somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মা

১০ ই মে, ২০১৫ সকাল ১১:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

“মা কথাটি ছোট্ট অতি
কিন্তু জেনো ভাই,
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর
ত্রি-ভূবনে নাই।”

......এমনই একটি কবিতা পড়েছিলাম ছোটবেলায়। লাইন সব ঠিকঠাক আছে কিনা নিশ্চিত নই, তবে এমনই ছিলো মনে হয়। ছোটবেলা থেকেই কেন যেন কবিতাটা খুব ভালো লাগতো। যখন পড়তাম, হালকা পাতলা ইমোশনাল হয়ে যেতাম। পরে অবশ্য আবার যেই-সেই! একটু অস্থির চিত্তের ছিলাম তো, তাই।

অন্যরা মাকে সাধারণত যেভাবে কল্পনা করে, অন্তত আমাদের প্রজন্ম ও তার আগ পর্যন্ত (নিরীহ, ঠাণ্ডা, সরল-ভূষণা, সন্তানের সব দোষ ঢাকতে উন্মুখ, অতি মমতাময়ী...) আমার মা তেমন ছিলো না মোটেও। আমার মা ছিলো ভীষণ চঞ্চল, দুষ্টু, আমুদে, হাসিখুশি, ম্যাচিং এক্সপার্ট (জ্ঞান হওয়ার পর আম্মুকে কখনো এক রঙের শাড়ির সাথে ভিন্ন রঙের কানের দুল পড়তে দেখি নি), মিশুক। সন্তানদের লেখাপড়া এবং চারিত্রিক উন্নতির দিক দিয়ে আমাদের ছোটবেলা থেকেই সে ছিলো ভীষণ কঠোর। আমাদের নামে, ভুল বললাম, আমার নামে কোন বিচার আসলে (আপ্পির নামে জীবনেও কোন বিচার আসে নি, সে ছিলো অতিরিক্ত শান্তশিষ্ট, আমার ধারণা সেটা অস্বাভাবিক!) আম্মু কখনোই তা ঢাকতে চেষ্টা করতো না। জনসমক্ষে ডেকে বিচার করে ধোলাই দিতো। অন্য মা-রা দেখতাম সন্তানদের নামে সত্যি-মিথ্যা কতশত সুনাম করতো, “আমার ছেলে অমুকটা করেছে “, “আমার মেয়ে তমুকটা পেয়েছে”... বলে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠতো। আমার আম্মু তার ধারে কাছেও যেতো না। এমনকি তার সন্তানদের নামে কেউ প্রশংসা করলে তা-ও মানতে চাইতো না। উল্টো দোষগুলো সবাইকে জানিয়ে দিতো! ব্যাপারটা নিয়ে আপ্পি আর আমি ভীষণ ক্ষেপতাম, এখনো ক্ষেপি।

জীবনে আম্মুর মার কম খাই নি। স্যান্ডেল ছাড়া বাকি মোটামুটি সবকিছুর মার খেয়েছি আম্মুর হাতে (যাক, আম্মু এতটুকু সম্মান তো রেখেছে, স্যান্ডেল দিয়ে মারে নি!)। তবে না মেরে অবশ্য উপায়ও ছিলো না। ডাকু টাইপের মেয়ে ছিলাম। বাসায় তুফান ছুটিয়ে বেড়াতাম সারাক্ষণ। স্কুলে কাউকে হুমকি দিয়ে কাবু করে ফেলতাম, কারো আবার মাথায় আলু গজাতাম। কিন্ডারগার্টেনে থাকতে বেস্ট ফ্রেন্ড বাবুর সাথে রাব্বি (বাবুর আরেক বন্ধু) বসে পড়ায় আমি প্রায় তাকে খুন করতে গিয়েছিলাম। এমনকি ‘আমার ফার্স্ট বেঞ্চে’ অন্য কেউ কেন বসেছে, তাই স্কুলের হেড মিস্ট্রেসকে দিয়েও একবার বেঞ্চ টানিয়েছিলাম (কাজটা ঠিক করি নি, এখন বুঝি...)। So, আমাকে আম্মু মারবে না তো কাকে মারবে?!

আমার আম্মু ছিলো নায়িকা শাবানা’র মতো সুন্দরী। আমি কিন্তু একবর্ণও বাড়িয়ে বলছি না! এখন হয় তো বয়সের কারণে সেই সৌন্দর্যের অনেকটাই মলিন হয়ে গেছে। কিন্তু আম্মুর কলেজ জীবনের একটা সাদাকালো ছবি আমি ক্লাস ফাইভে থাকতে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম এইটা শাবানা’র ছবি। শাবানা নিজে আমাকে ছবিটা দিয়েছে, কারণ তিনি আমার আপন খালা হন! সবাই কথাটা বিশ্বাসও করেছিলো, কারণ ছবিটা দেখলে সাক্ষাৎ শাবানাও ভড়কে যেতো, এতটাই মিল! আম্মুর এমন বেশ কিছু ছবি তোলা ছিলো্। কিন্তু আমার আব্বু সেগুলো সবার ‘কু’নজর থেকে লুকিয়ে রাখতে গিয়ে হারিয়েই ফেলেছে! অবশ্য এজন্য তাকে আমাদের সবার কাছ থেকে কম ঝাড়ি শুনতে হয় নি।

