somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কুকুর সমাচার

১২ ই জুলাই, ২০০৬ সকাল ৯:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


(ইদানীং ভূমিকা দিতে খুব ভালো লাগে, মনে হয় হাতির পিঠে হাওদা চাপাচ্ছি।
যা-ই হোক, রহস্যগল্প নিয়ে একটু বিতং করে গোটা দুয়েক বিখাউজ রহস্যগল্প তুলবার খায়েশ ছিলো। তার আগেই দেখি মুখফোড় তার মগাদিশু চৌরাসিয়া আর কার্বন মাঝিকেন্দ্রিক রহস্যগল্প দাগা শুরু করে দিয়েছে। ঐ ক্রসফায়ারে আমার নিরীহ ব্যাঙ্করাপ্ট ভাড়া-দিতে-অপারগ গরীব গোয়েন্দা গুল মোহাম্মদকে ঠেলে দিতে মন সরলো না। তবে এখন একটু সাহস করে বেচারাকে সামনে ঠেলছি, গোটা দুই তিন গল্প আপলোড করবো সামনে। সবই যে রহস্যে টইটম্বুর এমন নয়।
গল্পের তারিখ দেখতে পাচ্ছি 19শে সেপ্টেম্বর 2002। যেমন বলছি অনেক দিন ধরে, নতুন কিছু লেখা হচ্ছে না, কিন্তু ব্লগ লিখতে হাত নিশপিশ করে। এ এক যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি, ব্লগারু মাত্রেই জানেন।
মিষ্ট বা তিক্ত মন্তব্য ঝেড়ে দিতে আপনি আমন্ত্রিত। ধন্যবাদ ।)


1.
পাড়ার নেড়ি কুকুরটাকে গুল মোহাম্মদ ভালো চোখেই দ্যাখেন।

তাঁর বাড়ির সামনেই থাকে কুকুরটা। গেটের ওপাশে, ড্রেনের ধারে সে কুন্ডলী পাকিয়ে পড়ে থাকে আর আপন মনে লেজ নাড়ে। মাঝে মাঝে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়, বেড়াল তাড়া করে বেড়ায়, কাক-চড়ুয়ের মহাসমাবেশে গিয়ে হল্লা করে, ফেরিওয়ালাদের পেছন পেছন চামচার মতো ঘোরাঘুরি করে। সব মিলিয়ে কুকুরটা ভালোই। মস্তানি করে না, চাঁদাবাজি করে না, পলিটিঙ্ করে না। আলতুফালতু বিবৃতি দেয়ার ব্যাপারেও তার তেমন আগ্রহ নেই, তবে মাঝে মাঝে রাতে সে বেহুদাই ভারি করুণ সুরে কাঁদে। তা কাঁদুক, সমাজে কান্নাকাটি করার মতো বিষয়ের অভাব নেই।

গুল মোহাম্মদের কুকুর পোষার শখ বহুদিনের। কিন্তু তিনি শুনেছেন কুকুর পোষা অত্যন্ত খরুচে ব্যাপার। তাঁর নিজস্ব অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাও তাই-ই বলে। কারণ যথেষ্ঠ পয়সাওয়ালা লোকজনের বাড়িতেই কুকুর থাকে। তিনি হতদরিদ্র একজন গোয়েন্দা, মাসে মাসে এই বাড়ির চিলেকোঠার ভাড়া যোগাতেই তাঁর নাভিশ্বাস উঠে যায়, তাঁর কাছে কুকুর পোষা হাতি পোষার মতোই ব্যাপার। যদিও বড়লোকদের বাড়িতে হাতি নেই, কিন্তু কেন যেন তাঁর মনে হয়, হাতি পোষা ব্যাপারটাও যথেষ্ট খরুচে।

তবে এই কুকুরটাকে তিনি একরকম পোষ মানিয়ে ফেলেছেন। রোজ গুল মোহাম্মদ কুকুরটাকে এক প্যাকেট সস্তা বিস্কুট খাওয়ান। কুকুরটা এখন তাকে দেখলেই লেজ নাড়ে আর ভুক ভুক করে নিজের ভাষায় কী কী যেন বলে।

নেড়ি কুকুরের নাম কালু, লালু, ভুলু, এই গোছেরই হয়। কিন্তু গুল মোহাম্মদ এই ধরনের নাম পছন্দ করেন না একটি বিশেষ কারণে। পাড়ার বখাটে অলপ্পেয়ে বদমায়েশ পোলাপান তাঁকে আড়ালে এবং প্রকাশ্যে গুলু গোয়েন্দা বলে ডাকে, কখনো কখনো তারা তাঁর গোয়েন্দা পরিচয়কে বেমালুম অস্বীকার করে শুধু গুলু গুলু বলেই চেঁচায়। কাজেই কুকুরের নাম লালু বা কালু রাখলে তারা এই দুয়ের ছন্দ খুঁজে তাঁকে রোজ ক্ষেপাবে। হয়তো বলবে, 'গুলু যায় আগে আগে কালু যায় পিছে!' কিংবা, 'লালুর পোষা গুলু, নাকি গুলুর পোষা লালু?' কিংবা বলা যায় না, দু'জনের এই জুটিকে একসাথে নেড়ি গোয়েন্দা নাম দিয়ে বসতে পারে তারা।

ইত্যাদি সাত পাঁচ ভেবে প্রথমটায় গুল মোহাম্মদ মুষড়ে পড়লেন। কী বলে কুকুরটাকে ডাকবেন সেটা ঠিক করতে না পেরে তিনি হতাশ হয়ে কুকুরটাকে ডগি বলে ডাকা শুরু করলেন। ডগির এ ব্যাপারে কোনো আপত্তি নেই, একটা বিস্কুট দিয়েই গুল মোহাম্মদ তার আকিকা সম্পন্ন করলেন।

