somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জনপ্রতিনিধি সঙ্কট

০৩ রা মে, ২০০৬ বিকাল ৩:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ফুটবল খেলার মাঠগুলোর পাশে কেন যেন সবসময় বদমেজাজী লোকজনের বাড়ি থাকে। আর তাদের বাড়িতেই হঠাৎ হঠাৎ পাঁচিল টপকে বল গিয়ে পড়ে।

তো এমনি এক বেমক্কা শট মেরে জনৈক বদমেজাজীর চৌহদ্দিতে বল পাঠিয়ে দিয়ে আমরা মহামুশকিলে পড়লাম। কী করা যায়? আমরা এখন আর ছোট নই, রীতিমতো ধাড়ি, বিয়েশাদি করা ছেলেপেলেও আছে আমাদের মধ্যে দুয়েকজন, এই বয়সে কে যাবে ঐ ঝাড়ি খেয়ে বল আনতে? মান অপমান বোধ তো সবারই আছে।

একজন প্রস্তাব দিলো, একজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করা হোক খেলোয়াড়দের মাঝ থেকে। কিন্তু প্রাথর্ী হতে আগ্রহী পাওয়া গেলো না কাউকেই। সবাই একটু উদাস, আনমনা, বল-না-পেলে-খেলবো-না-কিন্তু-বলও-আনতে- যাবো-না ভাব চোহারায়।

শেষমেশ সবাই দেখি আমার দিকেই একমন টেরিয়ে তাকাচ্ছে। আমি অস্বস্তিতে পড়ে যাই, বলি, কী, কী দেখিস আমার দিকে এরকম ড্যাবড্যাব করে? বাড়িতে বাপভাই নাই?

সবাই গুজগুজ করতে থাকে। হুমম, হিমুটার গায়ের চামড়া অত্যন্ত পুরু মনে হচ্ছে। দুইচারটা তিক্ত কথা শুনলেও ওর কিছু এসে যাবে না। জনপ্রতিনিধি হবার জন্য আদর্শ। বলতে না বলতেই হ্যাঁ-না ভোটাভুটি শুরু হয়ে যায়, ব্যাপক ভোটে জিতে আমি জয়ী হই। আমার বিপক্ষে না ভোট দিয়েছে দুইজন, তাদের মধ্যে একজন আমার সত্যিকারের বন্ধু, আরেকজন বলের ভবিষ্যৎ ভেবে আমাকে না ভোট দিয়েছে, তার ধারণা আমি বল আনতে গেলে ঐ বলটা বটি দিয়ে কুচিয়ে ফেরত দেয়া হতে পারে, রাস্তার পোলাপানকে নাকি ঐভাবেই বল ফেরত দেয়া দস্তুর।

কী আর করা, বিষাদগ্রস্ত মনে দাঁড়াই সবার মনে। আমাকে শপথ পাঠ করায় সকলে মিলে, যেভাবেই হোক বল হাসিল করতে হবে, প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে হলেও। ঐ বাসার বুড়া মালিকের ঐতিহ্য আছে বল ও বলপ্রাথর্ীদের যুগপৎ আটকে রেখে বেওয়ারিশ মাল হিসেবে পুলিশে সোপর্দ করার, তাছাড়া ঐ বাড়িতে লেলিয়ে দেয়ার জন্য অভ্যস্ত কুত্তা আছে, আছে লাইসেনস করা শটগান, জব্বারের বলী খেলায় কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট দারোয়ানসহ আরো অনেক প্রতিকূলতা, সবের্াপরি বাড়ির সিংহদরোজায় কোন ঘন্টা নেই, সেটার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁক পেড়ে অভ্যন্তরস্থ লোকজনের মনোযোগ ও কুকুরের অমনোযোগ আকর্ষণ করতে হবে। তবে একটি সুন্দরী ও যৌনাবেদনময়ী তরুণীও সে বাড়িতে থাকে, হতে পারে সে কাজের বুয়া কিন্তু তাতে কি, সুন্দরী ও যৌনাবেদনময়ী তো, আমি বল উদ্ধারের প্রক্রিয়ায় তাকে কয়েক ঝলক দেখে ফেলতে পারি, চাই কি মুরোদে কুলালে তাকে পটিয়ে বার করে এনে নন্দন পার্কেও নিয়ে যেতে পারি নাকি।

আমি বিরসমুখে শুনি।

শপথ পাঠ করানোর পর সবাই হুড়ো দেয় আমাকে, কই, যা!

