রিয়েলেস্টিক হোনঃ যেসব ছাত্র বন্ধুরা কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন
এ আকাশ যেন অন্য রকম।
যে আকাশে মেঘ না থাকলেও ঝড় আসে।
যে আকাশে ঘন কালো মেঘের ফাঁকেও সূর্য হাসে। নতুন বাতাস।
যে বাতাসে মন জুড়িয়ে যায়। আর এ আকাশ-বাতাস’ হলো কলেজ মাঠের, ভার্সিটি ক্যাম্পাসের। যার সবুজকে ঘিরে প্রতিদিন জমে ওঠে আড্ডা। রচিত হয় নতুন নতুন স্বপ্ন। আর স্বপ্নে কলেজ /বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নিজেকে মানিয়ে নিতে চাইলে, সবকিছু বুঝে চলতে হবে। এমনও হতে পারে আপনি যে কলেজ বা ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছেন, সেটা আপনার মনের মতো হয়নি। বাধ্য হয়েই ভর্তি হয়েছেন। বন্ধুরা মেডিকেল কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হয়েছে। আপনারও ইচ্ছে ছিল। কিন্তু পারলেন না। আর এই কারণে মনটা একটু খারাপ হতেই পারে। তাছাড়া কলেজে বা ভার্সিটিতে গিয়ে দেখলেন চেনা মুখ একটিও নেই আশে-পাশে পরিবেশটা খুব অচেনা। চিন্তার কিছু নেই, বাংলাদেশের কতোটুকু বা চেনা সম্ভব?তবে ইচ্ছা থাকলে একটা অচেনা জায়গা চিনে ফেলতে খুব একটা সময় লাগে না। আর সেই সাথে জুটে যায় অনেক বন্ধু-বান্ধব। আর এজন্য আপনাকে বুদ্ধিদীপ্ত হতে হবে। বন্ধু পাতানোর ক্ষেত্রে ‘স্লো অ্যান্ড স্টেডি উইন্স দ্য রেস’ পদ্ধতি অবলম্বন করলে চলবে না। সবার সঙ্গে সমানতালে চলতে শিখুন। অপরকে বুঝতে এবং নিজেকে বোঝাতে শিখুন-দেখবেন আপনিও মানিয়ে নিতে পারবেন।
প্রথম দিকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বড়-ভাই বোনরা আপনাকে ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে দেবার জন্য একটু আধটু মজা করেন। আর সেই মজার জালে আপনাকে পড়তে হবে। তবে আপনাকে অবশ্যই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সে জাল থেকে বের হতে হবে। যদি পারেন পরিচিত কোনো বড় ভাইয়ের কাছ থেকে র্যাগিং সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন। র্যাগিং মানে কিন্তু রসবোধের পরীক্ষা।কাজেই ভ্যাবা চ্যাকা নাখেয়ে একটু সাহস করে দেখিয়েই দিন না আপনিও বেশ রসিক। দেখবেন, যখন ওরা বুঝতে পারবে আপনিও মজাটাকে উপভোগ করছেন আপনাকে ওরা ছেড়ে দেবে। আর মনে রাখবেন, র্যাগিং কিন্তু বড় ভাই বোনদের সাথে ভাল সম্পর্ক গড়ার একটা মোক্ষম সময়, মোক্ষম উপায়। যে ভাই আপনাকে চরম অপমান করল, দেখবেন সেই ভাইয়া বিপদের সময় আপনাকে সবচেয়ে বেশি উপকারে এগিয়ে এসেছে। সুতরাং সবকিছু সহজভাবে নিতে চেষ্টা করুন।
কবি নজরুল বলেছেন , ‘রইবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগতটাকে’'। জগতটা না দেখা হলেও অন্তত ক্যাম্পাসটা ঘুরে ফিরে প্রথমেই দেখে নেবেন। শুধু ক্লাসরুম আর বাড়ি ঠিকই আছে। কিন্তু এভাবে সারা বছর চললে একজন খাঁটি আঁতেল ছাড়া কিছুই হবেন না। আসলে কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালটা যেমন পড়াশোনার জায়গা, তেমনই স্টুডেন্ট লাইফ বলেও তো একটা কথা আছে। পড়া মানে তো এই নয়, শুধুই ক্লাসে আসবেন, পড়াশোনা করবেন। ছাত্র জীবন উপভোগ করতে চাইলে আপনাকে লাইব্রেরীতে যেতে হবে, আড্ডা মারতে হবে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে হবে, আর কতো কি না করা যায়! আপনার পছন্দের মানুষদের সাথে বন্ধুত্বটা পাকিয়ে নিতে পারেন, আপনার সময়টাও ভাল কাটবে।
মফস্বল থেকে যারা আসেন তাদের জন্য কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনগুলো একটু ঝামেলাই হয়ে যায়। আপনার মনে হবে কেউ আপনার সাথে কথা বলছে না। কিন্তু আপনাকে ক্যাম্পাসের প্রচলিত ভাষাটাই রপ্ত করতে হবে। এই মাস কালচারের যুগে আপনার সামনে এর বিকল্প নেই। তবে জোর করে নিজেকে পরিবর্তন করার চেয়ে আপনার নিজের যা আছে, তাকে কি করে কাজে লাগানো যায় সেটা ভাবাই সঠিক হবে। মনে রাখবেন সব শিক্ষাংগনে বিভিন্ন চরিত্রের ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে। অতএব আপনাকে নিজের স্বরূপটা সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। তেমনি অন্যের ভাল গুণগুলো আপনাকে আয়ত্ত্ব করতে হবে।