বাড়িওয়ালা শাহেদ সাহেব অবশ্য কুকুর পছন্দ করেন না। তিনি এককালে সরকারী চাকরি করতেন, গুল মোহাম্মদের ধারণা তিনি বিস্তর ঘুষ খেয়ে খেয়ে এই বাড়ি তৈরী করেছেন। একমাত্র অসৎলোকই কুকুর অপছন্দ করে বলে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস।

সেদিন ভোরবেলা যেমনটা হলো। শাহেদ সাহেব মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছেন, আর বেচারা ডগি কুন্ডলী পাকিয়ে পেটে নাক গুঁজে মহা আরামে ঘুমুচ্ছিলো। কথা নেই বার্তা নেই শাহেদ সাহেব ছড়ি উঁচিয়ে বেচারাকে তাড়া করলেন। গুল মোহাম্মদ তাঁর চিলেকোঠার ঘরে শুয়ে শুয়ে যোগব্যায়াম করছিলেন, (এসময় তাঁর অল্প অল্প নাক ডাকে, লোকে ভুল করে ভাবতে পারে যে তিনি হয়তো ঘুমুচ্ছেন, কিন্তু নাক ডাকাটাও আসনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এটা পাঠককে বুঝতে হবে) ডগির কুঁই কুঁই চিৎকার শুনে তাঁর যোগের ঘোর কেটে গেলো। ছাদে ছুটে বেরিয়ে এসে দৃশ্যটা দেখে তাঁর মাথায় রক্ত চড়ে গেলো, কিন্তু বাড়িওয়ালার সাথে ভ্যাজাল করার ইচ্ছে নেই বলে তিনি তখনকার মতো কিছু বললেন না, বহু কষ্টে যোগবলে রাগ কমিয়ে আনলেন। অবশ্য সেই বিকেলবেলা বাড়ির সামনে শাহেদ সাহেবের সাথে যখন তাঁর আবার দেখা হলো, তখন তিনি ভোরবেলার সেই অনাচারের শোধ নেয়ার জন্যে একটু খোঁচা মেরেই বললেন, 'কী ব্যাপার, শাহেদ সাহেব? আপনি কি এখন থেকে এই কুকুরটার কাছ থেকেও মাসে মাসে ভাড়া আদায় করবেন নাকি?'

শাহেদ সাহেব অতি ইতর প্রকৃতির লোক, চোখমুখ কুঁচকে বলেন, 'হ্যাহ, বললেন একটা কথা। কুকুর যদি ভাড়া দিতো, তাহলে কি আর মাসে মাসে মোটা টাকা গচ্চা দিয়ে চিলেকোঠাটা ফেলে রাখি? কুকুরটাকেই কি তাহলে সেখানে জায়গা দিতাম না?'

বলাই বাহুল্য, চিলেকোঠাটা খালি নয়, ওখানে উপমহাদেশের প্রখ্যাত গোয়েন্দা গুল মোহাম্মদ থাকেন। এইভাবে কুকুরের সাথে তাঁকে তুলনা করে তাঁকে কুকুরাধম প্রমাণ করার অপচেষ্টাকে তিনি খুব একটা ভালো চোখে দেখেন না, কিন্তু তাঁর মুখে সময়মতো জবাব এলো না বলে তিনি পুনরায় যোগবলে রাগ চেপে রেখে বৈকালিক ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লেন। আর শাহেদ সাহেবও অকর্মার ধাড়ি তথাকথিত গোয়েন্দাটাকে উচিত শিক্ষা দেয়া গেছে, এমন একটা ভুল ধারণা নিয়ে খুশি মনে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লেন। ব্যাটা, ভাড়া দিবি না সময়মতো, আবার রাস্তার কুকুরের হয়ে ওকালতিও করবি, তা কি হয়? গাছেরও খাবি, তলারও কুড়োবি? মনে মনে এসব আজেবাজে কথা ভাবেন শাহেদ সাহেব।

আর কুকুরটার পেছনে শুধু শাহেদ সাহেবই নন, পাড়ার আরো কিছু বদ লোক উঠে পড়ে লেগে থাকে। এদের মধ্যে একজন হচ্ছে পাড়ার টহলদার কনস্টেবল বাচ্চু মিয়া, যার একমাত্র কাজ গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো। 'পুলিশ আসিবার পূর্বেই চোর পলায়ন করিলো', পাস্ট পারফেক্ট টেন্সের সেই ট্রান্সলেশনটির পুলিশের এক পারফেক্ট উদাহরণ হচ্ছে বাচ্চু মিয়া। তার ডিউটি শুরু হয় সন্ধ্যে থেকে, শেষ হয় ভোরে। এই সময়টুকু সে ডগিকে নানা প্রকার জ্বালা যন্ত্রণা করে। হয়তো খামোকাই লাঠি দিয়ে খোঁচাতে থাকে, নয়তো ঢিল ছুঁড়ে মারে, অথবা ভেংচি কেটে কুকুরটাকে অপমান করার চেষ্টা করে। ডগি তখন দূরে সরে গিয়ে ঘেউ ঘেউ করে তাকে বকা দেয়।

