“হেঁটোয় কন্টক দাও, উপরে কন্টক
ডালকুত্তাদের মাঝে করহ বন্টক"
লাইনদুটি কোন কবি এবং কোন কবিতার তা ঘটা করে বলবার প্রয়োজন দেখি না । রবীন্দ্রনাথের ‘হবুচন্দ্র রাজার রাজ্য’ সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশী জানি । মূর্খ রাজা হবু লঘু পাপে অদ্ভুত অদ্ভুত গুরু দন্ড দেয়ায় পারদর্শী ছিলেন । বাস্তবে যে এমন রাজা ছিল না তা অবশ্যই নয় । অহরহ ছিল । ১৩৬৮ খ্রীষ্টাব্দের মিং সম্রাটদের কথা বলি (মতান্তরে খ্রীপূঃ ২০৬ অব্দের হান সাম্রাজ্য) । যুদ্ধে পরাজিত সেনাপতিদের কাটা মাথা সম্রাটের পায়ের কাছে এনে রাখা হতো । সম্রাট সেই কাটা মুন্ডুতে লাথি দিতেন । মুন্ডু গড়িয়ে যেতো । সম্রাট আনন্দ পেতেন । সেই আনন্দ থেকে উদ্ভব হল ‘চুজু’ (蹴鞠) নামের একটি চমকপ্রদ খেলার । যেটি বিবর্তনের ধারায় আজকের ‘ফুটবল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে !
(চৈনিক চুজু)
ভয়াবহ শাস্তি থেকে উদ্ভুত খেলা মানেই যে ‘বিষবৎ পরিত্যাজ্য’ –এই মনোভাব না থাকাই শ্রেয় । জন্ম হোক যথা তথা... শ্লোকের মতন । যে খেলার সামান্য একজন খেলোয়ারের কথায় একটি দেশের দীর্ঘ ৫ বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধ থেমে যেতে পারে সেই খেলার খারাপ দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না । আইভরি কোস্টের স্ট্রাইকার দিদিয়ের দ্রগবা ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় করেছিলেন এই অসাধারন কীর্তি । নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুধুমাত্র ফুটবল খেলে ৪৮ ঘন্টার জন্য বন্ধ করে রেখেছিলেন একজন ফুটবল খেলোয়ার । তার নাম এডসন আরান্তে দো নেসিমেন্তো । ছেলেবেলায় তিনি জুতা পালিশের কাজও করেছেন কখনো-সখনো । এই ছেলেটিকে এখন বিশ্বের সবাই এক নামে চেনে । পেলে ! নাম নিয়ে বেশ একটা নাটক করে ফেললাম । কি করব বলুন ? ছোটবেলায় একবার তার ক্লাসমেট নিক নামে ডেকেছিল বলে পেলে তাকে বেশ খানিকটা ধোলাই করেছিল :p
আশ্চর্য করা গল্প হচ্ছে পেলে’র মা ছেলের ফুটবল খেলা পছন্দ করতেন না । তিনি চাইতেন ছেলে পড়াশুনা করে মানুষের মত মানুষ হোক । আচ্ছা, পেলে যদি মানুষ হতো তাহলে আজকের এই মহামানবটিকে আমরা কিভাবে পেতাম । কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মানুষ না হওয়াটাই বরং ভালো । এরা মহামানব হওয়ার জন্যেই জন্ম নেয় । বাঙালি জাতি পেলের মতোই ফুটবল পাগল । এরা মা-বাবার কঠিন শাসন মানে না । পরীক্ষা-ক্লাসের পরোয়া করে না । বিশ্বকাপের সময় এরা উন্মাদ হয়ে যায় । সেই উন্মাদনার মাত্রা কোন স্কেলেই মাপা সম্ভব না । ১৯৯৪ সালে ম্যারাডোনা যেবার এফিড্রিন ড্রাগ নেয়ার দায়ে বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়েছিলেন বাংলাদেশে ঐ খবর শুনে ১০০’র বেশী ফুটবল ফ্যান আত্মহত্যা করেছিল ! বানিয়ে বানিয়ে বলছি না । ‘বিবিসি’ বা ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকা ঘাঁটলে এই খবর যে কেউ পেয়ে যাবেন । পাবনার ৫০ বছর বয়স্ক এক লোককে দেখলাম যে এখনো বিয়ে করেনি । কুমার থাকার কারন হচ্ছে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ না জিতলে তিনি বিয়ে করবেন না- এই জাতীয় কঠিন প্রতীজ্ঞায় তিনি আবদ্ধ ! ব্রাজিল আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী মারামারি কাটাকাটি হচ্ছে এতো হরহামেশার বাসি খবর ।
এগুলি কি ছেলেমানুষী নয় ? অবশ্যই ছেলেমানুষী । তবে এই পাগলামী বাঙালি কেবল ফুটবল এবং ক্রিকেটের জন্যেই করে । আমাদের রক্তে এই দুটি খেলা মিশে গেছে । আমার প্রায়ই মনে হয় এই উপভোগ্য পাগলামিটা অন্য কোন জাতি করতে পারবে না । কারন প্রচন্ডরকম ভালবাসার শক্তি নিয়ে একমাত্র বাঙালিরাই জন্মায় !
