somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লাগামচি

০৯ ই এপ্রিল, ২০০৬ সকাল ১০:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাখ যেভাবে সুর করেন, নুনিয়েজ সেভাবেই লাগাম বানায়, যেভাবে গোয়াইয়া ছবি আর দান্তে কবিতা। তার এই স্বাভাবিক ধী এক বাঁকহীন পথে নিয়ে গেছে তাকে, আর নুনিয়েজ বেঁচে আছে তার এই শিল্পের মধ্যে বুঁদ হয়ে থেকে।

তবে সব বড় মাপের মানুষের যে দুর্দশা হয়ে থাকে, নুনিয়েজও ভুগতো তাতেই। ঈশ্বরের কানুন মেনেই নুনিয়েজ জন্ম দিয়েছে তার শিল্পকর্মের। শিষ্যদের জন্যে সে রেখে গেছে তাকে অনুসরণ করার অজস্র পন্থা, কিন্তু কোন একটি রহস্য গোপন রাখা হয়েছে, যা তার সবচেয়ে কীর্তিমান অনুচরটিও ভেদ করতে পারেনি।

গোড়ায় নুনিয়েজ ছাতামাথা চামড়ার বোতাম বানাতো বুড়ো নিকাশিওর জন্যে, ফিতেগুলো ডলে যেতো যতক্ষণ তারা মোলায়েম না হতো। কিন্তু কালে সে শিখেছে অনেক কিছুই, সবচে' খাটনির কাজগুলো করে করে। নুনিয়েজ প্রশ্ন করতো না, নিশ্চুপ দেখতো নিকাশিওকে, বুড়োর কাজের বিভিন্ন ঢং হাভাতের মতো গিলে নিতো, আর ওদিকে বিদঘুটে লাগামের প্যাঁচগুলো পাক খেতো এমনভাবে, যা কাউকে কখনো শেখানো যায় না।

কিছু কাজকর্ম শেখার পর নুনিয়েজ মন দিলো নিজের স্বপ্নগুলোকে ধরাছোঁয়ার জগতে আনতে। একটু অবসরে সময়গুলোতে গিয়ে দোর দিতো সে, যখন অন্যেরা একটু গড়িয়ে নিচ্ছে, নিজের ঘরে চুপটি করে নুনিয়েজ লাগাম আর বোতাম বানানো শুরু করলো, এ তো ওর জন্যে সামান্য কাজ।

যে কেউ দেখলেই নুনিয়েজের লাগাম চিনতে পারবে, জটিল আর সূক্ষ বুনন, চলতি নকশার সাথে নুনিয়েজ নিজের মনের ছোঁয়াও মেশাতো তাতে, গাছপালা আর জানোয়ারের ছাঁচ দেখে তার মনে কতো নকশাই তো ভাসতো।

কিন্তু নুনিয়েজকে ধীরে এগোতে হয়েছে। ঘোড়ার কেশরের মতো সরু চামড়ার ফিতা বোনা কি চটজলদি করার কাজ? আর অবসর পাওয়াও তো সহজ কথা নয়, আর সেই সাথে আছে ইয়ারদোস্তদের ফোড়ন কাটা, নুনিয়েজ এড়িয়ে চলতো ওদের মড়কের মতো, পাত্তা দিলে যে ওর নিজের শিল্পই নষ্ট হবে শুধু।

নুনিয়েজ ব্যাটা কাজের শেষে ঘন্টার পর ঘন্টা নিজের ঘরে দোর দিয়ে করেটা কী? অন্য কারিগরদের কৌতূহল একদিন বড়কর্তাকেও ছুঁলো, খতিয়ে দেখতে নুনিয়েজের ঘরে ঢুকে সে চমকে উঠে দ্যাখে, এক রাশ চামড়ার ফিতা নিয়ে মগ্ন নুনিয়েজ, কর্তা আবার চুপিসারে বেরিয়ে যায়।

দুপুরঘুমের পর কর্তা নুনিয়েজকে ডাক পাঠান, নুনিয়েজের ঘাড়ে কাজ চাপে, সেই আদ্যিকালের কোন এক লাগামচির ভীষণ জটিল চার-বোতাম ছকের কিছু লাগাম বোনার। কিন্তু পরদিনই কাজ ফুরোয় নুনিয়েজের, আদ্যিকালেল লাগামচির হাতের কাজই বরং ছেঁদো লাগে নুনিয়েজের লাগামের পাশে। সবাই বোঝে, নুনিয়েজ এসে গেলো, তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে জঙ্গুলে আগুনের মতো।

ফরমাশ জমতে থাকে, নুনিয়েজ কাজ ছেড়ে দিয়ে সেগুলোর পেছনে লাগে। সেদিন থেকেই তার বাকিটা জীবন কাজ আর কাজ দিয়ে বোঝাই হয়ে যায়। আপসোস করার, বা এই পালটে যাওয়াকে উপভোগ করার সময়ও আর রইলো না নুনিয়েজের।