পাড়ার ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক বদিউল হুদাও কম যায় না। সেও ডগিকে বিস্তর হয়রানি করে। হয়তো ডগি আপনমনে শুয়ে আছে, তখনি সে এসে হাজির। একটা পুরোনো ক্যামেরা আছে তার, সেটা দিয়ে সে নানা অ্যাঙ্গেলে, নানা পজিশন থেকে ডগির ছবি তোলার ভান করবে। ডগি ভারি উৎসুক হয়ে চেয়ে থাকে, লেজ নাড়ে, খবরের কাগজে নিজের ছবি দেখার একটা সুপ্ত আশা হয়তো তার মাঝেও আছে। কিন্তু বৃথা আশা, একসময় তার শয়তানি শেষ হয়ে গেলে বদিউল হুদা ডগিকে কষে একটা লাথি মেরে চলে যাবে, ছবি না তুলেই। পিকচারের বদলে বেচারার ভাগ্যে জোটে টরচার। এ এক ধরনের নৃশংসতা, এক অসহায় নেড়ি কুকুরের ওপর মানসিক উৎপীড়ন চালানো, গুল মোহাম্মদ ভাবেন, পশু অধিকার সমিতির কাছে তিনি চিঠি লিখবেন, কিন্তু অনেক তদন্ত করেও এরকম কোন সমিতির ঠিকানা তিনি জোগাড় করতে পারেন নি।
অবশ্য ভাগ্য ভালো যে এমন নৃশংস বদলোকের সংখ্যা কম। পাড়ায় অনেক দয়ালু হৃদয়বান মানুষও আছেন। অনেকেই দুপুরে ডগিকে এটা ওটা খেতে দেয়, তাই বেচারার ওপর খরচের ধাক্কাটা কমই লাগে। না, আমি ডগির কথা বলছি না, গুল মোহাম্মদকেই বেচারা বলছি। একটা কুকুরকে দিনভর খাওয়াতে গেলে তো তিনি ফতুরই হয়ে যেতেন।

গুল মোহাম্মদ বাচ্চু মিয়া আর বদিউল হুদাকে দু'চোখে দেখতে পারেন না। শুধু ডগির ওপর অত্যাচারের কারণে নয়, এরা দু'জন তাঁর ওপরেও কি কম নির্যাতন চালায়? সেটা শারীরিক না হলেও মানসিক। প্রতিদিন যখনই তাঁর সাথে দেখা হয়, এরা একটা না একটা ছুতো ধরে তাঁকে ব্যঙ্গ করে, রহস্যের সন্ধানে তাঁর রহস্যময় গতিবিধির প্রতি কটাক্ষ করে তারা দু'টাকা দামের সস্তা রসিকতা করে, তাঁর ক্যারিয়ারের সাথে পানওয়ালা ছলিমুদ্দির ভাঙা সাইকেলের ক্যারিয়ারের তুলনা করে ছলিমুদ্দির সাইকেলটাকেই বেশি ভালো বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। অসহ্য সেই অত্যাচার, এক অসহায় কিন্তু বিখ্যাত গোয়েন্দার ওপর মানসিক উৎপীড়ন! এর চেয়ে তাঁর গায়ে ঢিল ছুঁড়লেও তিনি পাল্টা জবাব দিতে পারতেন। কিন্তু মুখের কথায় তিনি আবার একটু সংযমী, তাই তিনি কখনো কিছু বলেন না। আবার বললেও সমস্যা। বাচ্চু মিয়াকে কিছু বলতে গেলে সে হয়তো তাঁকে আইনের নানা বিটকেল ধারা দেখিয়ে হাজতে পুরে দেবে। বদিউল হুদা আবার আরেক কাঠি সরেস, সে হয়তো পরদিনের কোন এক খবরের কাগজে তাঁর নামে বিদঘুটে এক সচিত্র রিপোর্ট ঠুকে দেবে। কাজেই এদেরকে শায়েস্তা করার প্রবল ইচ্ছাটাকে গুল মোহাম্মদ দিনের পর দিন যোগবলে দমিয়ে রাখেন।
তো, এ পাড়ায় ডগিই তার একমাত্র শুভাকাঙ্খী। তাঁকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করা তো দূরের কথা, বরং তাঁর সাথে একাত্ম হয়েই চলাফেরা করে সে। তাঁর এবং ডগির শত্রুরাও মোটামুটি কমন পড়ে গেছে, কাজেই দু'জনের মধ্যে বন্ধুত্ব আরেকটু গাঢ় হয়েছে ইদানীং।

তবে প্রভুভক্তিরও একটা সীমা থাকা চাই। অতিভক্তি চোরের লক্ষণ। আর ডগির এই অতিপ্রভুভক্তির জন্যেই গুল মোহাম্মদ ধরা খেলেন। বাংলাদেশের লোকজন তাঁর দুর্ধর্ষ কীর্তির কথা জানতেই পারলো না, স্রেফ ডগির মাতবরির জন্যে। গুরুমারা বিদ্যা কখনোই ভালো নয়, যেমন দ্রোণাচার্য ধরা খেয়েছিলেন একলব্যের কাছে, রুস্তম সোহরাবের কাছে --- যাক গিয়ে, গল্পটা শুনুন।

2.
সেদিন গুল মোহাম্মদ বিকেলে চুপিচুপি ডগিকে এক প্যাকেট বিস্কুট গছিয়ে দিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছেন। চুপিচুপি এই কারণে, যদি শাহেদ সাহেব দেখেন তিনি কুকুরকে বিস্কুট খাওয়াচ্ছেন, তিনি হয়তো ভাবতে পারেন গুল মোহাম্মদের হাতে কাঁচা পয়সা এসেছে। তাহলে তিনি আবার বাড়ি ভাড়ার জন্যে এসে তাগাদা দেয়া শুরু করবেন। সেটা গুল মোহাম্মদ একেবারেই পছন্দ করেন না।

