somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প : হুমায়ূন আহমেদের লেখা গল্প

২৬ শে জুলাই, ২০১২ রাত ১:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মৃত্যুর এপারে জায়গাটা খুব অদ্ভুত। এক ধরনের ঘোরপূর্ণ জায়গা। পৃথিবীতে থাকলে এর নাম হয়তো দিতাম, ঘোরাঞ্চল। আমি যে পথের উপর দিয়ে হেটে যাচ্ছি সেটা তুলোর মত নরম একটা রাস্তা। জানতে ইচ্ছা হচ্ছে এটা কীসের তৈরি, কিন্তু জিজ্ঞাসা করতে পারছিনা। আমার পাশে যে দেবদূত হেটে চলছেন, বেশ গম্ভীর মুখ করে হাটছেন। আমি তার তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করছি। তার কোনো ভাবান্তর হচ্ছেনা। আমি তাকে জিঞ্জাসা করলাম। তার মুখ আরো এক দফা কঠিন হয়ে গেল।
এখানে একটা বিস্ময়কর বিষয় হলো মনের প্রশ্নের উত্তর একটা সময় পর এমনি পাওয়া যায়। আমি আমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছি। এটা পথটা মেঘের তৈরি। পার্থিব জীবনে যে বিষন্নতার মেঘ আমাকে ঘিরে রেখেছিল সেসবই এটা। ভেতরে জীবনের কান্নার সমান বৃষ্টিও আছে।
আমার ভাল্লাগছে, এখানে বৃষ্টি আছে ভেবে। আমার জানতে ইচ্ছে করছে এখানে কী বর্ষা আছে?
আমি দেবদূতের দিকে তাকালাম। দেবদূত ধরে ফেললো আমি তাকে প্রশ্ন করবো। সে আঙ্গুলের ইশারায় সামনে হাটতে বললো। আমি বাধ্য ছেলের মতো হাটতে থাকি। পৃথিবীতে নিষাদ মাঝে মাঝে এইরকম করতো। বিরক্ত করলে আমি তাকে হাত ইশারা করতাম, আমার বিরক্ত বুঝতে পেরে সে চুপসে যেত।
আমি হাটছি। খুবই রহস্যময় জায়গা এটা। আমি কোথায় যাচ্ছি জানিনা। জানার উপায়ও নেই। আমি হাটছি। সামনে কিছু গাছ দেখা যাচ্ছে। নুহাশ পল্লীতে এরকম কিছু গাছ আমি লাগিয়েছিলাম। আমি গাছের সামনে গিয়ে গাছগুলো চেনার চেষ্টা করলাম। চিনতে পাড়ছি না। বিপ্রদাশ বড়ুয়া হয়তো গাছগুলোর নাম বলতে পারতেন।
আমি হাটতে হাটতে কিছুটা ক্লান্ত হয়ে গেলাম। এখানে ক্লান্তি কাটানো কোনো উপায় দেখছি না। পানির পিপাসা পেয়েছে। আমি দেবদূতের কাছে সাহস করে পানি চাইলাম। সে কী একটা করলো, প্লাষ্টিকের একটা জার ভর্তি পানি। আমি পানির পিপাসা ভুলে গেলাম। তার পানি আনার প্রক্রিয়াটা ধরার চেষ্টা করলাম। তাকে আরেকবার করতে বললাম। পৃথিবীতে জুয়েল আইচকে আমি বহুবার একটা জিনিস বারবার করিয়েছি। তাকে বলামাত্র সে একবার তাকিয়ে হাটার গতি বাড়িয়ে দিল। আমি ভেবেছি সে হাটুক আমি আর যাবনা। কিন্তু রহস্যময় কারণে সে হাটতে থাকলে আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনা। আমিও হাটতে থাকলাম।
আমি একটা গাছের পাশে এসে দাঁড়ালাম। তেতুল গাছ। আমি এখানে থাকতে চাচ্ছি। সন্ধ্যা নেমে আসলে এখানে জোস্না দেখবো। দেবদূতকে কীভাবে বলবো? তার ভাবগতি খুব একটা সুবিধার মনে হচ্ছেনা। হয়তো রাজি হবেনা। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বসল। আমি হতচকিত হয় গেলাম। ব্যাটা করে কী?
তাকে ইশারা দিলাম। অ্যাই, ওঠ। বসা চলবে না। সে মুখ বাকা করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো।
নাম জিজ্ঞাসা করলাম। মুখ বাকা দেবদূতকে ভুতের বাচ্চার মতো দেখাচ্ছিল। যে ভুতের বাচ্চাগুলো ধ্রুব আকতো। ধ্রুব'র আকা ভুতগুলো মায়া ছিল। দেবদূতের প্রতি মায়া হচ্ছেনা। আমি আবারো নাম জিজ্ঞাসা করলাম।
