স্যাকারিন আবিস্কার ......
ফ্যালবার্গ কন্সশটান্টিন (Fahlberg Constantine)নামের এক রুশ তরুণ বিঞ্জানী উলুইন নিয়ে গবেষণা করছিলেন। উলুইন হচ্ছে একটি যৌগিক পদার্থ। বয়সে তরুণ হলেও ফ্যালবার্গের একটা সমস্যা ছিল। তা হলো গবেষণা করতে করতে তিনি সব কিছু ভুলে যেতেন।
তিনি পেয়িং গেষ্ট থাকতেন একজন ভদ্রমহিলার বাড়িতে। একদিন খাবারের সময় খাবারের কথা ভুলে বসে আছেন ফ্যালবার্গ। গৃহকর্তী বিরক্ত হয়ে ফ্যালবার্গের গবেষণাগারে ঢুকে দু-চার কথা শুনিয়ে দিলেন। এক্ষুণি খেতে না এলে তাঁর জিনিস পত্র ভেঙে গুড়িয়ে দেবেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পিছু পিছু খাবার খেতে এলেন ফ্যালবার্গ। তবে খাবার মুখে দিতেই ফ্যালবার্গ অনুভব করলেন, যা-ই মুখে তুলছেন তা-ই মিষ্টি লাগছে। তিনি আবার মিষ্টি একদম পছন্দ করতেন না। গৃহকর্ত্তী রান্নায় চিনি ব্যবহার করছেন ভেবে তিনি প্রতিবাদ জানালেন।
কিন্তু গৃহকর্ত্রী তো রান্নায় চিনি ব্যবহার করেনি।
অতএব প্রতিবাদ সহ্য করবেন কেন? দৃঢ় কন্ঠে বললেন তোমার মুড আজ খারাপ হয়ে আছে। কোন ছাইপাশ খেয়েছো বুঝি? আমি রান্নায় একটুও চিনি ব্যবহার করিনি।
ফ্যালবার্গ তার কথা বিশ্বাস না করে রাগে গরগর করতে করতে বেরিয়ে গেলেন এবং আবার বসলেন গিয়ে তাঁর গবেষণাগারে। মাথা একটু ঠাণ্ডা হতেই, ভাবতে শুরু করলেন গৃহকর্ত্রীর কথা। তিনি যদি মিষ্টি ব্যবহার করে না থাকেন, তবে এতো মিষ্টি এল কোথা থেকে! ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই নিজের আঙ্গুল কামড়াচ্ছিলেন... হঠাৎ চমকে উঠলেন তিনি। এ-কী! হাতের আঙ্গুলে এতো মিষ্টি?
স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে কাজ ছিলো তার। তাই ঠিক কোন রাসায়নিক পদার্থটি হাতে লাগার দরুন এ মিষ্টতার উদ্ভব হয়েছে, তা তিনি ঠিক নিশ্চিত ছিলেন না। ল্যাবে তার ডেস্কের উপর থাকা রাসায়নিক পদার্থগুলো একে একে চেখে দেখা শুরু করলেন। অল্প সময়েই তিনি পেয়ে গেলেন তার কাঙ্খিত সেই মিষ্টি স্বাদের উৎস।
সালফোবেঞ্জয়িক এসিড, ফসফরাস ক্লোরাইড
আর অ্যামোনিয়ার এক মিশ্রণ থেকেই তিনি পেয়েছিলেন সেই কড়া মিষ্টি স্বাদ। সেইদিনই তিনি এই মিশ্রণগুলো জ্বালিয়ে তৈরি করেছিলেন বেঞ্জয়িক সালফাইনাইড। এটি নিয়ে আগেও কাজের অভিজ্ঞতা ছিলো ফাহ্লবার্গের। কিন্তু কোনোদিনই এর স্বাদ
চেখে দেখেননি।
এরপর আর দেরি করলেন না ফাহ্লবার্গ।
তার গবেষণা সুপারভাইজার অধ্যাপক রেমসেনের সাথে একটি সায়েন্টিফিক পেপার লিখলেন। ১৮৭৯ সালে প্রকাশিত সেইবপেপারে তাদের দুজনকেই স্যাকারিনের উদ্ভাবক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিলো। তবে কয়েক বছরের মাঝে স্যাকারিনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বুঝতে পেরে ডিগবাজি দেন ফাহ্লবার্গ। ১৮৮৬ সালে করা স্যাকারিনের পেটেন্টে নিজেকেই এর একমাত্র আবিষ্কারক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। আর এটা নিয়েই ফাহ্লবার্গের সাথে রেমসেনের গন্ডগোল শুরু হয়। ফাহ্লবার্গের কাজটি মূলত রেমসেনের গবেষণাগারেই হওয়ায় রেমসেন চেয়েছিলেন এর সহ-উদ্ভাবক হিসেবে অন্তত তার নামটি থাকুক। অন্যদিকে ফাহ্লবার্গের বক্তব্য ছিলো যে, এর আগেও তিনি সালফোবেঞ্জয়িক এসিড নিয়ে বেশ কিছু কাজ করেছেন। তাই উদ্ভাবনের কৃতিত্ব মূলত তারই।
রাসায়নিক গঠনানুযায়ী স্যাকারিনের নাম-
‘anhydroorthosulphaminebenzoic acid’। কিন্তু এমন নাম জনসাধারণ উচ্চারণ করতে গেলে দাঁত ভেঙে যাবে! তাই ফাহ্লবার্গ বেছে নিয়েছিলেন ‘Saccharin’ শব্দটি যা এসেছে ‘Saccharine (চিনির মতো)’ থেকে। Saccharine এসেছে ল্যাটিন শব্দ
‘Saccharon’ থেকে যার অর্থ ‘চিনি’। Saccharon আবার এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘শর্করা’ থেকে!
স্যাকারিন এর ব্যবহারঃ
ক্যালরি কিংবা কার্বোহাইড্রেটবিহীন বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য ও কোমল পানীয়ের মিষ্টিকারক হিসেবে ব্যবহার করা হয় স্যাকারিন। দুইটি বিশ্বযুদ্ধের সময়ই চিনির সংকটকালে ইউরোপে এর মূল বিকল্প ছিলো স্যাকারিন ডায়াবেটিসে
আক্রান্ত কিংবা যারা ওজন নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছেন, তাদের জন্যও চিকিৎসকেরা কৃত্রিম এ মিষ্টিকারক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
এছাড়া কোমল পানীয়, বিভিন্ন বেকারীতে প্রস্তুত খাদ্যসামগ্রী, জ্যাম, চুইং গাম, ক্যানে সংরক্ষিত ফল, ক্যান্ডি, সালাদ ইত্যাদিতে বর্তমানে ব্যবহার করা হয়।
চিনির চেয়ে প্রায় ৪০০ গুন বেশি মিষ্টি স্যাকারিন তৈরি হয় আলকাতরা থেকে প্রাপ্ত উলুইন নামক পদার্থ থেকে। যা ফাহল্বার্গের হাত না ধোয়ার ফলে আশীর্বাদ রুপে পাওয়া এ রাসায়নিক পদার্থটি!
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ সন্ধ্যা ৬:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