কয়েক মাস পর গাহেকদের চাপ সামলাতে নুনিয়েজ চলে এলো শহরে, কাজের সুবিধে দেবে এমন দেখে একটা বাড়ি নিলো সে।

নুনিয়েজের কাজের জেল্লা বাড়তে থাকে, কিন্তু অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার সুনামকে ছাপিয়ে ওঠে এক কালো ছায়া।

অমন প্রশংসা বুঝি আর কেউই পায়নি। লোকে বলতো, নুনিয়েজ সবচে' দামী ভিকুনিয়ার মতো মোলায়েম, সূক্ষ আর আরামদায়ক পঞ্চো বুনতে পারে। কী সব বোতাম, কী সব অদৃশ্য সেলাই, নুনিয়েজ বোধহয় ঝাঁড়ফুঁকই জানে। সক্কলে মিলে তাকে চাবুকদার বানিয়ে দিলো।

ঘষাপাথরটা বুঝি নুনিয়েজের হাতেরই একটা অংশ ছিলো, আর ছুরিটা বুঝি ছিলো তার চটপটে আরেকটা আঙুল। তার বুড়ো আঙুল আর ছুরির ফলার মাঝে কলকল করে বয়ে যেতো বাঁকা বাঁকা চামড়ার পাতলা চোকলাগুলো।

কত কত বাহারী মোটা সুঁইয়ের হাতলগুলো নুনিয়েজের হাতের খাঁজে এমনভাবে লুকিয়ে পড়তো, যেন ওটাই ওদের ডেরা। মালিশ করতে করতে ফিতেগুলোকে মসৃণ করে তুলতো সে, তার ঠোঁটের ভাঁজে পিছলে যেতো সেগুলো। সবশেষে ছুরির উলটো পিঠে চালিয়ে ফিতেগুলোকে মজবুত করতো সে।

লোকে এ-ও জানতো যে নুনিয়েজের পিন্টোটা একটু অদ্ভূত গোছের। প্রত্যেক বছর মাদী ঘোড়াটা একটা কালো এঁড়ে আর একটা ফর্সা বকনা বিইয়ে যেতো। তিন মাস বয়স হবার পর নুনিয়েজ বাচ্চা দুটোর মাথা কাটতো, ছাল ছাড়িয়ে শুকোনোর জন্য ঝুলিয়ে দিতো, পড়ে কালোর সাথে সাদা মেশাতো সে, দক্ষ, অননুকরণীয় ছকে।

চলি্লশ বছর ধরে নুনিয়েজ তার মেধাকে কাজে লাগিয়েছে, খদ্দেরকে খুশি করার জন্যে। অনেক পয়সা রোজগার করেছে সে, অনেক, আর শহরের রইস লোকজনও বেশ খাতির করেই রেখেছে তাকে, কিন্তু তবুও সবসময় যেন নুনিয়েজের চোখে ভাসতো সন্দেহ।

বুড়ো হয়ে পড়েছে, মাঝে মাঝে চোখে সমস্যা হয়, দিনে চার ঘন্টার বেশি আর খাটনি দিতে পারে না নুনিয়েজ। ক্লান্তির সীমায় পৌঁছে যাবার পর কাজ করতে গেলেই লাগাম ফেঁসে যেতো তার। এমন হবার পর নুনিয়েজ কাজ ছেড়ে দিলো। খরচ হয়ে যাওয়া বেচারা লোকটা শেষ পর্যন্ত জীবনের রাশ নিজের হাতে নিতে পারলো।

চামড়ার ফিতা ছুঁয়ে দেখবারও রুচি হয় না নুনিয়েজের, এমনকি লাগাম নিয়ে কথাও বলতে মন চায় না তার, এমনই পরিস্থিতি, এর মধ্যে একদিন হঠাৎ করে যেন বুড়ো নুনিয়েজ আবার খোকা হয়ে গেলো। একদিন বাক্সপ্যাঁটরা ঘাঁটতে ঘাঁটতে সেই লাগামটা তার হাতে এসে পড়লো, যেটা বোনা শুরু করেছিলো সে , কবে সেই শৈশবে, আর সেই থেকেই নুনিয়েজের খোকারোগ শুরু। লাগামটা হাতে পেয়ে বুড়োর মাথা খারাপ হয়ে গেলো বুঝি। দলাপাকানো ফিতাগুলোকে জাপটে ধরে, আর কখনো লাগাম না বোনার প্রতিজ্ঞা ভুলে, পঞ্চাশ বছর আগে ফেলে রাখা কাজে আবার হাত দেয় সে, বিরতিহীন, নিজের ক্ষয়ে যাওয়া দৃষ্টি আর স্বাস্থ্যকে বেদম খাটিয়ে, কুঁজো হয়ে কাজ করার প্রচন্ড যন্ত্রণাকে মেনে নিয়ে। কাজের পেছনে এই মর্মান্তিক মনোযোগে দিনকে দিন ধ্বসে পড়তে পড়তে দন ক্রিসান্তো নুনিয়েজ একদিন মারাই পড়লো।