তখন ভর বিকেল, একটু পরেই সন্ধ্যে হয়ে যাবে। পাড়ার রাস্তায় মানুষজনের যাতায়াত নেই বললেই চলে। খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করার পর গুল মোহাম্মদের অসাধারণ পর্যবেক্ষণ শক্তি তাঁকে মনে মনে ফিস ফিস করে বললো, কেউ তাঁর পিছু নিয়েছে। গুল মোহাম্মদ খুবই সাহসী মানুষ, তিনি আনুষ্ঠানিকতায় সময় নষ্ট না করে ঘুরে দাঁড়ালেন। চোর-ছ্যাঁচড়-পুলিশ-সিআইডি-সিআইএ-কেজিবি-মাসুদরানা কারো পরোয়া করেন না তিনি। তাছাড়া সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়, শুভ কাজে দেরি করলে হয়তো দশবারোজনের মুখোমুখি হতে হবে তাঁকে।
তবে তাঁর পিছু নেয়া ছেলেটার ভাবভঙ্গি দেখেই গুল মোহাম্মদ বুঝলেন, চোর-ছ্যাঁচড়-পুলিশ-সিআইডি-সিআইএ-কেজিবি-মাসুদরানা কিছুই না, এ ব্যাটা সামান্য নেশারু ছিনতাইকারী না হয়েই যায় না। শুঁটকো হাড্ডিসার চেহারা, সারা মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি গোঁফ, ঢুলুঢুলু লাল চোখ, পরনে একটা চিপা জিনস, আর ময়লা গেঞ্জি। যখন তাঁর সামনে এসে একটা ইয়াবড় চকচকে ভোজালি বের করলো, গুল মোহাম্মদ মোটেও অবাক হলেন না। এমনটাই তিনি আশা করেছিলেন। এরকম যার চেহারা, তার হাতে ছুরিকাঁটাই শোভা পায়। বান্দরের হাতে তো খন্তাই থাকবে, নাহলে সে অনাচার করবে কি দিয়ে? অবশ্য একটা কবিতার চটি বই বের করলেও বেশ মানানসই হতো, আজকালকার কবিগুলোও কেমন যেন নেশাবাজ। তবে একজন কবি তাঁর পিছু পিছু একটা কবিতার বই নিয়ে আসছে, এ ঘটনাটা ভারি অলক্ষুণে, এবং আতঙ্ককর। পাড়াতুতো কবি যে ছোকরাটা, তাকে দেখলেই গুল মোহাম্মদ এদিকে ওদিকে সটকে পড়েন, একদিন বিকেলে গায়ে পড়ে এসে চাবিস্কুট খাইয়ে এমন সব বিদঘুটে কবিতা শোনাতে শুরু করেছিলো, ঘন্টা তিনেক সেসব কবিতা শুনে তাঁর দুই রাত ভালো করে ঘুম হয়নি। সে যাই হোক, এই পাতলা কিসিমের ছোকরার হাতে ভোজালি দেখে তিনি মোটেও ঘাবড়ালেন না। বরং একরকম বিরক্তই হলেন। বিরক্ত হলে তাঁর আবার গলা কাঁপতে থাকে। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, 'কী চাও?'

ছোকরা হয়তো ভাবলো, তিনি ভয় পেয়েছেন। সে ভারি খুশি হলো। ছিনতাইকারীরা খুশি হলে আবার তাদের সাহস বেড়ে যায়। সেই ছোকরা হাসি হাসি মুখে বুক ফুলিয়ে বললো, 'মানিব্যাগ দে। ঘড়ি খোল। চশমা খোল। টুপিটাও দে।'

গুল মোহাম্মদ আরো বিরক্ত হলেন। বিরক্তি বেড়ে গেলে তাঁর আবার তোতলামিও শুরু হয়ে যায়। তিনি এবার ফ্রিকোয়েন্সি খানিক বাড়িয়ে দিয়ে কাঁপুনির সাথে তোতলামি মিশিয়ে বললেন, 'তু-তু-তুই তোকারি ক-ক-করছো কেন হে ছো-চ্ছোকরা?'

এইটুকু বলতে গিয়েই বিরক্তিতে তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসে। তবে এই তোতলামি তাঁর পরিচয় গোপনে অনেক সহায়তা করে। কে ভাবতে পারে যে এই ভীতু ভীতু চেহারার থরহরিকম্পিত জবুথবু ভদ্রলোকটি আসলে উপমহাদেশের প্রখ্যাত গোয়েন্দা দুর্ধর্ষ গুল মোহাম্মদ?

ছেলেটা ভারি বিস্মিত হলো। ছিনতাইকারীরা অবাক হলে আবার তাদের তেজ বেড়ে যায়। সে গুল মোহাম্মদের কলার এক হাতে চেপে ধরে ভোজালিটা অন্য হাতে তাঁর পেটের ওপর ঠুসে ধরে বললো, 'চোপ ব্যাটা, পাজি কোথাকার! জলদি জলদি দে জিনিসগুলো। কত কাজ আছে সামনে ্#61630; দেরি হয়ে হয়ে যাচ্ছে না? সময়ের মূল্য নেই বুঝি?'

গুল মোহাম্মদ ভারি বিরক্ত হলেন এবার। নাহ্, এই সব দুই টাকা দামের ছিনতাইকারীগুলো কোন কাজের না। এতো কাঁচা অপরাধ করার কি দরকার? এর মধ্যে রহস্য কোথায়? ক্লু কোথায়? সাসপেন্স কোথায়? এরকম ঠগীদের মতো কাঁচা খুনজখম তিনি পছন্দ করেন না। কোথায় রয়েসয়ে একটু রহস্য মিশিয়ে, দু'একটা দুবের্াধ্য ক্লু ফেলে রেখে বড় মাপের একটা ক্রাইম করবে, তা না, পথেঘাটে লোকজনের সামনে এইসব দা-কুড়াল নিয়ে ছুটোছুটি! কিন্তু এই উজবুকটাকে এসব বুঝিয়ে কি লাভ? চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী। তিনি কথা না বাড়িয়ে তাঁর কেরামতি খাটানোর প্রস্তুতি নিলেন। না, মারধর নয়, এইসব ছেলেপেলেকে মেরে তিনি হাত গন্ধ করতে রাজি নন। একে একেবারে হাড়ে মজ্জায় শুধরে দেবেন তিনি। আজকে হিপনোটাইজ করে ছাড়বেন ফাজিলটাকে।

