শরীরের উপর মোবাইল ফোনের প্রভাব.....
মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অলস। এই অলসতার কারণ - Inactivity. অর্থাৎ - নিষ্ক্রিয়তা। আমি বলি - অকর্মণ্যতা।
এ নিয়ে গবেষণা হয়েছে অনেক। ২০০৩ সাল থেকে ২০১৭-এই সময়কালের মধ্যে মানুষ কী পরিমান অলস হয়েছে ইউরোপে, তা গবেষণা করতে গিয়ে দেখতে পেল যে - ইউরোপে মানুষ আগের চেয়ে ২০ পার্সেন্ট বেশি অলস হয়ে গেছে।
কিন্তু কেন অলস হয়ে উঠেছে?
শুরুতে উত্তরে বলেছিলাম - এই অলসতার কারণ - নিষ্ক্রিয়তা।
কিন্তু কি কারনে নিষ্ক্রিয়?
সেটি হল - মোবাইল ফোন। মোবাইল ফোন! মোবাইল ফোন!
মানুষ এখন টিভির চেয়ে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকে বেশি অথবা মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে অনেক বেশি। এক গবেষণায় দেখা গেছে - গড়ে মানুষ এখন দৈনিক সাড়ে তিন ঘন্টা থেকে সাড়ে চার ঘন্টা মোবাইল ফোনে কাটায়।
গড়ে একজন মানুষ দিনে ৫৮ বার মোবাইল ফোনটি হাতে নেয় (প্রেম ট্রেম করলে তো কথাই নেই! উঠতে-বসতে ফোনটাকেও চুমু খায়)।
প্রতিদিন তিন ঘন্টার উপর ধরলেও বছরে একটি মানুষ ৫০ দিন মোবাইল ফোনে কাটায়। সে হিসেবে বছরে বারমাসের প্রায় দুই মাস কেটে যায় মোবাইল ফোন দেখে দেখে। জীবনের আর কী বাকী থাকে। আধুনিক মানুষের অদ্ভুত সব ব্যাপার স্যাপার।
স্মার্টফোন মানুষকে কি আসলেই স্মার্ট করে তুলেছে! নাকি মানুষ আগের চেয়ে আরো বেশি আনস্মার্ট করছে। যন্ত্রের সামনে বসে থাকতে-থাকতে মানুষের এই নিষ্ক্রিয়তা শরীরকেও খেয়ে ফেলে। যন্ত্রের আনন্দে বিভোর থাকে বলে শরীরের যন্ত্রণা ভুলে থাকে। কিন্তু যন্ত্র থেকে উঠিয়ে নিলে শরীর যে যন্ত্রনা শুরু করে, সেটা কাটাতে পারে না।
গবেষকগণ বলেছেন, ৩০ থেকে ৪৫ বছর বয়সের লোকেরা বেশি সময় এখন মোবাইল ফোনে কাটায়। কিশোর তরুণরাও এখন অনেক বেশী সময় দেয় ফোনে। অথচ কিশোর-তরুণদের আরো বেশি উদ্দাম এবং শারীরিক অ্যাকটিভিটিতে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল।
মানুষ এখন গড়ে তিন ঘন্টা করে সময় দিলে তার দেড় ঘণ্টায় দেয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। আর ঠিক এই কারনে এখন দেখা গেছে যে- ৪০ এর আগেই অনেকের শরীরে ডায়াবেটিস এবং হার্টের বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা দেখা দিচ্ছে।
সারা পৃথিবীতে এখন প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রতি এগারোজনে একজনের ডায়াবেটিস। প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিস আক্রান্ত পৃথিবীতে।
বাংলাদেশে এখন ৭ মিলিয়ন বা ৭০ লক্ষ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ১২ কোটি মানুষ প্রাপ্তবয়স্ক। এই ১২ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় এক কোটির কাছাকাছি লোকই ডায়াবেটিস আক্রান্ত। পাশের দেশ ভারতেও প্রায় ৮০ মিলিয়ন লোক ডায়াবেটিস আক্রান্ত এখন। সাথে কম বয়সে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মারা যায় এখন হার্টের বিভিন্ন ধরনের সমস্যায়।
ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফোন আসক্ত জাতি ব্রিটিশরা। গবেষণায় দেখা গেছে যে - ব্রিটিশ জনগণ গড়ে ৩ ঘন্টা ১৫ মিনিট প্রতিদিন ফোনের পেছনে ব্যয় করে। শুধু ফোন নিয়ে অযথা বসে থাকার কারণে বছরে প্রায় ৮০ হাজার এর উপরে মৃত্যু হয়। সারা পৃথিবীতে এরকম অলসতার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় এক মিলিয়ন।
পশ্চিমা সরকারগুলো শিশু কিশোরদের দৈনিক দেড় ঘণ্টার বেশি ফোনে সময় না দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশ লোকজন গড়ে ৪ ঘন্টার উপরে ফোনে সময় দেয়। ৫ ঘন্টার উপরে সময় দেয় ২৮% এর মতো। এমনকি ছয় ঘন্টার উপরেও সময় দেয় ১২ পার্সেন্ট এর মতো। তার মধ্যে আবার দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় দেয় সোশ্যাল মিডিয়ায়।
ফোনের পেছনে এই নিষ্ক্রিয়তা কিডনি থেকে শুরু করে ডিপ্রেশন, আর্থ্রাইটিস থেকে শুরু করে হজম সমস্যা, ইমিউনিটি থেকে কার্ডিয়াক সমস্যা, কত কিছুতেই যে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, নিজেরাই জানেনা।
তাহলে কি করবেন?
