খবরগুলো সাংঘাতিক। পত্রিকার পাতাতেই এসেছে। বহুজাতিকেরা শ্যেনদৃষ্টি দিয়েছে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি। একজন দু'জন নয় অনেকেই। কেউ একা একা, আবার কেউ কেউ মিলে মিশে অন্যের সাথে। চোরে চোরে নয়, বদে বদে বদমায়েশরা অভদ্রেরা একত্রিত হয়ে ভাগাভাগি করে নিতে চায় বাংলার মানুষের প্রাকৃতিক সম্পদ, সেই সাথে ভাগ্য। শেষ দুঃসংবাদ হচ্ছে জলসীমায় ঢুকেছে দুবর্ৃত্ত। সার্বভৌমত্বের থোড়াই কেয়ার করে তারা। প্রতিবেশী এবং পরম প্রতিবেশীরা একত্রিত এখন। মানছে না, জলের সার্বভৌমত্ব, আনত্দর্জাতিক আইনও। এসব ক্ষেত্রে কূটনৈতিক তৎপরতা মাঝে মধ্যে লাভজনক হয়। ভারতকে সাথে নিয়ে মায়ানমারকে ঠেকানো, কিংবা মায়ানমারকে সাথে নিয়ে ভারতকে ঠেকানোর কূটনৈতিক ইয়ার্কি করে 'ক্ষণকাল' হয়ত ঠেকানো যেত ডাকাতি, রাহাজানি, কিন্তু তারা দু'জন এক হয়ে জলে নেমেছে। হাতড়াচ্ছে এবং শোল বোল সবই পেয়েছে। এখন শুধু ঝোল করে গলাধকরণটাই বাকি। পেয়েছে তারা আগেই। এসব জাতীয় সার্ভে একদিনে হয় না। অনেক বিশেষজ্ঞের অনেকদিনের মাপজোক লাগে এবং অপরিসীম ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়। অনেক তেল খড় পুড়িয়ে তারা এ কাজ সম্পন্ন করেছে কতকটা গোপনে কতকটা প্রকাশ্যে। শেষ মেষ তারা জানান দিয়েছে। এটাই তরিকা। ভূ-রাজনৈতিক লুক্তনের বিভিন্ন তরিকা আছে। কোন কোনটা অভিনব মনে হলেও ইতিহাসে অপরিচিত নয়। প্রতিবেশীরা যা করছে তা শুধু এশিয়াতেই নয় ইউরোপে এবং আফ্রিকাতে এমন কি দক্ষিণ আমেরিকাতেও পরিচিত এবং পুরান ঘটনা। বাংলাদেশ অবাক হতে পারে তবে সে অবাকটি হবে অজ্ঞতা প্রসূত। প্রাজ্ঞের বিস্ময় নয়।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই ইশারা বিল ক্লিনটনই প্রথমে প্রকাশ্যে দিয়েছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, বাংলাদেশ তেল-গ্যাসের উপরে ভাসছে। তাদের ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত। পত্রিকাতেই এসেছিল এসব কথাবার্তা। ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা অনেকেই আনত্দর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞ। বঙ্গোপসাগর নিয়ে চিনত্দা দুশ্চিনত্দা অনেক দিনের। সাথে এর বেলাভূমিও। বঙ্গোপসাগরের বেলাভূমি উন্নত খনিজ সমৃদ্ধ। ইউরেনিয়াম রেডিয়াম জাতীয় উন্নতমানের তেজষ্ক্রিয় পদার্থ নাকি সর্বত্র বিরাজ করছে। সিলেটে নাকি ইউরেনিয়ামের খনি আছে। কিন্তু পরে হঠাৎ করেই সবকিছু চুপচাপ হয়ে যায়। বাংলাদেশকে সু0পরিকল্পিতভাবে আর্থিক দৈন্যে ফেলা হয়। শিল্প-কারখানাগুলো লোকসান দিতে থাকে। পাটের গুদামে আগুন লাগতে থাকে। পানির অভাবে চাষ হয় না। আকাশ পানিতে চাষ হলেও বন্যায় ভেসে যায়। ফারাক্কা কখনো পানি বন্ধ করে, আর কখনো আকাশ বন্যার সাথে তাল মিলিয়ে পানি ছেড়ে প্রকৃত বন্যায় দেশ ভাসিয়ে দেয়। কৃষিপণ্য দাম পায় না, ভারতীয় কৃষি পণ্যে বাজার সয়লাব হয়ে যায়। উৎপাদনশীল খাতে বিদেশী পুঁজি ব্যবহৃত না