somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

Diary Of A Valentine

১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২১ বিকাল ৫:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

* Diary Of A Valentin
৭ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩;

আজ দেখা করতে যাওয়ার পথে ওঁর জন্য দশটা লাল গোলাপ কিনলাম শাহাবাগের ফুলের দোকান মাধুকরী থেকে। দাম শুনেতো আমার রেটিনায় সর্ষেফুল। অন্যান্য দিন যে গোলাপগুলো ৪/৫ টাকা করে নেয় আজ সেগুলোই তিরিশ টাকা! এই নিয়ে দশবছর হলো আমাদের সম্পর্কের। মেমসাহেবের আবদার, বছরের সাথে সাথে গোলাপের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। তারমানে পরের বছর এগারোটা। আর আজ থেকে চল্লিশ বছর বাদে পঞ্চাশটা। বাপরে! এটা আবদার না ডিএমপি'র নোটিস মাঝেমধ্যেই গুলিয়ে যায় আমার!

৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩;

আজ এই নিয়ে প্রায় তিনহাজার সাতশো উনত্রিশ বার প্রোপোজ করতে হলো ওঁকে! এই প্রোপোজ ডে-ফে তো একটা অজুহাত মাত্র। প্রথম প্রথম মহিলা ভালমতো প্রত্যুত্তর দিতেন। তারপর থেকে একটা নতুন কায়দা প্রয়োগ করলেন। প্রায় ঘাড় ধরে প্রোপোজ করিয়ে নেওয়ার পর, আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকতেন। আমি যখন বলতাম- "কী? চুপ করে গেলে যে!"
সাথে সাথে উনি মুচকি হেসে বলতেন- "ভেবে দেখবো।" আর আজ তো কিছুই বললেন না। শুধু কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর একটা মৃদু হাসির আওয়াজ শুনতে পেলাম বোধহয়। বুঝলাম ওটাই ওঁর উত্তর।

৯ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩;

চকোলেট নিয়ে হ্যাংলামোর একটা লিমিট থাকে। একবার বাসে যেতে যেতে পাশের সিটে বসে থাকা একটা বাচ্চা ছেলের ক্যাডবেরি ডেয়ারিমিল্কে, টুক করে ভাগ বসিয়ে দিয়েছিলেন ভদ্রমহিলা। তারপর সেকি কাণ্ড! লোকের খিদে পায়, কবিতা পায়, ওঁর নাকি হঠাৎ হঠাৎ চকোলেট পায়। তবে মোটা হয়ে যাওয়ার ভয়ে কখওনই নিজের টাকায় কিনে খান না। আজ যখন একটা ক্যাডবেরি নিয়ে ওঁর সাথে দেখা করতে ঢুকছি, দেখি দূরে ফুটপাতে একটা ছেলে তাঁর প্রেমিকাকে একটা ইয়াব্বড় সাইজের চকোলেট দিচ্ছে। মনে মনে ভাবলাম- "আমি তারমানে একা নই!"

১০ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩;

আজ শরীরটা খারাপ থাকায় দেখা করতে যেতে পারিনি। এমনটা মহিলাকে জানিয়েছি। গোলাপ আর চকোলেট তাও মেনে যাওয়া যায়। তবে এই বয়সে একটা বুড়ো লোক, বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মধ্যে দাঁড়িয়ে গোলাপি আর হলুদ ভাল্লুকছানার মধ্যে কোনটা সবচেয়ে নরম সেটা বাছাবাছি করছে; এটা কি খুব ভাল দেখায়! তাই এই টেডি ব্যাপারটা গত তিনবছর ধরে অনলাইনে কিনে ওঁর ঠিকানায় ক্যুরিয়ার করে দিই। প্রথমবার একটু রাগারাগি করেছিলেন বটে, তবে পরের দু'বছর মেমসাহেব আমার অসুবিধের কথাটা বুঝতে পেরেছিলেন।

১১ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩;

"তুমি দিনে পাঁচটার বেশি সিগারেট খাবে না। প্রমিস?"
"আমি বাদ দিয়ে আর অন্য কোন মেয়ের ছবিতে লাভ রি অ্যাক্ট দেবে না। প্রমিস?"
"আই লাইক ইওর সল্ট অ্যান্ড পেপার লুক। সো ইউ আর নট গোয়িং টু ডাই ইওর হেয়ার। প্রমিস?"

