আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমি খালাম্মার পা ধরে বলেছি, “ ওকে আমি দেখবো। ওর পড়ানোর খরচ যদি তোমাদের কাছে খরচ মনে হয় আমি দিবো, স্কুলে আনা-নেয়াও আমি করবো। কিন্তু কোনভাবেই এতোতাড়াতাড়ি ওর বিয়ের কথা মুখে নিয়ো না।”
খালাম্মার এক কথা, “আমার কথায় কি কিছু হয় এ সংসারে! তোর খালুরে বল। এক একদিন একটা প্রস্তাব পায়, আর ঘর মাথায় তোলো”....
প্লান ছিল কোনমতে যদি এই বিয়েটা ঠেকানো যায় ১ সপ্তাহের মধ্যে আমরা পালিয়ে যাবো। গেলে একদম বর্ডার ক্রস করে ইন্ডিয়া। তারপর সমরেস মজুমদারকে গিয়ে বলবো আমাদের প্রেম নিয়ে একটা হাজার পৃষ্ঠার গল্প বানান । তিনি যদি একবারে রাজি না হতেন তবে দ্বিতীয়বার প্লিজ সহকারে বলতাম্। রাজি তাকে করতামই!
অথচ বেয়াক্কেল ছুড়ি সব প্লান ভেস্তে দিয়ে আশরাফুল নামের একটা ফটকা ছেলের সাথে ঐ ঘটনার ৩ দিন পরেই ফুট! ক্যামনে কি করল ও জানে! এরপর কত জায়গায় খুজলাম, কতভাবে...। প্রায় ৬ মাসের মতো আমিও নিরুদ্দেশ টাইপের হয়ে গিয়েছিলাম। নাওযা নেই, খাওয়া নেই, ঘুম নেই....এই শহর থেকে ঐ শহর, তারপর আর এক শহর, ওর বান্ধবীর বাড়ি, বান্ধবীর শশুর বাড়ি, তার শশুর বাড়ি, নানা দাদা খালা-খালু... মানে যেইখানে যা আছে। কিন্তু নাই তো নাই ই।
.
.
.
হঠাত পরশু বিজিএমইএফটি ইনিভার্সি টির সামনে মাল্টার চা খাচ্ছিলাম।দেখলাম সেই ৬ বছর আগে হারানো সম্পাও একই ফ্লেবারের চা খাচ্ছে ঠিক আমার থেকে ১০ মিটার দূরে। আমি কাপ-টাপ রেখে দৌড়ে গিয়ে ওর কাপের মধ্যে আঙ্গুল ঢুকায়ে বলি, ’কি রে তুই বাইচা আছোস?’’ এইখানে করোস কি?”
ও ও চিনতে ভুল করলো না। ওর আল জিহ্বা আরো ছোট হয়ে গেলো। ও আমাকে দেখে কি করবে বুঝে উঠতে পারছিলো না।
ভাইয়া তুমি!
এরপর এতদিন পর দেখা হলে যেমন করার নিয়ম সম্পা সেরকম না কলে বলল, আমি ভার্সি টিতে আসলেই এই চা খাই! বাসায়ও মাল্টা রাখা আছে, সময় পেলেই বানাই।
আমি ওকে থাপ্রায়ে গাল টাল লাল করবো কি-না বুঝে উঠার আগেই আমার হাত ধরে টেনে হাটতে হাটতে ডিআইটির পিছনের পিঠার দোকানের দিকে যেতে লাগল।
ঠান্ডা হয়ে বললাম, হাত ছাড়, গাড়ি পাড় হতে ঝামেলা হবে। কিভাবে কি করলি বলতো? আমিতো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না।
শীত শেষ না হতেই বৃস্টির আনাগোনা শুরু হয়েছে এবার। আজকেও মনে হয় বৃস্টি হবে। মেঘ গুড় গুড় করছে বিকেল থেকে। সম্পা বলল, যা হয়েছে হয়েছে। চিতাই পিঠা খাবে? সরসেটার থেকে ধনে পাতারটা মজার।
বললাম, বিল দেবে কে?
ও হেসে বলল, আমি দিবো। আমার বেতন তোমার থেকে কমনা মনে হয়। আচ্ছা ভাইয়া তুমি কর কি এখন?
সে বলছি, তুই বেতন পাস কই? চাকুরী করস নাকি?
বারে! এই চাকুরী নিয়েই তো গেলো সব!
গেলো সব মানে?
