[ভূতের গল্প লেখার যুগ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এখন লেখা হয় ভয়ের গল্প। ভয়ের গল্প লেখার বরাত পেয়েছিলাম মাঝখানে, কিন্তু সেটা অকালেই বাতিল হয়। আমার ভয়ের গল্প লেখার প্রয়াসও কিছুদিন পর শেষ হয় দু'টি সম্পূর্ণ ও দশটি অসম্পূর্ণ গল্পের স্তুপায়নের পর। একটি লেখা ব্লগে তুলে দিলাম, এটি এপ্রিল 27, 2004 এ প্রকাশিত। মন্তব্য কাম্য।]
1.
আমার সত্যিই আর ভালো লাগছিলো না, নিজেকে সামলে রাখাই মুশকিল হয়ে পড়ছিলো, তাই শেষ পর্যন্ত মুখ ফসকে জিজ্ঞেস করে ফেললাম, 'আপনি সেই জি্বনের বিয়েতে দাওয়াত পাননি?'
বয়স্কদের সাথে রসিকতা করা যে আমাদের সমাজে অচল, এমন নয়, কিন্তু বয়স্করা এক্ষেত্রে যে সুবিধাটি ভোগ করে থাকেন সেটি হচ্ছে, রসিকতার উপযুক্ত জবাব দিতে না পারলে সেটিকে বেয়াদবি হিসেবে চালিয়ে একটা বিশ্রী প্রোপাগান্ডা শুরু করে দিতে পারেন। ঝুন্টি আপার মামাশ্বশুরও সেই সুবিধাটিকেই কাজে লাগালেন, কঠিন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ছোট মিয়া, আমারে নিয়া মশকরা করেন ভালো, এইসব নিয়া মশকরা করা ঠিক না। আল্লাহ নারাজ হন। নামাজকালাম করেন না, সেই গুনাহ আল্লাহ মাফ করুক, তাই বইল্যা তেনার ছিষ্টি জি্বন আর ইনসানরে নিয়া তামাশা করা ্#61630;।' ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমার অবশ্য প্রচন্ড ইচ্ছা ছিলো তাঁর মতো ইনসানকে এবং তাঁর গল্পের প্রোটাগোনিস্ট জি্বনগুলোর কোনটাকে মশকরার আওতা থেকে বাদ না দেয়া, কিন্তু দূর থেকে ঝুন্টি আপা ইশারা করায় আমি নিজেকে সামলে নিলাম। 'আরে মামু, রাগ করেন ক্যান, বলেন তারপর কী হইলো।' পাশ থেকে সগীর ভাই সামাল দেন। সগীর ভাই ঝুন্টি আপার স্বল্পসংখ্যক বুদ্ধিমান চাচাতোমামাতোফুপাতোখালাতো-দেবরদের একজন।
মামু সোৎসাহে আবার শুরু করলেন। জি্বনের গল্পের প্রশ্নে তিনি অক্লান্ত সৈনিক। গত আড়াইঘন্টা ধরে একনাগাড়ে চলছে তাঁর এই জি্বনচর্চা। তাঁর গল্প শুনে সবার মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এই জি্বন নামের অসাধারণ কীর্তিক্ষম শক্তিমান বস্তুটি কেন শহুরে জীবনে কোন ধরনের হস্তক্ষেপ এখনো করেনি? মামুর গ্রামটা সম্ভবত জি্বনেরাই চালায়। সেখানে জি্বনের সাথে ইনসানকন্যার প্রেম ভালোবাসা হয়, বখাটে জি্বন বেখেয়াল তরুণীদের ওপর ভর করে নানা অশালীন কাজকারবার করে (যেগুলোর বিশদবর্ণণা মামা রসিয়ে রসিয়ে দিলেন এতক্ষণ), আবার নেকবন্দ জি্বন পাপী মানুষকে সোয়াবের পথে নিয়ে আসে। জি্বন সেই গ্রামে মাঘ মাসে ঝড় তোলে, অগ্রহায়ণ মাসে কাঁঠাল ফলায়, আরো অনেক সমাজসেবামূলক কীর্তিও করে। জি্বনেরা একটা ছোটখাটো এনজিওই খুলে ফেলেছে মনে হচ্ছে।
যে যুবতী মেয়েটির গল্প তিনি করছেন (জি্বন ছাড়া দ্বিতীয় যে বিষয়টির প্রতি মামুর অগাধ উৎসাহ, সেটি হচ্ছে যুবতী নারী, তাঁর প্রতিটি গল্পেই জি্বনের পাশাপাশি একটি যৌবনবতী রমণী রয়েছেন) সে নিঃসন্দেহে এপিলেপ্সির রোগী, অন্তত বর্ণনা শুনে তা-ই মনে হলো আমার, কিন্তু ঝুন্টি আপার মামাশ্বশুরের গল্প অনুযায়ী, মেয়েটি নাকি সন্ধ্যেবেলা পুকুরঘাটে গোসল করতে গিয়ে কোন এক আলেম জি্বনের বিয়ের বরযাত্রীদের যাত্রাভঙ্গ করেছে। কোন তরুণী সন্ধ্যেবেলা পুকুরে গোসল করতে নামলে জি্বনেরা কেন কুপিত হবে, আর কেনই বা তাদের বরযাত্রা ভঙ্গ হবে, সেটার কারণ আমার বোধগম্য নয়, কিন্তু এই আসরে দেখলাম তারাই সংখ্যাগুরু যারা বিষয়টিকে বিনা আপত্তিতে মেনে নিয়ে গল্প (বা গুলগল্প) শুনছেন। তাঁদের ভাবখানা এরকম, সন্ধ্যেবেলা যুবতী মেয়ে পুকুরে গোসল করতে নামলে জি্বন বরযাত্রীরা তো চেতবেই, এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে?
