মানুষের শ্রেনীচেতনা খুব স্পষ্ট আপনার হাতের মিনারেল ওয়াটারের বোতলের মতোই পরিপাশর্্বকে ব্যাঙ্গ করে হাসনাইন ভাই,
কথাটার অনায়াস ভঙ্গি এবং সম্ভাষনের ছন্দপতনে বিভ্রান্তবোধ করি আমি, হঠাৎ জয়নালের ঢাকার পরিচিত ডায়ালেক্ট থেকে একেবারে শ্রেনীকক্ষের ভাষায় চলে আসার কার্যকরন খোঁজার বৃথা চেষ্টা করি, অবশ্য আশাবাদি হয়ে উঠি পরের শব্দ চয়নে,
ওই পিচ্চি, হারামের পয়দা, তোরে চা দিতে কইছি বচ্ছর গেলো ওহনও আইলো না, কাহিনী কি? ঐখানে দাড়ায়া মজমা দেখো, হালার পো যেইহান দে আইছস ঐহান দে হান্দায়া দিমু।
হাসনাইন ভাই লন চা লন, ওহন কন অধমরে জ্বালাইতাছেন ক্যান? এলাকার ভাঁও সুবিধার না, রমিজে বিলা হইছে, ওর এক পোলারে ডলা দিছিলাম ক্লাবে লয়া, পোলায় হালয়া মাকখন, টোকা দিছি তো খালাস হয়া গেছে, এখন পোলার মায়ে ধরছে রমিজরে, আমি মিচুয়াল করবার চাইতেছি পোলার মায়েরে আনুম একটু বাদে, যদি কোনো কাম থাকে কন নাতো ভাই এইবার যানগিয়া, আমি আমার ধান্দা দেখি। হাজার রকম ঝামেলায় আছি ভাই, দিমাগ চাইটেন না,
প্রিন্সের টেবিলে বসে আবার কথাটা মাথায় ঘুরঘুর করে, মানুষের শ্রেনীচেতনা,অনায়াস শব্দচয়ন এবং তার ব্যাবহার দেখে আমি নিশ্চিত জয়নালের অতীতে কখনও না কখনও বামদলের সংশ্লিষ্ঠতা ছিলো, কিন্তু কবে, কখন, এই বিষয়ে মুখ খুলবে না বোধ হয়, শ্রেনীচেতনা, শ্রেনীব্যাবধান, শ্রেনীঘৃনা, আমরা নিজেরা নিজেদের শ্রেনীতেই বা পরস্পরকে কতটুকু শ্রদ্ধা দেই। আমরা সবাই উচ্ছিষ্ট নিয়ে কাড়াকাড়ি করছি, একদল কুকুরের মতোই ফেলে দেওয়া আবর্জনা ঘেটে পরস্পর বিবাদ করছি, কোথায় কিভাবে দু পয়সা আমদানি হবে এই চিন্তায় পরস্পরের বুকে ছুড়ি মারছি, ক্রাইম রিপোর্টের তাড়নায় চেতনা অসার হয়ে যাচ্ছে বোধ হয়, এখন মৃতু্য স্পশর্্ব করে না, অকাল মৃতু্য, দ্্বেষ, ঘৃনা, কোনোটাই স্পশর্্ব করে না, আমি গল্প খুঁজি, কার্যকারন খুঁজি, অকারন রক্তপাত ঘটে না এই জগতে, কোথাও না কোথাও স্বার্থেটান না পড়লে এরা মানুষ শিকার করে না, পেশাদার ভাড়াটে খুনী বাদ দিলে এদের স্বাভাব অনেকটা পশুর মতোই, সবারই নিজস্ব সীমানা আছে, এক জনের সীমা সাধারনত অন্যজন অতিক্রম করে না, কিন্তু ওদের নিজেদের ভিতরে কি কোনো শ্রেনীচেতনা আছে? ওরা নিজেদের কোন শ্রেনীভুক্ত ভাবে, শ্রমিকের সাথে ওদের যোগাযোগ নেই, একেবারে খেটে খাওয়া মানুষের সাথে ওদের স্বার্থের কোনো যোগাযোগ নেই, কিন্তুওদের হারিয়ে যাওয়ার ঠিকানা এই শ্রমজীবি মানুষের ভীড়।
একেবারে আদি সমাজের আপাত সাম্যবাদ বাদ দিলে কখনই মানুষ সাম্য চায় নি, সম্পদের সাথে সাথে মানুষের ব্যাবধান বেড়েছে, শ্রমভিত্তিক সমাজবিভাজনের প্রয়োজন ছিলো, এখনও শ্রমভিত্তিক বিভাজন কি প্রকাশ্য নয়? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ আলাদা একটা ঘোরটোপে বসবাস করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়াটারগুলোর সামগ্রিক সংস্কৃতি বাংলাদেশের বাকি সমাজের সংস্কৃতির সাথে যায় না, তবে রাজনৈতিক নিয়োগের বাস্তবতায় সামগ্রিক সংস্কৃতির মান নীচে নামছে, এখন ওখানের কোয়াটারগুলোর মধ্যেও অনেক রকম অন্তজ সংস্কৃতির গ্রহন,