হয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হয়। এভাবে বিভিন্ন উপায়ে দেশে পুঁজি সংকট ঘটিয়ে দেশীয় বুর্জোয়াদের মেরম্নদণ্ড ভেঙ্গে দিয়ে লুম্পেন বুর্জোয়াদের মুৎসুদ্ধি পুঁজিকে সমৃদ্ধ করা হয়। চরম দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত হয় দেশ। ইতিমধ্যে জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় তিনগুণ। সীমিত সম্পদের দেশে প্রায় অসীম জনসংখ্যা দারিদ্র্যই বাড়ায়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনে না। জনসংখ্যাকে সম্পদে রূপানত্দরের কোন পরিকল্পনাই সার্থক হয় না। জন্ম নিয়ন্ত্রণের কৌশলের বিরম্নদ্ধেই মার্কিনীরা মিছিলও করেছিল। তাদের মনে ভয় ছিল যে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রিত হয়ে যাবে চীনের মত। তাহলেত দারিদ্র্য বাড়বে না এবং তারা দরিদ্র না থাকলে বুদ্ধি করে নিজ সম্পদ ব্যবহার করে নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে ধনী দেশ হয়ে যেতে পারে। এই প্রানত্দিকে ধনী দেশ ভারতের এবং মার্কিনীদের উভয়ের জন্যেই ক্ষতিকর। কেননা, তারা বিশেষ করে ভারত, তার বাজার হারাতে চায় না কোনক্রমেই। মার্কিনীরা আবার ইদানীং তাদের কৌশল বদলেছে। তারা ভারতের সাথে গাটছড়া বেঁধেছে। মজার ব্যাপার হল মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরম্নদ্ধে মার্কিনীদের এবং ভারতীয়দের নাক উঁচু ভাব ছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশের সম্পদ লুণ্ঠনের ব্যাপারে তাদের ভাব হয়েছে। মায়ানমারের কোম্পানীগুলোর সাথে ভারতের পুঁজিভিত্তিক আনুপাতিক অংশভাগ বর্তমান। রাজনীতি নৈতিকতা তুচ্ছ এখানে লুণ্ঠনের প্রশ্নে অবিশ্বাস্য রকম ঘনিষ্ঠতা তৈরী হয়েছে নৈতিকতা বর্জিত বিবেগুলোর মধ্যে। যেমনটি হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে ইরাক লুক্তনের ঘটনায়। লোভের দুতাশন এমনিই প্রবল হয়েছিল যে কোন কায়দা করতে না পেরে নগ্ন আগ্রাসন চালানো হয়েছিল জ্বালানি প্রশ্নে। যেন এর কোন বিকল্প নেই। জ্বালানি চাই-ই চাই। যে কোন উপায়ে। এখানে সম্পদ অধিকার ও ভোগই নৈতিকতা, অন্য ব্যাকরণ নেই। দুর্ভাগ্য মনে হয় বাংলাদেশকেও গ্রাস করতে আসছে। আবামা মাংসে হরিণী বৈরীর আপ্ত বাক্যই মনে হয় বাংলাদেশের উপরে চেপে বসবে। প্রাকৃতিক সম্পদই মনে হয় কাল হবে আমাদের সার্বভৌমত্বের।
জল আর জ্বালানি দুটোই বর্তমান বিশ্বের অভাব। জলের অভাব কোনমতে সামলাচ্ছে বিশ্ববাসী। কিন্তু তাও বেশিদিন চলবে না। ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে জলের প্রাধিকারের লড়াইয়ে নামবে সবাই এবং এটি আগামী দিনের রাজনৈতিক এবং জাতিগত দ্বন্দ্বের কারণ হবে। বিশ্ববাসী যুদ্ধে লিপ্ত হবে সুপেয় জলের অধিকার নিয়ে। তবে হয়ত বুদ্ধিমান জীবেরা কোন একটি বিকল্প খুঁজে নেবে যুদ্ধের বাইরে কিন্তু জ্বালানির বিকল্প খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রথমত বিকল্প যা জানা আছে তাতে জ্বালানির অবশ্যম্ভাবী প্রয়োজনীয়তা যেখানে, সেখানে বিনিয়োগকৃত পুঁজি এত বিশাল যে জ্বালানির বিকল্পে গেলে সাম্রাজ্যবাদীরা তাৎৰণিকভাবে দেউলে হয়ে যাবে। তাই জ্বালানির বিকল্প নয় পুঁজিকে রৰা করার জন্য বিশ্বজ্বালানি মজুদ অধিকারই তাদের পুঁজি বাঁচানোর লৰ্যে পরিণত হয়েছে। ভারতের সমস্যা ভিন্ন কারণে প্রকট। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশ হিসেবে ভারত ইতিমধ্যে বিশ্ব স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্ববাজারে মার্কিনীদের আগামী দিনের প্রতিদ্বন্দ্বি চীন, ভারত। চীনকে ঠেকানো সহজ কথা নয়। অন্যরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। ভারতকে ঠেকানো সোজা। কেননা ভারত বাজার অর্থনীতির জালে জড়িয়ে পড়েছে এবং সমাজতান্ত্রিক দেশ নয়। পুঁজি দিয়ে পুঁজিকে বিবেকহীনভাবে জড়িত করে ভারতীয় পুজিপতিদের মাধ্যমে ভারতেরই সম্পদে ভারতকে কোন্ঠাসা করা সম্ভব। এমনকি ভারতকে নিয়ত অস্থির রেখেও তাঁবে রাখা সম্ভব। মার্কিনীরা বিভিন্ন রকম এক্সপেরিমেন্ট করছে। ইরানের ব্যাপারে ভারতকে তারা বগলদাবা করতে পেরেছে। ভারতও নিজের মত করে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে যেতে চায়। ইরানের তেল সে আর পাবে না, যদি ইরান আক্রানত্দ হয়। চীনও ভয় পাছে ইরান আক্রানত্দ হলে তারও তেল কষ্ট হবে। সেৰেত্রে মায়ানমার এবং বাংলাদেশের জ্বালানির উপর ভরসা করছে দুটি প্রবৃদ্ধিপ্রবণ দেশই, চীন, ভারত উভয়েই। চীন থেকে মায়ানমারকে বিচ্ছিন্ন করার রাসত্দা, পুঁজি সংক্রমণের পথ। এ পথেই বিভ্রানত্দ করা সম্ভব। ভারত তাই করছে। ভারতের পুঁজি স্ফিতি পেয়েছে এবং আগ্রাসী হয়েছে। তার নিয়ত প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে, ভবিষ্যৎ মধ্যপ্রাচ্য সংকটের দিনে জ্বালানি ভান্ডার হিসেবে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন ছাড়া গতি নেই। তাই মায়ানমারকে পুঁজি সংক্রামিত করে দলে-বলে বাংলাদেশের বিরম্নদ্ধে জলে নেমেছে। জল ঘোলাও করবে প্রয়োজনে মাছও ধরবে। মায়ানমারের অবশ্য সে অনুভূতি নেই যে, চূড়ানত্দ হিসেবে সে কিছুই পাবে না। যেমন বাংলাদেশ শকুনি গৃধিনদের কাছ থেকে বাংলাদেশ কিছুই পাবে না। উল্টো বঞ্চিত হতে হতে নিঃস্ব হতে হতে একদিন না খেয়ে মারা যাবে। তাই বাংলাদেশকে বাঁচার লড়াইয়ে নামতে হবে। দেশের সম্পদ রৰার লড়াই হবে, সার্বভৌমত্ব রৰার লড়াই, প্রতিরৰার লড়াই। রাজনীতি, রাজনৈতিক দলাদলি রাষ্ট্রীয় প্রশ্নে তুচ্ছ এখন। রাষ্ট্র রৰাই রাজনীতি এখন গণমানুষের আর রাষ্ট্রছাড়া রাষ্ট্রীয় স্বার্থে কেউ বাক্য উচ্চারণ করার নেই। ভবিষ্যতেও করবে এমন ভরসাও নেই, রাষ্ট্রই রাষ্ট্রকে ধারন করম্নক। সম্পদ সম্ভ্রম রৰার প্রতিরক্ষার লড়াই করুক।
[ড. ইশা মোহাম্মদ : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক]
ঃঃ দৈনিক ইত্তেফাক ঃ 20.05.2006 ঃঃ
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মে, ২০০৬ ভোর ৪:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