আমি জি্বন বিশ্বাস করি না। কষা নাস্তিক যাকে বলে, তা আমি নই, কিন্তু ঈশ্বরউদাসীন বলে একটি শব্দ আছে, সেটি বোধহয় আমার জন্যে উপযোগী। কাজেই আমার অভিধানে জি্বন শব্দটি এখনো ঢোকেনি। জি্বন সংক্রান্ত কোন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমার হয়নি, আমার দৃঢ় ধারণা, হবেও না। অবশ্য এ কথা এখানে বললে মামু আমার ওপর সত্যিকারের দাঁতনখ বের করে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন। কাজেই একজন জি্বনভক্ত সেজেই আপাতত আমাকে থাকতে হচ্ছে। জি্বনের ওপর এই আসরের শ্রোতাদের অগাধ আস্থা, অতখানি আস্থা বোধহয় মানুষের ওপর তাদের নেই।
বোনের শ্বশুরবাড়িতে দাওয়াত খেতে এসে আমি এই জি্বনদিওয়ানা মামুর ফাঁদে আটকে গেছি। 'আরে ছোট মিয়া, কবে আসলেন দ্যাশে?' এই বলে তিনি আমাকে পাকড়াও করলেন। দেশের বাইরে আমি মোটে দুমাসের জন্য ছিলাম, কিন্তু মামুর আপ্যায়ন শুনে মনে হলো বছর দশেক পর ফিরছি। আমাকে তাঁর পাশে বসিয়ে হালকা কুশলজিজ্ঞাসার পরই ঘটলো দুর্ঘটনা। আমিও যখন ভদ্রতাবশে তাঁর কুশলাদি জিজ্ঞেস করলাম, খুশিতে তাঁর মুখ আলো হয়ে উঠলো, পাওয়া গেছে মওকা! 'না ভাইগ্না ভালো নাই!' পানের অত্যাচারে রুগ্ন বত্রিশ দাঁতের পাশে বেমানান বিমর্ষ গলায় জানালেন তিনি। কেন, কেন তিনি ভালো নাই? এর উত্তর তিনি গত আড়াই ঘন্টা ধরে দিয়ে আসছেন, এবং কিভাবে কিভাবে যেন আমাদের দুজনের "আলাপ"-এর মাঝে আরো দশপনেরোজন ঢুকে পড়েছেন। জি্বনের উৎপাত এবং নেকপাতের কারণে তিনি ভালো নেই। বদজি্বন তাঁকে জ্বালায়, আর ভালো জি্বন তাঁকে পীড়িত করে, তিনি ভাবেন আর কাঁদেন, কেন তিনি এই নেকাত্মা জি্বনের মতো সোয়াবের পথে চলতে পারছেন না। আমি বিশদ জানি না, তবে গুজব শুনেছি যে এই মামু একাত্তর সালে গ্রামের প্রচুর হিন্দুসম্পত্তি বেদখল করেছেন, এবং একাধিক মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে অগি্নসংযোগ করেছেন। তাঁর পক্ষে যে উল্লেখিত সোয়াবের রাস্তায় চলা কঠিন, তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই।
মামু যখন সোৎসাহে দুটি দুষ্ট হিন্দু জি্বন, যাদের নাম যথাক্রমে বুলন্দগী ও ইন্দরগী, কর্তৃক জনৈকা বিধবা রমণীর লাঞ্ছিতা হবার গল্পে হাত দিয়েছেন, তখন ঝুন্টি আপার ননদ এসে তীক্ষ্ন গলায় জানালেন, খাবার দেয়া হয়েছে, খাবার যাতে ঠান্ডা হবার আগে খেয়ে শেষ করা হয়। এনাকে সবাই একটু ভয় করে চলেন, সবাই গল্পের আসর ভেঙে সুরসুর করে উঠে পড়লেন, মামা সবার আগে।
আমি স্বস্তির শ্বাস ফেলে উঠলাম। সগীর ভাই দাঁত বের করে হেসে নিচু গলায় বললেন, 'এনার মতো দুই লম্বরী লোক দ্যাখছো জীবনে?'
অন্যসময় হলে আমি মাথা নেড়ে না বলতাম, কিন্তু গত দুইমাস এক ব্রিটিশ আর এক সুইসের সাথে কাজ করে আমি ডিপ্লোম্যাটিক আচরণের খানিকটা স্বাদ পেয়েছি। কাজেই একটা একপেশে হাসি হেসে চুপ করে রইলাম। কে জানে, খবরের কাগজের লোকজনের মতো যদি করেন সগীর ভাই? যদি রটিয়ে দ্যান যে আমি এই চরম দুইনম্বর মামাকে দুই নম্বর বলেছি?
সগীর ভাই নিচু গলায় বললেন, 'বুলন্দগী আর ইন্দরগী না ঘোড়ার আন্ডা। ওনার নিজের ছ্যারা দুইটাই এইসব জি্বনের কাম কইরা বেড়ায়। আর ছ্যারাগুলির কী দোষ দিমু, ইনি নিজেও কি জি্বনের কম নাকি?'
আমি আরেকদফা একপেশে হাসি উপহার দিই। সগীর ভাই যথোচিত বদনামে আমার সাড়া না পেয়ে বোধহয় খানিকটা বিরক্তই হন, তিনি কষে আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেন, 'চলো ছোট মিয়া, খানা রেডি।'
কম করে হলেও সত্তর জন আমন্ত্রিত মানুষ এখন এই দোতলা বাড়িতে, এর মধ্যে বেশির ভাগই মহিলা যারা দোতলায় চলে গেছেন। তাই বলে পুরুষদের সংখ্যা কম নয়, এবং সবাই এক ব্যাচে এক টেবিলে বসে খেতে পারবে তেমন টেবিল এ বাড়িতে নেই। কিন্তু ডাইনিং হলটা বিশাল, সেখানে অনেকগুলো চেয়ার এনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। মুরুবি্ব স্থানীয় লোকজন টেবিলে বসবেন, চ্যাংড়া পোলাপান (অর্থাৎ মুরুবি্বরা যাদের এখনো নিজেদের দলে টানতে রাজি নন) বসবে চেয়ারগুলোতে। আমি অবধারিতভাবে চ্যাংড়া, আমৃতু্য একজন চ্যাংড়া থেকে যেতে চাই আমি, আমাকে জোর করলেও আমি মুরুবি্ব হতে রাজি নই, কাজেই যখন দেখলাম ঝুন্টি আপার মামা শ্বশুর হাত ধুয়ে এসে মুখে একটা বিলোল হাসি টেনে টেবিলের এক প্রান্তে বসে পড়েছেন, আমি প্রায় ছুটে গিয়ে সে প্রান্ত থেকে সবচে দূরবর্তী চেয়ারটায় বসে পড়লাম।
ঝুন্টি আপা আর তার ননদই দেখলাম পরিবেশনের দায়িত্ব নিয়েছে। ঝুন্টি আপার ননদ, মিলি আপাকে সবাই সামলে চলে তার মেজাজের জন্য, কিন্তু আমার সাথে তার খুব খাতির। একগাদা খাবারসহ একটা প্লেট আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে তিনি দাঁত বের করে বললেন, 'অই ছ্যামরা, ভালা কইরা খা। তুই তো শুকায় শ্যাষ, অ্যাঁ? মাইনষে দ্যাখলে কইবো কী? তুই যে বিদ্যাশে গেলি, হ্যারা তরে ইথিওপিয়ার লোক মনে করে নাই?'
