somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চট্টগ্রাম নামের ইতিহাস!

০৪ ঠা এপ্রিল, ২০১৮ রাত ১১:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চট্টগ্রামের প্রায় ৪৮টি নামের খোঁজ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‌ রম্যভুমি, চাটিগাঁ, চাতগাও, রোসাং, চিতাগঞ্জ, জাটিগ্রাম ইত্যাদি। চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতভেদ রয়েছে। পণ্ডিত বার্নোলির মতে, আরবি "শ্যাত (খন্ড)" অর্থ বদ্বীপ, গাঙ্গ অর্থ গঙ্গা নদী‌ এ থেকে চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি। অপর এক মত অনুসারে ত্রয়োদশ শতকে এ অঞ্চলে ইসলামপ্রচার করতে বার জন আউলিয়া এসেছিলেন, তাঁরা একটি বড় বাতি বা চেরাগ জ্বালিয়ে উঁচু জায়গায় স্থাপন করেছিলেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় 'চাটি' অর্থ বাতি বা চেরাগ এবং 'গাঁও' অর্থ গ্রাম। এ থেকে নাম হয় 'চাটিগাঁও'।

আবার এশিয়াটিক সোসাইটিরপ্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম জোন্সের মতে এ এলাকার একটি ক্ষুদ্র পাখির নাম থেকে চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি। চট্টগ্রাম ১৬৬৬ সালে মোগল সাম্রাজ্যের অংশ হয়। আরাকানীদের হটিয়ে মোগলরা এর নাম রাখে ইসলামাবাদ। মোগলরা এর প্রশাসনিক সীমানা চিহ্নিত করে। ১৭৬০ সালে নবাব মীর কাশিম আলী খান ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে এটি হস্তান্তর করেন। ব্রিটিশরা এর নাম রাখে চিটাগাং।

খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দী থেকেই আরবগণ চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে পরিচিত ছিল। এশিয়ার ঘটনাবলী বর্ণনা করেছেন এমন বিখ্যাত পর্তুগিজদের মধ্যে প্রথম ঐতিহাসিক ডি বারোস ১৫৫২ সালে চট্টগ্রামকে এর বন্দরের জন্য বাংলারাজ্যের সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত ও সম্পদশালী নগরী বলে বর্ণনা করেছেন; যেখানে পূর্বাঞ্চলের সকল বাণিজ্য জাহাজ সমবেত হতো। বর্মি ঘটনাপঞ্জিতে আরাকান অঞ্চলের নরপতিদের এক দীর্ঘ তালিকা পাওয়া যায় । ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে চট্টগ্রাম আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল । এ সকল নরপতির নামের শেষে চন্দ্র পদবি যুক্ত ছিল। ঐতিহাসিক লামা তারনাথ গোপিচন্দ্র নামে এক বৌদ্ধরাজার নাম উল্লেখ করেছেন, দশম শতাব্দীতে যার রাজধানী ছিল চট্টগ্রামে । তিব্বতি জনশ্রুতি মতে চট্টগ্রাম ছিল দশম শতাব্দীতে কর্মরত বৌদ্ধতান্ত্রিক তিলাযোগীর জন্মস্থান । বাংলার শাসক গিয়াসউদ্দীন তুঘলক বাংলাকে লখনৌতি, সাতগাঁও ও সোনারগাঁও ও তিনটি প্রশাসনিক এলাকায় বিভক্ত করেন। ১৩৩৮ সালে ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ সোনারগাঁও এ ক্ষমতা দখল করেন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই চট্টগ্রাম অধিকার করেন। তিনি চাঁদপুর হতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি মহাসড়ক এবং চট্টগ্রামের কয়েকটি মসজিদ ও সমাধিসৌধ নির্মাণ করেন। শেরশাহ এর হাতে সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহ এর পতনের পর ১৫৩৮ হতে ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত সময়কালে পর্তুগিজরা চট্টগ্রামে ঘন ঘন আক্রমণ চালায় এবং প্রকৃতপক্ষে এ সময়ে চট্টগ্রাম তাদেরই শাসনাধীন ছিল। পরবর্তী ১২৮ বছর চট্টগ্রাম পতুর্গিজ ও মগ জলদস্যুদের আবাসস্থলে পরিণত হয়। মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের ফলে সার্বিকভাবে এ জেলায় এবং বিশেষ করে নগরীতে শান্তি-শৃঙ্খলা পুন:প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য পর্তুগিজদের অধিকারে থাকাকালে চট্টগ্রাম নগরী ও বন্দর ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে বিশেষ সুখ্যাতি অর্জন করে। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রধানত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রম বৃদ্ধিতে দিনে দিনে কলকাতার উত্থান ও উন্নয়নের ফলে এতদঞ্চলে চট্টগ্রাম গুরুত্ব হ্রাস পায়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং পূর্ববাংলা ও আসাম নিয়ে প্রদেশ সৃষ্টি হলে চট্টগ্রাম পুনরায় প্রাধান্য লাভ করে। আসামবেঙ্গল রেলওয়ে নির্মাণের ফলে এর প্রাকৃতিক পশ্চাদভূমির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সংযোগ সাধিত হয় এবং সার্বিকভাবে চট্টগ্রাম ব্যাপক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে।

