রবি চোরার গানকে একটু মুচড়ে নিলাম প্রসঙ্গমতো। ফি হোক বা ফাই, আপত্তি মোর নাই। এই সোনালী অনুপাতকে ঘিরে বন্ধুবর সাদিক ও আশার আলো উৎসাহভরে কয়েকটি ব্লগ করেছেন। এই আশ্চর্য (?) অনুপাতকে নিয়ে তাঁদের অনেক আশা। সৃষ্টিকর্তার সৃজননকশার হট কী হিসেবে এই সংখ্যাকে অনেক উপাখ্যানে চালিয়ে দেয়া হয়েছে, দ্য ভিঞ্চি কোডে ড্যান ব্রাউন পৃষ্ঠা ভরানোর জন্যে একেও উদার হাতে কপচিয়েছেন, তাই আশাবাদী সৃষ্টিতাত্তি্বকের মনে এই সংখ্যা অনেক শারদীয় উৎফুল্লতা এনে দেবে, সন্দেহ নেই।
তবে কয়েকটি কুচক্রী মহল থেকে প্রতিবাদও এসেছে। এস এম মাহবুব মুর্শেদ জোর গলায় প্রতিবাদ করেছেন, তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে জনৈক জ্ঞানপাপী হাজির করেছেন এক গণিতবিদের গবেষণাপত্র, সেখানে এই সোনালী অনুপাতের তুলা ধুনে দেয়া হয়েছে। আগ্রহীরা জ্ঞানপাপীর ব্লগে গিয়ে দেখতে পারেন লিঙ্কটি, আমি কিছুটা পড়েছি।
তবে ফি বা ফাইয়ের বিভিন্ন প্রসঙ্গে ঘন ঘন ভেসে ওঠাকে সৃষ্টিকর্তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট হিসেবে ধরে নেয়াতে আমার একটু আপত্তি আছে। এই সমস্ত মহাবিশ্বই এক অপূর্ব নকশার মাঝে আছে, এর সৌন্দর্য বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যে যার মতো অবলোকন করুন, কিন্তু কেন সবকিছুকেই জোর করে একটি সংখ্যার ছাঁচে ফেলে দেখতে হবে? আর 1.618 সংখ্যাটি কেন শুধু সৃষ্টির কিছু নিদর্শনে থাকবে, বাকিগুলোতে অনুপস্থিত থেকে যাবে?
মানুষ সবসময়ই নিজেকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে ধরে এসেছে, এই সংস্কার ব্যক্তি মানুষকে তৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু মহাবিশ্বের ব্যপ্তির কথা চিন্তা করলে একে আত্মম্ভরিতা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। আজকে আমার কনুই থেকে মধ্যমার শীর্ষ আর কনুই থেকে কব্জির দূরত্বের অনুপাত মেপে আমি নিজের শরীরের অন্দরেকন্দরে 1.618 খুঁজে মহা তৃপ্ত, এর পেছনে গাণিতিক ব্যাখ্যা খোঁজার আগে আমার প্রশ্ন, একটা বেড়ালের পায়েও কি একই অনুপাত পাওয়া যাবে? পাওয়া যাবে একটা হাতির পায়ে? হাতি আর বেড়াল কি সৃষ্টির অংশ নয়? মানুষকেন্দ্রিক ভাবনা থেকে একটু উত্তরণ ঘটলে কি আমাদের দৃষ্টির দিগন্ত আরো প্রসারিত হয় না?
আর মানুষের শরীরে এই অনুপাতের পরিমাপের গরমিল নিয়ে জ্ঞানপাপীর দেয়া লিঙ্ক-এ কিছু গাণিতিক বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে, আগ্রহীরা খুঁজে দেখবেন।
পরিশেষে বলি, কেউ যদি সৃষ্টির পেছনে কোন সংখ্যাকেই ঐশ্বরিক টিপসই হিসেবে খুঁজে পেতে চান, 1.618 কে ভুলে গিয়ে 0.75 কে নিয়ে পড়ুন। যেমন মস্তিষ্কবিশিষ্ট কর্ডাটার শরীরের ওজনের লগারিদম আর মস্তিষ্কের ওজনের লগারিদমের অনুপাত 0.75। ব্যাকটিরিয়া থেকে শুরু করে হাতি পর্যন্ত সব প্রাণীর শরীরের ওজনের লগারিদম আর বিপাকের হারের লগারিদমের অনুপাত 0.75। স্রষ্টার সৃষ্টি সব প্রাণীকেই ওর মধ্যে ফেলতে পারবেন। এ একেবারে মেপে দেখা, ছকে দেখা পর্যবেক্ষণ, জীববিজ্ঞানীরা ক্লাইবারের নিয়ম বলেন একে।
নাহ, জানি আপনারা আমার এ ফাঁদে পা দেবেন না। প্রথম কারণ, পৃথিবীর সব প্রাণীকে মানুষেরই মতো একই যাত্রায় অংশ নেয়া পথিক হিসেবে মেনে নেবেন না। দ্্বিতীয় কারণ, বহু রহস্যের অবসান ঘটিয়ে ক্লাইবারের নিয়মের গাণিতিক ব্যাখ্যা বার করেছেন ওয়েস্ট, ব্রাউন ও এনকুইস্ট। স্রষ্টা একটু রহস্যে থাকতে পছন্দ করেন বোধহয়, গণিতের জাল ছুঁড়ে মারলে বিরক্ত হয়ে সরে যান তিনি। তবে তাঁর সৃষ্টিকে নিয়ে আমি মুগ্ধ, বিমোহিত। যত খুশি জটিল পথে তাঁকে আবিষ্কার করুন, তুষ্ট করুন, ভাগযোগ মারপিট করুন তাঁকে দখল করার জন্য, আমার এই মুগ্ধতাই তাঁর প্রতি আমার নৈবেদ্য।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



