সুখ। খুব ছোট একটি শব্দ কিন্তু বিস্তার মারাত্মক। আমরা আজ সুখে আছি এই কথা যেন বলতেই ভুলে গেছি। আমাদের সুখের ঘর জুড়ে প্রতিনিয়ত অসুখের বসতি। সবখানে একই হাহাকার সেই সুখ আর নাইরে ভাই। আসলে কোন সুখ কখনো থাকে না। সুখ যে ক্ষণস্থায়ী সে তো আমরা সবাই জানি। কিন্তু আমাদের জীবনে সুখের চেয়ে দু:খের উপস্থিতিটা অনেক বেশি বলেই আমাদের এতো হা পিত্যেস। অথচ ভাবতে অবাক লাগে এরপরও আমরা এই প্রিয় দেশটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দেশে বলে পরিচিত করতে পেরেছি। এর কারণ কি? এর কারণ আমাদের দেশের মানুষের চাহিদা কম। মুষ্টিমেয় কিছু লোক ছাড়া বাকিরা অল্পতেই সন্তুষ্ট- মানসিকতা সম্পন্ন। তবে সে দৃশ্যপট পরিবর্তন হতে চলেছে। সেও খুব স্বাভাবিক। পরিবর্তনই জীবনের ধর্ম। অনেক বাজে প্যাচাল হলো। এবার মূল গল্পটা বলি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে এসে হঠাৎ মনে হলো মেস জীবনটা কেমন একটু উপভোগ করা দরকার। ব্যাস অমনি বাসায় সাত-সতের বুঝিয়ে রাজি করিয়ে ফেললাম। ছয় বন্ধু মিলে চার রুমের এক বাসা ভাড়া করলাম। শুরু হলো নতুন জীবন। এই সময়টার প্রতিটি দিনই আমার কাছে বৈচিত্র্যময় এবং এখনো অনন্য মনে হয়। সে সময়ের একটা ছোট ঘটনা বলাই এই পোস্টের মূল উদ্দেশ্যে। আমার একটা সমস্যা হলো মানিব্যাগে ভাংতি পয়সা থাকাটা আমার কাছে একরকম উৎপাত মনে হয়। ব্যাগ খুললাম দেখা গেলো একটা কয়েন গড়াতে শুরু করলো। অনেক সময় গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে যায় ম্যানহোলে আবার কখনো কোন রূপসীর (রূপসী বলেই ধরে নিচ্ছি, নাহলে আপনারা ইন্টারেস্ট হারাবেন) পায়ের কাছে গিয়ে। দেখুন তো কি বিপত্তি। যদি পাঁচ টাকার কয়েন ম্যানহোলে পড়ে মেজাজ কেমন বেখাপ্পা হয়ে যায় বলুন! আর কোন মহিলার পায়ের কাছ থেকে কয়েন কুড়ানো কম ঝক্কি নয়, মহিলা কি না কি ভেবে বসেন . . . .। সে যাক। এই ভাংতি পয়সার জ্বালা থেকে বাঁচার জন্য আমি বাসায় ফিরেই সেগুলো ডেস্কে জমা রাখতাম। কিন্তু কয়েকদিন পরে ডেস্ক যথেষ্ঠ ভরাট হয়ে উঠলো আর আমার জিনিসপত্র খুঁজতে দারুন বেগ পেতে হলো। তাই সেগুলো অন্য কোথাও সরানো জরুরী মনে হলো। আমার মেসের আরেক ফ্রেন্ড বাবু , ওর একটা মাটির ব্যাঙ্ক ছিলো। আমি ভাংতি পয়সাগুলো নিয়ে সব ওর মাটির ব্যাঙ্কে ঢুকিয়ে দিলাম। সে সময় রুমে ছিলো আরেক ফ্রেন্ড আতিক। সে আমাকে বললো, এতোগুলো পয়সা ওখানে রাখার মানে হয় না। বাবুর দরকার হলে ওগুলো দিয়ে 'বাংলা' খাবে। আমাদের ছয়জনের মধ্যে একমাত্র বাবুর পানাভ্যাস (বাকিদের কেউ সিগারেট অব্দি খেতো না) ছিলো। মাঝে মাঝে পুরো সপ্তাহ সে হাওয়া হয়ে যেতো। খুব বিচিত্র স্বভাব হলেও অসম্ভব উদার ছিলো সে। অন্যের কষ্টে নিজের সব দিয়ে দিতে পারে এমন। তো আমি আতিককে বললাম, যায় যদি যাবে, আমার কোন দাবী নেই। আমি ভাংতি পয়সার উৎপাত থেকে মুক্তি চাই। এরপর থেকে সব ভাংতি পয়সা আমি বাবুর মাটির ব্যাঙ্কেই ফেলে রাখতাম।
অনেক দিন পরের কথা। একদিন বাসায় ফিরে বাবুর রুমে যাই। উদ্দেশ্যে ভাংতি পয়সা ব্যাঙ্কে ফেলা। কিন্তু ব্যাঙ্ক নেই। বাবু শুয়েছিলো। তাকে জিজ্ঞেস করলাম ব্যাঙ্ক কোথায়? সে বললো ভেঙ্গে ফেলেছি। কারণ জিজ্ঞেস করে জানলাম, সে তার এক বন্ধুকে দেখে হাসপাতাল থেকে ফিরছিলো। আসার সময় দেখে বাইরে মেঝেতে এক বয়স্ক মহিলা লাশ নিয়ে কান্নাকাটি করছে। বাড়িতে নিয়ে যাওয়া আর দাফন করার টাকা নাই তার কাছে। প্রায় হাজারখানেক টাকা লাগবে। বাবু বাসায় এসে ব্যাঙ্ক ভেঙ্গে টাকাগুলো বের করে। বাকি বন্ধুরাও নিজেদের পকেট থেকে টাকা দিয়ে এক হাজার টাকা পুরো করে। সেই টাকা দিয়ে ভদ্রমহিলাকে লাশ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে এসেছে সে। আমার তখন কি যে ভালো লাগছিল ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিলো বন্ধু তোদের জন্য আমার গর্ব হয়, ভীষণ গর্ব হয় রে। সাথে একটা কষ্টও ছিলো। আমি যদি সেসময় থাকতাম তবে কিছু টাকা দিতে পারতাম। আমার বিড়ম্বনা মনে হওয়া সেই ভাংতি পয়সাগুলো আমাকে সেদিন উপহার দিয়েছিলো এক অনির্বচনীয় সুখ যার আনন্দময় স্মৃতি আমি আজো রোমন্থন করি। আমি আরো জানলাম যেখানে প্রত্যাশা নেই সেখানেই লুকিয়ে থাকে মধুর প্রাপ্তির সম্ভাবনা।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




