দিনলিপির পাতাগুলো সাঁকোর মতো অতীত দিনের সাথে নিত্য যোগাযোগ রাখে, যেকোনো নিস্তরঙ্গ দিনে যখন অকারন মন খারাপের গ্রহনকাল, আমি দিনলিপি খুলে অতিতে ভ্রমন করি। আজ সকাল থেকেই মনটা বিষন্ন, তরিকূল, আমার পরিচিত এক সাংবাদিক, তাকে একদল সন্ত্রাসী কুঁপিয়ে ফেলে রেখছিলো ধানক্ষেতে, ঝিনাইদহের কথা, ওখানে সর্বহারার উৎপাত ছিলো কিন্তু এটা ওদের কাজ নয়, এই কাজটা একটা মৌলবাদী দলের। আরও খারাপ লাগছে তরিকূলের মেয়েটার ছবি দেখে, বড় শখ করে নাম রেখেছিলো ভাষা, 3 বছরের ভাষার অভিধান থেকে বাবা শব্দটাকে মুছে ফেললো ধর্মের নামে কিছু পাষন্ড মানুষ। সাংবাদিক নির্যাতনে বাংলাদেশের অবস্থান সবার উপরে না হলেও মোটামুটি শীর্ষ দশের একটা, এখানে মন্ত্রি এবং মন্ত্রিপূত্র, সাংসদ এবং সাংসদপূত্রের রাজত্ব, এবং এরা সবাই ছোটোখাটো সামন্ততন্ত্র তৈরি করেছে নিজস্ব লোকালয়ে, এদের বিরূদ্ধে কোনো কথা বলা মানেই নিজের জীবনের ঝুঁকি নেওয়া, এবং এদের প্রত্যক্ষ এববং পরোকথষ সহযোগিতায় বিভিনণ সন্ত্রাসীগোষ্ঠি তাদের সন্ত্রাস চালাচ্ছে অবলীলায়, কোনো আইন তাদের অন্যায় গতিরোধ করতে পারছে না। বাংলাদেশের মানুষ এখন আর রাস্ট্র নিয়ে আশাবাদি নয়, দেশপ্রেম, শ্রদ্ধাবোধ, এসব মানুষের অভিধান থেকে মুছে যাচ্ছে, এবং এই সব পরিচিত শব্দ মুছে গিয়ে সেখানে জন্ম নিচ্ছে ভয়, সন্ত্রাস, গুমখুন সব ঋনাত্নক শব্দগুলো অভিধানের পৃষ্টা জুড়ে রাজত্ব করছে, এবং সাধারন মানুষ এটাকেই নিয়তি নির্ধারিত ভেবে বসে আছে। এর পরিবর্তনে কি করা দরকার আমি জানি না। গতকাল সম্পাদকের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম, তিনি বেশ গম্ভির মুখে বললেন আন্দালিফ সাহেব একটু সাবধানে লিখবেন, সব সত্য বলতে হয় না, কিছু সত্য প্রাণসংহারি, আপনি সন্ত্রাসিদের ডেরায় গিয়ে তথ্য নিচ্ছেন, অনেক বড় বড় মানুষের যোগাযোগ পাবেন সেখানে, সবাই নিজ প্রয়োজনে এসব যোগাযোগ রেখেছে, এসব সত্য কথা বলবেন এবং তা সম্পাদনা না করে আমি ছেপে দিবো এমনটা ভাববেন না, আমাদেরও ব্যাবসা করে খেতে হয়, এখানে শুধু আপনি এক সাংবাদিক না, অন্য আরও সংবাদ কর্মি আছে যাদের রূজি এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত, তাদের পেটে লাথি মারবেন না আশা করি। যদি সরকার এই দৈনিক নিষিদ্ধ ঘোষনা করে এর সাথে জড়িত এতৗলো মানুষের সংসার ভেঙে যাবে। আমি কিছুই বলতে পারি নি, সম্পাদকের কথা অগ্রাহ্য করার মতো নয়, এটা তার ব্যাবসা, মানুষ বীভৎসতা বেঁচে