somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এতিমখানা থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে

০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ রাত ৮:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছয় মাস বয়সে বাবা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় না ফেরার দেশে। তখন কিছু বুঝতাম না। শুধুই কাঁদতে জানতাম। তবে নানা বলতো তখন আমি নাকি সবার অজান্তেই অনেক কেঁদেছিলাম। মায়ের বুকে মাথা রেখে যখন আমি কাঁদছিলাম তখন পাশের বাড়ীর খালা এসে আমায় কোলে তুলে নিয়ে বলেছিল একদিন আমি অনেক বড় মাস্টার হব। যে দিন মায়ের আর কোন অভাব থাকবে না। এভাবেই নানার মুখে শোনা কথাগুলো বলছিলেন আব্দুর রহিম।
বাবা মারা যাওয়া পর মা ভেবেছিল বড় হলে আমাকে অন্যের বাড়ীতে রাখবে। কিন্তু নানা তা হতে দেয়নি। সবাই চেয়েছিল আমি যেন লেখা পড়া করি। আমার বয়স যখন পাঁচ বছর তখন সবার মতো জীবনে শুরুতে কখনও প্রথম শ্রেণীতে পড়া হয়নি। ছোট বেলায় সবাই যখন অ-আ-ক-খ পড়ার জন্য প্রথম শ্রেণীতে যায়, তখন আমার পড়া শুরু করতে হয়েছিল দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে। আমি নাকি সবার থেকে একটু বেশী পারতাম তাই মায়ের কথা শুনে নানা গিয়ে সোজা হাজী দানেষ এতিমখানা ও পাঠাগারের ‘ক্লাস টু’-তে ভর্তি করে দেয়। শুরু হয় আমার পড়া। চলতে থাকে দুবেলা খেয়ে পরে আনন্দ নিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা। তবে এতিমখানায় পেট পুরে খাওয়া হতো না কোন দিন। তবু ক্লাসে কখনও প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি।
কিন্তু পেটে ক্ষুধা নিয়ে পড়তে পড়তে আর ক্ষুধা সহ্য হচ্ছিল না। তাই অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় বাবুর্চির কাছে বেশী ভাত চাই, কিন্তু তিনি তা না দেওয়ায় এতিমখানা থেকে পালিয়ে বাড়ী আসি। সিদ্ধান্ত নেই আর কোন দিন এতিমখানায় যাব না। মানুষের বাড়ীতে গিয়ে গরু চড়ায়ে হলেও তিন বেলা পেট পুরে খাব। মা তখন অনেক কেঁদেছিলেন আমার জন্যে। কিন্তু পরের দিনই আমাদের বাড়ীতে এসে হাজির হন এতিমখানার সভাপতি এমাজউদ্দিন ও শিক্ষক রফিকুল ইসলাম। তারা এসে মায়ের কাছে বলে তোমার ছেলেকে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিন, সে একদিন পড়াশুনা করে অনেক বড় হবে। মা তাই করে। এভাবেই পার হয়ে যায় এসএসসি পর্যন্ত। সেখানে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০০২ সালে ৩ পয়েন্ট সাত তিন পেয়ে তিনি এসএসসি পাশ করেন।
বাড়ীর পাশের গ্রামের এক কলেজ থেকে এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে ২০০৪ সালে তিনি ৪ পয়েন্ট ৪ পেয়ে যাই। এইচএসসি পাশের পর আমাকে নিয়ে বিপাকে পরতে হয় সবাইকে। ইচ্ছা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। কিন্তু কোচিং করতে যে টাকা লাগতো তা আমাদের ছেল না। তাই কোচিং না করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দেই।
২০০৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনি বিদ্যা বিভাগে পড়ার সুযোগ হয় আমার। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর স্যার খুঁজে দেন টিউশনি। টিউশনি করে ভালোভাবেই চলে যাচ্ছিল সময়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে একটা ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে একদিন মায়ের গলায় ‘গোল্ড মেডেল’ দেব। পূরণও হয়েছে। নবাব আব্দুল লতিব হলের সমাপনিতে আমার মাকে নিয়ে এসেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতিতে আমাকে যখন মেডেল দেওয়া হয়েছিল তখন ভেবেছিলাম আমার স্বপ্ন আজ পূর্ণ। কারণ ওই মায়ের গলায় মেডেল পড়াতে দিতে পেরেছিলাম।
তবে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে আমি বিভাগে দ্বিতীয় ছিলাম। তখন নানা বলেছিলেন, ‘রহিম তো জীবনে কোন দিন প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি। তাহলে এখন কেন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দ্বিতীয় বা তৃতীয় হবে?’ নানার প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে এসে গিয়েছিল তৃতীয় বর্ষে। এ বছর ১২৯ নম্বর লিড রেখেই প্রথম স্থানে বিভাগে প্রথম হয় আমি। তখন মনে হচ্ছিল যে বিভাগ বা হল থেকে মেডেল নিয়ে মায়ের গলায় দিতে পারবো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসর সময়ে সবার সাথে আড্ডা দিতে ভালবাসতাম। অনেক সময় নাটক ও কৌতূক দেখে কেটে যেত সময়। টিউশনি করে পড়ার খরচ যোগালেও নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত ছিলাম। স্যারদের এমন ভাবনা হয়েছিল, কেউ যদি ক্লাসে না আসে তবে রহিম ক্লাসে থাকবে। আমি কখনও ক্লাসে মিস করতাম না। নিয়মিত সময় করে পড়তাম। কখনও রাত ১১টা বেজে কক্ষে আসলেও অন্তত দুই ঘন্টা পড়ে তবেই ঘুমাতে যেতাম।
সেই উচ্ছাস নিয়ে ¯œাতক ও ¤œাতকোত্তরে প্রথম স্থানে হওয়ার ভাগ্য হয়েছিল তার। বিভাগে প্রথম হওয়ার পাশা পাশি জীব ও ভূ-বিজ্ঞান অনুষদে তিনিই প্রথম হয়েছিলেন। সেই সাথে এনে দিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ‘গোল্ড মেডেল’। ২০১২ সালের ৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে হাতে নিয়েছিলাম ‘গোল্ড মেডেল’। ওই দিনও মায়ের ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছিল পুরাদমে।
আব্দুর রহিম বর্তমানে শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সরণী কাকরাইলে কর্ম জীবনে আছেন। মায়ের নাম রহিমা খাতুন। টেনা গ্রামের বোটাগঞ্জ উপজেলার দিনাজপুরে জন্ম তার। তিনি এখন জুনিয়র হাইড্রোজিওলোজিস্ট হিসেবে মাটি ও পানির নমুনা নিয়ে কাজ করছেন। তবে তার ইচ্ছা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। মায়ের ইচ্ছাও তাই।
+8801724008482
Email: [email protected] (Official)
[email protected]
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