মিলি আপার বর সাজ্জাদ ভাই মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে ছিলেন, কাজেই আমিও ছাড়লাম না সুযোগটা। বললাম, 'হ, ভাবছিলো তো, তারপর যখন শুনলো যে বাংলাদেশ থিকা গেছি, তখন কইলো, "ও, ঐ যে সাজ্জাদ নামের একটা চুট্টা বদমাইশ আসছিলো কয়েক বছর আগে, সেই দ্যাশের লোক তুমি?" আমি কইলাম হ, ঠিক ধরছো।'
মিলি আপা দাঁত কিড়মিড়িয়ে আমার মাথায় কষে একটা চাঁটি মেরে চলে গেলেন। কপাল ভালো সাজ্জাদ ভাই আশেপাশে নেই। আমার পাশে যিনি বসেছিলেন, তিনি সম্ভবত সাজ্জাদ ভাইয়েরই কোন আত্মীয় হবেন, রুষ্ট চোখে আমাকে একবার দেখে নিয়ে রোস্টে একটা জিঘাংসু কামড় বসালেন।
ওদিকে মুরুবি্বদের খাওয়াদাওয়া সার্ভ করা হয়ে গেলেও খাওয়ার কাজটা শুরু হয়নি, কারণ ঝুন্টি আপার শ্বশুর এখনো আসেননি। তিনি অত্যন্ত রাশভারি লোক, এখানে সবাই তাকে দেখলে কিছুটা জড়োসড়ো হয়ে যায়। আমি তাঁকে পছন্দ করি, কারণ তিনি ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সৎ এবং সাহসী, আর ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি যে তিনি কখনো ফালতু কথা বলেন না।
আমি ধীরেসুস্থে খাই, তাই আমার পড়শীরা যখন এক প্লেট শেষ করে আরেক প্লেটের জন্যে "মিলি আপা", "ভাবী", "বড় ভাবী" এবং "বৌমা" ইত্যাদি রবে ডাকাডাকি করছেন, তখন আমার মাত্র হাফ প্লেট শেষ হয়েছে। এই গোলমালের মধ্যে মিলি আপা আর ঝুন্টি আপা একগাদা প্লেট ভর্তি একটা ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে ঢুকলেন, এবং মিলি আপা তার স্বভাবসিদ্ধ দাঁত খিঁচুনি দিয়ে যখন বললেন, 'আইতাছি তো, চিল্লান ক্যান', তখনই ডাইনিং রূমের দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িতে ন'টার ঘন্টা বাজা শুরু করলো, আর প্রায় সাথে সাথেই ঝুন্টি আপার শ্বশুর ধীরে ধীরে হেঁটে ঘরে ঢুকলেন। মুরুবি্বদের কেউ কেউ উঠে চেয়ার ঠেলে তাঁকে বসিয়ে দিলো। আমি বুঝলাম, যখন ঐ মুরুবি্বর দল চ্যাংড়াদের দলে ছিলো, তখনও ঝুন্টি আপার শ্বশুর মুরুবি্বই ছিলেন। তিনি অনেকদিন ধরেই গুরুজন।
আমি আমার প্লেটে পড়ে থাকা পর্বতপ্রমাণ খাবার খুঁটে খুঁটে খেয়ে চলছিলাম, আর আমার দুপাশে উপবিষ্ট দুজন, আমাকে মোটেও পাত্তা না দিয়ে এবং আমাকে ডিঙিয়ে যাদের একজন আরেকজনকে মিয়াভাই এবং মিয়াভাই তার কনিষ্ঠকে শালার ভাই বলে সম্বোধন করছিলেন, তারা মুখের চূড়ান্ত সদ্ব্যবহার করে চলছিলেন, অর্থাৎ ইতিমধ্যে কয়েক প্লেট সাবড়ে দিয়ে সমানে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের নেত্রীদের গাল দিয়ে চলছিলেন, সেই গালিগুলির মধ্যে কয়েকটি অভিনব ও চমকপ্রদ রকমের অশালীন, এবং সেই গালি আমি আমার সিনিয়র সহকমর্ীর জন্যে মনে মনে সঞ্চয় করে রাখার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছি, এমন সময় তাঁরা হঠাৎ চুপ করে গেলেন। তাঁদের সাথে থেমে গেছেন অন্যান্যরাও, এবং হলঘরে চলতে থাকা মৌমাছির গুঞ্জন, হঠাৎ যেন কেউ জিপার টেনে বন্ধ করে দিলো।
আমি শুনতে পেলাম ঝুন্টি আপার শ্বশুরের গলা, 'খাওয়ার সময় জি্বন নিয়ে কথা বলা ঠিক না, ইদ্রিস।'
ঝুন্টি আপার শ্বশুর কথা কম বলেন, কিন্তু বলার ভঙ্গি অসাধারণ। একটা নিচু, শক্ত সুরে সমস্ত কথাটা বলে ইদ্রিসে এসে যেন সম ধরলেন তিনি। ভদ্রলোক এককালে বোধহয় গানের চর্চাও করেছেন। আরো বুঝলাম, ইদ্রিস হচ্ছেন সেই জি্বনওয়ালা মামাশ্বশুর।
ইদ্রিস তর্ক করার চেষ্টা করেন, 'কিন্তু ভাইসাহেব, কোরানহাদিসে কোথাও তো শুনি নাই খাওয়ার সময় জি্বনের নাম নেয়া গুনাহ?'
ঝুন্টি আপার শ্বশুরের নিচু গলা খুব সামান্য এক পর্দা উঁচু হয়। 'গুনাহ তো না। আমি কি গুনাহ্র কথা বললাম?'
