somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তিনটি দৃশ্য ও একটি আংশিক প্রেমের গল্প

০৮ ই মে, ২০১৫ রাত ১২:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক

নিমের মাজন দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে আরেকবার মিয়াবাড়ির আওতার উপর দিয়ে উঁকি মারে সুজন। উঠোনের অর্ধেকটা চোখে পড়ে। একপাশে চট বিছিয়ে তাতে ধান আর মরিচ রোদে দিয়ে এখনও ঝিমুচ্ছে জাও বুড়ি। বড় মিয়ার কোন দূরসম্পর্কের বোন। বাড়ি ঘর কিছুই নেই। চাকরানীর মত পড়ে থাকে মিয়া বাড়িতে।

বুড়ির দাঁত নেই, ফোকলা দাঁতে ভাত খেতে পারেনা বলে নরম করে 'জাও' রেঁধে খায়। সেই থেকে এখন নামই হয়ে গেছে 'জাও বুড়ি'।

দাঁতমাজতে উশখুশ করে সুজন। আড়চোখে আশপাশটা দেখে দ্বিতীয়বার উঁকি দিতেই 'হুশ হুশ' করে উঠে বুড়িটা। ওর কলজে শুকিয়ে যায়। দেখে ফেলল নাকি ?

ভয়টা কাঁটে একটু পরেই।দেখেনি ! ধানে মুরগী লেগেছিলো। তাই তাড়িয়েছে।

না! আজকে বোধহয় আর উপায় হবেনা।

দাঁতন করতে করতে পুকুর ঘাটের দিকে এগোয় ও। গেল কোথায় আজ?

কার খোঁজ করে ও? মিয়াবাড়ির আওতার বাইরে বেলীর ঝুপে দাড়িয়ে কাকে দেখার আশায় উঁকি মারে সুজন?

অবৈধ ,নিষিদ্ধ একটা কাজে এত টান কেন ওর?

ভাবে সুজন। জানে বিপদ। তারপরও! নুরু মিয়ার বউকে ভাল লাগলে ও কি করবে?

এক গাদা ছবি লেপ্টানো ওর মনে । ভেজা চুলে এলোকেশী কিংবা ঘামে ভেজা হাসি হাসি মুখের ছবিগুলো দিনরাত যদি বায়োস্কোপের মত ওর চোখের তারায় নাচে কিইবা করবে ও।

ছয়মাস হল নুরু মিয়া দুবাই। এমন বউ রেখে ক্যামনে থাকে কে জানে ?

পুকুর ঘাটে এসে মুখ ধোয়ে ওজুটাও সেড়ে ফেলে।

এ অভ্যাসটা সুজন পেয়েছে তার দাদার কাছ থেকে। তার বয়স তখন কত হবে, ছয় কি সাত।

দাদার সাথে ঘাটে আসত গোসল করতে করতে। দাদাকে ওজু করতে দেখে সুজন প্রশ্ন করত , কি কর দাদা?

দাদা নাকে পানি দিয়ে সাফা করতে করতে বলতেন, এইডারে কয় ওজু দাদু ভাই। হগল কাজের আগে ওজু কইর্যা নিবা। কু চিন্তা মাথা থেইক্কা বাইর হইয়্যা যাইব।

সুজন ওজু করে। তাও তার তার মাথা থেকে নুরু মিয়ার বউয়ের ছবি যায়না।

'হালার শয়তান আমারে ছাড়েনা ক্যান ?'

বিড়বিড় করে ও। ঘাট থেকে উঠে বাড়ির পথে পা বাড়ায়।

একটা লম্বা মেঠোপথ চলে গেছে সোজা উত্তরে। পথের একপাশে আম জাম ,তেতুল আর বাঁশের ঝাড়ের জঙ্গল। অপর পাশটা খালি । খোলামাঠে কাঁদা পানিতে জাম্বুরা নিয়ে ফুটবল খেলতে নেমেছে ছেলের দল। মাঠের পাশের বড় কদমগাছটার নিচে দাড়িয়ে কিছুখন খেলা দেখে ও। মাঠের ওপাড়ের ছোট রাস্তাটা পেরোলেই মিয়াবাড়ি। ভাবে আরেকবার দেখে আসবে নাকি ?

দুই

মা বলেন , কিরে তোর বাপে কই ?

সুজন রা করেনা। চুপচাপ ঘরে ঢুকে বেড়া থেকে শীতলপাটিটা নিয়ে মেঝেতে বিছিয়ে শোয়ে পড়ে । তাঁতে বসে লুঙ্গী বুনতে বুনতে কথা বলছিল মা।

এবার বুনন থামিয়ে বলেন, কিরে তোর বাপে কই গেছে ? বাজার করতে গেছে বিয়ান বেলায় ,এহনতো বেইল মাথার উপর। রান্ধুম কহন ?

