আমি মাঝে মাঝে সিরিয়াস ছবি দেখি, সিরিয়াস প্রবন্ধ আর সিরিয়াস সাহিত্য পড়ে ফেলি। তাই কৌশোরের শেষ বেলায় জীবনের লক্ষ্য খুঁজে যখন বন্ধুরা হয়রান, আমি নির্দিধায় নিজের লক্ষ্য স্থির করে ফেলি,আমার জীবনের লক্ষ্য হবে মানুষকে বিরক্ত করা। হালকা মানুষ হয়ে কাটিয়ে দিবো জীবনটা, সব সমস্যার সহজ একটা সমাধান থাকে, সমস্যা গায়ে না মাখা হলো সেই সহজ সমাধান. এবং মানুষকে বিরক্ত করে হয়রান করে ফেলতে হবে এমন ধারনায় আমি কলেজের রাস্তায় খোদাই ষাঁড়ের মতো ধীরে ধীরে হাটতাম, পিছনে রিকশা বা গাড়ী থাকলে হঠাৎ উদাসিন হয়ে বিড়ি ফুকতাম রাস্তায় দাড়িয়ে, রিকশা এসে থামতো পাশে ক্রিং ক্রিং ঘন্টা বাজাতো আমি রাজন্যের মতো তাকিয়ে রিকশা আরোহীর বিরক্ত মুখ দেখে পুলকিত হতাম, পুলকিত হতাম গাড়ীচাপা মানুষের বিরক্ত মুখ দেখে, তার পর পথ ছেড়ে দিতাম, পথের উপর আমার একান্ত অধিকার, পথ আমার প্রেমিকা গোছের ভাড়ী কথা ওরা বুঝবে না তাই একটু করূনার চোখে দেখতাম সে সব বিরক্ত মুখ।
সব খানেই আজিব জিনিষ থাকে, কলেজ ক্যান্টিন বলতে সেই ছাঁপড়া চায়ের দোকান, ছোটো সিঙারা, বালুসাই(জিনিষটার নাম কেনো বালুসাই এটার ব্যাখ্যা কেউ কি দিতে পারবে, আটার দলা গোল করে ভেজে সেটাকে চিনির রসে ডুবালে কেনো জিনিষটা বালুসাই নামান্তরে বালুশাহী হয়ে যায়) সেখানে উঠতি আঁতেল গোছের এক পাবলিককে দেখি, তসলিমা আবার একটা সাহিত্যিক, তেলাপোকাও পাখি, লজ্জা লিখেছে এক রাতে। আমি চমকিত হই, পুলকিত হয়, আদমের ছানা ( বনি আদমের অধমীয় বাংলা) বলে কি, বললাম তা তুমি কি সেই রাতে তসলিমার ফুটফরমাশ খেটেছো, চা-টা দিয়েছো। উচ্চারন প্রমাদ নয়, সে বয়েসে সব কথার গাঁয়ে হালকা আদিরস মাখিয়ে গড়িয়ে দেওয়ার অভ্যাস ছিলো বিলক্ষন, সেও চা-টা কে চাটা ভেবে ক্ষেপে উঠে চলে গেলো। হুমম তখন আমাদের গলিতে আসলো লাভলী-শ্যামলী 2 বোন। বিভিন্ন দুর্সম্পর্কের বন্ধুরা প্রতিদিন বিকালে আমার সাথে দেখা করার জন্য ছুটে আসে, আমিও আমার এই হঠাৎ জনপ্রিয়তায় মুগ্ধ হই। সুলুকসন্ধান করবো না ভেবেছিলাম, কিন্তু দেখলাম এক বন্ধু সুবেশী মনোহর সাজে দাড়িয়ে আছে সদ্য তোলা ফ্ল্যাট বাড়ীর সামনে, দিনাজপুরে সেই লোকই প্রথম ঢাকার আদলে বানিজ্যিক ব্যাবহারের উদ্দেশ্যে বাসা তৈরি করে 5টা 4 তলা 8 ইউনিট বাড়ী, এবং এর একটাতে এসেছে সে দুই বোন, গলিতে দাঁড়ালে ওদের বারান্দা দেখা যায়। আমাদের উঠতি যুবক বড় ভাই মামা চাচারা মাঞ্জা মেরে গলি দিয়ে হাটে আর আড়ে আড়ে