সরকারী কর্মচারীদের জন্য আলাদা বসতি, সব পেশাজীবিই বাকি সমাজ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে , এবং এই সব কর্মজীবিদের নিজেদের ভিতরের লবিং গ্রুপিং, কোথায় নষ্ট রাজনীতির ছোঁয়া নেই এটা ঠাওর করা মুশকিল। পানির বোতলটা হাতে নিয়ে আবার জয়নালের কথাগুলো মনে পড়লো-
বাংলাদেশের বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর বেশীর ভাগ কর্মিই সচ্ছল মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চিবিত্তের শৌখিন সমাজসেবার খেয়ালে মগ্ন ছেলেমেয়েদের দিয়ে ভর্তি, ওদের সাথে কেনো ওদের বাবাদের সাথেও কখনও শ্রমিক শ্রেনীর যোগাযোগ নেই, ওরা একেবারেই জনবিচ্ছিন্ন তারুন্য, সাপ্তাহিক মিছিল আর পাঠসভায় মাক্স কপচানোর বাইরে মাঠ পর্যায়ে গেলেই এদের উচ্ছাস মিইয়ে যায়, এরা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে না, এরা সমরেশের উপন্যাস পরে নিজের ভেতরের বিবেককে সান্তনা দিতে বাম সংগঠনে যোগ দেয়, এদের কেউ কি স্বেচ্ছায় শ্রেনীবিচু্যত হয়ে সামগ্রিক বিপ্লবি হবে?
শিক্ষাজীবনের শেষে একেবারে অনিশ্চিত স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে বিপ্লবের স্বপ্ন বেচবে? আপনার কি তাই মনে হয় হাসনাইন ভাই? আমার মনে হয় ওরা শিক্ষাজীবন শেষে হয় বিদেশে পাড়ি জমাবে নাতো শোষনের হাতিয়ার হয়ে যাবে, ওদের দিয়ে সমাজ বদল সম্ভব না, আর শ্রমিক সমাজের উত্তরন সম্ভব নয়, যেখানে নিজের পেট আর পিঠ আলাদা রাখতে জীবন ক্ষয় হয়ে যায় সেখানে মেরুদন্ড সটান রেখে প্রাতিবাদি হয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, মধ্যবিত্ত স্বাপি্নকেরা বিপ্লবের প্রাণ আর এই খানে মধ্যবিত্তস্বাপি্নকদের ভিতরে প্রাতিষ্ঠার ঘুণ ধরেছে, সুতরাং ওদের দিয়ে সম্ভব নয় মোটেও।
আমার পরিচিত এক ছেলে একেবারে গ্রাম থেকে উঠে আসা, বাবা কৃষক, ভেতরে দাসত্বের বসবাস, তোয়াজের জোড়ে এখন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের, যার পদলেহন ভিন্ন কোনো যোগ্যতা নেই সে কি শিখাবে তার ছাত্রদের? বিশ্বব্যিালয়ের শিক্ষকতা এখন কোনো সম্মানজনক পেশা নয়, ওটা এখন রাজনৈতিক পদ, এই ফাঁদে পড়ে আমরা সবাই? সবার ভিতরেই গোপনে এক সামন্তপ্রভুর বসবাস, তার থাবায় নিয়মিত তোয়াজের প্রসাদ না জুটলে বিষন্নতাগ্রাস করে, ক্ষমতাবলয়ের সবাই কোনো না কোনো পন্থায় একে অন্যের থাবায় তোয়াজের উপঢৌকন দিয়ে যাচ্ছে, আপনি আমার সাথে কথা বলছেন এটাও আপনার জীবিকার দায়, আমার দৈনন্দিন আপনার আহার্য আমরা সবাই সবার খাদ্য, আমরা সবাই খাদ্য-খাদকের শেকলে বাধা পড়ে আছি।
------------------------------------
অনেক ভাবে চেষ্টা করছি, জড়তা কাটছে না, তবে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো নিদান জানা নেই, হয়তো একদিন ভাষার উপর দখল আসবে তখন এই অসংলগ্নতা কাটিয়ে উঠবো, এটা অনেক দূর্বল একটা গদ্য হয়ে গেলো, গদ্যের দূর্বলতা কারছে ,
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