ক্যাম্পাসে এসে কোন প্রায় সব ছাত্রদেরই বন্ধুত্বের জন্য মনটা আনচান করে। তাই সুযোগ বুঝে বন্ধুত্বটা করে ফেলুন। সেই বন্ধুত্ব হবে নির্মল বন্ধুত্ব। বন্ধুর সাথে জমে উঠতে থাকবে আড্ডা। সেই আড্ডা হবে শিক্ষার, জ্ঞানের আর নির্মল বিনোদনের।
বন্ধুত্ব, আড্ডা মানেই কিন্তু ছাত্র জীবনের মুল উদ্দেশ্য নয়। কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার উদ্দেশ্য শুধু মাস্তি করা নয়।সবার আগে পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে হবে। তাই শিক্ষকদের সঙ্গে সম্পর্কটা ভাল করতে হবে। শিক্ষকদের সঙ্গে সম্পর্কটা কোন পর্যায়ে রাখতে হবে এটা জেনে নেয়া খুব দরকার। সিনিয়র ছাত্র ভাই-বোনরা এ ব্যাপারে সহায়ক হতে পারেন। তবে শিক্ষকদের তোষামুদি করতে যাবেন না।মনে রাখবেন যে, যারা আপনাদের পড়ান, তারা ছাত্র জীবন কাটিয়েই শিক্ষক হয়ে এসেছেন। আর শিক্ষকদের সঙ্গে কতোটা ঘনিষ্ঠ হবেন, সেটা বোঝাও জরুরি। তাঁরা যেহেতু আপনার শ্রদ্ধার মানুষ, এটা কখনোই ভেবে নেবেন না যে, তাদের সঙ্গে পুরোপুরি বন্ধুর সম্পর্ক রাখা যায়। একটা দেয়াল থাকা ভাল, তবে এখন অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকরা ছাত্রদের সঙ্গে খোলাখুলি মেশেন।
‘ভর্তিচ্ছু ভাই বোনদের লাল গোলাপ শুভেচ্ছা’- কলেজে প্রথম দিন পা রাখলে এমন সব শ্লোগান আর অভিনন্দনে অভিষিক্ত হবেন। বড় ব্যানারে একটা লাল গোলাপের ছবি আর মুখে গোলাপ বর্ষণ চলতেই থাকে শুরুর দিনগুলোতে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের ব্যানারে। তবে কিছুদিন পরে বোঝা যায় গোলাপ কিভাবে ইট-পাটকেলে পরিণত হয়। সব ছাত্র সংগঠন যে এমন করে তা নয়, তবে বর্তমান চেহারা এমনই। বিভিন্ন দল বিভিন্নভাবেই চাইবে আপনাকে দলে টানতে।যেমন হোস্টেল/হলে উঠতে চাইলে আপনাকে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের কিংবা কলেজে আধিপত্য বিস্তারকারী ছাত্রসংগঠনের ছত্রছায়ায় থাকতে হবে। আপনাকে বাধ্য করা হবে মিছিল মিটিং-এ। সব কিছু কৌশলে মেনে চলতে হবে টিকে থাকতে হলে। আর আপনি রাজনীতিতে কতোটা জড়াবেন তা আপনার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাই আপনারা যদি মনে করেন, বিভিন্ন মিটিং-মিছিলের মাধ্যমে দেশোদ্ধার সম্ভব। তাহলে আপনারা তা করতে পারেন। আর না চাইলে এড়িয়ে চলুন। যাই করবেন ভেবেচিন্তে করবেন।
নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের কথা আগেও বলেছি। এখানে একটু যোগ করি। কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বেশি উগ্রভাবে চলাফেরা করবেন না। মনে রাখবেন ‘সিম্পলি দ্য বেস্ট’'। আপনার সহজ সরল সাবলীল উপস্থাপনা আপনাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। মেয়েদের বলছি একগাদা মেকআপ করা বা জমকালো ড্রেস, দু’টোকেই বিদেয় দিতে হবে। ওগুলো আপনাকে সবার থেকে এমন আলাদা করবে যে একটা সময় আপনি বড্ড একা হয়ে যাবেন কিংবা আপনাকে মেয়ে না ভেবে ভাববে ‘ফ্যাশন গার্ল’! ছাত্র-ছাত্রী বন্ধুদের মনে রাখতে হবে ক্যাম্পাস ফ্যাশন স্যুট নয়।
খুব আফসোস করে অনেকেই বলে ‘কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একটা প্রেম করতে পারলাম না’।কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রেম করতেই হবে এমন নয়। ভালোবাসাবাসির চেয়ে বরং বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে পরিমিত আড্ডা মারুন, সেটাই বরং বেশ হয়। প্রেম করা মানে ‘দু’জন অনেকের থেকে একা হয়ে যাওয়া। এরকম একটা শর্টফিল্ম দেখেছিলাম নাম ছিল ‘টুগেদার অ্যালোন’। সে যাই হোক, প্রেম-ট্রেমের চেয়ে বন্ধু হিসেবে থাকুন সেটাই বরং ভাল হবে। ঝুট ঝামেলা কম হবে। ভালোবাসাকে সিনেমার গানের মতো ভাববেন না, তাহলে জীবনের আসল প্রাণ খুঁজে পাবে না। রিয়েলেস্টিক হোন। পড়াশোনা করুন মন দিয়ে শিক্ষা জীবন উপভোগ করুন প্রাণ খুলে।
(আমার এই লেখাটা বছর দুয়েক আগে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়েছিল)
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ রাত ১০:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