চায়। লাভলী এমন সব বিকেলে বারান্দায় দাড়িয়ে তারা দেখে, বা দেখতো তখন নিয়মিত। লাভলীর কল্যানে আমার অনেক বন্ধুই সৎ প্রেমিক কিংবা সহপ্রেমিক হয়ে যায়। এক মেয়েকে অনেকগুলো ছেলে পছন্দ করলে এবং প্রেম নিবেদন করলে সেই সব ছেলেদের পারস্পরিক সম্পর্ক কি হবে তাদের এক কথায় কি নামে ডাকা যাবে আমার জানা নেই। (মুখা, হিমু সুমন, কৌশিক, শমিত এবং আরও যারা যারা আছে সবাই একটা বাক্যসংকোচন করেন দেখি,আমরা বাংলা ভাষায় নতুন একটা অর্থবোধক শব্দ প্রসব করি)
কলেজেও প্রেম জমে উঠে। মৌসুমি,আভা বিভা শবনম জুঁই কনককত কত নামের বাহার। মাসুম বলে এক জন প্রেমে পড়ে পিচ্চির( মেয়েটার সুন্দর একটা নাম ছিলো তবে এখন মনে করতে পারছি না) এবং সেই মেয়ের প্রেমে পড়ে পলাশ। ডুয়েল লড়ার একটা নিয়ম ছিলো মধ্যযুগে। এ যুগে ডুয়েল প্রথা তেমন চালু নেই, তাই পলাশ মাসুমকে ধরে হলকা উত্তম মধ্যম দিয়ে ছেড়ে দেয়। পরাজিত প্রেম ভয়ংকর। মাসুম কয়েক দিন পর পলাশকে বাগে পেয়ে পলাশের পাছায় ক্ষুর মারে, আমরা শিহরিত হই, আহা রে পাছায় ক্ষুর মারা বড় নির্দয় কাজ, টাট্টিখানায় গিয়ে প্রথমেই মাসুমের নাম স্মরণ করে 2টা গালি দিবে পলাশ প্রতিদিন সকালে। নাহ আসলে 500 পুরুষের বাজারে 50টা মেয়ে চলে আসলে এক জন মেয়ের পাণিপ্রার্থ ী পুরুষের সংখ্যা বাড়বেই। কলেজে প্রেমজনিত শিবির উপশিবির তৈরি হয়,
জুঁই, বড়জোর 5 ফুট হবে মেয়েটা, মাথার চুল কোঁকড়া, তেমন নজরকাড়া সুন্দরিও নয়, দেখতে দেখতে আমাদের ঘনিষ্ঠ 3 বন্ধু সেই মেয়ের প্রেমে পড়ে। তনুজ, আরিফ, নাসিম। এবং এদের ভিতরে ভদ্্রলোকীয় সমঝোতা হয়,জুঁই যাকে প্রথম ভালোবাসি বলবে তাকে অধিকার ছেড়ে দিয়ে বাকি 2 জন পিছু সরে যাবে। পাছায় ক্ষুর মারামারি করার মতো অভদ্্রতা করবে না।
প্রেম জিন্দাবাদ বৃন্দাবন জিন্দাবাদ বলা যায় অনায়াসে, তাহলে আমার ভুমিকা কি ছিলো এই ব্যাঞ্জনে,
আমি নিরীহ দর্শক মাত্র। নারীরহস্য বুঝতে নারি নর। আমার ভিতরে অসভ্য একটা প্রশ্ন ঘুরঘুর করে, একি সাথে বসবাস করা যদি সহবাস হয় তবে সহবাসের সংজ্ঞায় আমাদের কতটুকু দুরত্বে বসবাস করতে হবে। আমরা কত দুরে বাস করলে সহবাস করতে পারবো।
এসব প্রশ্ন কাউকেই করা হলো না, বরং নতুন নতুন সব বিস্ফোরক তথ্য আসলো কানে, রেবেকা ফেন্সি খায়, শাপালার সাথে সাদীর কেমন জানি সম্পর্ক , গুজবের ডালপালা বাড়ে, অনেকেই সমাজ গোল্লায় যাচ্ছে ভেবে গলায় রক্ত তুলে, নৈতিকতার অবক্ষয় বলে চিহি্নত করতে প্রয়াসি সচেতন বন্ধুসমাজে কিছু মানুষ গোপনে হাত মারে কিন্তু সব গেলো সব গেলো সমাজ গোল্লায় গেলো প্রচারনায় এরাই উচ্চাকণ্ঠ বেশী।