আমি দূর অস্ত বাড়ির দরজার দিকে তাকাই। তারপর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। নাহ, প্রতিনিধি যখন আমাকে নির্বাচিত করাই হয়েছে, প্রতিনিধিসুলভ আচরণই আমাকে করতে হবে। তাছাড়া শাস্ত্রে আছে, দূত অবধ্য, আমার কী ভয়?

আমি কেশে গলা পরিষ্কার করি, তারপর রাজনের দিকে ফিরে বলি, "তোর মোটরসাইকেলটা দে আমাকে!"

রাজন অতিশয় কঞ্জুস, সে সব কিছুই বাঁচিয়ে চলে, গালি পর্যন্ত গুনে দেয়, আর ওর কয়েক হাতফেরতা মোটরসাইকেলটার মতো মহাঘর্্য জিনিস হস্তান্তর করবে আমার মতো জনপ্রতিনিধির কাছে, এ আশা করা অন্যায়। তাই ও যখন ফুঁসে উঠে প্রত্যাখ্যান করে, আমি অবাক হই না।

"মোটরসাইকেল লাগবে কেন তোর?" রাজন ওর ময়লা দাঁতগুলি খিঁচায়।

"কত দূরে বাড়িটা দেখেছিস?" আমি কপালের নিচে হাত রেখে সেই দিলি্লর মতো দূরবতর্ী বাড়িটার আগাপাস্তলা খুঁটিয়ে দেখি। "পায়ে হেঁটে যাই কিভাবে? বাহন লাগবে না?"

অন্যরা একে অন্যের দিকে তাকায়। একজন দুর্বল যুক্তি দাঁড় করায়, "কী বলিস? এক শট মেরে বল ফেলে দিলাম, আর তুই বলছিস দূর? ঐ তো দেখা যায় ---!"

আমি উদাস হাসি। বলি, "ওরে, আসমানের চাঁদও তো দেখা যায়! কোনদিন চাঁদে না বল পাঠিয়ে দিস এক শট মেরে। তাছাড়া বেশি কিছু চাইনি আমি। আইনপ্রণেতা জনপ্রতিনিধিদের মতো বিনাশুল্কে গাড়ি তো চাইনি। স্রেফ মোটরসাইকেল, তাও পুরানা! ভেবে দ্যাখ, মোটরসাইকেলে চড়ে গেলে একটা মানসম্মান থাকে, হয়তো চাওয়ার আগেই বল দিয়ে দেবে!"

সবাই নিমরাজি হয়, একা রাজনটা গজগজ করতে থাকে। আমি ওকে আশ্বস্ত করি, "আরে ভাই এমপিদের মতো বেচে দিবো না তোর মোটরসাইকেল! খালি যাবো আর আসবো! এটুকু মেনে নিতে তোর *োগা জ্বলে?"

রাজন দাঁত কিড়মিড় করে চাবিটা দেয় আমার হাতে।

আমি তবুও আনমনে কী যেন ভাবি। ওরা হুড়ো দেয়, "যা এবার! দাঁড়িয়ে আছিস কেন খাম্বার মতো?"

আমি শিবলির দিকে তাকাই। "দোস্ত তোর ক্যামেরাঅলা মোবাইলটা দে!"

শিবলি সিঁটিয়ে যায়, "যা ভাগ! মোবাইল দিয়ে তুই কী করবি?"

আমি অভিমান করি। "মোবাইল দিয়ে কী করবো মানে? ফুটানগি দেখাবো, আবার কী? তাছাড়া ওরা ... ওরা যদি সত্যি সত্যি কুত্তা ছেড়ে দেয়, শটগান দিয়ে গুলি করে, দারোয়ান দিয়ে প্যাঁদায়, ওগুলোর একটা প্রমাণ লাগবে না? তাই ক্যামেরাঅলা মোবাইল। তাছাড়া আটকে রাখলে আমিই পুলিশের ছোটবোনকে ফোন করবো, তোরা তো জরিনাকে চিনিসই ... ঐ যে ডিআইজির ছোট বোন ...।"

শিবলি রাজি হয় না, ওর এতো শখের মোবাইল।

আমি রাগ করি। "আরে ভাই আমি তো সাংসদদের মতো কোটি কোটি টাকা ফোনবিল বাকি রাখার আব্দার করি নাই! বড়জোর পাঁচসাত টাকা বিল উঠবে! তা-ও তোরা এমন করিস? মৃতু্যর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বল উদ্ধার করতে যাচ্ছি, তবু তোরা কান্টামি করিস *াল!"