লোকে যখন খুঁজে পেলো তাকে, শক্ত আর বেঁকে যাওয়া, তখন তার বুকে হাড্ডিসার হাতে শক্ত করে চেপে ধরা লাগামটা কিছুতেই ছাড়িয়ে নেয়া সম্ভব হলো না। ওটা সহই শেষশয্যায় শোয়ানো হলো তাকে।

বন্ধু, স্বজন, ভক্তেরা সবাই শেষকৃত্যে যোগ দিলো, সবাই স্মরণ করলো, কিভাবে খ্যাপার মতো অসমাপ্ত কাজের পেছনে পড়েছিলো নুনিয়েজ। একজন আবার ঐ লাগামটাকে তার সেরা শিল্পকর্ম আখ্যা দিয়ে প্রস্তাব করলো, অমন সুন্দর একটা কাজ তার সাথে সমাধিস্থ না করে বরং বৃদ্ধের আঙুলগুলো কেটে ওটা ছাড়িয়ে নেয়া হোক। সবাই মহা চটে গিয়ে জ্বলন্ত চোখে তাকালো তার দিকে, "নুনিয়েজের আঙুল কাটা? নুনিয়েজের স্বর্গীয় আঙুলগুলো?"

সেই অদ্ভূত, ব্যাখ্যাতীত ছবি ভেসে রইলো অনেকক্ষণ, কেমন করে বৃদ্ধ তার প্রথম এবং শেষ কাজ বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। এ কি অসম্পূর্ণ কোন কিছুকে পেছনে ফেলে না যাবার চেষ্টা? এ কি ভালোবাসা? নাকি এ নিছক শিল্পীর আর্তি, তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সৃষ্টির সাথে সমাহিত হবার?


-------------------------------------

রিকার্দো গুয়েরালদেজ এর গল্প, ক্রিস্টিন এ ডোলানের অনুবাদে "দ্য ব্রেইডার" অবলম্বনে। গুয়েরালদেজ বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক সেরা আর্জেন্টাইন লেখকদের একজন, এই গল্পটি তার 1915 সালে প্রকাশিত "কুয়েন্তোস দে মুয়ের্তে ঈ দে সাংরে" থেকে উৎকলিত।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দুর্ভিক্ষের আওয়াজ কি আমরা বাংলাদেশিরা শুনতে পাচ্ছি?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৪৩

মুচলেকা দিয়ে, গোপন সমঝোতা করে মীর জাফর কিংবা মীর কাসিমের মতো “কথিত ক্ষমতার” সিংহাসনে বসা যায় ঠিকই কিন্তু বসে বসে জনগণের সর্বনাশ দেখা ছাড়া তাদের বিশেষ কিছু করার থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সম্ভাবনার বন্দি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:১৮



বান্দরবান জেলা কারাগারের চারপাশে পনেরো ফুট উঁচু পাথর ও কংক্রিটের নিরেট প্রাচীর। তারও ওপরে পেঁচানো ধারালো কাঁটাতারের জাল।

বর্ষার কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে ৩ নম্বর ব্লকের সংকীর্ণ সেলে শান্ত হয়ে বসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাজার থেকে নৌকাবাইচ- এরপর কোথায়?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০

মাজার থেকে নৌকাবাইচ- এরপর কোথায়?
মাজার বিদ্বেষ, বাউলগান বিদ্বেষ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আপত্তি- এরপর কিছুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কলেমা লেখা পতাকা টানানো; আর এখন সিলেটের বিয়ানীবাজারে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে ঐতিহ্যবাহী... ...বাকিটুকু পড়ুন

খোঁজা সম্প্রদায়

লিখেছেন কিরকুট, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭

হিন্দু লোহানা জাতি থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছিল খোঁজা সম্প্রদায়।মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই খোঁজা সম্প্রদায়ের মুসলিম ছিলেন এবং শিয়া গোষ্ঠীর আশারি সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। খোঁজাদের বিশ্বাস এবং ধ্রমীয় আচার-আচরণ সহজে কোন পরিচিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাবিতে "মব সায়েন্স" পড়তে হলে কী কী যোগ্যতা লাগে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:১৮



- রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তৌহিদী জনতার ব্যবহার করা জানতে হবে।

- রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও মবকে থামাতে না পারলে সেটাকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা না বলে "জনতার শক্তি" বলতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×