সেদিন খবরের কাগজে দেখলাম বাংলাদেশের পতাকা বিধিমালা ১৯৭২ এর বিধি ৯(৪) অনুযায়ী যশোরের জেলা প্রশাসক নির্দেশ জারি করেছেন, বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে টাঙানো সব পতাকা নামিয়ে ফেলা হোক । সবাই বিষয়টাকে কি চোখে দেখেছে বলতে পারবো না, আমার কাছে সংবাদটা দুঃখের । আমরা বাঙালীরা উৎসবপ্রিয় জাতি । ১২ মাসে ১৩ পার্বনের এই দেশে ১৪-তম পার্বন আসে বিশ্বকাপের সময় । দিকে দিকে উড়ছে নানা রঙের পতাকা । সুখের সংজ্ঞা হচ্ছে নানা রঙের পতাকার ওপরে লাল-সবুজের একটি পতাকা দেখতে পাওয়া । বেশীরভাগ বাংলাদেশীই এই নিয়ে কোন ছাড় দিতে রাজি নয় । বিশ্বকাপ আসলে তাই জাতীয় পতাকা বিক্রিরও ধুম পড়ে যায় । সবুজ কাপড়ে পড়ে যায় টানাটানি ! এই উৎসবে বাধা দেয়াটাকে দেশপ্রেম বলা যায় না । কিছুতেই না । বিস্ময়কর ব্যাপার হল এই অদ্ভুত উৎসব দেখতেও অনেক পর্যটক বাংলাদেশে ছুটে আসছেন । আমি একজন সুইস ভদ্রলোককে চিনি যিনি বাংলাদেশ নামের দেশটির সম্পর্কে জানতেই পারেন বিশ্বকাপের সময় বাঙালিদের এই পতাকা বিষয়ক উন্মাদনার জন্য । বিশ্বকাপের সময় মিলিয়ে তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং ঘুরে ঘুরে সুইজারল্যান্ডের পতাকা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন !
কয়েকদিন আগে স্প্যানিশ ভাষার ‘এল হেরাল্ডো’ নামের একটি পত্রিকার শিরোনাম ছিলঃ Los fanáticos anónimos de la Selección de Honduras যার অর্থ দাঁড়ায় “সাপোর্টাররা সমর্থন জানালেন অখ্যাত হন্ডুরাস দলকে” । আমার যে জিনিসটি দেখে চোখ ঠিকরে গিয়েছে সেটি হল খবরটিতে বাংলাদেশের নাম আছে । বাংলাদেশের অগণিত সমর্থকের ‘পাগলা’ সমর্থনে তারা মুগ্ধ !
অবিশ্বাস্য সংবাদ । প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না । পরে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারলাম রুয়েটের একদল শিক্ষার্থী ‘ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা গোনার টাইম নাই, আমরা হন্ডুরাসের পাগলা সমর্থক’ নামে ফেসবুকে একটি ইভেন্ট খোলে । শুধু ইভেন্ট না, জার্সি-পতাকা-মোবাইল ওয়ালপেপার সব জায়গা তারা ভর্তি করে ফেলে হন্ডুরাসের পতাকায় ! একটা সময় ইভেন্টে ইংরেজী ভাষায়ও লিখে দেয়া হয় WE are crazy fans of Honduras football team from Bangladesh ।
এই নামটিই দৃষ্টি আকর্ষন করে হন্ডুরাসের কিছু ফেসবুক ইউজারদের ! ধীরে ধীরে তারা যোগ দিতে শুরু করে ইভেন্টে । অদ্ভুত এক কায়দায় দুই দেশের মানুষগুলো দুই গোলার্ধের প্রান্তে বসেই দ্রুত সম্প্রীতিতে জড়িয়ে পড়তে শুরু করল । হন্ডুরাসের এক ভদ্রলোক আবেগ নিয়ে বললেন তিনি এই বিশাল সমর্থনের খবর জানাবেন হন্ডুরাস দলকে এবং অনুরোধ করবেন হন্ডুরাসের প্রথম গোলটি যাতে বাংলাদেশ নামের দেশটিকে উৎসর্গ করা হয় !