ইদ্রিস এঁড়ে তর্ক করে যান, 'তাহলে? খোদার আইনে তো নাই।'
ঝুন্টি আপার শ্বশুরের গলা এবার নেমে যায়। 'খোদার আইন তো তুমি ভালোই জানো ইদ্রিস। কিন্তু মানুষেরও কিছু আইন আছে। আর আছে ভদ্রতা বলে একটা কথা।'
ব্রাভো! কাউকে মুখের ওপর এর চেয়ে শক্ত অথচ পরিশীলিতভাবে অভদ্র বলতে আগে কখনো শুনিনি। ইদ্রিস মামা একেবারে চুপসে গেলেন। কিন্তু গ্রাম্য জোতদার এতো সহজে হারতে চায় না, তিনি নিচু বাঁকা গলায় বলেন, 'তা তো ঠিকই। তাছাড়া জি্বনপ্রেতের কথা তো আপনার ভালো না লাগারই কথা।'
অন্যান্য মুরুবি্বরা একদম নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। কথাটার নিশ্চয়ই কোন গূঢ় অর্থ আছে। ঝুন্টি আপার শ্বশুর আরো নিচু, ঠান্ডা গলায় বললেন, 'ঠিক তাই। আমার ভালো লাগে না এসব।'
একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ হয়তো দানা বাঁধতে যাচ্ছিলো, কিন্তু ঝুন্টি আপার শ্বশুর পরিবেশটাকে নষ্ট হতে দিলেন না, অল্প হেসে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার মেয়ের জামাই কেমন আছে?'
মুরুবি্বদের কথা আবার শুরু হলো, এবং চ্যাংড়ারা যখন বুঝতে পারলো, এরকম রগড় আর হবে না, তখন মৌমাছির গুঞ্জন আবার শুরু হলো। মিয়াভাই ও শালার ভাই আবারো যথাক্রমে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাহীন দলের বিভিন্ন নেতাউপনেতাকে অশালীন সব উপমায় ভূষিত করতে লাগলেন। এই গন্ডগোলের মধ্যে আমি খেয়ে চলছিলাম, কিন্তু মুরুবি্বদের টেবিল থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। ইদ্রিস মামা একটু ধ্বসে গিয়ে রোস্ট চিবুচ্ছেন, তাঁর মুখ দেখে মনে হলো, তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। তাঁর পাশর্্ববর্তী মুরুবি্বদের সবার চোখে মুখেই হালকা হাসি ও তৃপ্তির ভাব, সবাই মনে মনে খুশি হয়েছেন এই জি্বনবাজ প্রৌঢ়টির অপমানিত হবার ঘটনায়। ঝুন্টি আপার শ্বশুর আমার দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসেছেন, অতএব তাঁর মুখের ভাব আমি দেখতে পাচ্ছি না। এ নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমার মনে পড়লো, সন্ধ্যের শুরুতে যখন ওনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম, তখন ওঁকে দেখে খুবই চিন্তিত মনে হচ্ছিলো।
তিনি মিলি আপাকে হঠাৎ হাতের ইশারায় ডাকতে আমি একটু সচকিত হয়ে বসলাম। মিলি আপা এগিয়ে গিয়ে তাঁর বাবার পাশে ঝুঁকে দাঁড়ালেন। তিনি কি বললেন কে জানে, মিলি আপা সাথে সাথে মাথা ঝাঁকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন দ্রুত পায়ে। কিছুক্ষণ পর দেখলাম একটা ট্রেতে অনেক খাবার সাজিয়ে দোতলার দিকে এগোচ্ছেন তিনি।
খাওয়াদাওয়া শেষ করে আবার ড্রয়িংরূমের দিকে যাবার সাহস হলো না। মামা সেখানে আবার জমিয়ে বসার উদ্যোগ নিয়েছেন। ভরপেট খাওয়ার পর এখন নিশ্চয়ই তাঁর জোশ এবং রূহানি তাকত অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। খামোকা জি্বন ও যুবতী নারীদের গল্প শোনার কোন মানে হয় না। এর চেয়ে একটু খোলা হাওয়ায় গিয়ে দাঁড়ালে ভালো।
খোলা হাওয়া, অর্থাৎ সামনের বারান্দায় যে মুরুবি্বদের ইজিচেয়ার সম্মেলন, সেটা আমি জানতাম না। কাজেই শেষ মূহুর্তে বহুকষ্টে জান বাঁচালাম। ঝুন্টি আপার শ্বশুর ও জনা তিনেক মুরুবি্ব সেখানে পুরনো দিনের আরামকেদারায় বসে পান খাচ্ছেন। ঝুন্টি আপার শ্বশুর হয়তো কিছু বলবেন না, কিন্তু বাকিরা একটিবার আমার টিকির নাগাল পেলে জেরায় জেরায় আমাকে শেষ করে ফেলবেন। খাওয়াদাওয়ার পর পান চিবাতে চিবাতে কিছু উপদেশ খয়রাত করার মতো বড় আনন্দ আর কিসে আছে?
পেছনের বারান্দায় উঁকিঝুঁকি মেরে নিশ্চিন্ত হলাম, সেখানে কয়েকজন চ্যাংড়াকে দেখা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে সাজ্জাদ ভাই আর আমার দুলাভাইকে সনাক্ত করতে পারলাম। গা ঢিলা দিয়ে এগিয়ে গেলাম।
আমার দুলাভাই বেশ রসিক মানুষ, তিনি আমার কান পাকড়ে বললেন, 'শালা, তুই বলে আমার বইনজামাইরে চুট্টা বদমাইশ কইছোস?' বুঝলাম, মিলি আপা জায়গামতো গিয়ে সব বলেছেন।
সাজ্জাদ ভাইও একটা নকল হুঙ্কার ছাড়লেন, 'মার, শালার কানপট্টিতে একটা চটকানা মার!'
আমিও নকল কাতরতায় বললাম, 'হ, কইছি তো!'
দুলাভাই এবার কানের বদলে পিঠে চাপড় মারেন। 'সাবাস শালামিয়া, মানুষ চিনতে শিখছোস!'
সাজ্জাদ ভাই একটা গালি দিয়ে বলেন, 'যতো শালা খবিশগো লগে আত্মীয়তা করলাম। অ্যাগো লাইগা চুরি করি, আর অ্যারাই কয় চোর!' এবং এই ইসু্যতে একটা ব্যাপক ধূমপানের প্রস্তাব করেন তিনি। আশপাশে অন্যান্য চ্যাংড়া, তাদের মধ্যে কয়েকজন চাচা, মামা এবং ফুপাস্থানীয় রয়েছেন, মূহুর্তে জুটে যায়, এবং সাজ্জাদ ভাই হাতে ধরা বাঙ্ খুলে সবাইকে চুরূট বিলাতে থাকেন। এগুলো নাকি খাঁটি হাভানা সিগার। সবাই হাভাতের মতো সেই হাভানার গোড়া কাটে এবং আগায় পানির পরিবর্তে আগুন ঢালে।
আমি ধূমপান করি না, ধোঁয়ায় আমার দম আটকে আসে। তরল পদার্থের প্রতি আমার ভক্তি অটল, কিন্তু তামাক বা গাঁজার সাথে আমার কখনো প্রেম হয়নি। তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যেই বারান্দাটা ধোঁয়ায় আবছা হয়ে যায়। রসিকেরা আহাউহু করে সাজ্জাদ ভাইয়ের পিঠ চাপড়ে দেন, সাজ্জাদ ভাই জবাবে দুলাভাইয়ের কলার ধরে বলেন, 'শালা, এইগুলি কইলাম চুরি করি নাই, লগদ পয়সায় কিন্যা আনছি, বোঝলা?'