আড়চোখে তাকিয়ে গুল মোহাম্মদ দেখলেন, এই ফাঁকে দূরে লোকজন জমে গেছে, যাদের শতকরা একশো ভাগই নীরব দর্শক। মোড়ের চায়ের দোকানে বসে একদঙ্গল লোকও এই তামাশা দেখছে। তাদের মধ্যে আলসে কনস্টেবল বাচ্চু মিয়া, আর বেওয়ারিশ সাংবাদিক বদিউল হুদাকে প্রথমেই শনাক্ত করলেন তিনি। দু'জনেই জুলজুল করে তাকিয়ে আছে এদিকে। বাচ্চু মিয়া আবার বাদামওয়ালার কাছ থেকে এক ঠোঙা বাদাম কিনে নিয়ে সেগুলোর খোসা ছাড়িয়ে বসে বসে খাচ্ছে। বদিউল হুদা তার ক্যামেরার লেন্সে ফিল্টার লাগাচ্ছে। নিশ্চয়ই দুর্ধর্ষ এক ছিনতাইয়ের গল্প ফেঁদে বসবে আগামীকালের কাগজে। ব্যাটা অকর্মার ধাড়ি। বিনে পয়সার সিনেমা পেয়েছো, অ্যাঁ? গুল মোহাম্মদ ভারি চটলেন। তবে তিনি মনের এক কোণায় কিছুটা খুশিও হলেন। যাক, খবরের কাগজে অন্তত তাঁর নাম আর ছবি ছাপা হবে। বিখ্যাত গোয়েন্দার কাছে কুখ্যাত ছিনতাইকারী পরাস্ত, এমন শিরোনামে আগামীকালের ফ্রন্ট পেজেই হয়তো তাঁকে দেখা যাবে।

সম্মোহন বড় কঠিন জিনিস, মাথা গরম করে সেটা করা ভারি মুশকিলের কাজ। তাই বহুকষ্টে যোগবলে মেজাজ ঠান্ডা করে ঘড়িটা খুলে হাতে নিলেন গুল মোহাম্মদ। পুরনো দিনের ব্রিটিশ ঘড়ি, তাঁর বাবার জিনিস। একটু রঙ চটে গেলেও ভারি সুন্দর দেখতে। ঘড়িটা ব্যান্ডে ধরে ঝুলিয়ে তিনি ছেলেটার চোখের সামনে ধরলেন। তারপর গম্ভীর, রহস্যময় গলায় বললেন, 'দ্যাখো এই ঘড়ির দিকে। তাকিয়ে থাকো।'

ছেলেটা ভারি গবেটের মতো তাকিয়ে থাকে ঘড়িটার দিকে।

গুল মোহাম্মদ ঘড়িটা আস্তে আস্তে ডানে বামে দুলিয়ে বলতে থাকেন, 'তোমার এখন ঘুউউউউউম পাচ্ছে --- গভীঈঈঈর ঘুম --- ঘুউউউউউম --- ঘুউউউউউম --- হুউউউউউম ---।'

ছেলেটার চোখের পাতা এবার ভারি হয়ে আসে।

গুল মোহাম্মদ গলার তেজ কমিয়ে এনে বেজ বাড়িয়ে দ্যান। গম্ভীর গলায় তিনি বলতে থাকেন, 'ঘুুউউউউউম --- ঘুুউউউউউম --- ঘএদীর্ঘঊকার ঘুউউউউম --- ভীঈঈঈঈঈঈঈষণ ঘুম পাচ্ছে তোমার ---। অঅঅঅঅঅনেক রাত হয়েছে, অঅঅঅঅনেক রাত, ঝিঁঝিঁ ডাকছেএএএএএএ --- শেয়াল ডাকছেএএএএএএ --- কালকে সকালে তোমার হাফ ঈয়ারলি পরীক্ষা --- অঅঅঅঅনেক পড়া বাকি --- তোমার ঘুউউউম পাচ্ছে --- ঘুম পাচ্ছেএএএএ ---। ঘুমিয়ে পড়োওওওওওওওও --- ঘুউউউউউম ---।'

ছেলেটা বোকার মতো ঢুলঢুলু চোখে তাকিয়ে থাকে তাঁর দিকে। গুল মোহাম্মদের মুখে এবার তৃপ্তির হালকা হাসি ফুটে ওঠে। এই তো, চমৎকার কাজ হচ্ছে। আজ এই ছেলের কালিমাখা মনের আগাপাশতলা চুনকাম করে দেবেন তিনি। আজ থেকে সে আর চিনির সিরায় গুলিয়ে ডাইল খাবে না, বরং দু'টি ডালভাত খেয়ে নিরিবিলিতে ঘুমোতে যাবে। আজকে এই ঘাগু দুষ্কৃতিকারীর মনের গহীনে তত্ত্বকথার হালচাষ করে তিনি সততার বীজ বুনে দেবেন। স্নেহমায়ামমতার বেড়া দিয়ে ঘিরে তাতে পৃষ্ঠপোষকতার সেচ প্রকল্প চালু করবেন। ছিনতাই করার বেয়াড়া প্রবণতার আগাছাগুলো সব ভালোবাসার লনমোয়ার দিয়ে ছেঁটে দেবেন। এই হিরোইঞ্চিটার প্রতি ইঞ্চি সাফসুতরো করে তাকে হিরো বানিয়ে তুলবেন। ভাবতে ভাবতে উৎফুল্ল চিত্তে মনের অজান্তেই তিনি গুনগুনিয়ে ওঠেন, 'মন রেএএএ, কৃষিকাজ জানো না ---।'

