বেড়া যখন ক্ষেত খায় তখন পাহাড়ার প্রয়োজন কি বলেন? প্রশ্নটা শুনে বুঝতে পারলাম না কিছুই, জয়নালের কথাগুলো মাঝে মাঝেই স্বগতোক্তি মনে হয় আমার। জয়নালের হাতে খবরের কাগজ, তার পেছন দিয়ে ধোঁয়া উঠছে, বললো, নাহ আজকের পেপার পড়ছেন? লিখছে সেন্ট্রাল জেলে নাকি মাদক ব্যাবসা চলে, ওখানে নাকি সব এক নম্বর মাল পাওয়া যায়, তা অপরাধিদের সংশোধনের জন্য জেলখানা কিংবা অপরাধীদের সমাজ থেকে আলাদা করে রাখার জন্য জেলখানা?
আমরা কেনো জেলখানা বানিয়েছি? প্রশ্নটা সরল, কিন্তু উত্তরটা কি হবে তা আমার নিজেরও জানা নেই সঠিক, জেলখানার পরিবেশ মানুষকে অপরাধপ্রবন করে তুলতে পারে, যদি মানুষকে কারাগারে রাখার উদ্দেশ্য হয় সে কারাগারে থাকার সময় নিজস্ব কৃত কর্মের জন্য অনুশোচনা করে নিজেকে সংশোধন করে সমাজের নাগরিক হিসেবে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিবে তবে বাংলাদেশের কারাগারে এমন শোধন সম্ভব হবে না। ধারনক্ষমতার চেয়ে বেশী অপরাধী সেখানে, জীবনের নু্যনতম প্রয়োজংুলো মিটলেই কি সব হয়? মানুষতো একেবারে পশুপর্যায়ভুক্ত না, তার বিনোদন, সংস্কৃতির চর্চা এবং মননশীলতার চর্চা তাকে পশুসমাজে আলাদা একটা অবস্থান দিয়েছে, কিন্তু ভেতরের পশুত্ব প্রকাশিত হলে আমরা তাদের আলাদা করে খোয়ারে ভরে রাখি, এ জন্যই কারাগার ব্যাবস্থা?
জয়নালকে বললাম, তোমার অভিজ্ঞতা আছে নাকি চৌদ্দ শিকে থাকার?
আমি যেই ব্যাবসা করি তাতে মাঝে মাঝে যেতে ই হয় লাল দালানে কিন্তু এখনও ব্যাকিং আছে ভালো তাই বেশী দিন থাকতে হয় নাই, মাঝে মাঝে বাজার গরম বুঝলে নিজেই চলে যাই, আমাদের মতো মানুষের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা কারাগার। তবে প্রথম বার যাওয়ার পর বেশ কষ্ট হইছিলো, যাউকগা ঐসব কথা কইয়া লাভ নাই, আপনি কি এই খানেই থাকবেন? আমি একটু মোহাম্মদপুর যামু, কাম আছে,
ঠিক আছে যাও ।
জয়নাল যাওয়ার পর আসলেই আমার তেমন কোনো কাজ থাকে না, জয়নালের সাথে আমার পরিচয়ের সূত্র এক বন্ধুর বন্ধু,সেবার উত্তরা ক্লাবে খুন হলো একজন, তার পেছনে ক্ষমতাসীন এক মন্ত্রিপূত্রের হাত আছে, এমন জনরব, সেই মন্ত্রিপূত্র উত্তরার একটা মাঠ দখল করে রাতারাতি বাজার বসিয়েেিছা,চাঁদা সংক্রান্ত বিরোধে সে এই খুন করেছে, আমি উত্তরায় গিয়েছিলাম সরোজমিন তদন্ত করতে, রাজলক্ষি কমপ্লেক্সের সবাই বোবা, কেউ কোনো কথা বলে না, কথা বলে না উত্তরা ক্লাবের অন্য সব সদস্য, সেখানে ক্লাব টেন্টে থাকা ছেলেরাও কেউ কিছু জানে না, কি এমন ভয়ের রাজত্ব এখানে, কেউ সত্য উচ্চারন করতে সাহস পায় না, মন্ত্রিপূত্রের এমন দাপট? আমার এক বন্ধুর াফিস ছিলো বনানী, সেখানে গেলাম দুপুরে, অনেক দিন পর দেখা, ভালোই একটা অফিস সাজিয়ে বসে আছে, সফটওয়্যার ফার্ম সাথে আরও কি সব এক্সে সরিজের ব্যাবসা। ভালোই চলে মনে হয়।
আমাকে দেখেই বললো আবে হালায় ব', কোনো কামে আইছিলি এই দিকে নাকি হবাহবাই আইছস,
আসছিলাম উত্তরা ক্লাবে যে এক পোলা খুন হইলো ঐ বিষয়ে।
আবে হালায় হিসাবতো বরাবর দীপু চৌধুরি মারাইছে ওরে, মালপাত্তি নিয়া গেঞ্জাম, এইটা কওনের কথা? ওরে সবাই মাইপা চলে, এখন ওর হেভী পাওয়ার, বাপে মন্ত্রি হইছে, আইন আদালত হালায় পকেটে নিয়া চলে।
তোরে এক পোলার নাম্বার দিটাছি দীপুর লগে পড়তো স্কুলে, ওর লগে কথা কইয়া দেখ কিছু বাহির হয় কিনা।
হালায় আমারেও নোটিশ দিছে, 30 হাজার চান্দা দেওন লাগবো এই খানে ব্যাবসা করতে হইলে। হালায় টেকা কি বলদের পুটকি দিয়া পড়ে? যাউকগা তুই একটু খোজ খবর নিয়া রিপোর্ট লেখ, কিছু হইবো না জানি তারপরও একটু সান্তনা আর কি।