সুজন এবারও রা নাই। মায়ের চেচামেচিতে খালি একবার ওপাশ ফিরে শোয় ও।

সুজনের মতে ওর বাপটা একটা 'হারামী'। কাজ কর্ম করেনা ,বউয়ের রোজগারে ফুর্তি আমোদ করে।

সকালের দৃশ্যটা মনে পড়ে ওর। নলী আনতে মহাজন বাড়ি গিয়েছিল। দেখে কিনা মহাজনের বউয়ের সাথে হেসে হেসে পিরিতের আলাপ জুড়ে দিয়েছে ওর বাপ।

'হ, আইব বাজার নিয়া! দেখ গিয়া মাগীর লাইগ্যা তেল,চুরি আইন্যা টেহ্যা উড়াইয়্যা দিছে এতখনে' বিড়বিড় করে সুজন।

সুজনের রা নাই দেখে তাতের গর্ত থেকে উঠে আসেন মা।

: কিরে ? বিড়বিড়াইয়্যা কি কস ? উত্তর দেসনা ক্যারে ?

মায়ের কথায় মূহুর্তেই রাগ চড়ে যায় ওর। বাপের রাগ গিয়ে মায়ের উপর। সপাং করে মেঝের এক কোনে রাখা কুপিটা ছুড়ে মারে দরজার বাইরে।

তারপর খেকিয়ে উঠে, ঘুমাইতেছি দেহস না? এত প্যাড় প্যাড় কিয়ের তোর ?

ভয়ে কুকড়ে হতভম্ব মা তাতের খুটিতে ভর দিয়ে পাথর হয়ে দাড়িয়ে থাকেন কেবল।

তিন

: দোস্ত খবর হুনছুনি ?

চায়ের স্টলে বসে সুরত্ করে চায়ে চুমুক দিয়ে বলে শাজান।

: কিয়ে খবর ?

: নুরু মিয়াতো দেশে আইতাছে। আইজ রাইতেই ফেলাইট।

: কসকি ? হেদিন না মাত্র গেল ?

ভয়ে মুখ শুকিয়ে যায় সুজনের। হীরাভাবীর ব্যপারটা জেনে গেল নাকি ?

: হেদিন কইত্যে। আধা বছরের উপরে হইছে। আর তুমি যেন দোস্ত এহনও দুধের শিশু। এমন বউ রাইখ্যা কেউ বেশিদিন বাইর থাকতে পারেনি ?

সুজন চায়ের কাপ তুলতে গিয়ে দেখে তার হাত কাঁপছে। ব্যাপারটা শাজানকে বুঝতে দেয়া যাবেনা।

'যাই দোস্ত ,বাইতে কাম আছে' বলে হুট করে চাস্টল থেকে বেড়িয়ে আসে ও।

নুরু মিয়া চইল্যা আসতেছে! ভাবতে এত খারাপ লাগছে কেন তার? মাথা ঘুরাচ্ছে ভন ভন করে । নেশাখোরের মত এলোমেলো পা ফেলে হাঁটতে হাঁটতে বাজার পেড়িয়ে মেঠো সড়কে উঠে পড়ে ও ।

চোখের সামনে ভেসে উঠে হীরা ভাবীর ছবি। হীরা ভাবী ওর কে ? তার জন্য এত আকুলি কেন তার ?

ভাবনা আছে ,কুল নাই। এইযে মেঠো সড়ক এই সড়কের আরেকটু গেলেই মাঠ। মাঠের উপারে মিয়া বাড়ি। আর মিয়া বাড়িতে থাকে হীরাভাবী। সহসা সুজনের ইচ্ছে হয় এক দৌড়ে পৌছে যায় সেখানে। হাত ধরে বলে হীরাভাবীকে জানায় ওর মনের কথা। ওর জন্য তার কতটান ,কত মহব্বত। সব খোলে বলে হালকা করে নেয়ে নিজেকে।

দিকনা ফিরিয়ে , মগজে চেপে রাখা কথার কিলবিল করা তো কমবে!

রাস্তার পাশে প্রকান্ড একটা তালগাছ। সেটার মাথায় খিলখিলিয়ে হাসছে একটা মস্ত চাঁদ । সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুজন।

অত উচু চাঁদটা ছোঁয়ার সামর্থ্যই তার নেই !

সমাপ্ত
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×