এই ছিলো মহিলার গত তিনবছরের প্রমিস করানোর নমুনা। এই যৎসামান্য 'প্রমিসিং এজেন্ডা' নিয়ে যে মানুষটা দিনের পর দিন আমাকে সহ্য করে চলেছেন তাকে না ভালবেসে থাকা যায়! তাই আজ মেমসাহেকে কোনওরকম সুযোগ না দিয়ে আমিই আগেভাগে বলে উঠলাম- "প্রমিস। তুমি যা বলবে আমি তাই করবো।" দেখি উনি এতটাই হতবাক হয়ে গেছেন যে ঠোঁট থেকে কথাই সরছে না ওঁর।

১২ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩;

আজ একটা সিকিউরিটি গার্ড আমাদের দেখে কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেছিলো। মহিলার বরাবরের অভিযোগ আমার উচ্চতা নিয়ে। আমি যখন ওঁর পাশে হাঁটি নাকি আমাকে ওঁর বড়োখালু, বড়োখালু মনে হয়। আমাকে জড়িয়ে ধরলে নাকি ওঁর মনে হয় উনি পাহাড়ে ওঠা প্র্যাক্টিস করছেন। আজ ভদ্রমহিলাকে জড়িয়ে ধরতে হলো এক বিশেষ কায়দায়। অবশ্য আর কোনও উপায়ও ছিলো না। ঠিক সেই সময় ওই সিকিউরিটি গার্ড কোত্থেকে এসে হাজির! উফফ্! আর সময় পেলো না এদিকে আসার!

১৩ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩;

এই ব্যাপারটা না ভীষণ ব্যক্তিগত। তবে আজ অবধি ভদ্রমহিলাকে যতবার চুমু খেয়েছি ততবারই মনে হয়েছে বুকের ভিতরে কেউ দামামা বাজিয়েছে। আজও তার অন্যথা হয়নি। শুধু আজ সিকিউরিটিটা আমাকে দেখে আরও একবার অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলো। লোকটা বোধহয় আজ অবধি কাউকে এইভাবে চুমু খেতে দেখেনি। কী করবো! মহিলা যে মাটির নীচে কফিনের মধ্যে দিব্যি শুয়ে আছেন। চুমু খেতে হলে আমাকে তো ঠোঁটটা মাটিতে ঠেকাতেই হবে। গতকাল জড়িয়ে ধরার পর উঠে দেখি সারা জামায় ধুলো লেগে গেছে। সিকিউরিটি গার্ড নির্ঘাত আমায় পাগল ঠাউরেছে।

১৪ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩;

লোকের মুখে শুনেছি "যার কেউ নেই তার আল্লাহ আছেন।" তবে আমি মনে করি যার কেউ নেই তার অপেক্ষা আছে। আর এই অপেক্ষাই পারে সারাজীবনের মতো আলাদা হয়ে যাওয়া দুটো মানুষকে এক আকাশের তলায় সামনাসামনি দাঁড় করাতে। গত আট মাস ধরে তুমি আমার পাশে নেই। তবে আমার থেকে বেশ খানিকটা দূরে মাটির নীচে যে তুমিটা চুপ করে শুয়ে আছ, আমি জানি তুমি অপেক্ষা করছিলো এই সাতটা দিনের। এই সাতটা দিন কারও চোখে আদেখলাপনা। কারও চোখে লোক দেখানো। কারও কারও চোখে কলোনিয়াল হ্যাংওভার। আমিও এক এক বছর মনে মনে বিরক্ত হয়ে যেতাম এই সাতটা দিন আসলেই। তবে আজ তুমি যখন নেই বুঝতে পারলাম এই সাতটা দিনের মাহাত্ম্য। এই যে বছরের নির্দিষ্ট দুইটা দিনেই দুই ঈদ পালন করে, এই যে বছরের নির্দিষ্ট পাঁচটা দিনেই ধুমধাম করে দুর্গাপুজো হয়, এই যে বছরের নির্দিষ্ট একটা দিনেই ক্রিসমাসের জন্য আলো ঝলমলে হয়ে ওঠে গোটা শহর- সেগুলো তো বছরের যে কোনও দিনই হতে পারে!
কেন হয় না?
কারণ, তাহলে অপেক্ষা নামক শব্দটাই চিরতরে মুছে যাবে উৎসবের অভিধান থেকে। আমরা যারা ভালবাসাকে একটা ধর্ম হিসেবে মেনে নিয়েছি, তাদের কাছে এই সাতদিন ভালোবাসা নামের একটা ধর্মীয় উৎসব।

