
ধর্ম (Religion) হলো এমন একটা শব্দ, যা ছুরির চেয়েও ধারালো, সাপের বিষের চেয়েও বিষাক্ত। একমাত্র এই শব্দটাই মানুষকে নৃশংসভাবে কেটে খন্ডিত করে। মানুষকে বানায় হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন, ইহুদী, খৃষ্টান এসব। মানবতা লুন্ঠিত করার শক্তিশালী হাতিয়ার এই ধর্ম। দুর্জন ব্যক্তিরা এই ধর্মটাকেই যুগ যুগ ধরে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। কেবল নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য। সমাজের অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মানুষের মাঝে ধর্মের মাতম তুলে নিজেরা লুফে নেয় স্বার্থ। আরাম আয়েশে বিলাসিতায় জীবনকে উপভোগ করে নিরালায়। আজ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাস ঘাটলে যা দেখি, রাজ্য বিস্তার বা ক্ষমতা দখলের জন্য যত না প্রাণহানি হয়েছে, ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ সংঘাতে তার চেয়েও বেশি প্রাণহানি হয়েছে, বিধ্বস্ত মানবতা। বেশি দূরে নয়, আমাদের এই মহাদেশের দিকে দৃষ্টি দিলেই সহজে উপলব্ধি করা যায় বিষয়টা। বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের বাড়াবাড়ি, ভারতে সনাতন ধর্মের বাড়াবাড়ি, মায়ানমারে বৌদ্ধ ধর্মের বাড়াবাড়ি, ইসরাইলে ইহুদী ধর্মের বাড়াবাড়ি, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যের কথা বাদই দিলাম। আর ইউরোপে? জার্মান, সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক ওসব দেশের দিকে তাকাই। ওসব দেশে শান্তি আছে, ধর্ম নেই। আর যেখানেই ধর্ম, ধর্মের বাড়াবাড়ি সেখানেই অশান্তি, বিপন্ন মানবতা।
অনেকে ধর্মশিক্ষাকে নৈতিক শিক্ষা বলে গুলিয়ে ফেলেন। উন্নত অনেক দেশেই ধর্ম নেই, তাই বলে কি সেখানে নৈতিক শিক্ষা নেই? নৈতিকতা নেই? বরং আমাদের মতো যেসব দেশে ধর্মের জিকির তোলা হয়, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি হয়, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি, সেসব দেশই পিছিয়ে আছে উন্নয়নে, নৈতিক শিক্ষায়। বিশ্বে উন্নত সব দেশে ধর্মের বাড়াবাড়ি নেই, সেসব দেশ মানবতা ও নৈতিকতায় এগিয়ে রয়েছে আমাদের থেকে বহুদুর। তাঁরা বিজ্ঞানমনস্ক জাতি, নিয়মশৃঙ্খলা, নৈতিকতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে ব্যাস্ততা তাঁদের। এই উপমহাদেশের ধর্মাশ্রয়ী নেতাদের মতো কার ফ্রিজে গরুর মাংশ, শুকরের মাংশ আছে, কাকে পিটিয়ে বা পুড়িয়ে মারতে হবে, কে কোন ধর্মপ্রবক্তাকে কি বলে কটাক্ষ করেছে এসব ঘাটার মতো অযথা সময় ব্যয় করার মতো সময় ওদের নেই। এদেশের দুর্নীতি আর ওসব দেশে দুর্নীতির তুলনা করলেই বুঝা যায় অনায়াসে নৈতিকতার অবস্থান।