অমনি কেমন একটা গন্ডগোল লেগে যায়। ছেলেটা কৃষিকাজের কথা শুনেই যেন ঘোর ভেঙে তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে, তারপর একটানে তাঁর হাত থেকে ঘড়িটা ছিনিয়ে নেয়। শুধু তাই না, কষে একটা চড়ও বসিয়ে দেয় তাঁর গালে। ধাম করে টায়ার ফাটার মতো একটা শব্দ হয়, গুল মোহাম্মদ সেই চড়ের ধাক্কায় একপাক ঘুরে আবার ছেলেটার মুখোমুখি হন। আজকালকার ছেলেছোকরারা ভারি কৃষিবিমুখ।

ছেলেটা এবার ভোজালি আকাশের দিকে তুলে লাফাতে থাকে, 'ব্যাটা পাজি --- কাজের সময় খালি ঘুমের কথা তোলে --- বদমাশ, ফাজলামি করার আর জায়গা পাস না? মানিব্যাগ দে জলদি? দে বলছি? পচা, পাজি, দুষ্টু ্#61630; খালি ফাঁকিবাজি করার ধান্ধা?'

ওদিকে বাচ্চু মিয়া চোয়ালব্যাপী বিসতৃত হাসি মুখে নিয়ে আরেক ঠোঙা বাদাম কেনে। বদিউল হুদা ডানে বামে সরে ক্যামেরার ফোকাস ঠিক করতে থাকে। ব্যাটার ডানবাম জ্ঞানও নেই।

গুল মোহাম্মদ এবার চরম বিরক্ত হন। না, এই ছেলে সংশোধনের ঊধের্্ব। লাঠ্যৌষধি শাসন ছাড়া এর আর কোন গতি নেই। তিনি মানিব্যাগটা বের করে মনে মনে বিবেচনা করতে থাকেন, একে কি জুজুৎসুর জুৎসই প্যাঁচ কষে জুতোর নিচে পিষে ফেলবেন, নাকি কারাতের লাথি বসিয়ে রাতারাতি কারাবন্দি করবেন। ছেলেটা অবশ্য তাঁর চিন্তাধারা ঘুণাক্ষরেও টের পায় না, পেলে কি আর সে এ তল্লাটে থাকতো? সে খপ করে মানিব্যাগটা নিয়ে নিজের হিপ পকেটে গুঁজে দেয়।

ঘড়ি আর মানিব্যাগ নিয়েও সে ক্ষান্ত হয় না, সে গুল মোহাম্মদের চশমা নিয়েও টানাটানি করতে থাকে, এমনই চশমখোর। গুল মোহাম্মদ ইতিমধ্যে মনস্থির করে ফেলেছেন, জুদোর এক আছাড় মেরেই তিনি এই বেআদবটাকে কাবু করবেন, চশমা খুলে নেয়াতে তিনি এবার কিছুটা বিব্রত বোধ করেন। চশমা ছাড়া তিনি আবার খুব একটা ভালো দেখতে পান না। তাঁর শখের সবুজ রঙের টুপিটাও ছেলেটা হাতিয়ে নেয়, নিয়ে নিজের মাথায় চাপায়। তারপর পকেট থেকে একটা আয়না বার করে নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে।

ওদিকে বাচ্চু মিয়া পর পর দু'টাকার দু'ঠোঙা বাদাম কিনে যখন বাদামওয়ালা ছোঁড়াটাকে একশো টাকার নোট বাড়িয়ে দেয়, সে তখন ভারি চটেমটে খ্যাচখ্যাচ করতে থাকে। বদিউল হুদা খচাখচ অনেকগুলো ছবি তোলে। ছিনতাইকারী ছেলেটার এক হাতে বাঁকা স্টিলের ভোজালি আর হাতে ধরা আয়না, মুখে সেলুকাসের হাসি, মাথায় গুল মোহাম্মদের টুপি। তার সামনে জবুথবু (আসলে জুদোর স্টাইল) ভঙ্গিতে দাঁড়ানো গুল মোহাম্মদ। বাদামওয়ালার সাথে বচসারত বাচ্চু মিয়া। পানের দোকান। মেঘলা বিকেল। আকাশে উড়ন্ত মেটে রঙের একটা চিল। বদিউল হুদা আনমনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড় বিড় করতে থাকে, 'হায় চিল, সোনালি ডানার চিল ---।' নিরানন্দ জীবনে জীবনানন্দকে বেহুদাই টেনে আনতে চায় সে। সাংবাদিকদের কাজকারবার বোঝা দায়।

ওদিকে গুল মোহাম্মদ সব দেখেশুনে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। না, অ্যাকশনের সময় চলে এসেছে। তিনি চিল চিৎকার দিয়ে ওঠেন, 'তবে রে শয়তান ---।' হাত বাড়িয়ে ছেলেটার টুঁটি চেপে ধরতে যাবেন, এমন সময় এক প্রলয়ঙ্কর কান্ড ঘটে যায়। কোত্থেকে যেন ডগি ছুটে আসে বঙ্গীয় রাজশার্দূলের মতো। পাড়ার কুকুরের পক্ষে বেমানান, এমন এক পাড়াকাঁপানো গুরুগম্ভীর ভিনভাষ গর্জন করে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছোকরাটার ঘাড়ে। ছেলেটা এমন আক্রমণ হয়তো আশা করে নি, সে ভারি ঘাবড়ে যায়। ডগি তাকে মাটিতে ফেলে আঁচড়ে কামড়ে একাকার করে ফেলে। ছেলেটা ভোজালি বেকার হাতে ধরে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে থাকে।