ছোটবেলা থেকে আমি কোনওদিন ডায়েরি লিখিনি। গত ৭ই ফেব্রুয়ারি রাতে প্রথম লিখতে বসেছিলাম। তাই গত ছ'দিন যা যা লিখেছি সেগুলো পড়ে হাসি পেলেও সেটা সংবরণ করার চেষ্টা করো। আজ এই পাতাটা এখানে বসে লিখছি কারণ তোমার ইচ্ছে ছিলো আমায় প্রেমপত্র লিখতে দেখার। এই লেখাটা শেষ হওয়ার পর ডায়েরির সাতটা পাতা আমি রেখে যাবো এখানে। সাথে নিয়ে যাবো এমন একটা ডায়েরি যাতে চাইলেও কেউ এই সাতদিনে কোনও দাগ কাটতে পারবে না। আবার এভাবেই পরেরবছর এই দিনে একটা ডায়েরি হাতে নিয়ে বসবো তোমার সামনে। যাওয়ার সময় রেখে যাবো আরও সাতটা পাতা। ততদিন অপেক্ষা করো। কেমন? বাই দ্য ওয়ে সিকিউরিটি গার্ড সাথে আজ ঢোকার মুখে দেখা হলো। কাল ওইভাবে কফিনে ঠোঁট ঠেকিয়ে রাখার কারণটা জানার পর টানা পাঁচমিনিট জড়িয়ে ধরলেন। তুমি ছাড়া এই প্রথম আমায় কেউ এতক্ষণ জড়িয়ে থাকলো। হিংসে হচ্ছে না তো?

* Diary Of A Valentine
১৯৯৩ সনে 'যায়যায়দিন' পত্রিকার প্রথম ভ্যালেন্টাইন্স ডে সংখ্যায় আমার লেখা গল্প। একই গল্প ২০০৮ সনে সামহোয়্যারইন ব্লগে এবং ২০১০ সনে ফেসবুকে শেয়ার করেছিলাম। ফেসবুক বন্ধুদের পাঠক্রিয়া বুঝে এবার গল্পের সাইজ ছোট করেছি।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২১ সকাল ১০:০৫
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাত পাঁচ (নাকি সকাল!) ঘটিকায় ব্লগে আমি ও অনলাইনে আছেন!!!

লিখেছেন অজ্ঞ বালক, ০৭ ই মার্চ, ২০২১ ভোর ৬:০২

কি করা যায়? সাধারণত এরকম সময়ে নির্বাচিত ব্লগই পড়া হয়! কিন্তু আজ নির্বাচিত ব্লগ পড়তে ইচ্ছা করছে না, আসলে তার উপায়ও নেই। নির্বাচিততে শেষ আপডেট হয়েছিলো গ্যাস্ত্রিকোর ব্লগটা, ফেব্রুয়ারির বাছাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

'যদি' কথন

লিখেছেন স্থিতধী, ০৭ ই মার্চ, ২০২১ সকাল ৭:৩৩



শর্ত, অনিশ্চয়তা, আকাঙ্খা , সম্ভাবনা, বিকল্প ভাবনা; এমন অনেক কিছুর প্রকাশবাহী একটা ছোট শব্দ “ যদি”। এই “যদি” এর শর্তে আমরা অনুপ্রাণিত হই আবার থমকেও যাই।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই তোমায়, তোমারি জন্ম শতবর্ষে ।

লিখেছেন সেলিম আনোয়ার, ০৭ ই মার্চ, ২০২১ সকাল ১১:৪৮



ভেবে ভেবে অবাক হতে হয়
কীর্তি তোমার স্বাধীন বাংলাদেশ—সারা বিশ্বের বিষ্ময়!
এমন তরো স্বপ্নের বাস্তবায়ন
কেহ আগে কী পেরেছে অথবা পারবে? পারবে না নিশ্চয়
তোমার কারণেই স্বাধীন বাংলার লাল—সবুজ পতাকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ বেলা অবেলা

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৭ ই মার্চ, ২০২১ দুপুর ১২:৫৯

[১]
অনেকক্ষণ ধরে ডোরবেল একটানা বেজে চলেছে। বাথরুম থেকে তো জুলেখা ঠিকই শুনতে পাচ্ছেন আর কেউ শুনতে পারছে না নাকি!
তুতুল কি করছে কে জানে? এই দুপুর বেলা পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছে হয়তো।
আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামী বয়ানে ৭ মার্চের ভাষণ

লিখেছেন সাইফুল ইসলাম৭১, ০৭ ই মার্চ, ২০২১ দুপুর ২:৫৮


ইসলাম শুধু একটা ধর্ম নয় বরং ঈমানদারদের জন্য একটি সর্বাঙ্গীন জীবন বিধান। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণে ইসলামের কার্যকরী প্রভাব রয়েছে। আজ আমরা সেই অদেখা ভুবন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×