
সময়ের দাবী, নিরাপদ সড়ক চাই।
নিরাপদ সড়কের জন্য এই শ্লোগানটি আজ নতুন কিছু নয়। এটা কোন রাজনৈতিক দলের কোন এজেন্ডাও নয়। রাস্তায় সাধারণ মানুষের অক্ষত বেঁচে থাকার দাবী। চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর, নিরাপদ সড়কের জন্য ইলিয়াস কাঞ্চন একটি সাংগঠনিক রূপ দাঁড় করিয়েছেন। তিনি একে ব্রত হিসেবেই নিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে ৩ আগস্ট শুক্রবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘আমার সন্তানদের বলতে চাই, তোমরা একটি গাড়িও ভাঙচুর করবে না। কারণ এই ভাঙচুরের কারণে সুযোগ সন্ধানীরা ১০টি বা ২০টি গাড়ি ভাঙচুর করবে। বাবারা-মায়েরা, তোমরা খেয়াল রাখবে, তোমাদের আন্দোলন কেউ যেন বানচাল করতে না আসে। তোমাদের মধ্যে যেন কোনো অপশক্তি ঢুকে না যায়, এটা লক্ষ রাখতে হবে।’
তিনি তাঁর অন্তঃসত্ত্বা কন্যাকে দেখতে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে বলেন, ‘লন্ডনে আমার একটা সন্তান, আর এ দেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় আন্দোলনে করছে হাজার হাজার সন্তান। এই কোমলমতি সন্তানদের রাস্তায় রেখে আমি কী করে লন্ডনে মেয়ের কাছে যাই? পুরো বাংলাদেশ এখন নিরাপদ সড়কের দাবিতে চিৎকার করছে। থাক না আমার এক মেয়ে ওখানে। আমি আছি সমগ্র বাংলাদেশের সন্তানদের নিয়ে। স্বজন হারানোর বেদনা কতটা হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়, তা তো আমি জানি। আপাতত তাই লন্ডন যাওয়া বাতিল। তা ছাড়া অনিয়মকে নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধতে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, তা চিহ্নিত করার দায়িত্ব এসেছে আমার কাঁধে। গঠিত তদন্ত কমিটির দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে চাই।’
তিনি আরো বলেন, ‘সব অধিদপ্তর যদি তাদের কর্মকাণ্ড শুরু করে দেয়, তাহলে আমার সন্তানদের উদ্দেশ্যে বলব, তোমরা অবশ্যই ঘরে ফিরে যাবে, লেখাপড়া করবে। বাবা-মায়ের কাছে থাকবে। প্রয়োজনে আবারও যদি কোনো অসুবিধা হয়, তখন অবশ্যই আমরা তোমাদের সঙ্গে থেকে আবার রাজপথে নামব।’ তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা আমাদের দেশের মেরুদণ্ড। আজ সড়ক দুর্ঘটনায় দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে যাচ্ছে যা সত্যিই দুঃখজনক। আমরা চাই কাল রাজধানীর সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ও সবস্তরের জনগণ আমাদের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবেন। সবার প্রতি আহ্বান থাকলো, সবাই মিলে সচেতন হই যেন আর কোনো তাজা প্রাণ সড়কের অপঘাতে নিভে না যায়।
এখানে তাঁর প্রতিটি কথাই মানবিক এবং সুবিবেচিত। সরকারের দায়িত্বশীল মহলের কি এ কথাগুলো খুবই দুর্বোদ্ধ?
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক ফেডারেশনের মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ একই দিনে ঘোষণা জারী করেন, ‘সড়কে নিরাপত্তা ফিরে না আসা পর্যন্ত বাস চলাচল বন্ধ থাকবে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০০ বাস ভাংচুর ও ৮টি বাস পোড়ানো হয়েছে। তাই শিক্ষার্থী ঘরে ফিরলেই স্বাভাবিক চলাচল হবে।’
শিক্ষার্থীরা যুক্তিসংগত আন্দোলনে রাস্তায় নেমেছে, এটা তাঁর বোধগম্য হচ্ছে না। কিসের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরবে, তা নিয়ে তাঁর কোন মাথা ব্যাথা নেই। কোন দুঃসাহসে, কার উস্কানিতে তিনি এই হুঙ্কার দেন? বাস ভাঙচুরএর মায়াটা তাঁর কাছে বড় হয়ে দেখা দেয়, প্রতিনিয়ত রাস্তায় গাড়ির নিচে চাপা দিয়ে প্রাণ সংহারের বিষয়টা কিছুই না? পরিবহন ব্যবসা করে টাকার পাহাড়ে বসবাসকারী এনায়েত উল্লাহদের মতো পরিবহন শ্রমিকের পরিবার পরিজন কিন্তু প্রাইভেট কারে চড়ে চলাফেরা করে না, তারাওতো সাধারণ পরিবহনে সড়কেই চলাফেরা করে। তাঁদের জন্যও প্রয়োজন সড়কে নিরাপত্তা।
একটা সময় আওয়ামী লীগ জনগণের সকল দাবীর সাথে একাত্ম থাকতো। রাজনৈতিক দাবী ছাড়াও অনেক সাধারণ দাবী দাওয়ায় তাঁদের সমর্থন পেয়েছে মানুষ। বর্তমান পরিস্থিতে আওয়ামী লীগ সরকারের রহস্যময় নিরবতা ও ক্রমাগত জনবিচ্ছিন্ন আচরণই পরিস্থিতিকে জটিলতার দিকে ঠেলে দেবার জন্য মুলত দায়ী। জোর করে বা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে এই আন্দোলন বানচালের অপতৎপরতার চিন্তা বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের ন্যায়সংগত "নিরাপদ সড়ক"এর দাবী মেনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া উচিৎ। নইলে হয়তো আন্দোলনকারীদের পিছে হটার সুযোগ থাকবে না।
সরকার কি এখনো অনুধাবন করতে পারছে না, জনগণ ফুঁসছে। পরিস্থিত ক্রমশঃ জটিল হয়ে উঠছে। একদিন হয়তো তাঁরাই অসহযোগের ডাক দিয়ে বলবে, সড়ক নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত কাজে যোগ দিবো না।
(তথ্যসূত্রঃ প্রথম আলো, যুগান্তর। ছবিঃ নেট থেকে সংগৃহীত)
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই আগস্ট, ২০১৮ রাত ৩:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