দুলাভাই আর সাজ্জাদ ভাই বাল্যবন্ধু, কাজেই তিনি ঢুলুঢুলু চোখে বলেন, 'শালা তোর বাপ!'
আমি মনে মনে হাসি। ঝুন্টি আপার শ্বশুর এই ধূমপানকান্ড ও কথোপকথন শুনলে ফিট হয়ে যেতেন।
ফুসফুসে বেমক্কা খানিকটা ধোঁয়া ঢুকতেই আমি কেশে ফেললাম। সাজ্জাদ ভাই অবাক হয়ে বললেন, 'কিরে, কাশোছ ক্যান?'
দুলাভাই হতাশ ভঙ্গিতে বলেন, 'এই পোলাডা এখনও দুধ খায়। .. .. অই, তুই বাইরা, বাইরের ঘরে গিয়া বয়, এককাপ দুধ খা গিয়া। এইখানে বড়দের বৈঠক। আর কেউ যদি আমাগো কথা জিগায়, কবি যে দ্যাখছ নাই, বুঝলি?'
আমিও মানে মানে সরে পড়াই স্থির করলাম, কারণ এই বারান্দায় খোলা হাওয়া বলতে আর কিছু নেই। তবে বেরিয়ে আসার আগে একটা জিনিস আমার চোখে পড়লো। এই বাড়িটা ইংরেজি "এল" আকৃতির, তাই বারান্দা থেকে ছাদের একটা অংশ চোখে পড়ে। ছাদে দাঁড়িয়ে কেউ একজন সিগারেট খাচ্ছে। আগুনটা উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, আবার টিমটিমে হয়ে যাচ্ছে। বাইরে নিকষ কালো রাত, তবুও বোঝা যায়, যে সিগারেট খাচ্ছে সে বেশ দীর্ঘকায়। অনেকখানি উচ্চতা জুড়ে তার ছায়াবয়ব বা সিলু্যয়েট।
2.
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, ছাদে গিয়ে একটু বসবো। নইলে আমাকে জি্বনমামা অথবা মুরুবি্বদের পাল্লায় পড়তে হবে।
ডাইনিং রূমে এসেই আমি মিলি আপার মুখোমুখি হলাম, টেবিল গোছাচ্ছে। আমাকে দেখে তিনি তীক্ষ্ন গলায় বললেন, 'ঐ, তোর চুট্টা বদমাইশ দুলাভাইরে দ্যাখছোস?'
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। 'না তো।'
'দ্যাখলে কবি আম্মায় তারে খুঁজতাছে, একসময় গিয়া য্যান একটু দ্যাখা করে।' মিলি আপা আবার নিজের কাজে ফিরে যান।
'কী চুরি করছে এইবার? পানের বাটা?' আমি নিরীহ গলায় বলি।
মিলি আপা সহজেই চটে যান, কাজেই আমাকে আরেকটা চাঁটি খেতে হয়। কিন্তু এর বদলে এককাপ চায়েরও অনুমোদন মেলে। আমি গম্ভীর গলায় বলি, 'আমি ছাদে যাইতাছি, তুমি চা পাঠায় দিয়ো।'
মিলি আপার কাছ থেকে একটা ঝাড়িই আশা করেছিলাম, কিন্তু দেখলাম তিনি ফ্যাকাসে হয়ে গেছেন। আমতা আমতা করে বললেন, 'ছাদে যাওয়ার কী দরকার, বারান্দায় গিয়া খা।'
আমি একটু অবাক হলাম। ছাদে যেতে সমস্যা কী? মিলি আপাদের এই বাড়ির ছাদটা অত্যন্ত চমৎকার, এই ছাদে আমরা ছেলেবেলায় শীতে ব্যাডমিন্টন খেলেছি, শরতের রাতে মাদুর বিছিয়ে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গানের লড়াই করেছি। ছাদে যেতে সমস্যা কীসে?
কাজেই আমি গোঁ ধরি, 'উঁহু, ছাদে গিয়াই খাই। বারান্দায় তোমার চুট্টা বদমাইশ বিড়ি খাইতাছে, শ্বাস ফেলন যায় না।'
মিলি আপা ধমক দিয়ে বলেন, 'তাইলে একটু আগে ক্যান কইলি যে দ্যাখছ নাই?' তারপর হনহনিয়ে বারান্দার দিকে এগোতে গিয়েও থেমে যান। তারপর আমাকে বলেন, 'শোন, এখন ছাদে উঠিছ না কইলাম। সমস্যা আছে, আমি আইতাছি, তুই এইখানে খাড়া।'
মিলি আপা বারান্দায় ঢুকে দরজা বন্ধ করেন, তবুও আমি তার চাপা গলায় তীক্ষ্ন ধমক শুনতে পাই। 'তোমাগো কি হায়া শরম বইলা কিছু নাই? এহ, একজন আরেকজনের কান্ধে উইঠ্যা বিড়ি টানতাছে! ডাক্তারে কী কইছে খ্যাল নাই? ্#61630; খবরদার দাদা, হাসবি না। তুই আরেকটা বদমাইশ। দুই বদমাইশে মিল্যা এইসব খাছ, না? তুইও মরবি, এইডারেও মারবি! .. .. কোণে এইটা ক্যাডা? হারুন মামা নাকি? আপনের ভাইগনার যে বিড়ি টানা হারাম, আপনে জানেন না? কই মানা করবেন, আপনে নিজেও তার লগে বইয়া খাইতাছেন? খাড়ন, আপনাগো ইসকুরু আমি টাইট দিতাছি। .. .. অই, ফালাও, ফালাও কইতাছি, অ্যাক্ষণ ফালাও এগিলি, যত্তোসব .. ..।'
এরই মাঝে একটা অপরিচিত কন্ঠস্বর শুনি, যেন অনেক দূর থেকে, 'কোন সমস্যা, মিলি?'