এদিকে দূরে দর্শক গ্যালারিতে সাড়া পড়ে যায়। বাচ্চু মিয়া বাদাম টাদাম ফেলে একশো টাকার নোটখানা আবার নিজের পকেটস্থ করে, তারপর তার ব্রিটিশ আমলের দুইমণী বন্দুকটাকে টেনে হিঁচড়ে তুলে সেটাকে সামনে বাগিয়ে ছুটে আসে। বদিউল হুদা তার আগেই ক্যামেরা নিয়ে দৌড়ুতে দৌড়ুতে আসে, ডগির সাথে ছেলেটার লড়াইয়ের খন্ডচিত্র সে ফিল্মবন্দী করতে থাকে, আর মনে মনে ভাবতে থাকে, ছবিটার ক্যাপশন কি দেবে, 'কল অফ দ্য ওয়াইল্ড' নাকি 'হোয়াইট ফ্যাং'? তাছাড়া আশেপাশের নানারকম আড়াল থেকে গোটা বিশেক জনগণও ছুটে আসে হৈ হৈ করতে করতে। গুল মোহাম্মদ ভারি অবাক হয়ে গোটা ব্যাপারটা দেখতে থাকেন। অনেকক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করার পর, জনগণের মুখে নেড়ি কুকুরের নামে জয়ধ্বনি শুনে তিনি যখন বুঝতে পারেন গোটা ব্যাপারটা কি হচ্ছে, তখন তাঁর আর করার কিছুই থাকে না। যা করার ডগিই করে ফেলে। তিনি মাথার চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে হায় হায় করতে থাকেন। গেলো, খবরের কাগজে নাম ওঠার সুযোগটা এবারও তাঁর হাত ফসকে গেলো। সব ক্রেডিট ডগিই হাতিয়ে নিলো। প্রভুভক্তির এই কি নমুনা? প্রভুর কাজে বাগড়া দিয়ে, পরদিনের খবরের কাগজে প্রভুর ছবিসহ খবর ছাপা হওয়াটাকে ভন্ডুল করে নিজের নাম ভাঙানো? এমন মীরজাফরী কোঁৎকা দেবার জন্যেই কি তিনি রোজ এক প্যাকেট বিস্কুট খাইয়ে খাইয়ে ডগিকে অমন হোঁৎকা করে তুলেছেন? হায় সেলুকাস!

ডগি যখন ছেলেটাকে আঁচড়ে কামড়ে আর ধমকে মোটামুটি সাবাড়্ব করে ফেলেছে, তখন বাচ্চু মিয়া অকুস্থলে এসে দাঁড়ায়। হুশ হুশ করে ডগিকে খেদিয়ে দিয়ে সে নিজেই ছেলেটার কলার ধরে দাঁড় করায়। বদিউল হুদা এ ঘটনারও ছবি তুলে ফেলে পটাপট। ছেলেটা খানিকটা হাঁপ ছেড়ে নিশ্চিন্ত মনে এক হাতে চোখ ডলতে ডলতে অন্য হাতে বিনা বাক্যব্যয়ে হিপ পকেট থেকে মানিব্যাগ, বুক পকেট থেকে চশমা, হাত থেকে ঘড়ি আর মাথা থেকে টুিপ খুলে গুল মোহাম্মদের হাতে সঁপে দেয়। বাচ্চু মিয়া আপত্তি জানাতে চায়, এভিডেন্স হিসেবে সে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করতে চায়, কিন্তু এসব বাজে আব্দার গুল মোহাম্মদই বা শুনবেন কেন? তিনি আবার হুঙ্কার দেন, 'তবে রে শয়তান ---।' তিনি এবার ভদ্র জুদো ফেলে আগ্রাসী কারাতের স্টাইলে ভাঁজ হয়ে দাঁড়ান। অবশ্য এই হুঙ্কার তিনি কাকে উদ্দেশ্য করে দিলেন সেটা পরিষ্কার বোঝা যায় না।

এতোক্ষণে হাজির জনতার ভিড়ে অনেককে দেখা যায়, যারা এতক্ষণ গোটা ঘটনাটা আড়ালে আবডালে বসে উপভোগ করছিলো। তারা সবাই গুল মোহাম্মদকে ঠেলেঠুলে সরিয়ে দিয়ে নিজেরা জায়গা করে নেয়। পাড়ার বীর যুবকেরা সবাই হাতা গোটাতে থাকে, এই ছোকরাকে তারা গণধোলাই দিয়ে খতম না করে বাড়ি ফিরবে না। এদের মধ্যে আবার কয়েকজন ছেলেবেলায় স্কাউটিং করে পোক্ত হয়েছে, তারা ভলান্টিয়ার হয়ে ধোলাই-দানে-ইচ্ছুকদের একটা লাইনে সাজিয়ে ফেলে। বাচ্চু মিয়া আবার আইনকে সহজে জনগণের হাতে তুলে দিতে নারাজ, সে এই ছোকরাকে ধোলাই দেয়ার বিপক্ষে, তাই তাকেও ধোলাই দেয়ার একটা হালকা প্রস্তাব ওঠে কোত্থেকে যেন, এবং মূহুমর্ূহু সমর্থনে সেই দাবী জোরালো হচ্ছে দেকে বাচ্চু মিয়া চট করে বুদ্ধিমানের মতো দল বদল করে, এবং ছেলেটার গালে কষে একটা চড় লাগায়। ছেলেটা আবার ফুঁপিয়ে ওঠে। গুল মোহাম্মদ চড়ের শোধ নেয়ার মওকা খুঁজছিলেন, ছেলেটার চড়প্রাপ্তির ঘটনায় সুযোগের অভাবে পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করতে হলো বলো তাঁর মনটাই খারাপ হয়ে যায়।
ওদিকে বদিউল হুদা খচাখচ ছবি তুলতে থাকে। উত্তেজিত কর্মবীর জনতার সামনে কাবু ছিনতাইকারী বনাম কর্তব্যপরায়ণ পুলিশ কনস্টেবল। কে একজন এসে হেঁকে বলে, 'সেই কুকুরটা গেলো কোথায়? অ্যাঁ? দ্যাখো তো, এই ছেলেটাকে কামড়ে দিয়েছে কি না। হাইজ্যাকারকে কামড়ালে যদি কুকুরটার আবার জলাতঙ্ক হয়?' গুটি কয়েক পাড়াতুতো বুদ্ধিজীবী এই বক্তব্যের সপক্ষে এবং বিপক্ষে তুমুল তর্ক শুরু করে দেয়। বাদামওয়ালা ছোকরাটা ইতিমধ্যে তার ডালি সাজিয়ে বসেছে, তুমুল উৎসাহে 'অ্যাই বাআআআআদেএএএমম' বলে সে হাঁক পাড়তে থাকে। গোটা কয়েক জনতা বাদাম কিনে নিয়ে লাইনে দাঁড়ায়। ছিনতাইকারীকে এক হাত দেখে নেয়ার জন্যে জনতার ভিড় ফুঁসতে থাকে।

