মোহাম্মদপুরকে অনেকেই মোঘল সাম্রাজ্য বলে ডাকেন। কারন এই এলাকার অনেক রাস্তা ঘাটের নাম মোঘলদের নাম অনুসারে রাখা হয়েছে। আজ থেকে অল্প কয়েক বছর আগেও পুরো মোহাম্মদপুর এলাকা ছিলো বেশ নিরিবিলি, কোলাহলমুক্ত, সবুজ গাছগাছালি পুর্ন। কিন্তু এখন যুগের হাওয়ায় চারিদিকে পরিবর্তন হচ্ছে। পুরানো দৃষ্টিনন্দন সব বাড়ি ভেঙ্গে তৈরী হচ্ছে নতুন ফ্ল্যাটবাড়ি, দোকান পাট, অভিজাত রেস্টুরেন্ট, মার্কেট ইত্যাদি। তবে নতুন অনেক দোকানের পাশাপাশি এখনও পুরানো কিছু ঐতিহ্যবাহী দোকান এখনও গর্বের সাথে টিকে আছে, ব্যবসা করছে সুনামের সাথে। এই দোকানগুলোর অধিকাংশই হয়ত খুব একটা 'হাই ফাই' না, তবে তাদের খাবারের মান ও স্বাদ নিঃসন্দেহে 'হাই ফাই'।
গতকাল ব্লগে জুলভার্ন ভাই, সিংগারা নিয়ে পোস্ট দিয়েছিলেন। সেখানেও এই সিংগারার কথা বলেছিলাম। তাই আজকেও সেই সিংগারা দিয়ে শুরু করছি। মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের বিপরীতে জাকির হোসেন রোডে ঢুকার মুখে বেশ পুরাতন একটা কাবাবের দোকান আছে। স্থানীয়ভাবে 'মাঞ্জা মামা'র দোকান হিসাবে বেশ পরিচিত। একটা সময় ছিলো, এদের এখানে দুর্দান্ত একটা কলিজার সিংগারা পাওয়া যেত। সেই সময় যখন ঢাকায় ১০ টাকায় তথাকথিত কলিজার সিংগারা পাওয়া যায়, তখন এদের এক পিস কলিজার সিংগারার দাম ছিলো ২০ টাকা। আপনি কামড় দিলে বুঝবেন জিনিসটা আসলে কি দুর্দান্ত। শুধু পেঁয়াজ আর কলিজার পুর দিয়ে সবাই সিংগারা বানায় না। ঢাকার খুব কম স্থানে আপনি এই ধরনের সিংগারা পাবেন। আমি এই দোকানে গেলে খুব মন খারাপ করে দুইটা বা তিনটা সিংগার খাই। কারন এই ধরনের সিংগারা নুন্যতম ৪/৫ টা খেতে না পারলে শান্তি কোথায়?
আমি লাস্ট প্রায় বছর দুয়েক আগে এই সিংগারা খেয়েছি। কারন এটা খেতে হলে বিকেলের মধ্যে যেতে হবে। বিকেলের শেষের দিকে অনেক সময় থাকেও না। তাই সময়ের অভাবে আমার আর সেখানে যাওয়া হচ্ছে না। বাড়ছে দীর্ঘশ্বাস। এই দুঃখের অন্য এক জায়গা থেকে সিংগারা এনে খেলাম। মাঞ্জা মামার সিংগারার ছবি দিতে পারলাম না, অন্য ছবি দিলাম। এর নাম দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো। যদিও ঘোল খেতে খুবই মজা।


এই দোকানের অন্য বেশ কিছু আইটেমও পাওয়া যায়। যেমন চিকেন কারি, বুটের ডাল দিয়ে গরুর মাংস বা কলিজা ভুনা এবং স্পেশাল বিফ কাবাব। এই সব শুধু বিকেল বেলায় পাওয়া যায়। মানুষের ভীড়ে আপনি জায়গা পাবেন না। ফলে অনেক মানুষই পার্সেল নেয়। এদের স্পেশাল বিফ কাবাবও দারুন! অবশ্য যে কোন খাবারের স্বাদ ব্যক্তিগত রুচির উপর নির্ভর করে। যা আমার কাছে অমৃত তা হয়ত আপনার কাছে জঘন্য। আমি শেষবার এই দোকানে গিয়ে খেলাম তন্দুরি চিকেন। ঢাকায় অনেক দোকানেই ভালো তন্দুরি চিকেন বানায়, এদেরটাও বেশ ভালো। তাজা মুরগির মাংস ব্যবহার করার কারনে মাংসটা ড্রাই ছিলো না। একটা লুচি আর টকদই বোরহানী মাখা সালাদ দিয়ে মুখে দিতেই আহ!! অসাধারন অনুভুতি! চারিদিকে চমৎকার স্বাদের মিছিল!



