জেনেসিস
আমাকে ঈশ্বর সৃষ্টি করেন এক শুক্কুরবার। সপ্তাহের শেষ দিন, এরপর টানা দুটি দিন উইক এন্ড, সে আনন্দে ঈশ্বর বেচারার কাজে মন বসে না। বিকেলবেলা আমার ছাঁচটাকে কারখানার চুলি্লতে ভরে সেটা চালু রেখেই শিস দিতে দিতে ঈশ্বর কারখানায় তালা লাগিয়ে বাড়ি ফিরে যান। আহ, দুই দিন ছুটি। ভিসিআর ছেড়ে শ্রীদেবীর সিনেমা দেখা হবে।
সোমবার কারখানা খুলে ঈশ্বর দাঁতে জিভ কাটেন। ওহহোহো, বড় ভুল হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি চুলা থেকে একটা চিমটে দিয়ে ধরে আমার কয়লাকালো শরীরটা বার করেন তিনি। ফুঁ দিয়ে একটু জীবনবায়ু ঢুকিয়ে দিতেই আমি ধড়মড়িয়ে উঠে বসি। ঈশ্বর আমার সামনে একটা আয়না ধরেন।
"এটা কী?" আমি ঘাবড়ে যাই।
ঈশ্বর সস্নেহে বলেন, "তুমি বাছা। এটাই তুমি।"
আমি তেড়ে যাই ঈশ্বরের দিকে। "বললেই হলো? এই চিমসা কালা বান্দরের মতো দেখতে ... এইটা আমি?"
ঈশ্বর হাসেন। "আরে বান্দরের মতো দেখতে তো কী হয়েছে? কোন সমস্যা নাই, ডারউইন সব বুঝিয়ে বলবে। যাও, এবার দুনিয়াতে গিয়ে চরে খাও।"
আমি এই বেইনসাফিতে রাজি হই না, ঘ্যান ঘ্যান করতে থাকি। দুইদিন ফূর্তি করে ঈশ্বরের মুড ভালো, তিনি বলেন, "ওকে ওকে, তোমার জন্য ক্ষতিপূরণ দিচ্ছি। পাঁজরের একটা হাড্ডি খুলে দাও তো, তোমার জন্য একটা সঙ্গিনী বানাই।"
আমি আবারও তেড়ে যাই। ব্যাটা চান্দাবাজির জায়গা পায় না।
ঈশ্বর মুখ গোমড়া করে নতুন মশলা দিয়ে দিনভর খেটেখুটে আমার জন্য এক অপূর্ব রূপবতী বালিকা নির্মাণ করেন (বুঝতেই পারছেন, এ হচ্ছে টারজানা খান, চ্যানেল টু-তে সংবাদ পাঠ করেন)।
"এই নাও।" ঈশ্বর বলেন। "এখন যাও, আর গোল করে না।"
সোমবারই জন্মেছিলাম। দুনিয়াতে এসে টারজানাকে খুঁজে পেতে একটু সময় লেগে গেলো, এখনও যোগাযোগ করে উঠতে পারলাম না। তবে হবে। হবেই।
বাংলা ব্লগে আমি