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব এর সময় ৩৪তম বেঙ্গল পদাতিক রেজিমেন্টের ২য়, ৩য় ও ৪র্থ কোম্পানীগুলি চট্টগ্রামে মোতায়েন ছিল। ১৮ নভেম্বর রাতে উল্লিখিত তিনটি কোম্পানী বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং জেল থেকে সকল বন্দী মুক্ত করে সিপাহিরা ৩টি সরকারি হাতি, গোলাবারুদ ও ধনসম্পদ নিয়ে চট্টগ্রাম ত্যাগ করে। তারা পার্বত্য ত্রিপুরার সীমান্ত পথ ধরে এগিয়ে সিলেট ও কাছাড়ে পৌঁছে। দূর্ভাগ্যবশত তাদের সকলেই কুকি স্কাউটস এবং পরবর্তীকালে দশম গোর্খা রাইফেল নামে পরিচিত সিলেট লাইট ইনফ্যান্ট্রির হাতে নিহত বা বন্দী হয়।

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল রাতে ৭০০ যুবক কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ে আর্টিলারী কোরের অস্ত্রাগার ও গোলাবারুদের ভাণ্ডার আক্রমণ করে, টেলিফোন ও টেলিফোন অফিস দখল করে এবং ধুম নামক স্থানে রেলপথের ফিসপ্লেট উপড়ে ফেলে সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তাছাড়া মাষ্টারদা নামে খ্যাত বৃটিশ রাজের ভীত কাপানো এ বিপ্লবীর তত্ত্বাবধানে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার নামে এক উচ্চ শিক্ষিতা বিপ্লবী নারীর নেতৃত্বে পাহাড়তলীতে অবস্থিত ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ করে তা ধ্বংস করে দেয়া হয়। ক্লাব ধ্বংস করে ফেরার পথে ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে মহীয়ষী এ নারী পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। পরবর্তীতে সূর্যসেন ইংরেজ শাসকগন কর্তৃক গ্রেফতার হন এবং ১২ জানুয়ারি ১৯৩৪ সালে তাকে ফাঁসি দেয়া হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশগণ চট্টগ্রামকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে চট্টগ্রাম জাপানি আক্রমণের লক্ষ্যস্থলে পরিণত হয়। ১৯৪২ সালের এপ্রিলে পতেঙ্গার বিমানঘাঁটিতে পর পর দুদিন এবং ঐ বছর ২০ ও ২৪ ডিসেম্বর পুনরায় বোমাবর্ষণ করা হয়।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

‘সবচেয়ে কঠিন’

লিখেছেন আবু সিদ, ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:১৫


আমি সাদ। আমার বয়স ১৭ বছর। আমি ক্লাস টেনের ছাত্র। আমার ক্লাসের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বয়স ১৫ বা তার আশপাশে। আমারও ১৫ বছর বয়সে ক্লাস টেনে থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মঞ্চে রাজনৈতিক বিভাজন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:২৪



উদীচী পুড়ার সময় কি হারমোনিয়াম, তবলা, একতারা, দোতারা, সেতার কিংবা বাঁশি পুড়েনি?, মনে রাখবেন তখন আগুন শুধু কিছু বাদ্যযন্ত্র পোড়ায়নি, -পুড়েছিল এই বাংলার সংস্কৃতির, এই বাংলার শত কোটি মানুষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

'মেটিকুলাসলি ডিজাইন' করে সিলেটকে অশান্ত করে তোলার অর্থ কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:১৫

সিলেটে এন,সি,পি সাংগঠনিক ভাবে দূর্বল।
দলের ভিতরে কোন্দল মারাত্মক তা ফেসবুকে দলীয় নেতা কর্মীদের পোস্ট দেখে বুঝা যায়।
অথচ, সামনে সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন।
এই পরিস্থিতিতে, দলের মানুষদের 'গরম' করে তোলার একটাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বাক্ষী থেকো বাংলাদেশ, স্বাক্ষী থেকো ১৮ কোটি মানুষ।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২৮

স্বাক্ষী থেকো বাংলাদেশ, স্বাক্ষী থেকো ১৮ কোটি মানুষ।
================================
ইতিহাস কখনো মুছে যায় না। যে জাতি তার মানুষের কান্না, আর্তনাদ ও ন্যায়বিচারের দাবি ভুলে যায়, সে জাতির ভবিষ্যৎও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আজ এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্তর্দহনের ওপারে প্রশান্তি

লিখেছেন মুহাম্মদ তমাল, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৫৩



প্রিয় আকাশ,
মাঝে মাঝে তোমার দিকে তাকিয়ে মনে হয়, তুমিই সৃষ্টিকর্তার সবচেয়ে নিঃশব্দ প্রাঙ্গণ। তাই আমার সমস্ত অভিযোগ, অনুযোগ, ক্ষোভ, দীর্ঘশ্বাস আর অব্যক্ত আর্তনাদ তোমার দিকেই ছুড়ে দিই। তুমি নির্লিপ্ত,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×