আমি বিকালে সেই ছেলের সাথে যোগাযোগ করি তার অফিসে। চমৎকার সাজানো েগোছানো অফিস। ডিশের লাইনের ব্যাবসা। কয়েকজন পার্টনার নিয়ে চালায়। তার কাছেই শুনলাম সামনের একটা হোটেলে সুব্রত বাইন, শুভ্র, সগির, সবাই আড্ডা দেয়, মোহাম্মদপূর থেকে এই দিকে কেউ আসে না এখন, ঐ দিকের ক্যাডারদের সাথে এদের গেঞ্জাম চলতেছে এখন, ওর কাছেই শুনলাম জয়নালের কথা, বললো এই ছেলেটার কাছে আরও খবর পাবেন, ভালো ছেলে নতুন আসছে এই লাইনে কিন্তু শার্প পোলা। সব দিক হিসাব করে চলে। কারো সাথেই বড় কোনো ঝামেলায় নাই। অবশ্য এরা নিজেরা নিজেরাই এলকা ভাগ করে নিছে, কেউ কারো এলাকায় যেয়ে কোনো গেঞ্জাম করে না। সেই হোটেলে গেলাম সন্ধ্যায়, কোনার টেবিলে বেশ ক'জন বসে আছে, তাদের তোয়াজ করছে সব বয় বেয়ারা। আমার হাসি লাগছইলো এটা ভেবে যে এখানে যে কয়জন আছে তাদের নাকি পুলিশ খুঁজে পায় না। তারা আত্মগোপন করে আছে পুলিশের ভয়ে।
আমার ধারনা পুলিশ সব জানে, কে কোথায় আড্ডা দেয়, কার কোথায় গোপন ঠেক আছে, কিন্তু পুলিশ ভদ্্রলোক, এদের ঘাটায় না, এরাও পুলিশদের ঘাটায় না, শান্তিপূর্ন সহাবস্থান যাকে বলে।
জিগাতলায় একজন সন্ত্রাসি নিহত হওয়ার পর এই বিষয়ক উন্মাদনা কমে যায়, মানুষের মনোযোগ এই আকাশ সংস্কৃতির যুগে খুব দ্্রুত পালটায়। একটা ক্লিকেই যেখানে নতুন একটা চ্যানেলে চলে যাওয়া যায় সেখানে দৈনিকের ধারাবাহিক অপরাধ প্রতিবএদন শুধুমাত্র সাংবাদিকদের পেটের রসদ, এমন কি এত খেটে করা রিপোর্টগুলো দেখেও পুলিশ কোনো ব্যাবস্থা নিবে না, কেউই স্পষ্ট করে রিপোর্ট লিখে না, সবারই প্রাণের মায়া আছে, জনৈক প্রভাবশালী সাংসদের পূত্র জড়িত এমন কথা পেপারে পাওয়া যাবে কিন্তু একেবারে তথ্যনির্ভর স্পষ্ট কথা লেখার মতো দৈনিক নেই, সবাই রাজনৈতিকদের আনুকল্য চায়, কেউই তাদের ঘাটাতে চায় না, এই সাংসদপূত্রেরা সব দেশের অঘোষিত রাজপূত্র, রাজাধিরাজ সব,
জয়নালের চেহারায় কোনো ভয়ংকর ভাব নেই, একেবারে সাদামাটা চেহারা। পাশের বাসার ছেলের মতোই সাধারন, তার কথা যেমন শুনি ঠান্ডা মাথার খুনী, ভাড়াটে খুনী ভাবটাই নেই ওর মধ্যে, অবশ্য কেউ যদি ভাবে আমি প্রতিদিন সকালে এসব ভারাটে খুনীর সাথে প্রাতঃরাশ সারি তাহলে ভুল হবে, আমার ধারনা ছিলো যারা ভাড়াটে খুনী তাদের চেহারায় একটা নৃশংস ভাব থাকবে, একটু ডাকাবুকো ভাব যাকে বলে, কিন্তু জয়নালের চেহারা দেখে আমার সেই প্রত্যাশার বেলুন চুপসে যায়।
অফিস থেকে দায়িত্ব দেয় নি, আমি নিজেই ভাবি একটা প্রতিবেদন লিখবো এই সব তথাকথিত আন্ডার ওয়ার্লডের লোকদের নিয়ে, তাদের জীবন যাপনের কথা লিখবো, তারা কোন উপায়ে এখনও পুলিশের নজর এড়িয়ে চলছে, তাদের ক্ষমতার নেপথ্য উৎস করা, কারা তাদের ব্যাবহার করে, তাদের সেবা নিয়মিত ক্রয় করে কারা।
জয়নালের সাথে দেখা হওয়ার পর ওর কাছে এসব জানতে চেয়েছিলাম, বললো, সব খবর জাইনা কি করবেন, এই খবরতও সকলেই জানে, কে কোন থানায় কত নাজরানা দেয় এই হিসাব পাবেন আপনি থানার ওসিদের কাছে, পুলিশের আই জি কোথা থেকে টাকা পায়, এইসবতো গোপন বিষয় না, সবাই জানে, সবাই বুঝে, কেউ কথা বলে না, বাংলাদেশের রাজনীতির প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে মানানসই এই ছবি, তাই এর ব্যাতিক্রম হলেই সেটা খবর হয়।
আপনি অবশ্য একটা কাজ করতে পারেন, সৎ পুলিশ অফিসারের একটা তালিকা তৈরি করেন, প্রতি সৎ পুলিশ অফিসারের জন্য 10 হাজার টাকা পুরুষ্কার। আপনার পুরুস্কারে অংক কত হবে এটা বলেন?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