আরিলড ক্লকারহগ একদিন আমার ইংরেজি ব্লগে একটা কমেন্ট ঝাড়লেন। তখন বুঝিনি, দুয়েকদিন পর সেই লিঙ্কে ক্লিক করে দেখি উরেব্বাস, একেবারে রমরমা অবস্থা। ইংরেজি ব্লগ গুটিয়ে এখানেই চলে এলাম, টুকটাক করে লিখতে লিখতে আজ শ'খানেক লিখে ফেললাম সাড়ে তিন মাসে। এই ব্লগবান্ডিলের প্রায় একশো ভাগের এক ভাগ আমার যোগানো, ভাবতেও ভালো লাগে। হিট কাউন্টার দেখে মনে হচ্ছে অনেকেই আমার পোস্টগুলি পড়েন, তবে কমেন্টের রুগ্নাবস্থা দেখে বুঝি, পড়ে তাঁদের খুব একটা মনে ধরে না। না ধরুক। আমার বয়েই গেলো।
পুরনো কিছু কবিতা এখানে পোস্ট করা শুরু করেছিলাম, আর দুয়েকটা গল্পসল্প, অনুবাদ ... প্রভৃতি ... তারপর একদিন মন খারাপের সময় দেখি এখানে বসেই কবিতা লেখা শুরু করে দিয়েছি। মাঝে মাঝে একে ওকে খোঁচাই, নেহায়েত খোঁচানোর খাতিরেই।
পরিচিত অপরিচিত চিনিচিনিসন্দেহজনক সবাইকেই পাকড়ে এই বাংলাব্লগের ঠিকানা গছিয়েছি। কয়েকজন লেখা শুরু করেছেন, কয়েকজন নিঃশব্দ পাঠকমহলেই থেকে গেছেন, আবার কেউ কেউ পাত্তা দেননি। না দিন। আমার বয়েই গেলো।
এখানে অনেকের লেখাই পড়ি, অনেকের লেখাই পড়ি না, উপাদান ও শৈলীগত বিচারে পছন্দ করি কয়েকজনের লেখা। পছন্দের মাত্রানুসারে নয়, এলোমেলোভাবেই উল্লেখ করি তাঁদের।
শোহেইল মতাহির চৌধুরীর নামটা সবচেয়ে দীর্ঘ, তাই তাঁকে দিয়েই শুরু করি। অনেক কিছু নিয়ে লেখেন, ওনার প্রয়াত গুরু হীরক লস্করের মতোই। এঁরা দুইজন ব্লগের মন্দা সময়ে এসে রিলিফ পোস্ট দেন প্রায়ই, যদিও লস্কর বাং মেরেছেন দীর্ঘদিন হলো, তবে মশাল ধরিয়ে দিয়ে গেছেন চৌধুরীর হাতে। জটিল প্রশ্ন আর কূটিল উত্তর নিয়েও তাঁর কারবার প্রশংসার্হ।
আমার চৌধুরীপ্রীতি নেই, তবে আরেক চৌধুরীর লেখা ভালো লাগে, আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু ও জার্মান শিক্ষায় সতীর্থ সুমন চৌধুরী। ওঁর কবিতাগুলি আমার মাথায় টক্কর মেরে যায় প্রায়ই, তবে গদ্যের সাথেও সুমনের দুশমনি নেই।
রাসেলের লেখা ভালো লাগে, আমাদের ব্লগের অ্যাংরি ইয়ংম্যান, অনেক কিছুর ওপরই ওঁর রাগ। তাঁর সব অনুভূতিতে হয়তো সমর্থন দিতে পারি না, তবে লেখা পড়ে আনন্দ পাই। একই প্রতিক্রিয়া জানাই অপ বাক, দীক্ষক দ্রাবিড় এবং মহুয়ামঞ্জুরীর ক্ষেত্রে। শ্রেয়সী বসুকে মিস করি অনেক (দীর্ঘশ্বাস), মহিলা যে কই গেলেন ... আমাদের একা ফেলে ... হায় ...!