বাকিরা গুজগুজ করে, শিবলি মুখ গোঁজ করে ওর ঝাক্কাস মোবাইল সেটটা বাড়িয়ে দেয়।

আমি সেটাও পকেটস্থ করে দাঁড়িয়ে থাকি। তারপর আরো কিছু নিখাদ যুক্তির প্রকোপে রাশেদের সানগ্লাস, মাহমুদের ব্রেসলেট আর মুন্নার গলার মোটাসোটা চেনটাও বাগাই। ওরা দাঁড়িয়ে থাকে আশা নিয়ে।

সবকিছু নিয়ে রওনা হতে যাবো, এমন সময় ছ্যাঁক ছ্যাঁক করে তেলেভাজার শব্দ আর ঘ্রাণ যথাক্রমে কানে ও নাকে ভেসে আসে। গুনগুন করি, ভেসে আসে সুদূর পুরির সুরভী হায় সন্ধ্যায় ...। সবাই অগি্নদৃষ্টি হানে আমার দিকে।

আমি অসহায় হয়ে পড়ি। "আরে বাবা কয়েকটা ডাল পুরি আর কয়েককাপ চা-ই তো খাওয়াবি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মতো কোটি টাকার বাজার তো আর করে দিতে বলছি না। এই সামান্য কাজটুকু করে দিবি না তোরা?"

এরপর সবাই ফুঁসে ওঠে। বলে, বল নাকি আর লাগবে না। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, খেলা ডিসমিস। একে একে যে যার মালসামানা ফিরিয়ে নিতে উদ্যত হয়। আমার একটু মন খারাপ হয়, বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি যে জনপ্রতিনিধিদের কিছু কিছু সুবিধা দিতে হয়, নইলে কাজ উদ্ধার হয় না, কিন্তু ওরা যেন কেমন, এদেশে বাস করেও এই নিকষিত সত্য কথা মানতে চায় না।

আমাদের খেলা ভেস্তে যায় সেদিনের মতো।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়: সব কিছু ভেঙে পড়ে

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৬ ই মে, ২০২৬ দুপুর ২:২৮


"তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও - আমি এই বাংলার পারে
র’য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;
দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের..."

জীবনানন্দ দাশ ''রূপসী বাংলা'র কবিতাগুলো বরিশালে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে বসে লিখেছিলেন। জীবনানন্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার কারণে দিদি হেরেছন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩




আপা এপারের হিন্দুদেরকে স্নেহ করতেন তাতে ওপারের হিন্দু খুশী ছিল। আপা ভারতে বেড়াতে গেলে মোদীর আতিথ্যে আপা খুশী। কিন্তু আপার আতিথ্যে দিদি কোন অবদান রাখলেন না। তাতে হিন্দু... ...বাকিটুকু পড়ুন

লেখালিখি হতে পারে আপনার বিক্ষিপ্ত মনকে শান্ত করার খোরাক।

লিখেছেন মাধুকরী মৃণ্ময়, ০৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৪:২৯

এই যেমন আমি এখন লিখতে বসছি। সর্বশেষ লিখেছি ২০২১ সালে জুলাই এর দিকে। লিখতে গিয়ে আকাশে বাতাসে তাকাচ্ছি, শব্দ, বিষয় খুজছি। কিন্তু পাচ্ছি না। পাচ্ছি যে না , সেইটাই লিখছি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই মে, ২০২৬ রাত ২:৩৩


নট আউট নোমান ইউটিউব চ্যানেলের ক্রীড়া সাংবাদিক নোমান ভাই একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। বাংলাদেশে এখন আমরা এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছি যেখানে প্রকৃত দেশপ্রেমিক আর ভুয়া দেশপ্রেমিকের পার্থক্য করা... ...বাকিটুকু পড়ুন

রফিকুল ইসলামের ২য় বিয়ে করার যুক্তি প্রসঙ্গে chatgpt-কে জিজ্ঞেস করে যা পেলাম...

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ০৭ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০



ইসলামে একাধিক বিয়ে বৈধ, তবে সেটা বড় দায়িত্বের বিষয়। শুধু “বৈধ” হলেই কোনো সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তম বা সবার জন্য উপযুক্ত হয়ে যায় না। Qur'an-এ বহু বিবাহের অনুমতির সাথে ন্যায়বিচারের শর্তও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×