3.

আরেকটু দূরে দাঁড়িয়ে ডগি লেজ নাড়ে আর ঘেউ ঘেউ করে হাইজ্যাকার অথবা উপস্থিত জনতাকে বকা দেয়। গুল মোহাম্মদ নিজের মালসামান ফেরত পেয়ে এবার তাকে পাকড়াও করে বাড়ির পথে নিয়ে চলেন, আর সমানে বকতে থাকেন। ঘরের কুকুর হয়ে তাঁর হাত থেকে এভাবে বাহাদুরি ছিনতাই করে নেয়াটা তিনি কিছুতেই বরদাশত করতে পারেন না। তিনি গজগজ করতে থাকেন, 'ব্যাটা নিমকহারাম --- বিস্কুটহারাম --- আমার বাড়া ভাতে ছাই দেয়া --- পাকা ধানে মই দেয়া --- কেন রে ব্যাটা ইস্টুপিট, আমার ফাইটিঙের মধ্যে নাক গলিয়ে আমাকে নাকাল করলি? আমি কি পারতাম না ঐ ছোঁড়াটাকে ধরে তুলে একটা আছাড় দিয়ে নাচার করতে, তারপর থানায় পাচার করতে? --- তুই কেন আমার কাজে বাগড়া দিলি? --- কাল পেপারে তোর ছবি উঠবে, বাচ্চু মিয়ার ছবি উঠবে --- আমার নাম তো কিছুতেই আসবে না --- মাঝখান দিয়ে ঐ ছোকরা আমার গালে একটা চড় অব্দি কষিয়ে দিয়ে গেলো --- আমার ভরাডুবি হয়ে গেলো --- হায় হায় হায় --- এই লজ্জা আমি রাখি কোথায় ---?'

ডগি গুল মোহাম্মদের পেছনে পেছনে লেজ নাড়তে নাড়তে চলতে লাগলো। পেপারে নাম ওঠা নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই। বাচ্চু মিয়া, আর বদিউল হুদা, আর সেই হাইজ্যাকার ছোকরা --- আর দর্শক জনতা চুলোয় যাক। তার কর্তব্য সে পালন করেছে কেবল। নইলে রোজ তাকে আদর করে বিস্কুট খাওয়ানোর প্রতিদান সে দেবেই বা কিভাবে?

ডগি গুল মোহাম্মদের বকাবকিও কানে নেয় না, সে আপন মনে চলতে চলতে ভুক ভুক করে ডাকতে থাকে। বোধহয় নিজের ভাষায় গাইতে থাকে, 'মন রে, কৃষিকাজ জানো না ---।'

সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০০৬ সকাল ১০:৪১
১৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সবাই জামাতের পক্ষে জিকির ধরুন, জামাত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে!

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৩১



চলছে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ভোট গণনা, তুমুল লড়াই হচ্ছে জামাত ও বিএনপির মধ্যে কোথাও জামাত এগিয়ে আবার কোথাও বিএনপি এগিয়ে। কে হতে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ সরকার- জামাত না... ...বাকিটুকু পড়ুন

নির্বাচন তাহলে হয়েই গেল

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৪:১৬


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। ২৯৯টি আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত বেসরকারি ফলাফলে ১৭৫টি আসনে জয় পেয়েছে দলটির প্রার্থীরা।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা ৫৬টি আসনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেটিকুলাস ডিজাইনের নির্বাচন কেমন হলো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৪


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ২১৩ আসনে জয়ী হয়েছে। তবে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভালো ফলাফল করেছে জামায়াত ! এগারো দলীয় জোট প্রায় ৭৬ টি আসনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশ চুরান্ত লজ্জার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:১৮



অনেক জল্পনা কল্পনার পর শেষ পর্যন্ত বিএনপির ভূমিধ্বস বিজয় হয়েছে- এ যাত্রায় দেশ চুরান্ত লজ্জার হাত থেকে বেঁচে গেলো। চারিদিকে যা শুরু হয়েছিলো (জামাতের তাণ্ডব) তা দেখে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০ বছর সামহোয়্যারইন ব্লগে: লেখক না হয়েও টিকে থাকা এক ব্লগারের কাহিনি B-)

লিখেছেন নতুন, ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৪২



২০২৬ সালে আরেকটা ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেগেছে একটু আগে।

ব্লগার হিসেবে ২০ বছর পূর্ন হয়ে গেছে। :-B

পোস্ট করেছি: ৩৫০টি
মন্তব্য করেছি: ২৭০৭২টি
মন্তব্য পেয়েছি: ৮৬৬৭টি
ব্লগ লিখেছি: ২০ বছর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×