একবার মোহাম্মদপুর থেকে হেঁটে কলাবাগানের বাসায় ফিরছি। প্রধান উদ্দেশ্য নিজেকে ফিট রাখা, প্রস্থ কমিয়ে উচ্চতা বাড়ানো। কিন্তু সলিমুল্লাহ রোডের মাথায় আসতেই কয়লার আগুনে পোড়া কাবাবের গন্ধ নাকে এসে ভয়াবহ বাড়ি মারল। মন্ত্র জপার মত বার বার মনে মনে আউড়ে নিজেকে বুঝালাম, ওরে!! ওজন বেড়ে যাবে, ডায়েট করতে হবে, ভুলেও এই সব খাসনে বাপ! কিন্তু যতক্ষনে কপালের ঘাম মুছে সম্বিত ফিরে পেলাম, ততক্ষনে দুই প্লেট কাবাব অর্ডার দিয়ে আমি হাফ ছেড়ে বেঁচেছি।
সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম এই 'সেলিম কাবাব ঘর' সেই আগের মতই আছে। তবে অনেক ভীড় বেড়েছে। দোকান ভর্তি মানুষ গম গম করছে। অনেকেই আমার মত লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে এতবার খেয়েছি যে, বাসার খাবার ভেবে কখনও রিভিউ বা এই জাতীয় কিছু লেখার কথা মাথায়ই আসে নাই। তবে, ইদানিং অনেকেই ফুড ভ্লগিং করছেন। তাদের কল্যানে অনেক হাইজিন প্রেমিরা এখানে খেতে এসে প্রায় ভাঙ্গাচুরা একটা দোকান দেখে ভ্লগারদের গুষ্ঠি উদ্ধার করে ওয়েস্টিন অথবা ল্য মেরিডিয়ানে গিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচে। খাবারের টেস্ট সম্পর্কে বলতে গেলে তারা বলবেন, যাহ বাব্বা! হোটেলটার কিচেন কিন্তু দারুন পরিষ্কার। হেব্বি জোস!।
এই দোকানে আপনি আসল কিমাপুরী পাবেন। আমার জানা মতে আমি ঢাকার কোন হোটেলে এই ধরনের কিমা পুরী দেখি নাই। মাংসের কিমা দেয়া পুরী। সাথে ওরা একটা কাবার রোল করে, যেটা আগে ছিলো না, সেটাও খেতে দুর্দান্ত। কিমা পুরীর সাথে কাবাব দিয়ে একটা কম্বিনেশন। চমৎকার স্বাদ। তবে কাবাবে এরা হচ্ছে সেরা! খুবই হালকা মশলা আর স্মোকি ফ্লেভারের জন্য আপনার খেতে দারুন লাগবে। এখানেও লুচি পাবেন। ইতিমধ্যে আমার খাবার তৈরী হয়েছে। পুর্ব পরিচিত এক কর্মচারী আমার খাবার নিয়ে আসলো। তার সাথে দুস্টামি করে জিজ্ঞেস করলাম, ক্যায়া বাত হ্যায় ভাই!! প্যাহেলে তো ইতনা তাকলিফ নেহি হোতা তুমহারে ইহাপে কাবাব খানে কে লিয়ে। ইন দিনো মে ক্যায়া হুয়া জো ইতনা লাম্বা লাইন লাগা দিয়া লোগনে? মাসলা ক্যায়া হ্যায়? ইয়ে ক্যায়সি জাদু?
( কি হলো ভাই? আগে তোমার এখানে কাবার খাওয়ার জন্য এত কষ্ট করতে হতো না। এক কয়দিনে কি এমন হলো যে মানুষ এত লম্বা লাইন দিয়েছে, ঘটনা কি? তুমি কি এমন জাদু করছ?)