সব চুপ হয়ে যায়।
মিলি আপা কয়েক সেকেন্ড পর অত্যন্ত অস্বস্তিমাখা স্বরে বলেন, 'জি্ব না। কিছু না।'
তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে মিলি আপা সহ সবাই বেরিয়ে আসে বারান্দা থেকে। সবার চেহারাতেই অস্বস্তি। সাজ্জাদ ভাই যেন পরিবেশ হালকা করার জন্যেই আমার দিকে আঙুল তোলেন, 'এই যে। মীরজাফর, কুইসলিং, গোলাম আজম, যা-ই কছ না ক্যান, এই ব্যাটাই ধরায় দিছে আমাগো।'
দুলাভাইও সামলে নেন নিজেকে। 'খাড়া, তরে যদি .. ..।'
মিলি আপা ফুঁসে উঠেন, 'হইছে হইছে। বাইরের ঘরে গিয়া বসো।'
সাজ্জাদ ভাই হে হে করে হাসেন। 'তোমার ইদ্রিস মামু তো জি্বনের দোকান দিয়া বসছে ঐ ঘরে।' তারপর সুর পাল্টে বলেন, 'শুনলাম ওনার একটা পোলা নাকি জি্বনের বগর্ায় .. ..।' দুলাভাই তার পাঁজরে কনুই দিয়ে গুঁতো মারেন ঠিকই, কিন্তু নিজের হাসি সামলাতে পারেন না। অন্যান্যরা নানা সুরে হেসে ওঠে। মিলি আপা হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে নাড়তে আমাকে এক পাশে টেনে নিয়ে যান।
'শোন, তুই দুলাভাইগো লগে বয়। ছাদে একজন গেস্ট আছে, বুঝলি? ওনারে ডিস্টার্ব করন যাইবো না। আব্বার পারমিশন ছাড়া ছাদে উঠা নিষেধ।'
আমার কেমন যেন অস্বস্তি লাগছিলো, সাথে একটা কৌতূহল। ছাদের সেই লম্বা, সিগারেট-ফোঁকা মানুষটাই তাহলে এই গেস্ট, এইমাত্র যাঁর গলা শুনলাম। কিন্তু এ কেমন গেস্ট, যে ছাদে উঠে বসে থাকে? এর জন্যেই কি ঝুন্টি আপার শ্বশুরকে আজ সন্ধ্যেবেলা এত বিব্রত দেখা যাচ্ছিলো? আর এতো লুকোছাপার কী আছে?
হঠাৎ আমার একটা কথা মনে পড়ে গেলো, আমি বললাম, 'তাইলে ঐ যে ট্রেতে কইরা খাবার নিয়া গেলা, উনার জন্যই?'
মিলি আপা চোখ বড়বড় করে বললেন, 'বাপ রে, তর দেখি ইদ্রিস মামার মতো নজর, অ্যাঁ? অ্যাতো কিছুতে খ্যাল দ্যাছ?'
মিলি আপা যে উত্তর না দিয়ে প্রসঙ্গ ঘোরাতে চাচ্ছে, সেটা বুঝতে পারি। কিন্তু আমি কিছু বলার আগেই সাজ্জাদ ভাই নাটকীয় ভঙ্গিতে ফিসফিস করে ওঠেন, 'হারূন মামু, বাতাসে চায়ের গন্ধ পাইতাছেন? মনে হইতাছে না, য্যান আমাগো লাইগা চা বসাইছে কেউ?'
সেই ঝাড়িখাওয়া হারূণ মামা, যিনি আমার পাশে বসে খাবার সৎকার করেছিলেন, অর্থাৎ মিয়াভাই, সাথে সাথে সায় দ্যান, 'হ ভাইগনা।'
মিলি আপা হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গি করে উপস্থিত জনতার মাথা গোনেন, 'এই এক কাপ, পরে আর চা পাইবো না কেউ। রাত জাইগা চা খাইবা, বিড়ি খাইবা আর তাস খ্যালবা, এইসব চলবো না। আব্বায় আইসা যখন দিবো ঝাড়ি, তখন সব কয়টা বোঝবা মজা।'
মিলি আপা চা বানাতে চলে গেলে আমি দুলাভাইকে ধরি সোজা। 'আঙ্কেল, ছাদে কোন গেস্ট আসছে?' দুলাভাইয়ের মাথার চুল যুবক বয়সেই খানিকটা পেকে গিয়েছিলো, তাই আমার ভাই বোনেরা তাকে মাঝে মাঝে ক্ষেপানোর জন্যে আঙ্কেল বলে ডাকতো। আমি তখন অনেক ছোট বলে ওদের দেখাদেখি আঙ্কেল বলে ডাকতাম, সেই থেকে এখনো আঙ্কেলই বলে চলছি।
দুলাভাই পলকে ফ্যাকাসে হয়ে যান। কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলেন, 'তুই মিলির কাছ থেইকা শুনিছ।' আমি একটা কিছু বলতে যেতেই তিনি অসহায় ভঙ্গিতে বললেন, 'আমারে আর কিছু জিগাইছ না, হয় মিলিরে গিয়া জিগা, নাইলে আব্বার কাছ থিকা শোন। আমি এই ব্যাপারে নাই।'
আমি এই প্রথম টের পাই, ব্যাপারটা সিরিয়াস। এবং ঝুন্টি আপার কাছ থেকেও কিছু জানার চেষ্টা করা বৃথা, বরং মিলি আপাকেই টাইট করে ধরা যাক। ব্যাপারটা বেশ ঘোরালো, এবং কেন জানি না, একটা দুর্নিবার আকর্ষণ টের পাচ্ছি। অন্যের ব্যাপারে ঘাঁটাঘাঁটি করার অভ্যেস আমার নেই, কিন্তু দুলাভাইদের এমন একজন গেস্ট সম্পর্কে আমার কৌতূহল ফেনিয়ে উঠছে।
মিলি আপা যখন ট্রলিতে করে সাত কাপ চা নিয়ে ঘরে ঢুকলো, তখনই ঘটলো ঘটনাটা। লোডশেডিং। মূহুর্তের মধ্যে সব নিকষ অন্ধকার। চৈত্রের কৃষ্ণপক্ষ চলছে, কয়েকদিনের মধ্যেই অমাবস্যা।
সাজ্জাদ ভাই আবারো হইহই করে উঠলেন, 'এই শালা ইলেকট্রিক্যাল এনজিনিয়ারগুলান সব আবুল!' কথাটা আমাকেই বলা, কারণ এখানে ইলেকট্রিক্যাল এনজিনিয়ার একমাত্র আমিই।
মিলি আপার অবশ্য সব মুখস্থ, রান্নাঘর থেকে কয়েকটা মোমবাতি নিয়ে এলেন তিনি, একটা জ্বালানো। 'অন্ধকারে যে যেইখানে আছেন চুপচাপ বইসা থাকেন। বেহুদা হাঁটাহাঁটি করবেন না।' তীক্ষ্ন গলায় বললেন তিনি। আমাদের ঘরে একটা মোমবাতি রেখে আরেকটা ধরিয়ে তিনি বারান্দার দিকে গেলেন। বুঝলাম, এখন আর মিলি আপাকে জেরা করা যাবে না।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই শরীর ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেলো। দুলাভাইকে বললাম, 'আঙ্কেল, চেয়ারগুলি নিয়ে চলেন বারান্দায় বসি।'
দুলাভাইয়ের উত্তরটা একটু দেরিতে এলো। 'মশায় খাইবো। এক কাম কর, দরজাটা খুইলা দে, বাতাস আসুক। এইখানেই আড্ডা মারি ব্যাকটি মিল্লা।'
আমি পেছনের বারান্দায় দরজা খুলে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় বসলাম। আমার একটু বিরক্ত লাগছিলো। এখন মশার উৎপাত ততটা নেই। বারান্দায় বসলে তবুও যা একটু ঠান্ডা লাগে। কোন একটা বিচিত্র কারণে দুলাভাই বারান্দায় এসে বসতে চাচ্ছেন না। শুধু দুলাভাই না, অন্যরাও এই ব্যাপারে গররাজি। কারণটা কি?