• ফোনের ব্যবহার কমিয়ে দিন।
• অন্যকিছুতে নিজেকে অ্যাক্টিভ করুন এবং অ্যাক্টিভ রাখুন।
• দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক পরিশ্রমের কাজ বাড়িয়ে দিন।
• সে সুযোগ কম থাকলে ব্যায়াম করুন, হাঁটুন।
• ঘরে মহিলারা কাজের লোকের উপর নির্ভর না করে নিজ হাতে কাজ করুন।
• ফোনে বেশি অলস সময় না দিয়ে প্রিন্ট ফরমেটে ভালো একটি বই পড়ুন, গান শুনুন, প্রকৃতির কাছে যান, বাগান করুন।
• সামাজিক সাক্ষাতে গল্প করুন, ফোনে নয় সাক্ষাতে কথা বলুন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষকে এখন সবচেয়ে বেশি অসামাজিক করে তুলেছে। সামাজিক শব্দটি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে মানুষকে প্রলুব্ধ করে সবচেয়ে বেশি অসামাজিক করেছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এবং মিডিয়া। এই দানবদের হাত থেকে বেরিয়ে আসুন।
অ্যান্ড্রয়েড এবং অ্যাপেল, দুটোতেই একটি অ্যাপস আছে। সেটি হলো - স্ক্রিন টাইম।
আপনি কত সময় স্ক্রিনে সময় কাটাচ্ছেন, তার একটি সাপ্তাহিক হিসাব। আমি নিজে এটি ব্যবহার করি। কতটা সময় আমি অপব্যয় করছি এখানে, তা বুঝতে পারি এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।
সপ্তাহে আমার গড় স্ক্রিন টাইম ১৫ ঘণ্টা! দৈনিক প্রায় দুই ঘন্টা!! ফেসবুকে লেখালেখি করি। আমার লেখাটি লিখি। মুখে মুখে লেখা লিখি বলে বেশি সময় লাগেনা। এমনকি এই লেখাটিও ফোনে কফি খেতে খেতে মুখে মুখেই লিখছি। সামাজিক মাধ্যমে ভালো লেখা নিয়মিত পড়ি। সময় বাচাতে মন্তব্য লেখার চাইতে ইমোজি ব্যবহার করি। সবচেয়ে বড় কথা - স্বাস্থ্য এবং শরীরকে নিরাপদ রাখি। টিভি দেখি না তেমন।
কাজের সময় কাজ, পরিশ্রমের সময় পরিশ্রম, বিনোদনের সময় বিনোদন, ঘুমের সময় ঘুম।
ফোনে সময় দেয়া নিয়ন্ত্রণ করুন। সামাজিক মাধ্যমে নিজের পছন্দের একটি বলয় তৈরি করুন। ভালো কোন লেখা মনোযোগ সহকারে পড়ুন। অনেক আবর্জনা এবং অপ্রয়োজনীয় লেখা পড়ে চোখ এবং মাথা নষ্ট না করুন।
একমুখী কোন কিছুই ভালো নয়।
ভারসাম্যের আরেক নাম জীবন।
শরীর এবং মন দুটোই ভাল থাকবে।
তথ্যসূত্রঃ
The End of Absence - Michael Harris
The Guardian
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ সন্ধ্যা ৬:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