বিহারী কর্মচারী আমার চেয়েও চাল্লু! সে আমাকে হাসতে হাসতে বলল, হাম ক্যায়া কারে সাহাব!! এই তো আপকাই কিয়া কারাম হ্যায়! আপনে যো দিলসে হামারি বাত ইতনি পাবান্দি কে সাত লোগকো বোলা! ইসলিয়ে ও খানে চালে আয়ে।
( স্যার আমি কি করব? এই গুলো তো আপনিই করেছেন। আপনি যে মন থেকে আমাদের খাবারের জোর সুনাম করেছেন, সেই কারনে তো মানুষজন চলে আসছে)
যাইহোক, আমি খাবারে মনযোগ দিলাম। গরম শিক কাবাবের সাথে হালকা পুদিনার চাটনি, শশা আর পেঁয়াজের সালাদ মাখিয়ে মুখে দিতেই আরামে চোখ বন্ধ হয় এলো! পরম সুখে চাবাতে চাবাতে ভাবলাম - শালার বাঙালির আবার ডায়েট কিসের?





গত কয়েক বছর ধরে সোশ্যাল মিডিয়াতে বোবার বিরিয়ানী আর কামাল বিরিয়ানী নিয়ে হাজার হাজার রিভিউ পড়েছি! এত রিভিউ পড়ে আমি মহা চিন্তায় পড়ে গেলাম এইটা মোহাম্মদপুরের কোনখানের বিরিয়ানি যেইটা আমি খাই নাই?
মোহাম্মদপুরে অনেক রেস্টুরেন্টের বিরিয়ানী বা তেহারীর স্বাদ কিন্তু ঢাকার অনেক অঞ্চলের চাইতে ভালো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরানো ঢাকার চাইতে মোহাম্মদপুরে ভালো তেহারী পাওয়া যায়। শওকতের তেহারী বা বিরিয়ানীর নাম সবাই শুনছে। মোহাম্মদপুর কাঁচা বাজার বা টাউন হলের সাথেই ওদের দোকান। কিন্তু শওকতের বিরিয়ানীকে বোবার বিরিয়ানী বা কামাল বিরিয়ানী বলার কারন কি?
ফোন দিলাম ক্যাম্পের বাজারের আবুল ফয়সল ভাইকে। খুবই ভদ্র এবং অমায়িক লোক। রাজনৈতিক মার প্যাচের কারনে জেনেভা ক্যাম্পে আটকে পড়ে জীবনটাই অন্যরকম হলো। উনার চাচা মুরশাদ জানে আলম বেশ নাম করা বাবুর্চি ছিলেন। উনাদের কাছ থেকে অনেকে কাবাব চাপ বানানো শিখেছেন। বর্তমানের অনেক জনপ্রিয় চাপ আর কাবাব হাউজ উনাদের পরিচিত কারিগর দিয়েই গড়ে উঠেছে। মুস্তাকিম চাপ প্রসঙ্গ যখন আসল তখন বলে রাখা ভালো যে, একটা সময় মুসলিম, মুস্তাকিমের চাপ ছিলো পুরো ঢাকায় বিখ্যাত। তাদের স্যুপটাও ছিলো দারুন মজার। কিন্তু এখন কাউকে শাস্তি দিতে চাইলে ঔ মুস্তাকিমের চাপ খাওয়াতে হবে। ধরেন ব্লগে কেউ ওভার কনফিডেন্ট নিয়ে মাল্টি চালানোর পরও ধরা খেলো, বা কেউ আজাইরা গুটিবাজি করল। তাকে শাস্তি দেয়ার জন্য বর্তমানের মুস্তাকিমের চাপ খাওয়াতে হবে। একদম সিধা হয়ে যাবে।
যাইহোক, ফয়সল ভাইকে ফোন দিয়ে বললাম, ভাইজান, ইয়ে বোবা বিরিয়ানী ক্যায়া হ্যায়? ইসকি নাম তো প্যাহেলে কাভি নেহি শুনা? ক্যাম্পমে কাহা হে ইয়ে? ঔর এক বিরিয়ানি দু কান ভি হ্যায়। ইন দিনো মে বহুৎ নাম ফেল রাহা হ্যায় - কামাল বিরিয়ানী। ক্যায়া ইয়ে সাচ মুক কামাল বিরিয়ানী ও শ্রেফ নামই কামাল হ্যায়?