আমার মা এখনো অনেকটা তেমনই আছে। তবে সংসারের চাপে তার সেই উড়ালপাখির ডানা কেটে গেছে। চাইলেও আম্মু আর এখানে সেখানে বেড়াতে যেতে পারে না। জীবনের সুখ, আনন্দ অনেকটাই আম্মুর জীবন থেকে দূরে সরে গেছে। তার জন্য দায়ী অবশ্য আমরা, তার সন্তানেরা। আমরা আমাদের মাকে সেই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যটুকু দিতে পারি নি। আমার নিজের কথাই বলি, আলস্য আর অজ্ঞতার কারণে আমার মাকে আমি প্রায় কোনরকম সাহায্যই করি না। মা-টা আমার সারাজীবন খেটেই মরলো্। তার দুই অকর্মা মেয়ের জন্য জীবনে শান্তি পেলো না। বরং কষ্টই পেয়ে গেলো।

আজ বিশ্ব মা দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় দিনটাকে বিভিন্নভাবে পালন করে। দিনটিকে ঘিরে ভালো ব্যবসাও চলে গিফ্ট শপগুলোর। সারা বছর যারা মাকে ভুলে থাকে, মায়ের খোঁজটাও একবার নেয়ার প্রয়োজন মনে করে না, তারাও অনেকটা ফর্মালিটির খাতিরে আজকের দিনটাতে মাকে ফোন করে বা দেখতে যায়, টুকটাক গিফ্ট দিয়ে মাকে সাময়িক খুশি করতে চায়। মনে করে মায়ের প্রতি তার দায়িত্ব সে যথাযথভাবে পালন করেছে! একারণেই অনেকে বিশেষ কোন দিবস উদ্‌যাপনের বিপক্ষে।

আমি কোন দিবস পালনের বিপক্ষে নই, বরং পক্ষে। আমার মনে হয় বিশেষ দিনগুলো আমাকে সেই সম্পর্কের ব্যাপারে আরও সচেতন করে তোলে, ভালোবাসাকে আরও গাঢ় করে তোলে, মনে করিয়ে দেয় সম্পর্কটা আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন কারো জন্মদিন মনে রাখা, পালন করা, যত ছোট করেই হোক, তাকে সুন্দর করে উইশ করা, পছন্দের কোন উপহার দেয়া, তার সাথে সময় কাটানো, এ কাজগুলোর মধ্য দিয়ে আমরা মানুষটাকে বোঝাতে পারি তার গুরুত্ব আমাদের কাছে কতখানি যে তার ছোট ছোট বিষয়গুলো আমরা শুধু তার জন্য মনে রাখি; শুধু তাকে খুশি করতে আমরা তার পছন্দের কিছু তাকে উপহার দিচ্ছি, তার সাথে সময় কাটাচ্ছি তাকে ভালোবাসি বলে। মা দিবসটাও আমার জন্য এমনই। মাকে ভালোবাসবো রোজ। কিন্তু এই দিনটায় যেন মাকে নতুন করে মনে করিয়ে দিতে পারি তাকে কতটা ভালোবাসি, তাই তার জন্য দিনটা পালন করতে চাইছি, তার জন্য ছোট্ট কোন উপহার নিয়ে এসেছি। কিন্তু এমন যদি হয় সারা বছর ফিরেও তাকালাম না, শুধু বিশেষ দিনটাতেই তার জন্য ভালোবাসা উথলে পড়লো - না। এমন মা দিবস আমি সমর্থন করি না। বিশেষ দিন বিশেষ মানুষকে বিশেষ অনুভব করানোর জন্য, সারা জীবন তাকে তুচ্ছ গণ্য করে এক দিন বিশেষ করে ছোট করার জন্য না।

আম্মু, তোমাকে অনেক ভালোবাসি। হয় তো সবসময় বোঝাতে পারি না। তোমাকে আলসেমি করে সাহায্যও করি না তেমন। যখন তখন জেনে না জেনে অনেক কষ্ট দিয়েছি। কিছু কষ্ট আবার এতটাই বড়, যা ভেবে আমার নিজেরই ভীষণ যন্ত্রণা হয়। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে সত্যিই অনেক ভালোবাসি। কোন একটা সময় তুমি আমার প্রতি উদাসীন হয়ে গিয়েছিলে, তা যে কারণেই হোক। তখন আমি তোমার থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিলাম। এ কারণেই তোমাকে অত বড় কষ্ট দেয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। নইলে হয় তো সেই ভুল করাই হতো না। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে জীবনের অনেক বড় কিছু শিক্ষাও পেয়েছি। তোমাকেও পেয়েছি নতুনভাবে। সত্যিই ঈশ্বর যা করেন ভালোর জন্যই করেন। শুধু যখন করেন তখন বুঝতে পারি না। তিনি আমার জীবনটাই পাল্টে দিয়েছেন। আর বন্ধুত্বটা আরো গাঢ় করে দিয়েছেন ‘মা’ নামের বন্ধুর সাথে।


(ছবি: ইন্টারনেট)
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মে, ২০১৫ রাত ১১:২০
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×