কবিতা জীবনবিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় বলে আমি মনে করি না। কবিতা জীবনের উনুনে তৈরি হতে থাকে। কোনো এক মুহূর্তে টসটসে কবিতা ঝড়ে পড়ে। কিন্তু এই একটা কবিতার পেছনে যাপিত জীবনের ইতিহাস লুকানো। অনুভব, ব্যার্থতা, আক্ষেপ, কবিতার শব ব্যাবচ্ছেদ করলে এই সব তাৎক্ষনিক অনুভব বুঝে নেওয়া সম্ভব, বুঝে নেওয়া সম্ভব কবির জীবন যাপনের ইতিহাস। কবিতা সেই অর্থ ব্যক্তিগত জীবন উন্মোচন।
খটকা লাগলো এখানেই, অন্য যেসব কবিতা পড়লাম গত 2 দিনে তার সাথে এই কবিতার স্বরের কোনো মিল নেই। সম্পুর্ন আলাদা। ব্লেক যার শৈশব থেকেই অতিলৌকিক দৃশ্য দেখার স্বভাব আছে- সেই ছোটো ছেলে যে 9 বছর বয়েসে ঘরে ফিরে মা'কে বলেছিলো একদল দেবদুত গাছে বসে আছে- সেই ছেলেটাই পরবর্তিতে মাঠের কৃষাণদের ভেতরে অনেক ছদ্মবেশী দেবদুত কাজ করছে এমন অতিলৌকিক দৃশয় দেখছে- কিন্তু এই লেখায় এইসব মৌল বিশ্বাসের উদ্ভাসন নেই। হতে পারে তার জীবনের মৌলিক ধারনার বদল হয়েছে - মৌল বিশ্বাসের বদল হয় না রূপান্তর হয়। আশৈশব ধারনার সাথে কিছু আবছায়া যুক্ত হয়ে একটা পরিনত মানসিকতা তৈরি হয়- সেই সময়ের ইংল্যান্ডের অবস্থা, তার ইংরেজ ঔপনেবিশিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান, মূলত অনাস্থা। এবং তার এই সব অতিলৌকিক অনুভব- তার প্রথম সরব নারীবাদি নেত্রির সাথে সখ্য- এমন অনেক ছোটো ছোটো ঘটনা হয়তো জীবনের সংজ্ঞায় সামান্য বিবর্তন ঘটাতে পারে কিন্তু একেবারে বিপরীত মুখী অবস্থান নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাবে এমনটা আমার মনে হয়- এর পরও সংক্ষিপ্ত জীবনি পাঠ করে তার মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা।
ছাত্রজীবন থেকে নিজের মতে চলতে থাকা। তার শিক্ষকদের সাথে মতভেদ, এবং তার আপাতবিরোধি 2 ধরনের ধারনা দেখলে মনেহ য় বৈপিরিত্ত্ব তার জীবনেই ছিলো- তাই একটা পর্যায়ে নতুন উপলব্ধি তার পৃথীবির সকল ধর্মই এক, মূলত একই উৎস থেকে উদ্ভুত সব ধর্মবিশ্বাস। এবং কোনো স্বাভাবিক ধর্ম নেই- সব ধর্মই আমাদের নীতিবোধ এবং শুভবোধ দিয়ে তৈরি।
তার সিদ্ধান্ত গ্রহন, পৌত্তলিকদের সূর্যপূজার ধাপ ধরে একক ইশ্বরের কল্পনা পৃথিবীতে এসেছে- সব দেবতাই সূর্যদেবতার অধিনস্থ। এই সূর্যদেব পরবর্তিতে একক ইশ্বর হয়ে যান।
পৌত্তলিকতা- যদিও পেগানিজমের সঠিক প্রতিশব্দ এটা কি না জানা নেই, তবে পৌত্তলিকতা যেমন প্রকৃতির স্বাভাবিক বিষয়গুলোর সাথে সামান্য রহস্যময়তা জুড়ে দিয়ে- কিছুটা অন্ধ বিশ্বাস আর কিছুটা অলৌকিকত্ব জুড়ে তৈরি হয়- ইংল্যান্ডে শিল্পি মহলে তখনও ক্ল্যাসিকাল আর্টের ধারাবাহিক প্রভাব বর্তমান। প্রাচীন স্থাপত্য- গ্র ীক রোমান সভ্যতার ধারাবাহিকতা- মধ্য যুগের কল্পনার রং মিশিয়ে আঁকা গীর্জার অলংকরন। এসব কিছুর নির্যাস নিয়েই জিউস আর যীশুর শান্তিপূর্ন সহাবস্থানের মাধ্যমে ইউরোপের শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে- এর পটভূমিতে ব্লেকের শৈশবের শিক্ষা, তার প্রথম খোদাই স্কুলের কাজ- তার তৎকালীন শিক্ষকের প্রভাব- এবং তার আজীবন মুগ্ধতা মাইকেল এঞ্জেলোর চিত্রকর্ম ও স্থাপত্যের প্রতি- এই একটা জায়গায় ব্লেক প্রাচীনতাবাদী। আবার তার হাতেই গড়েউঠছে কবিতার নতুন প্রকরণ।
চিত্রশিল্পি হিসেবে কাজ করার সাথে কবিতার চর্চাও চলছিলো, 14 বছরের সঞ্চিত কবিতা নিয়ে 1783তে প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রকাশ- পোয়েটিক্যাল স্কেচেস-
বেকন নিউটন এবং সমকালীন দার্শনিকদের ধারনার বিপরীতে ব্লেকের ইশ্বর কল্পন- একদল দার্শনিক যারাপ্রকৃতির মাঝে ইশ্বরের ছায়া খুঁজে পাচ্ছে তার বিপরীতে ব্লেকের অবস্থান- ইশ্বর মানুষ কল্পনা করে, নিজের কল্পনার সৃজন হচ্ছে ইশ্বর-
ম্যারেজ ওফ হ্যাভেন এন্ড হেল লেখার সময় ব্লেকের বয়েস 33। পরিনত বয়েসের লেখা-যদিও এটা একটা স্যাটায়ার- ব্যাঙ্গ করে লেখা- তার পরও যদি সৃষ্টিকে স্রষ্টাবিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়- কিংবা যদি শিল্পকে শুধু শিল্প দিয়ে যাচাই করতে হয় তাহলে এই একটা লেখার সাথে ব্লেকের মৌলিক বিশ্বাসের তফাতটা চোখে পড়বে। এবং এর শুরু একটা সাধারন আপাত পরস্পর বিরোধি কিংবা একেবারে পারস্পর্যহীন বেশ কিছু অনুভব দিয়ে শুরু হলেও- এরপরে একেবারে নিরেট গদ্য। বোধ হয় কবিতায় প্রকাশ সম্ভব ছিলো না- আমি জানি না- শুধু অনুমান করার চেষ্টা করছি-
শুরু হয় রিনট্রাহ বলে একজনের আর্টচিৎকারে- এবং ধাপে ধাপে প্রচলিত বিশ্বাসের বিপরীতে চলে যায় লেখাটা-
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