শুরুতে লিখেছিলাম দ্রগবা-পেলেদের যুদ্ধবিরোধী কীর্তি নিয়ে । এই বন্ধুত্বের কীর্তিও কী কম ! দেশ ভিন্ন- ধর্ম ভিন্ন- ভাষা ভিন্ন- রং ভিন্ন, অথচ ফুটবলের ক্ষেত্রে দেশ-ধর্ম-ভাষা সব একটা রঙেই রঙিন । অঞ্জন দত্তের একটা গান আছে না ?
তুমি বলবে আমার বেনিয়াপুকুর, তোমার বেহালা
তুমি গন্ডি কেটে দেখিয়ে দেবে পশ্চিম-বাংলা
হয়তো কেরালার আকাশ আর একটু বেশী নীল
তবু সেটাও কি নয় আমার পৃথিবী ??
বিশ্বকাপ ফুটবল নিজেকে ‘দেশ’বাসী না ভেবে ‘পৃথিবী’বাসী ভাবতে শেখায় । অন্য একটি দেশের প্রতি শ্রদ্ধার জায়গাটা ধরে রাখতে শেখায় । অচেনা অজানা দেশগুলিকেও মন থেকে অনুভব করতে শেখায় । ফ্রান্সের রেমি গাইলার্দের একটি ভিডিও দেখে মুখ হাঁ হয়ে গিয়েছিল । এই ছেলেটি বিশ্বকাপে থাকা ৩২ টি দলের জার্সি গায়ে যে অসাধারন মাপা-মাপা কিকগুলি দেখিয়েছে তাকে একটি শব্দ দিয়ে প্রকাশ করতে হলে লিখতে হবেঃ Wonder ।
ভিডিওটি অবশ্যদর্শনীয়ঃ
_
ভিডিওটির মাপা শট দেখে যতটা বিস্মিত হয়েছি তারচে অনেক বেশী মুগ্ধ হয়েছি গাইলার্দের জার্সি বৈচিত্র্যে । ছেলেটি ইচ্ছে করলে শুধু ফ্রান্সের জার্সি পড়েই শটগুলি করতে পারতো । তা কিন্তু সে করেনি ! সে ফুটবলের পৃথিবীতে গন্ডি কাটতে চায়নি ।
গাইলার্দের মাপা শটের কথা প্রসঙ্গে একটা চমৎকার গল্প মনে পড়ে গেল । গল্পটা বলি । ইন্দোনেশীয়ার জাতীয় দল ভারত সফরে এসেছে । খেলার সময় ছ’ফুট উচ্চতার এক কৃষ্ণকায় যুবক সবার দৃষ্টি আকর্ষন করল । সে খুব দ্রুতই ক্ষীপ্রগতিতে ৪-৫ জনকে কাটিয়ে মাঝমাঠ থেকে বল টেনে নিয়ে গিয়ে অসাধারন এক শট খেললেন । কিন্তু বল গোলবারে লেগে ফিরে এল । মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আবারও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ! এবার ছেলেটি গোঁ ধরে খেলা ছেড়ে পরিচালনা কমিটির কাছে অদ্ভুত এক নালিশ করল । গোলপোস্ট নাকি মাপে ছোট আছে ! অনেকেই তাকে বোঝাতে এল । কিন্তু তার এক কথা, ‘আমার শট মেজারমেন্টে বারবার ভুল হতে পারে না !’ কেউ তাকে কিছুতেই বোঝাতে সমর্থ না হয়ে শেষ পর্যন্ত গোলপোস্ট মাপা শুরু করল ।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, গোলপোস্ট আসলেই চার ইঞ্চি ছোট ছিল ! ভুল স্বীকার করে কমিটি গোলবারে লাগা প্রত্যেকটি শটকে গোল হিসেবে ধরে নিলেন !
