উত্তর মেরূ থেকে দক্ষিণ মেরূ পর্যন্ত যত ভু ও জলভাগ সব খানেই একই গল্প, একই ইতিহাসের পূনারাবৃত্তি হয়। প্রতিবারই গন মানুষের কথা বলে অধিগ্রহন কিংবা পারিতোষিক, ক্ষতিপুরণএর শিল্পায়নের নামে জমি দখলের ঘটনা ঘটে।
পৃথিবীর সাম্প্রতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্দ অংশ এই দখল এবং দখলের বিপক্ষে লড়াই। ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার চর্চা এবং নিরন্নের প্রতিরোধের গল্পগুলোও একই রকম। প্রশাসনের বিরুদ্ধে সাধারন মানুষের প্রতিরোধে সব সময়ই একটা ভুল প্রত্যাশা থাকে বোধ হয় এবার পুলিশ কিংবা রক্ষী বাহিনী থাকবে জনতার পাশে-
প্রতিবার আশায় বুক বাধে মানুষ এবং প্রতিবারই আশাহত হয়। এই নিরন্তর চক্র চলতেই থাকে। এই একই দৃশ্যের পৌনপুনিক আবর্তনের পরও কেনো যেনো মানুষের ভেতরের আশাবাদ মরে যায় না।
" তবু প্রতিবার আশায় বুক বাধি, জানি কুকুরের কাজ করে যাবে বেয়ারা কুকুর, আশ্চর্য হই তবু অনায়াসে "
ক্ষমটার চর্চা এভাবেই করে প্রশাসন। এর পরও পণ্যবাধী সভ্যটার চাকা থেমে যায় না। টিভিতে হাস্যোজ্জ্বল রমনীরা নটিপনা করে, ভিজে ডিজে উপস্থাপিকার রঙ্গরস দেখে খানিকটা যৌনউত্তেজনা জাগে, কোথাও একটা কালো ব্যাজ ঝুলিয়ে দিলে অন্তত মনে হতো এই যে 20 জন মানুষের হত্যা হলো তার প্রতি সহমর্মিতা ছিলো-
"যখন ভাতের থালায় কামড় বসায় কুকুর তখন মরিয়া মানুষ পালটা কামড় দেয়-
তবে কুকুরকে কামড়ানো অশোভন বলে প্রেসনোট চলে আসে সন্ধ্যায়"
আমারা শান্তি রক্ষার্থে গুলি চালাতে বাধ্য হই- এই একই ধরনের কথা আমরা কতবার শুনলাম, কতবার শুনেছি এই কথাগুলো- আমরা এইসব রাষ্ট্রিয় হত্যার প্রতিক্রিয়ার শব্দগুলো জানি।
কোলকাতার কিংবা পশ্চিম বাংলার সাথে আমার যোগাযোগ সাহিত্যিক পর্যায়ে- শুধু এই একটা বিষয়ের ভোক্তা বলেই হয়তো নন্দীগ্রামের কোনো খবর আমার কাছে আসে নি। হয়তো আসতোও না কোনো দিন যদি শ্যাজার সাথে দেখা না হতো আচম্বিতে-
তাই গত রাতে বেশ সময় নিয়ে দেখলাম কি ঘটনা, কি বৃত্তান্ত, সেখানের ঘটনার সাথে বাংলাদেশের ঘটনার কোনো সাদৃশ্য আছে কি না? এমন ঘটনা দেশে আসলে অবাক হই নি, সিঙ্গুর নিয়ে বিশাল তর্ক চলছিলো- সেখানে টাটা জমি দখল করে কাঁটা তারের বেড়া লাগিয়েছে, মানুষ আত্মহত্যা করছে। হয়তো বিনা প্রতিরোধেই মরে যেতো তবে সেটা আত্মসম্মানহীন মৃতু্য বলে শেষ কামড় লাগাতে বিবেকে তারা গলায় বিষ ঢেলে পড়ে থাকে খোলা মাঠে কিংবা ঘরের বিছানায়-
নন্দীগ্রামের ঘটনাও এমনই সহজ ও স্বাভাবিক- বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকায় সম্ভবত রাসায়নিক কারখানা বসানোর পরিকল্পনা আছে- কোনো না কোনো অবকাঠানো ভিত্তিক সুবিধাও নিশ্চিত ভাবে আছে- হতে পারে সেটা এলাকার অবস্থান- কাঁচামালের সরবরাহ পথ- উৎপাদিত পণ্য কারখানা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ। এবং এসব দিক বিবেচনা করেই হয়তো রাজ্য ভেবেছে তারা নন্দীগ্রামেই বসাবে কারখানা-
শিল্পায়ন অবশ্যই প্রয়োজনীয়- খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- আমরা যেমন জানি, একটা কারখানা হলে সেখানে অনেক শ্রমিক কাজ পাবে, অনেক রকম স্থানীয় উন্নয়ন হবে- সেখানে ভাতের হোটেল হবে- শাড়ী চুড়ির দোকান হবে- কত্ত কত্ত উন্নয়নের আলো জ্বলবে পথে ঘাটে- এর পরও মানুষের চেতনায় সাড়া জাগে না-
