ঝনাইদহ সদর উপজেলার খড়িখালী গ্রামের গোপেন্দ্র নাথ চক্রবতর্ী নিপুণ হাতে শোলা থেকে তৈরি করেন তাজমহলসহ নানান শিল্পকর্ম। ঢাকার বাজারে তার শিল্প কর্মের দারম্নণ কদর। প্রতি বছর বৈশাখী মেলায় হোটেল সোনারগাঁতে স্টল দেন তিনি। তবে তার স্টলের যাবতীয় ব্যবস্থা করে দেয় বিসিক।
কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার আড়পাড়া গ্রামে জন্ম গোপেন্দ্র নাথ চক্রবতর্ীর। বৈবাহিক সূত্রে খড়িখালীতে এসে স্থায়ী আবাস গড়েছেন। তবে থাকেন ঢাকায় এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে ছোট চাকরি করেন। অবসরে শোলার শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেন। দীর্ঘ 35 বছরের সাধনায় বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শোলা শিল্পীর খ্যাতি অর্জন করেছেন। 1984 সালে হসত্দশিল্পের জন্য জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন। এদেশে মালাকার সম্প্রদায় শোলা দিয়ে তৈরি করে নানান শৈল্পিক পণ্য। তারা হিন্দু ধর্মালম্বীদের বিয়েতে বরের মুকুট ও পূজা পার্বণে নানান শোলার জিনিসের যোগান দিয়ে থাকে। কিভাবে শোলা শিল্পী হলেন, এ প্রসঙ্গে এ সংবাদদাতার সাথে আলাপকালে গোপেন্দ্র নাথ চক্রবতর্ী বলেন, চাকরি স্থলে একটি মাইক্রোসকোপের প্যাকিং খোলার পর সাদা ধবধবে কর্ক পান। এ কর্কগুলো শোলা জাতীয় পদার্থের তৈরি। তিনি কর্কগুলো যত্ন করে রেখেছেন। একদিন এ দিয়ে শিল্প কর্মের হাতেখড়ি দেন। পরে শোলা দিয়ে শিল্পকর্ম তৈরি শুরম্ন করেন। তিনি নির্দিষ্ট কোন শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেন না। বাংলার প্রকৃতিতে যখন যা নজরে পড়ে, মনে চাইলে তাই তৈরিতে হাত দেন। তার সৃষ্ট শোলার তাজমহলের ব্যাপক চাহিদা বলে জানান। বিদেশীরা শোলার তৈরি শিল্প কর্মে মুগ্ধ হয়ে কিনে নিয়ে যান। সিলেটের লন্ডন প্রবাসীরা দেশে এসে ফিরে যাওয়ার সময় তাজমহল কিনে নিয়ে যান। একটি শোলার তাজমহল 8শ' টাকা থেকে দু'হাজার টাকা পর্যনত্দ দরে বিক্রি হয়ে থাকে। এছাড়াও তিনি গরম্নগাড়ি, মোষের গাড়ি, ঘোড়াগাড়ি পালকি। ঢাকাইয়া দু'ঘোড়া টানা পালকি গাড়ি, কাকাতোয়া, ময়ূর, হাতি, শাপলা, পদ্ম, গোলাপ, কদম ফুল তৈরি করেন। তিনি জানান, একবার এক ব্যক্তি কোরিয়াতে রপ্তানির জন্য 3 হাজার পালকির অর্ডার পেয়েছিল। কিন্তু স্বল্প সময়ে সাপস্নাই দেয়া সম্ভব হয় না। তিনি জানান, 1974 সাল থেকে প্রতিবছর ঢাকায় বৈশাখী মেলাতে স্টল দেন। বর্তমানে দেশে শোলার অভাব। ভাল শোলা মেলে না। শোলা এক ধরনের উদ্ভিদ। বিল-বাঁওড়ের ধারে বর্ষাকালে জন্মে। এখন ধান চাষের কারণে শোলার পরিমাণ কমে গেছে। কুষ্টিয়ার চাঁপাইগাছির বিল ও ফরিদপুর এলাকায় কিছু ভাল শোলা জন্মে। তিনি প্রতিবছর চাঁপাইগাছি বিল এলাকা থেকে শোলা সংগ্রহ করে নিয়ে যান। ফরিদপুর জেলার বিল বাঁওড়ের শোলাও সংগ্রহ থাকেন। দেশীয় মালাকাররাও বিল বাঁওড় থেকে শোলা সংগ্রহ করে। জানা যায়, ভারতে শোলার ব্যাপক চাহিদার কারণে এদেশ থেকে চোরাচালান হয়ে যায়। গোপেন্দ্র নাথ জানান, একমাত্র পুত্রকে ঢাকাতে নিয়ে এ লোকশিল্প শিখিয়েছেন। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। পেশার চেয়ে এটাকে তিনি নেশা হিসেবেই নিয়েছেন। তিনি জানান, হসত্দ শিল্পজাত পণ্য হিসেবে শোলার তৈরি পণ্য রপ্তানি হতে পারে।
পশ্চিমের মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার শতপাড়া গ্রামের মালাকার বংশ পরম্পরা শোলার বাহারি পণ্য তৈরি করে আমাদের শিল্প সংস্কৃতিতে অবদান রাখছেন। কোমল উদ্ভিজ শোলাকে ইংরেজিতে স্পঞ্জ উড (ঝঢ়ড়হমব ড়িড়ফ) বলা হয়ে থাকে। আর ইংরেজ আমলে শোলা দিয়ে নানান রকমের টুপি তৈরি শুরম্ন হয়। এ জন্য নতুন নামকরণ হয় হ্যাট পস্নান্ট। শোলা গাছের বাইরের অংশ বা আচরণ কাটা কাটা হলেও ভেতরের অংশ ধবধবে সাদা ও কোমল। বাংলাদেশে দু'ধরনের শোলা হয়ে থাকে কাঠ শোলা ও ভাত শোলা। বাংলার লোকশিল্পের এ অনন্য উপাদান শোলা যশোর, মাগুরা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, ঝিনাইদহ, খুলনা, রংপুর, পাবনা, মুন্সিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও বরিশাল এলাকায় বদ্ধ জলাশয়ে জন্মে থাকে।
ঃঃ দৈনিক ইত্তেফাক ঃ 18.05.2006 ঃঃ
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