ভাইয়া বাদ দাও। আমি বিজিএমইএফটিতে পড়াই। মায়নাও পাই ভালো।
এরপর রাস্তা পার হয়ে ডিট এর পিছনে এসে পিঠার দোকানে দাড়িয়ে অনেকক্ষন কথা বললাম। ওর হাজব্যান্ড গাড়ী এক্সিডেন্টে মারা গেলো তাও বছর খানেক হয়। রিক্সা থেকে দুজনে রাগারাগি করে নামতে গিয়ে এক্সিডেন্ট। অনেক ঝামেলার পর ওর শশুরের সাপোর্টে ভার্সিটির চাকুরীটাতে বহাল আছে। মাস খানেক হয় শুশুরে বাসা থেকে আলাদা থাকছে।
অনেক কথার পর বিষয় এড়াতে বললাম, পালানোর আগে আমার কথা ভাবলিনা একবারও?
ধুর ভাইয়া! তুমিযে আমাকে পছন্দ করতে এটাইতো জেনেছি ফিজিক্স বইয়ের মধ্যে তোমার চিঠিটা পেয়ে। খোদার কসম ভাইয়া, আমি ভাবতাম তুমি আমাকে কাজিন হিসেবে এত আদর কর!
আমার হাসিও পাচ্ছিল আবার কস্টও। বললাম, ফিজিক্স বই কি নিয়ে আসছিলি?
হ্যা, সব বই তো নিয়ে আসছি। ডায়রি, তোমার দেয়া কলমদানি, আকাশি রংয়ের ওরনা সব। ভালো কথা ভাইয়া, তোমার জন্য নাকি মেয়ে দেখছে? খালার সাথে ৬ বছর পর কাল কথা হলো।
দেখতেছে তো বছর খানেক ধরে। এইতো গত মাসে দেখলাম একটা । সেরাম সুন্দরী, একটু খাটো যা। ওকে তোর পাসে এসে দাড় করালে তোকে দেখাই যাবেনা।
সম্পা হাসতে হাসতে বলল, আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি এই মেয়ের সাথে যদি তোমার বিয়ে হয় আমি আজীবন একা থাকবো। তুমি নিশ্চিত থাকো তোমার বিয়ে হবে আমার মত এইটাইপের কারো সাথে।
বললাম, তোর টইপের মানে?
এই টাইপের মানে, একবার দুইবার বিয়ে হইছে, দুইটা বাচ্চা আছে, এসব আরকি! আয়নার দেখছো নিজেরে?
ততক্ষণে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। মেয়েদের সাথে থাকলে এই এক সুবিধা, শীত বর্ষা, ঝড় যাই হোক সৌন্দর্য্য রক্ষা কবজ থাকবেই সাথে। বর্ষায়ও ছাতা আর রোদেও।
অনেকদিন পর এক ছাতার নিচে হাটলাম। হাটতে হাটতে সোজা স্লুইজ গেট পর্যন্ত এলাম। ততক্ষণে সন্ধ্যাও হয়ে আসছে। বাইরে ইস্তিমার ভীড়। দুনিয়ার মানুষ। সবাই ভীড় জমাচ্ছে মুনাজাতের জন্য।
তারেক জামিল ছাব বয়fন করছেন। কী সুন্দর গলা! অবশ্য আমি উর্দূ বুঝিনা ভালো। আমার বন্ধু মিরাজ বাংলার থেকে উর্দূতে ভালো বোঝে। যখন তারেক জামিল বা সাদ সাহেবরা ওয়াজ করেন আমি চুপচাপ থাকি। অপেক্ষা করি জুবায়ের ছাহেবের জন্য। উনি বাংলায় এত দরদ দিয়ে বলেণ, চোখে পানি এসে যায়।
পানি অবশ্য অনেক কারনে আসতে পারে। এতক্ষণে সম্পাও কয়েকবার চোখে পানি নিয়ে এসছে। সে তখনও সুখে ছিলনা, আর এখও নেই।
অবশ্য আমি পুরো পথই চুপচাপ ছিলাম। কখনো জুবায়ের সাহেবের মুখে পরের জনমের দুঃখের কথা, আবার সম্পার মুখে ওর জীবনের দুখের কথা। অদ্ভুদ কষ্ট থাকে দুজাগাতেই।
সম্পার নতুন বাসা স্লুইজ গেটের কাছেই। বললাম, সম্পা, বয়নাটা শুনে যাই। রাত হয়ে গেছে, তুই যা।
সম্পা যেতে যেতে বলল, ভাইয়া, আবার যদি মাল্টার চা খেতে ইচ্ছে হয় সোজা ৩ নম্বর রোডের ১২ নম্বর বাসায় চলে এসো।
আমি নিশ্চিত জানি এই চায়ের সাদ আমার এখন ক্ষণেক্ষণে জাগবে।

সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ৮:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