পয়সা কামাই করছে, সংবাদ পত্র জুড়ে শুধু অপসংবাদ, মাঝে মাঝে আশার প্রদীপ হয়ে একটা দুইটা ভালো খবর আসে এছাড়া দৈনিকের পাতা উলটালেই শুধু হত্যা, ধর্ষন আর অপরাধের সংবাদ, দূর্নিতির খবর, জলোচ্ছাসে মৃতু্যর খবর, খরায় এবং অভাবের তাড়নায় আত্মহত্যা করা মানুষের সংবাদ , মানুষ মানুষকে পুড়িয়ে মারছে, মানুষ মানুষকে কেটে 2 টুকরা করে ফেলছে, সংবাদপত্রকর্মিদের কারোই কখনও সস্তির ঘুম হয় না বোধ হয়, সবাই একটা উদ্দেগ মাথায় নিয়ে ঘুমাতে যায় এবং মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠে চোখে মুখে পানি দিয়ে আবার ঘুমাতে যায়।
দৈনন্দিনের কোথাও একটু সস্থি নেই, আমার নিজের মাঝে মাঝে ভয় হয় কোনো একদিন পাগল হয়ে যাবো, এত নির্মমতার গ্রাস আমার সহ্য হবে না, আমি ড্রয়ার খুলে একটা ট্যাবলেট মুখে দেই, পানির প্রয়োজন বোধ করি না, তিতকুটে স্বাদটা আটকে থাকে গলার কাছে, বাইরে বিখ্যাত ঝলসানো বিকেল। উর্মির ভাতঘুমকাল চলছে, ঢাকার রাস্তার ঘেয়ো কুকুরেরা নিশ্চিন্তে পার্কের ছায়ার জিড়িয়ে নিচ্ছে দুদন্ড, খদ্দেরের প্যান্টের চেইন খুলে হাত মারছে কোনো যৌনকর্মি এমন বাস্তব দৃশ্যও আছে, উদাসিন চেহারায় বসে আসে সদ্য কিশোর, যৌনকর্মি ওড়নায় হাত মুছে 5 টাকা নিয়ে মুড়িওয়ালার কাছে মুড়ি কিনছে, ছেলেটা প্যান্টের চেইন লাগিয়ে ব্যাগ কাঁধে চলে গেলো, সাস্থসচেতন দুই একটা মানুষ জগিং করছে, একটু পরেই হুমায়ুন আজাদকে দেখা যাবে কেডস আর ট্রাউজার পড়ে দৌড়াচ্ছেন, আরও একটু সামনে আগালে রেজিস্টার বিলডিংয়ের সামনের মাঠে দলগত জগিংএ দেখা যাবে নীল দলের একদল কে, তাদের সামনেই আবার জগিং করছে সাদা দলের লোকজন, এই মধ্যবয়েসের ভুড়ির দাপটে তাদের স্ফিত উদর দুলছে জগিংয়ের তালে তালে, এবং আমি নিশ্চিত এই জগিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে তারা একে অন্যের মুন্ডুপাত করছেন, রাজনৈতিক সব কটা চাল তাদের জানা, এর পর জগিং শেষে একদল যাবে ভিসির বাড়ীতে অন্য এক দল যাবে তাদের নেতার বাসায়, সেখানে বৈকালিক চায়ের সাথে পরচর্চা হবে, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাবে গিয়ে সন্ধ্যায় একে অন্যের মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষন শেষে তারা ঘরে ফিরবেন, অনুগত রাজনৈতিক নেতাদের পরবর্তি রাজনৈতইক চালের নির্দেশ দিয়ে বৌয়ের সাথে সংগম করবেন কেউ কেউ, অবশ্য অলস দুপুরে গৃহবিবাদ এবং রেষারেষি লেগেই থাকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়াটারগুলোতে। মানুষ একেবারেই অসভ্য জন্তুর মতো, ওখান থেকে সামনে যাও, নীল ক্ষেত, বইয়ের দওকানের পিছনে মাদকের জমজমাট ব্যাবসা, নিউমার্কেট, গাউসিয়ার বদ্ধ সিঁড়িতে যৌবনের খাঁজে উত্তেজনা খোঁজা মানুষেরা হাতাহাতি করছে, সেখান থেকে বামে যাও ইডেনের সামনে প্রেমের আসর বসেছে রাস্তার দুপাশ জুড়ে, ওখানে আবার সরকারি কর্মচারিরা থাকে, ওখান থেকে সামনে গেলে পলাশীর বাজার, সেখান থেকে লালবাগ, চকবাজার, চাঁনখাঁর পূল, কোথায় মাদকের আনাগোনা নেই, সব খানেই ফেন্সিডিল আর গাঁজা পাওয়া যায়, এই চত্বরে দিনে মাদকের আসর আর রাতে বন্য যৌন্যতার শীৎকার শুনা যায়, শহীদ মিনারের বেদিতে প্রকাশ্য যৌন বিহার চলছে, চারপাশ ঘিরে দেখছে এক দল রিকশাওয়ালা এমন একটা দৃশ্য এবং 21শে ফেব্রুয়ারির ফুল শুকিয়ে যাওয়া চত্বরে একটা কুকুর এক পা তুলে মুতছে শহীদ মিনারের বেদীতে , দৃশ্যটা সিম্বলিক শটের মতো, সত্যজিতের কোনো এক ছবি থেকে উঠে আসা এমনটাই মনে হয় আমার।
হাই কোর্টের সামনে ফুলের বাজার বসেছে, একটু সামনে গেলেই মৃৎশিল্পের পসরা সাজিয়ে বসে আছে অনেক ব্যাপারি, আর সেখান থেকে সামনে গেলেই সচিবালয়, দেশকে বিক্রির টেন্ডার নিয়ে ওখানেও অনেক ব্যাবসায়ি বসে, ওদের চর্বিসর্বস্ব স্ত্র ীরা মাঝে মাঝে অন্যের হাত ধরে ভাগে, উপসচিবের বউ ভাগে সচিবের হাত ধরে, সচিবের বউ যায় অন্য সচিবের হাত ধরে, এমন বীভৎস কেনো এই সব চালচিত্র, আমি বাংলাদেশের মানচিত্রে একটা সুন্দর দিন দেখতে চাই, একটা দিন যেখানে কোনো অন্যায় নেই, মানুষের যৌনকামনার দাসত্ব এবং অর্থলোলুপতা বিহিন একটা সুন্দর দিন, এবং আশ্চর্য হলো এই সব সচিবের বেশীর ভাগই আবার তুমুল দঃর্মবিশ্বাসী, কপালে নামাজের তিলক আঁকানো এই সব সচিবেরা সরকারি পয়সায় গাড়িতে চড়েন, তাদের বিবি বাচ্চাদের নিজেদের প্রয়োজনে অফিসের গাড়ী যায়, তার ছেলে মেয়ে অফিসের গাড়ীতে যায় টিউশনি করতে, এবং তাদের বউয়েরা বিপনিবিতানে যায়,স রকারি তেল, জনগনের ঘাম পুড়ে যায় বিলাসব্যাসনে,
এমন অন্ধকার দিন দেখে হতাশার কিছু নেই, একটু পড়েই নামবে গাঢ় সন্ধ্যা, আকাশের মেঘে রংয়ের তুলি দিয়ে আশ্চর্য আল্পনা আঁকবে , বিকেলের রক্ত জমে থাকবে পরাজিত সন্ধ্যাতারায় নীচে, একে একে হলদে সোডিয়াম আলোয় জেগে উঠবে রাতের শহর, আমি আর একটু পরেই ফিরবো, উর্মির বাবার বাসায় যেতে হবে,
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