সে নিশ্চুপ।
আমরা কোথায় যাবো?
সেরকমই চুপ সে।
আমি বসে পড়লাম। পৃথিবীর কথা মনে করার চেষ্টা করছি। আর বিড়বিড় করে কথা বলছি, আমি পৃথিবীতে থাকাকালিন মৃত্যুর পর এই জীবনটা নিয়ে ভেবেছি অনেক। আমি বেঁচে থাকাই জীবনের সব আনন্দ ধরে নিয়েছিলাম। খুব কম আয়ু নিয়ে গিয়েছিলাম, তাই হয়তো এমন তাড়না ছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে একটা মেলা হয়। আমি ২২-২৭ তারিখের মধ্যে যে কোনো সময় যেতাম। মানুষ আমাকে অনেক ভালোবাসতো। ঘন্টার পর ঘন্টা তারা আমার জন্য অপেক্ষা করতো। আমি লিখতে পারতাম বলে তাদের এই ভালোবাসা। বিশ্বাস করবেনা, আমি কখনো ক্লান্ত হইনি।
আমার না পৃথিবীতে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমার যে নুহাশ পল্লী আছে সেখানে। আমার রাজহাসগুলোকে আমি কাঁদতে দেখে এসেছি। আমার গাছগুলো আমার কফিনবন্দী অবস্থাকে মেনে নিতে পারেনি। তারা আমার দিকে তাকায়ও নি। আমার সেন্টমার্টিন যেতে ইচ্ছে করছে। নুহাশকে নিয়ে। নিষাদকে নিয়ে। নিনিতকে নিয়ে। আমি খুব একটা গান পারিনা। আমার গান গাইতে ইচ্ছে করছে।
শাওন সুন্দর করে গান গায়। আমি পারিনা।
আমি যে বর্ষায় চলে আসলাম খুব কষ্ট হয়েছিল আমার। আমার ব্যাঙ্গের ডাক শুনতে ইচ্ছে করছিল শেষবারের মতো। মাকে কী এখান থেকে জানানো যাবে আমার ইচ্ছেটা?
ছোট ভাই শাহীন ডোবা নালা চষে ব্যাঙ্গের ডাক রেকর্ড করে পাঠাবে।
তোমার বিশ্বাস হয়?
আমি দেবদূতের দিকে তাকালাম। তাকে দেখে অবাক হলাম। তার চোখে পানি।
সুন্দর একটা গন্ধ বের হচ্ছে তা গা থেকে। আরো অবাক হলাম, তার গা হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। তাকে হিমু হিমু লাগছে।
১৫টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫



সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।

ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৩



তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে-

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু এখন রহস্যের আরেক নাম। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়াংসান থেকে জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্ত

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৯



Youngsan সিউলের ভিতরে আমেরিকান একটি মিলিটারি বেইস। মিলিটারি বেইসের ভিতরে বার্গার কিং, KFC, Macdonald সব আছে। কোরিয়ান ভিতরে সামরিক ঘাঁটি হলে ও মিলিটারি বেইসের ভিতরে প্রধান কারেন্সি ইউএস ডলার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

DNA — ঈশ্বর এবং প্রশ্ন ?

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১২



১. ক্ষুধা
পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছিল, বাড়ছিল মানুষের খাদ্যচাহিদা; কিন্তু সীমিত জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছিল।
মানুষ নির্বাচিত প্রজনন ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এমন ব্রয়লার মুরগির জাত তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×