আজ সমাজের যে নেতা ব্যক্তিটা ব্যাঘ্র নিনাদে ধর্মের মাতম তুলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে এগিয়ে আছে, তাকে বা তার সন্তানকে সেসব ধর্মমুক্ত দেশে শুধু যাবার সুযোগ দিলে, লেজ গুটিয়ে ম্যাও ম্যাও করে ছুটবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। মধ্যপ্রাচ্যে কতোটা শিক্ষা আর মানবতা আমরা দেখতে পাই? ইসলাম ধর্মের পূণ্যভূমি সৌদি আরবের কথাই দেখি। এদেশ থেকে নারী শ্রমিক কাজ নিয়ে সেখানে গিয়ে কি অবস্থার শিকার হয়ে দেশে ফিরছে? সেখানে তো সম্পুর্ন ধর্ম শাসিত দেশ। ধর্মীয় অনুশাসনে চলে সব কিছু। একজন নারী শ্রমিক ফিরে এসে যখন কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে জানায়, উপুর্যুপুরি পিতা ও পুত্রের ধর্ষণের শিকার হয়েছে সে। বিচার চাওয়ার অধিকার পায়নি ধর্মীয় অনুশাসনের পুণ্যভূমিতে। তাদের অর্থে এদেশে যারা ধর্মীয় শিক্ষা তথা অনুশাসনের দাবী তোলে, খুব ভয়াবহ বিপর্যয়ের দুশ্চিন্তাই তখন যেকোন বিবেক সম্পন্ন মানুষকে বিচলিত করে।
বঙ্গভঙ্গ হয়ে পাকিস্তানের উপনিবেশে প্রবেশ করেছিলাম আমরা ধর্মেরই দোহাইয়ে। ধূর্ত ইংরেজরাও বুঝেছিল, ভারতবর্ষের স্বাধীনতায় আন্দোলনরত সুসংগঠিত নাগরিকদের খণ্ডিত করার একটাই উপায়, তা হচ্ছে ধর্ম। এই একটা উস্কানীতে বৃটিশরা এ দেশের সম্পদ লুন্ঠনের জবাবদিহিতা এড়িয়ে স্বচ্ছন্দে পগার পার হবার পথ খুঁজে পেয়েছিল সহজে। তারপরের ধর্মীয় দাঙ্গার ইতিহাস কি ভুলে যাবার? ইতিহাস থেকে তা মুছবে না কখনো, যদিও জাতি হিসেবে আমরা প্রায়শঃ ইতিহাস বিস্মৃত। পাকিস্তান গঠিত হবার পর সেই ধর্মের ভূত পুরোই চেপে বসলো শাসকদের মাথায়। ধর্মের মওকায় শাসনের চেয়ে শোষন অনেক বেশি সহজ। ওরা তাই করলো। যেখানে বৃটিশের সাথে লড়াই করে ওদের দ্বারা লুণ্ঠিত সম্পদ পুনরুদ্ধারে লেগে থাকার কথা, সেখানে ভারত বিদ্বেষ ও ইসলাম কায়েমের দোহাই দিয়ে এদেশের উপর স্টিম রোলার চালিয়ে সম্পদ চুরির পাঁয়তারা শুরু করলো। দেশ বিভাগের সীমানার জটিলতার দিকেও দৃষ্টি দিতে ভুলে গেল পাকি ক্ষমতাধরগণ। দীর্ঘদিন যার ভুক্তভোগী ছিল এদেশের সীমান্তবর্তী সাধারণ জনগণ। তারা এদেশে ইসলাম কায়েমের নামে সম্পদ লুণ্ঠন শুরু করেছিল, সাধারণ মানুষের শান্তি-স্বস্তির কথা ভাবেনি, উন্নয়নের কথা ভাবেনি। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ধর্মের জিকিরে শোষণ নিপীড়ন নির্যাতন চালিয়েছে। ১৯৭১ সালে পাকি সেনারা এদেশে যুদ্ধ করেছে নাকি ইসলাম রক্ষার জন্য! আর এই ইসলাম রক্ষার জোসেই এরা আমাদের মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠন করেছে অবলীলায়। এখানেও ধর্মই হাতিয়ার।
মায়ানমারে ধর্মীয় গুরুর উস্কানী আর সেনাবাহিনীর তান্ডবে বিপন্ন মানবতা কি আমাদের দৃষ্টি এড়ায়? সেখানেও জাতি ও ধর্ম নিয়েই সঙ্ঘাত। পালেস্টাইনের নিরীহ শিশুও রক্ষা পায় না ইসরাইলের ইহুদী জান্তার হাত থেকে। নজিবউল্লাহর আধুনিক সুসভ্য আফগানিস্তান আজ বিধ্বস্ত কেবল ধর্মের কারণেই। পৃথিবীর বহু দেশ আজ অস্থির এই ধর্মের সংঘাতে। মানবতার বানী সকল ধর্মেই রয়েছে, কিন্তু মানবতাকেই নৃশংসভাবে ধ্বংস করেছে ধর্ম ও ধর্মের ধ্বজাধারীরা। যদিও কেবল ধর্মকে বাদ দিলেই সম্পূর্ণ অখন্ড থাকবে মানুষ, সুরক্ষিত হবে মানবতা, এ কথা বলা যায় না। তবে অনেকাংশেই নৃসংসতা ও কুপমণ্ডকতা থেকে পরিত্রান পাবে নিঃসন্দেহে বলতে পারি। অন্তত এক ধাপ এগিয়ে যাবে সভ্যতা।
দূর হোক সকল অধর্ম, জয় হোক মানবতার।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুন, ২০১৮ বিকাল ৩:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




