোগ্রামও নিতে হবে। সর্বশেষ কথা হলো- ভাংচুর যারা করল তাদের থেকে আইন করে ৰতিপূরণ আদায় করতে হবে। গত মঙ্গলবারের ঘটনা সম্পর্কে কোন কোন প্রচার মাধ্যমে এমন ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে যে কোন তৃতীয়পৰ অথবা উদ্দেশ্যমূলক গোষ্ঠী অথবা ষড়যন্ত্রকারীরা ঐ ঘটনার জন্য দায়ী। বাংলাদেশে এমন ঘটানো অস্বাভাবিক নয়। এদেশে অনেক সময় 'খেয়ে যায় মোচওয়ালা আর নাম পড়ে দাড়িওয়ালার'। সুতরাং সরকারের তরফ থেকে একটি স্থায়ী ভিজিলেন্স টিম কার্যকর থাকলে তাৎৰণিক ৰয়ৰতি নিরূপণে সুবিধা হয়।
সর্বোপরি সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকে আহূত মাইন্ড সেট (গওঘউ ঝঊঞ) বা জনমনভঙ্গির পরিবর্তন সাধন করতে হবে। এখন গাড়ি ভাঙা যে আর পরের ৰতি সাধন নয় বরং নিজেদের সর্বনাশ এটি সবাইকে বোঝাতে হবে। এখানে সবচেয়ে গুরম্নত্বপূর্ণ সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে রাজনৈতিক এলিটরা। গত মঙ্গলবারের গাড়ি ভাঙচুরের পর বা কর্মসূচি পরবতর্ীকালে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের বিবৃতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে ঐসব বিবৃতিতে এরকম নির্বিচার গাড়ি ভাঙচুরের প্রতিবাদ করা হয়নি। সরকারী মহাজনরা সরকারী তাগিদেই কথা বলেছেন। তারা বিরোধী দলে থাকলে হয়ত এটিও করতেন না। আবার আগামীতে অঘটন ঘটন পটিয়সীরা ৰমতায় গেলে ভাষা পাল্টে যাবে। কিন্তু তাতে জনগণের অবস্থার কোন পরিবর্তন হবে না। প্রবাদ আছে 'বাঘে মহিষে লড়াই করে টুলু খাগড়া পড়িয়া মরে।' জনগণ উলু খাগড়ার মত চিরকালের জন্য চিরকালই নিষ্পৃষ্ট হতে থাকবে? গেল কয়েক মাস আগে শাহাবাগ মোড়ে গাড়ি ভাঙচুররত ছেলেদের প্রতি করজোড়ে নিবেদনরত এক বৃদ্ধা মহিলার করম্নণ ছবি সকলের বিবেককে স্পর্শ করে। সুতরাং ঐ করম্নণ আর্তির পুনরাবৃত্তি কোন বিবেকবান মানুষ আর দেখতে চায় না।
[ড: আবদুল লতিফ মাসুম : ট্রেজারার, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়]
ঃঃ দৈনিক ইত্তেফাক ঃ 15.05.2006 ঃঃ
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