আমরা দল বেধে চটি পড়ি, কোনো এক দিন তপুর বাসায় গড়াগড়ি দেই হেসে, রসময়ের রসবোধ ছিলো, আদিরসবোধ ছিলোই এটা প্রমানিত কিন্তু রসময়ের কৌতুকবোধও খুঁজে পাওয়া যায় মনস্ক পঠনে। আমরা বার কয়েক উজ্জল মার্কারে দাগানো পংক্তিগুলো পড়ে হেসে গড়াগড়ি দেই।
একদিন দুরপাল্লার ট্রেনে চেপে ভিক্ষা করে চটি কেনার অভিজ্ঞতা আছে, আমরা বোনারপাড়া জংশনে নামি দলবেধে, রাজু, তপু, মাহমুদ, আরিফ, জুয়েল, বোধ হয় আমরা ছিলাম 8 জন, বোনার পাড়ার স্টেশনে নেমে হঠাৎ রাজুর মাথা থেকে বের হয় জটিল আইডিয়া, দি আইডিয়া বলা যায়, স্টিমারের ছাদে চটি পড়া হবে, চমৎকার প্রস্তাব, চটির দাম 20 টাকা, আমি চটি কিনে পড়বো না এমন কি সমাজতান্ত্রিক ধারায় যৌথপ্রয়াসে চটি কেনা হলেও সেখানে আমার অবদান থাকবে শুন্য, এর চেয়ে চল আমরা ভিক্ষা করি, ভিক্ষার টাকায় চটি কেনা হবে, মাধুকরির টাকায় চটি কেনার মহান উদ্যোগ আমরাই প্রথম নিয়েছি উপমহাদেশে।
আমরা বিভিন্ন জনের কাছে হাত পাতি, কিন্তু বাঙালি বড় নির্মম, কেউ পয়সা ছাড়তে চায় না, মাত্র এক টাকা, আমরা 8 জন সুবেশী তরুন, মাত্র একটাকা চাইলেই সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকায় জনগন। নিয়ম পালটে আমরা ভিখারির কাছে ভিক্ষা চাই, এক চাচা মিয়াকে বলি চাচা আমাকে ভিক্ষা দেন। চাচামিয়া কি বুঝে তার ভাঙা থালা থেকে 2টাকা দেয় আমাকে, এর পর আরও 5 টাকা জোগার হয়। আমরা 8 জন মিলে 20 মিনিট ভিক্ষা করে মাত্র 7 টাকা পেয়েছিলাম, পরে অন্য কম্পার্টমেন্টে থাকা কয়েক বন্ধু বাকি টাকা ভিক্ষা দেয় আমাদের উজ্জল পরিকল্পনায় সাড়া দিয়ে। আমি ভিক্ষার টাকায় জীবনে প্রথম চটি কিনতে যাই। কেনা শেষ হলে স্টিমারে ছাদে যাই দলবেধে, বেশ আয়োজন করে বসি, সমস্যা বাধায় এক মোল্লা, আমরা 8 জন তরুন যারা প্রতিটা কথার আগে এবং পরে অলংকরন হিসেবে একটা দুইটা গালি গেঁথে দেই তাদের তুমুল গালিবৃষ্টির মাঝেও নির্বিকার বসে থাকে মোল্লা বেটা। অবশেষে সঙ্কোচ ঝেড়ে ফেলে রাজু উদাত্ত স্বরে চটি আবৃতি করে , উথাল পাথাল হাওয়া বয় স্টিমার ছাদে, আমাদের সিগারেটের ছাই উড়ে, কিন্তু মোল্লা বেটা নির্বিকার শুনতে থাকে আমাদের আবৃতি। 3টা গল্প শেষ হলে আমরা হাল ছেড়ে দেই। নিশ্চই আল্লাহ সবরকারীদের সাথেই থাকেন।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