( ভাই, এই বোবার বিরিয়ানী টা কি? এর নাম তো আগে কখনও শুনি নাই। ক্যাম্পের ভেতর কোথায় এটা? আরেকটা দোকান আছে, বর্তমানে খুব নাম করেছে- কামাল বিরিয়ানী। তা দোকানটার নাম কি কামাল বিরিয়ানী নাকি আসলেই স্বাদের কারনে কামাল বিরিয়ানী হয়েছে)
ফয়সল ভাই আমার কথা শুনে কিছুক্ষন হাসলেন। তারপর বললেন, ভাইজান! আপ বহুত মজাকিয়ে আদমি হো। জালদি ইয়া আযাইয়ে। ম্যা আপকো খিলাউঙ্গা। ( ভাইজান, আপনি খুবই মজা করেন। জলদি চলে আসেন। আমি আপনাকে খাওয়াবো)
যাইহোক, ক্যাম্পারেরবাজারে গেলাম। গিয়ে ফয়সল ভাই যে দোকানে নিয়ে গেলেন, সেই দোকানে আমরা বহু বার খাইছি। এই দোকানের এক কর্মচারী কথা বলতে পারেন না। সেই কারনে এটা বোবার বিরিয়ানী নামে বিখ্যাত হইছে। আসল নাম হচ্ছে ফয়জালে মদিনা। এই দোকানে আমরা ২০ টাকা দিয়ে খাওয়া শুরু করছিলাম। সেটা এখন পঞ্চাশ টাকা। তখন পকেটে টাকা কম থাকলেই আমরা এই বিরিয়ানী মেরে আসতাম। এই দোকান যেখানে অবস্থিত সেখান থেকে আরো কিছুটা ভেতরে গেলে আরেকটা বিরিয়ানীর দোকান ছিলো, সেটারই নাম হচ্ছে কামাল বিরিয়ানী। ঐখানে আগে দুই একবার খাওয়া হইছে। কিন্তু বর্তমান ফুড ব্লগারদের কারনে তার রমরম অবস্থা!!
যাইহোক, একবার আমার স্ত্রীর খুব মন খারাপ। সম্ভবত কোন একটা ম্যাচে ব্রাজিল ২ গোল খেয়েছে। স্ত্রীর দুঃখ দেখে আমি ঠিক মত আনন্দ করতে পারছি না। এই অবস্থায় স্ত্রী আমাকে বললেন, আর ভান করতে হবে না। আমাকে বোবার বিরিয়ানী খাওয়াও। আমি হাসতে হাসতে সাথে সাথে রাজি হলাম।





তবে যেতে যেতে কিছুটা রাত হয়ে যাওয়াতে বোবার বিরিয়ানী প্রায় শেষের দিকে ছিলো। সেখানে না খেয়ে গেলাম কামাল বিরিয়ানীতে। সেখানে দেখি পার্সেলের জন্য বিশাল লাইন। কিছুক্ষন পর বসার সুযোগ পেলাম। খাওয়ার পর বুঝলাম, বোবা আর কামালের পার্থক্য হলো মাংসের মশলায়। তাও যারা নিয়মিত খায় তারা ধরতে পারবে, নইলে ধরা টাফ। বোবার মশলা হালকা আর কামালের বিরিয়ানীর মসলা একটু ভারী। 'বেশি টানা যায় না'- এটাই পার্থক্য।
বাসায় ফেরার পথে একটা মিষ্টি পান মুখে দিয়ে বাসায় রওনা দিলাম। আগের দিন হলে মোহাম্মদপুর থেকে রাত এগারটায় রিকশা করে কলাবাগান আসার কথা কেউ চিন্তাও করতাম না - ঠ্যাক অবধারিত। এখনও চামে সুযোগ পেলে ঘটনা ঘটে যায়। কিন্তু এখন অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে আগের চাইতে অনেক। তাছাড়া এত সুন্দর বাতাস ছিলো, যে রিকশা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারছিলাম না। রিকশায় উঠে মোটামুটি একটা দুরত্ব আসার পর স্ত্রী বললো, তার ঠান্ডা পানীয় খেতে মন চাইছে।
আমি বললাম, গোল তো দুইটা খাইছে। কিন্তু ইয়ে মানে মানে ডাবল আপ বলে তো কোন ড্রিংক্স নাই, সেভেন আপ চলবে?
তারপর উদাস গলায় বললাম - আসলে অতীত চাইলেও তো ভুলা যায় না।
স্ত্রী বললেন - হারজেন্টি.....।
সাথে সাথে প্রসঙ্গ পালটে বললাম - চলো ফান্টা খাই!!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