বন্ধুবর অরূপ আর মুখফোড়ের লেখা পছন্দ করি ভীষণ। অশ্বারোহী ল্যানসার এঁরা দুজন। লেখার গতি আর ধার অনেক। আমি হাসতে ভালোবাসি, এঁরা আমাকে নিয়মিত হাসান।
হাসানোর প্রসঙ্গ এলো, রুনাম্যান হাসানের কথাই না বলে পারি কিভাবে? হাসানের লেখা ভীষণ ঝরঝরে, সৈকতে দমকা বাতাসে ওড়া বালির মতো। একেবারে বিঁধে যায়।
সাদিকের সুফিবাদ ও তদজনিত বাদানুবাদের সাথে সবসময় একমত পোষণ করে উঠতে পারি না, কিন্তু গরম আবহাওয়ায় সাদিকের নরমপন্থা ভালো লাগে। সাদিকের পরিমিতিবোধ চমৎকার, এই গুণেই তাঁর লেখার বুনোট উপভোগ্য হয়ে ওঠে। এই চমৎকার বুনোট আছে তীরন্দাজের লেখাতেও। শুধু ফলার ধারই নয়, তাঁর তীরের পালকের ভারসাম্যও চোখে পড়ার মতো।
মাশীদ অল্প লেখে, তবে ভালো লাগে পড়ে। উৎসের লেখা অনেক ভালো লাগে, শুধু জেনেটিক্স আর বিবর্তন নিয়ে আমারও আগ্রহের কারণে নয়, উৎসের লেখার ভঙ্গিটিই চমৎকার। ইশতিয়াক জিকো খুব গোছানো লেখেন, কিন্তু ইদানীং তাঁর লেখা চোখে পড়ে না। অমি রহমান পিয়ালের লেখাও মসৃণ, নিয়মিত পড়ি, যদিও তাঁর সাথে আমার ভীষণ শত্রুতা।
ধূসর গোধূলির পোস্টের চেয়ে মন্তব্য বেশি স্বাদু, একই কথা খাটে কালপুরুষ ও শুভর ক্ষেত্রেও। লুনা রুশদীর লেখা ভালো লাগে, কিন্তু তিনি লেখেন কম। লবিয়াল ব্রাত্য রাইসুর পোস্টের চেয়ে ঝগড়াবাচক কমেন্টগুলি বেশি আগ্রহ উদ্দীপক (উনি কিন্তু দলবাজি আর খুনসুটি একদম পছন্দ করেন না!)। সম্প্রতি লজেনস পেয়েছি সূচিত্রার (নাকি সুচিত্রা?) কাছ থেকে, এ-ও ভালো লেগেছে। শমিতের ছবি আর লেখার মধ্যে মাঝে মাঝে পার্থক্য করতে পারি না, চোখরোচক ভীষণ, চোখে আরাম দেয় দুটোই। কৌশিক মাঝে মাঝে দমকা পোস্ট করেন, ইনিও ক্রুদ্ধ যুবাদের দলে, পড়ি এবং উপভোগ করি। এস এম মাহবুব মুর্শেদের লেখায় ধার আর ভার দুটোই থাকে, পড়ে ভালো লাগে। বদরূল আহমেদও আমার প্রিয় ব্লগারদের একজন, তাঁকে ও বাভিকে সালাম, চঞ্চুতে চঞ্চু ঠেকিয়ে তাঁরা যেন চিরকাল আলাপন চালিয়ে যেতে পারেন সে কামনাই করি।
অনেকের কথা বোধ হয় বলা হলো না, শুদ্ধিপত্রে অবশ্যই প্রকাশ করবো।
আমার সব লেখাই আমার পছন্দ নয়, দুয়েকটা ভালো লেগেছে অনেকের লেখার ভিড়ে। তবে আমার লেখা পড়ে কারো ভালো লাগলে আমার নিজেরও অনেক ভালো লাগে, সামান্য মুগ্ধতা কাউকে উপহার দিতে পারলাম সে আনন্দে।
পরিশিষ্ট
আমি বোধহয় লিখে লিখে নিজের চেহারাই আঁকি। যারা আমার পোস্ট পড়ে আমাকে অলস, পলায়নপরায়ণ, মদখোর, ঝগড়াবাজ ও বালিকালোলুপ হিসেবে চিনেছেন, অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি, আপনারা ঠিক ধরেছেন।
ধন্যবাদ সেসব ভিজিটরদের যাঁরা আমার পোস্টগুলো পড়েছেন। ধন্যবাদ এই ব্লগস্থানের স্রষ্টাদের। তোমাদের এই হাসি খেলায়, মনে রেখো, আমি যে গান গেয়েছিলেম, জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায় ... মনে রেখো ...।
শেষ হইয়াও হইলো না শেষ
ছবিটি শিরোনামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বোধহয়। জনৈক কেলে আদম লাইফ জ্যাকেট পরে টাঙ্গুয়ার হাওরের মিঠাপানিতে লবণ যোগের প্রচেষ্টায় রত। ছবির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয় শ্রদ্ধেয় বরুণ বকশীর কাছে। না, এটা আমার ছবি হতেই পারে না ...!
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