ঘটনাটি প্রায় ৮০ বছর আগেকার । যে কৃষ্ণকায় ছেলেটির গল্প বলছিলাম তিনি একজন বাঙালী । তাঁকে ডাকা হত Wizard of football বলে । তার নাম সৈয়দ আবদুস সামাদ (১৮৯৫-১৯৬৪) । কে বলবে এদেশের মাটিতে কত জাদুকর সামাদ- পেলে- ম্যারাডোনা জন্মেছিল । স্কুল-কলেজের পেরেশানিতে হয়তো পেলে-ম্যারাডোনা হয়ে ওঠা হয় নি । কিংবা হয়তো কোন রানাপ্লাজার ইট-বালু-সিমেন্টের নীচে চাপা পড়ে মারা গেছে ছেলেটি ! ব্রাজিল এবার যে জার্সি পড়ে খেলবে সেটি বাংলাদেশের একটি গার্মেন্টস থেকে তৈরী, এই তথ্য কি পাঠকরা জানেন ? ব্রাজিলের জার্সির ওপর এবার লেখা থাকবে ‘Made In Bangladesh’ বাক্যটি ! ধুর ছাই- আবার জাতীয়তাবাদী হয়ে গেলাম ! যশোরের জেলা প্রশাসককে বলতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে,
“স্যার, আমরা জাতে মাতাল হলেও তালে ঠিক আছি । লাল সবুজ রঙদুটি দেখলে আমাদের রক্তে যে রঙ ধরে তা বসন্তের রঙের চেয়েও প্রখর । এই রঙ অন্য দেশের পতাকা টাঙালে নিভে যাবে ভাবাটা ঠিক না... । দিনশেষে আমাদের সবার মনই চিৎকার করে বলেঃ
‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি !’
বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, আমাদের মনটা বিশ্বকাপ ট্রফির মতই ১৮ ক্যারেট সোনার- না কোথাও ফাঁপা আছে- না কোথাও খাদ !”
=============================================
উৎসর্গ
ক্লাস ফোরে যখন পড়তাম তখন একবার আবৃত্তি প্রতিযোগীতায় একটা ‘সুকুমার সমগ্র’ জিতেছিলাম । তাঁর সন্দেশ পত্রিকার বিষয়ভিত্তিক আর্টিকেলগুলি পড়ে আমি যারপরনাই মুগ্ধ হলাম । ঐ শুরু । এরপর স্কুল ম্যাগাজিনে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘উনো, হিন্দী, ক্রিকেট’ পড়ে ভাবলাম, ‘আরে ! এই ধরনের লেখাই তো খুঁজছিলাম’ । শুরু করলাম তাঁর ‘ধুপছায়া’, ‘পঞ্চতন্ত্র’ পাঠ । কি চমৎকার সব লেখা ! কি চমৎকার সব তথ্য ! মুজাফফর আহমেদের কিছু কিছু প্রবন্ধ বা অন্নদাশংকরের একহারা, জীয়নকাঠী পড়েও একই অবস্থা,... আর সবশেষ যোগ হল হকিং, কার্ল সেগানের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রবন্ধগুলি আর হুমায়ূন আহমেদের ‘রং-পেন্সিল’ আর ‘ফাউন্টেন পেন’ । আমি মনে মনে ভাবলাম এই ধরনের তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধ লেখা যেত !
কিছু লিখলাম বিজ্ঞানবিষয়ক- কিছু লিখলাম ইতিহাস নিয়ে- সবটা মিলিয়ে একরকম জগাখিচুড়ী । ফিফটি পার্সেন্ট নাক কুঁচকে কোন মন্তব্যই দিল না । আমি বুঝে নিলাম ‘যাচ্ছে তাই-আবর্জনা’ লিখেছি । বাকী ফিফটি পার্সেন্ট আশ্চর্যজনকভাবে লেখাগুলোকে সাধুবাদ জানালেন । আমি যখনই এ ধরনের লেখা লিখি ঐ সাধুবাদের প্রেরণা থেকেই লিখি । এদের কাছে অনেক বড় দায় আছে । দায় অল্প অল্প করে ঘোচানো শুরু করা উচিৎ ।
তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধগুলির মুগ্ধ পাঠকদের প্রথম সারিতে যিনি আছেন তাঁকে উৎসর্গ করলাম লেখাটা । যাঁর অনুবাদের এবং গল্পের আমিও প্রথম সারির ভক্তপাঠক-
কয়েস সামী
প্রিয়জনেষু
=============================================
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুন, ২০১৪ ভোর ৪:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