আমি চা খেতে খেতে ছাদের দিকে চোখ রাখি। ছাদের যতটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতে কাউকে চোখে পড়ছে না। ছাদের সেই রহস্যময় গেস্ট কি এমন করেছেন, যে তাঁকে এমন লুকিয়ে রাখা হচ্ছে? শুধু তাই না, সবাই এড়িয়ে চলছে তাঁকে। ঘটনা কি?
আমি চায়ের কাপে শেষ চুমুক দেয়ার আগেই ইলেকট্রিসিটি ফিরে এলো। ভেতরের ঘরে সাজ্জাদ ভাই সম্ভবত কোন একটা রসিকতা করেছেন, একটা হাসির হল্লা আমার কানে এসে ঝাপটা মারলো। আমি ভেতরে যাবো বলে উঠে দাঁড়ালাম, এমন সময় একটা নিচু, ভারি, স্পষ্ট গলা আমার কানে এলো।
'শুনুন।'
কন্ঠস্বরটাতে এমন কিছু ছিলো যে মূহুর্তের মধ্যে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেলো। ঘাড় ফেরাতেই দেখলাম ছাদে একটা দীর্ঘ ছায়ামূর্তি।
'জি্ব?' আমি ঢোঁক গিলে বললাম।
'মিলিকে বলবেন আমাকেও এককাপ চা দিতে।'
'জি্ব।'
'ধন্যবাদ।' ছায়ামূর্তি ছাদের কিনারা থেকে সরে গেলো।
আমি যখন ঘরে ঢুকলাম, তখন দেখলাম সবাই কথা থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সম্ভবত আমার মুখ মাত্রাতিরিক্ত ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
3.
মিলি আপাকে খুঁজে পেতে কিছুটা সময় লাগলো, এর মধ্যে আমি একবার বাথরুমে গিয়ে মুখে পানি ছিটিয়ে এসেছি। বাথরুমে ঢুকলে আমার মাথাটা একটু ঠান্ডা হয়, এবং কাজও আগের চেয়ে ভালো করে। ঠান্ডা পানিতে হাত দেয়া মাত্রই কী একটা জিনিস আমার মাথায় খোঁচানো শুরু করলো। এ এক বিচিত্র অস্বস্তি, পেটে আছে মুখে নেই। আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারছি, কোন একটা অসংগতি, কিন্তু সেটা নিয়ে চিন্তা করতে পারছি না। সময়ের হাতে ব্যাপারটা ছেড়ে দিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলাম।
বেরিয়েই মিলি আপার মুখোমুখি হলাম। আমার ভেজা চুল দেখে তিনি অবাক হয়ে বললেন, 'মাথায় পানি ঢাললি নাকি? কী হইছে?'
আমি হাসলাম। 'কিছু হয় নাই। .. .. শোন, তোমাদের গেস্টের চায়ের পিয়াস লাগছে। আমারে কইলো, তুমি য্যান চা দিয়া আসো।'
মিলি আপা ফ্যাকাসে হয়ে গেলেন। 'তরে কইলো এই কথা?'
আমি বললাম, 'হ। বারান্দায় গেছিলাম, তো উনি আমারে ডাক দিয়া বললেন উনারেও এক কাপ চা দিতে।'
মিলি আপা বিস্ফারিত চোখে একবার আমার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করা শুরু করলেন। তারপর এগিয়ে এসে সশব্দে আমার বুকে তিনবার ফুঁ দিলেন।
আমি ঘাবড়ে গেলাম, কিন্তু কিছু বলার আগেই মিলি আপা এক ধরনের আতঙ্কিত চাপা গলায় বললেন, 'শোন ছ্যামরা, ওনার কাছে যাইছ না, উনি মানুষ না।'
আমি চরম ঘাবড়ে গেলাম, কিন্তু মিলি আপা হনহনিয়ে রান্নাঘরে চলে যাওয়ায় আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলাম না।
মানুষ না, এর অর্থ কী? জি্বন নাকি?
আমি এগিয়ে গিয়ে একটা খালি সোফায় বসলাম, সাজ্জাদ ভাইদের তাসের আড্ডা থেকে একটু দূরে। একগাদা দেশলাইয়ের কাঠি দেখলাম টিপয়ের ওপর, অর্থাৎ কোন এক কিসিমের জুয়া চলছে। পড়ে দেশলাইয়ের কাঠির পরিবর্তে টাকাপয়সা অদলবদল হবে। এই ঘরে বসে তাস খেলা একটা চরম রিস্কের কাজ, কারণ যে কোন সময় ঝুন্টি আপার শ্বশুর বারান্দা থেকে উঠে আসতে পারেন। তবুও খেলা চলছে, এবং বেশ উত্তেজনা নিয়েই চলছে, কারণ নিষিদ্ধ কাজের মজাই আলাদা।
নিষিদ্ধ কাজের মজাই আলাদা!