।।মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনার রাস্ট্রীয় জঙ্গীবাদ।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮


মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনা ভারতের প্রযোজনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদেরকে দিয়ে জঙ্গী জঙ্গী নাটক মঞ্চস্থ করতো। বহিবিশ্বকে বোঝাতো দেশে ইসলামী জঙ্গী দিয়ে ভরে গেছে এবং সেই জঙ্গীরা ইউরোপ আমেরিকার ভয়াবহ ক্ষতি করবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=শরত তুই যাস নে ! =

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৩



ভ্যাপসা গরমে নাভিশ্বাস জীবনে কেবল বৃষ্টির হাপিত্যেশ,
মেঘ বলেছে আসবো আসবো আমার উদ্দেশ,
শুভ্র মেঘেদের নাচন
উত্তাপ হাওয়ায় যায় না আর বাঁচন,
তবুও স্নিগ্ধ আবেশ মনজুড়ে,
হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটা, বাজে পাতার বাঁশি সুরে।

বিকেলের হাওয়ায় দেহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

১ কোটি চাকরি: শর্ত প্রযোজ্য, মেধার প্রবেশ নিষেধ !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:২৫


ভোটের আগে বলা হয়েছিল, ক্ষমতায় এলে প্রথম আঠারো মাসেই এক কোটি মানুষকে চাকরি দেওয়া হবে। কথাটা শুনে দেশের বেকার তরুণেরা তো মহাখুশি, কেউ ভাবল সরকারি চাকরি হবে, কেউ ভাবল... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বে ঋণ খেলাপিতে বাংলাদেশ ১ নম্বর এবং দেশে ঋণ খেলাপিতে শীর্ষ ২০ জনের ১৯ জনই ওনাদের!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:০৫



শাস্ত্রীয় কথায় না গিয়ে সোজা কথায় কেউ ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করলে তাকে ঋণ খেলাপি বলা হয়। আপনি জানলে অবাক হবেন যে শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির ১৯ জনই... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কি ডার্ক জাস্টিসকে ফলো করছেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:১০



ছোটবেলায় দেখা একটি টিভি সিরিয়াল তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিলো। একজন বিচারক যিনি দিনের বেলায় কোর্ট রুমে অপরাধের বিচার করতেন, আর, রাতেরবেলা আইনের ফাঁক -ফোকর গলে বেরিয়ে যাওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

×