এই গাছের ছায়া- এই ঘরের দাওয়া- এই পথ আর রথের মেলার স্মৃতিগন্ধ বুক ভরে টানে- চৌদ্দ পুরুষের ভিটা বাবু, এই জমি আমি ছাড়িবাক লয়- বলে যে কৃষক কিংবা যে মুদির দোকানী রুখে দাড়ায় তার কাছে এই থান শুধু একখন্ড এলেবেলে ভুমি নয়, তার কাছে এটাই পুর্বপুরুষ, এটাই রাম এটাই কৃষ্ণ, এটাই নারায়ন- স্থানের সাথে মানুষের স্মৃতিময় সম্পর্ককে অস্বীকার করা যায়- স্মৃতিতো মানুষের মস্তিষ্কে জমে থাকে। স্থানিক পরিব্যাপ্তিতে কোনো এক স্মৃতির সুতোয় টান পড়লে মানুষ বলে- ঐযে ঐখানে আমি মাকে দেখেছিলাম- শেষ বার শাঁখা হাতে দাড়িয়ে ছিলেন- এখানে বাবার আঙ্গুল ধরে আমি হাঁটতে হাঁটতে গেলাম পার্বণে- এইসব ছেদো স্মৃতির কোনো মুল্য কি আছে প্রশাসনের কাছে- নেহায়েত ভাববাদী বিলাসের সাথে আসলে পণ্যবাদী সভ্যতার সংঘর্ষ এভাবেই বাড়তে থাকে-
যখন জীবন যাপন শুধু চাহিদা- যোগান- বিভিন্ন উপাত্ত আর গ্রাফের মিলিত অরণ্য, সে অরন্যে মানুষের বসবাস নেই- সেখানে সুবিধা আর সচ্ছলতার স্বপ্ন বোনা হয়, রুয়ে যায় ভবিষ্যত-
এইসব দৃশ্যের সাথে চলে আসা পরিবেশ বিপর্যয় কিংবা স্মৃতি ও মানসিক বিপর্যয়কে পাত্তা দেওয়া সাজে না বামপন্থিদের- বামপন্থি বস্তুবাদের কোথাও এসব সুত্র নেই- আর এখনও যেকোনো উন্নয়নশীল এলাকায় মানুষের নিজস্ব দাবী নিজস্ব অস্তিত্বের লড়াই অবশেষে রাজনৈতিক দলগুলোর রশিটানাটানির ভেতরে নগন্য একটা ইসু্য হয়ে ঝুলে থাকে-
রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চার ভেতরে মানুষ দাবার ঘুঁটি হয়ে যাওয়ার পর সেখানে পুলিশ গুলি ছুড়ে 20 জনকে হতয়া করলো কিংবা 60 জন আহত হলো এটার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় এই অঘটনে আমার পার্টি কিভাবে লাভবান হলো এই হিসাবটা।
রাজনীতি মানবিক নেই, অমানবিক প্রশাসন, কার কাছে ধামা ধরবে মানুষ- কেউ তার কথা শুনবার নেই- ক্ষতিপুরণ দিলেই আর সব কিছুর ক্ষতিপুরণ হয়- স্মৃতির ভেতরে ঘুনপোকা কুট কুট কামড় দেয় আর মানুষের ক্ষয় হতে থাকে-অসভ্যতা বা নির্বুদ্ধিতা কিংবা প্রতিরোধ কিংবা দুস্কৃতিকারী- এইসব ইত্যকার বিশেষণ আসলে আমাদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া- আমাদের নিজস্ব অবস্থা নির্দিষ্ট করা-
আমাজানের কয়েক হাজার জাতিস্বত্ত=বা নদীর সাথে ভেসে গেলো- এটার বিরুদ্ধেও বেশ কথাচালাচালি হলো- ঘটনার অবসান হলো ব্রাজিলের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য, গন মানুষের জন্য মুষ্টিমেয় কিছু মানুষকে বলি দিতে হবে-
দ্বন্দ্বটা মুলতঃ পণ্যবাদীটার থাবা মানুষের গ্রাসে- সেখান থেকে বিশ্লেষণ করতে হবে সব কিছু-
যখন মোটামুটি বিশ্বের সর্বত্রই একটা :ইউনিকোড" সভ্যতা শুরু হচ্ছে, যেখানে শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক মডেল নিয়ে বিভিন্ন নিরীক্ষা চলছে সেখানে কিছু আউটমোড স্বাভাবিক ভাবেই বাতিল গন্য হবে- এই নিয়ে কিছু মানুষ অহেতুক শোরগোল করছে- গুলি খেয়ে মারা যাচ্ছে- যাবেই- এরা নির্বোধ এরা বুঝে না, রথার চাকার সাথে পাল্লা দিতে নেই- সীমিত সম্ভবনা চাকার নীচে পড়ে পটল তোলার-
তাই আমি বিন্দুমাত্র লজ্জিত না, যে যেকাহেন যেভাবে খুশী নিরন্নের হোগা মারুক, আমি আজ থেকে একদম চুপ, আমি সব রীতিনীতি বুঝে গেছি- কোথাও প্রতিকারের আশা করা বৃথা- তাই আমি এইসব প্রতিরোধে কোনো রকম পক্ষপাত না করে ক্ষমতাসীনের পক্ষে যাবো- সেটা আমার জন্য নিরাপদ, ভবিষ্যত মানবতার জন্য নিরাপদ-
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




