
বাংলাদেশে কমবেশি ৪৫টি আদিবাসী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বাস। এর মধ্যে পার্বত্য অঞ্চলে রয়েছে চাকমা, মারমা ত্রিপুরাসহ ১১টি আদিবাসী পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। রাষ্ট্রীয়ভাবে পার্বত্য অঞ্চলটি (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান) ‘উপজাতি’ বা আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তিতেও (খন্ড ক, ধারা-১) এর উল্লেখ রয়েছে। পার্বত্য শান্তিচুক্তি অনুযায়ী পাহাড়ি শিশুদের মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে (পার্বত্য চুক্তি, খন্ড: খ, ধারা: ৩৩-খ-২)।
পার্বত্য শান্তিচুক্তির যুগ পূর্তি হয়েছে অনেক আগেই। ১৯৯৭ সালে যে শিশুর জন্ম হয়েছিল, এখন তার বয়স ১৮ বছর। নীতিনির্ধারকদের অবহেলায় ১৮ বছরেও কেন পার্বত্য অঞ্চলের শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত করা গেল না, এ প্রশ্নের কী জবাব দেবে ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে থাকা শাসক দল ? নিজের মাতৃভাষা রক্ষার জন্য যে বাঙালি লড়াই করেছে, তারাই কেন আবার নিজের দেশের অন্য ভাষাভাষীর মর্যাদা দিতে অনাগ্রহী ? অনাদর আর অবহেলায় বাংলাদেশে অনেক ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের মাতৃভাষা হারিয়ে যেতে বসেছে।
শিশুশিক্ষার প্রধান বাহন হচ্ছে মাতৃভাষা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরুতেই মাতৃভাষা ব্যবহারের অন্যতম, শিশুকে নিজের ভাষায় বলতে ও বুঝতে সক্ষম করে তোলে। মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পেলে একজন শিশুকে নতুন ভাষা শেখার চাপ সইতে হয় না। সে সহজেই সবকিছু রপ্ত করতে পারে। মাতৃভাষায় যেটা সম্ভব, নতুন কোনো ভাষায় তা সম্ভব নয়। ‘নানান দেশের নানান ভাষা/বিনে স্বদেশী ভাষা, পুরে কি আশা’? মধ্যযুগের কবি রামনিধি গুপ্তের এই কথার আবেদন ও উপযোগিতা এখনো কি প্রাসঙ্গিক নয়(?)।

এই সুশীল সমাজ, একবারও কি আপনি ভাবতে পারেন, আপনার শিশুটিকে ভিনদেশি অচেনা কোনো ভাষায় (ধরা যাক জাপানি, চীনা, জার্মান বা রুশ ভাষায়) ফুল পাখির নাম কিংবা ছড়া পড়তে হচ্ছে ? নিশ্চয় নয়। নিজের সন্তানের জন্য যা সত্য, অন্যের জন্য তা কেন আপনারা মানতে চাইবেন না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কথা তো বহুল উচ্চারিত ‘আগে চাই মাতৃভাষার গাঁথুনি, তারপর...’।
জাতিসংঘের মতে, নিজস্ব ভাষা ব্যবহার ও সংরক্ষনের পাশাপাশি আদিবাসীদের ভাষার অধিকারে আরো যা আছে সেগুলো হলো:
১) মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের অধিকার,
২) আদিবাসী ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভের অধিকার,
৩) বৈষম্য মুক্ত ভাবে বাস লাভের অধিকার,
৪) আদিবাসী ভাষায় মিডিয়ায় প্রবেশ লাভের অধিকার।
আদিবাসী ভাষাকে রক্ষা ও সংরক্ষনের জন্য জাতিসংঘ যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে মনে করেন সেগুলো হল:
১) মাতৃভাষায় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের শিক্ষালাভের নিশ্চয়তা প্রদান করা,
২) আদিবাসী ভাষাকে সংরক্ষন ও উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত ফান্ড বরাদ্দ রাখা,
৩) আইন ও রাজনৈতিক মূলধারাসমূহ আদিবাসী ভাষায় অনুবাদ করা যাতে করে আদিবাসীরা রাজনৈতিক ও আইনগত দিকগুলোতে ভালোভাবে অংশগ্রহন করতে পারে,
৪)আদিবাসী ছাত্র ও বয়স্কদের জন্য ভাষাসংলিষ্ট প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করা,
৫) প্রসাশনিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে আদিবাসী ভাষার ব্যবহার বাড়িয়ে আদিবাসী ভাষার সন্মান বৃদ্ধি করা,
৬) আদিবাসী ভাষা ব্যবহার করা যাতে করে সেগুলো বংশপরম্পরায় টিকে থাকে।
শান্তিচুক্তির স্বাক্ষর আছে, সংবিধানে আইন আছে কিন্তু আইনের প্রণয়ন নেই। আশা নয় বিশ্বাস করি আগামীর মাতৃভাষা দিবস উদযাপিত হবে অসাম্প্রদায়িক ও সার্ব মাতৃভাষা দিবস।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৩:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