আচমকা কী একটা উৎসাহ আমার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়লো। কোনভাবে সবার চোখ এড়িয়ে যদি ছাদে গিয়ে দেখা যেতো এই অতিথিকে?
আমি চোখ বুঁজে আজকে সন্ধ্যা থেকে দেখা এবং শোনা ঘটনাগুলোকে সাজানোর চেষ্টা করলাম, ছাদে হেঁটে বেড়ানো এই রহস্যময় অতিথিকে সিরিজের সামনে রেখে। সন্ধ্যেবেলা দেখা ঝুন্টি আপার শ্বশুরের উদ্বিগ্ন মুখ, খেতে বসে তাঁর জি্বনবিতৃষ্ণার প্রকাশ, মিলি আপার গোপনে খাবার পাঠানোর ঘটনা, ছাদে একশো চুয়ালি্লশ ধারা জারি, সিগারেট এবং চায়ের সমঝদার সেই দীর্ঘদেহী অতিথির সিলু্যয়েট, তাঁর সম্পর্কে কথা বলতে মিলি আপা ও দুলাভাইয়ের অনীহা প্রকাশ, তাঁর সঙ্গে আমার কথোপকথন এবং সবের্াপরি তাঁর মনুষ্যত্বে মিলি আপার সন্দেহপ্রকাশ। এর কী মানে হতে পারে?
এবং এর মধ্যে কোথাও একটা গন্ডগোল আছে। কোথায়?
আমি শার্টের একটা বোতাম আলগা করে হেলান দিলাম সোফায়। এমন সময় দেখলাম মিলি আপা রান্নাঘর থেকে সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে বের হলেন, হাতে একটা ছোট ট্রে, তাতে একটা চীনামাটির কেটলি, দুটো কাপ, চিনি আর দুধের পট। সেগুলো নিয়ে সিঁড়ির দিকে রওনা দিলেন তিনি। সাজ্জাদ ভাই গুনগুনিয়ে বলেছিলেন, 'মিলি, আমাকেও একটু দিও .. ..।' মিলি আপা কোন উত্তর দিলেন না।
মিলি আপা উত্তর না দিলেও আমি আমার প্রশ্নের উত্তরটা খুব চটজলদি পেয়ে গেলাম। ছাদনিবাসী ভদ্রলোকের সাথে আমার সংক্ষিপ্ত কথোপকথন আমার মনে পড়ে গেলো, এবং সেটার ট্রিগার অবশ্যই সাজ্জাদ ভাই। ভদ্রলোক বলেছিলেন, 'মিলিকে বলবেন আমাকেও এককাপ চা দিতে।' বলেননি, "আমাকে" এককাপ চা দিতে, বলেছেন "আমাকেও"। দুটোর মধ্যে বিরাট তফাৎ। অর্থাৎ আমি যে চা খাচ্ছি সেটা তিনি জানতেন। কিন্তু জানার কথা না। কারণ আমি যখন বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলাম, বারান্দায় কোন আলো ছিলো না।
উনি অন্ধকারে বুঝলেন কিভাবে যে আমি চা খাচ্ছি?
ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের বিশেষ একটা গন্ধও থাকে না। সেই গন্ধ ছাদে বসে শুঁকতে গেলে জানোয়ারের মতো ঘ্রাণশক্তি চাই। মানুষের ঘ্রাণশক্তি খুব নিচু মানের।
মিলি আপাও বলেছিলেন, ভদ্রলোক মানুষ না।
এর মানে কী?
আমি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসলাম। কাছেই সাজ্জাদ ভাইরা বসে তাস পেটাচ্ছেন নিশ্চিন্তে। বসার ঘর থেকে ইদ্রিস মামার গলা শোনা যাচ্ছে মাঝে মধ্যে। এসব দেখে আমি আবার শক্ত মাটিতে নেমে এলাম। এই ইদ্রিস ভদ্রলোকটিই যত নষ্টের গোড়া। যাবতীয় উদ্ভট গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে সন্ধ্যা থেকেই মাথাটা ধরিয়ে রেখেছে। তাই যাবতীয় উল্টোপাল্টা চিন্তা আসছে মাথায়।
শুধু এ বাড়ির লোকজনের আচরণটাকেই ছকে মেলানো যাচ্ছে না .. ..।
ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ আমার মনে পড়লো মিলি আপার চা নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা। হাতে ট্রে, তাতে কেটলি, দ'ুটো কাপ .. ..।
দু'টো কাপ কেন? মিলি আপা তো চা খায় না। তবে কি অতিথি দু'জন?
আমার মাথা আরো গুলিয়ে গেলো।
4.
সাজ্জাদ ভাইদের তাসের আড্ডা যে আমার কারণে ভেস্তে যাবে, একথা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। চোখ বুঁজে সোফায় হেলান দিয়ে শুয়েছিলাম, কতক্ষণ শুয়েছিলাম তা-ও জানি না। একটা ভারি গলা শুনে প্রায় লাফিয়ে উঠে বসলাম। 'মাহবুব, ঘুমাচ্ছো নাকি?'
আমি চোখ কচলে চশমাটা যখন পড়লাম, তখন দেখলাম ঝুন্টি আপার শ্বশুর বারান্দার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, আর এদিকে হারূন মামা তাঁকে আড়াল করে দক্ষ ক্রুপিয়ের মতো সবকটা তাস হাতের পাঞ্জায় লুকিয়ে ফেললেন।
'যদি একটু আসতে .. ..।' নরম গলায় বললেন ঝুন্টি আপার শ্বশুর।
আমি শশব্যস্ত হয়ে এগিয়ে গেলাম। ঘুরে দাঁড়ানোর আগে একই রকম নরম গলায় তিনি বললেন, 'রাত বাড়ছে, ইয়ংম্যানরা ঘুমিয়ে পড়ার বন্দোবস্ত করেন।'
ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম সাজ্জাদ ভাই অত্যন্ত গোমড়া মুখে আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন। কিছু করার নেই, এখন শুতে যেতেই হবে।
বারান্দায় গিয়ে দেখলাম মিলি আপা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পাশে ঝুন্টি আপাও। দুজনেরই ভয় পাওয়া চেহারা। ঘটনা কী?
ঝুন্টি আপার শ্বশুর খুব নরম কিন্তু নিচু গলায় বললেন, 'ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটু উ
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



