somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

আবদুল সাত্তারের 'গীতা' .......

০৬ ই অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১০:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আবদুল সাত্তারের 'গীতা' .......

শুনে একটু অবাক লাগছে তাই না? এই নামের মানুষের কাছেতো কোরআন থাকার কথা, গীতা কেন? শুনুন এক অসাধারণ কাহিনী.....
সময়টা ১৯৯৭ সন। মূক ও বধির একটি মেয়ে নাম রাধা। তাকে নিয়েই এই কাহিনী। বয়স তার সেসময় আট কি নয়। রাজস্থানের সীমান্তবর্তী এক গ্রামে দরিদ্র পরিবারে জন্ম, পশুপালনই যাদের পেশা। একদিন ছাগল চড়াতে চড়াতে মেয়েটি সীমানা পেরিয়ে ঢুকে পড়লো পাকিস্তানে। দেখে তো কিছু বোঝার উপায় নেই, দুদিকেই রুক্ষ প্রকৃতি ঊষর প্রান্তর। ভাষাও এক, ফারাক শুধু ধর্মে। রাধা না পারে কথা বলতে, না পারে শুনতে। সামাল দিতে এগিয়ে এলেন ওপারের এক ভদ্রলোক।
উনি এক আধদিন নয় একযুগের ওপর ধরে মূক ও বধির মেয়েটিকে আশ্রয় দিলেন, সন্তানের স্নেহযত্নে পালন করতে লাগলেন। লাগাতার চেষ্টা চালিয়ে গেলেন তার পরিবারের খোঁজখবর নিতে। অবশেষে জানতে পারলেন মেয়েটি ভিনদেশী। নিশ্চিত হবার পর তিনি চিঠি লিখলেন ভারতের বিদেশ মন্ত্রকে।

এদিকে মেয়েটি ছিলো তাঁর স্ত্রী বিলকিস বানুর খুব আদরের। ধর্মীয় পরিচয় জানার পর উনি নাম রাখলেন গীতা। সাইন ল্যাঙ্গোয়েজে তাকে ভাব প্রকাশ করতেও শেখালেন। অবশেষে দু তরফের চেষ্টায় তেরোবছর পর (২০১০) দেশে ফিরে এলো গীতা। এদেশে খবরের শিরোনামে এলেন সহৃদয় ঐ পাকিস্তানি ভদ্রলোক। তখনও অবশ্য খোঁজ পাওয়া যায়নি মেয়েটির পরিবারের। বিদেশ মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ব্যাক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করলেন, ততদিন তার ঠাঁই হলো দিল্লির এক এনজিও আবাসনে। নিজের পরিবারের কাছে ফিরে আসতে অবশ্য মেয়েটির লেগেছিল আরও পাঁচ বছর। প্রায় বিশবছর পর ২০১৫ সালে দেখা হলো মা-মেয়ের।
আজকের দিনে যেখানে পথে ঘাটে মেয়েরা যৌন হেনস্থার শিকার হচ্ছে হামেশাই, সেখানে এই মানুষটি এক ভিনদেশী কুমারীকে আগলে রেখেছেন এক যুগেরও বেশি সময় ধরে! পিতার স্নেহে আগলে রেখেছেন তার ধর্ম, তার সম্ভ্রম! হিন্দি ছবির বজরঙ্গী ভাইজান এর গল্প মনে হচ্ছে না?

অধিকাংশ ভারতীয় চেনেননা মানুষটিকে। নাম আবদুল সাত্তার এধি। অল্প বয়সে চিকিৎসার অভাবে মাকে হারান। পরবর্তী কালে এই ঘটনাই তাঁকে সমাজসেবা মূলক কাজে অনুপ্রাণিত করে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সপরিবারে চলে আসেন পাকিস্তানে এবং করাচিতে বসবাস শুরু করেন। জীবিকা বলতে ছিলো একটি হোলসেল দোকানে খাতা লেখার কাজ। বন্দর শহরটিতে তখন প্রচুর দরিদ্র উদ্বাস্তু, তাদের জন্য প্রথম চালু করলেন দাতব্য চিকিৎসালয়। সেই শুরু.....

কয়েক বছরের মধ্যে কিছু শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ কে নিয়ে ১৯৫০ সালে সেবামূলক কাজের জন্য তৈরী করলেন "এধি ফাউন্ডেশন"। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন আরও অনেক মানুষ। বর্তমানে এটি পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ এবং বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তর সেবা কল্যাণমূলক সংগঠন। আজ পর্যন্ত তারা বিশহাজারের বেশি পরিত্যক্ত শিশুকে উদ্ধার, অসংখ্য গৃহহীন মানুষের আশ্রয় এবং হাজার চল্লিশের বেশি স্বামী পরিত্যক্ত অসহায় মেয়েদের নার্সিং ট্রেনিং দিয়েছে। গোটা পাকিস্তান জুড়ে শহর ও গ্রাম এলাকায় সাড়ে তিনশো সেবামূলক কেন্দ্র চালিয়ে থাকে। এখানে থেকে বিনামূল্যে খাদ্য, ওষুধ, মানসিক রোগীদের ক্লিনিক এবং পথশিশুদের জন্য লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। সারা দেশে আটটি হাসপাতালের মাধ্যমে রয়েছে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা।সংস্থাটির হাতে প্রায় দু'হাজার আ্যম্বুলেন্স ছাড়াও রয়েছে একটি হেলিকপ্টার, দুটি প্রাইভেট জেট বিমান এবং ২৮টি উদ্ধারকারী স্পিড বোট!

আজীবন সমাজসেবী মানুষটি দেশ-বিদেশ থেকে পেয়েছেন অসংখ্য সম্মান। পাকিস্তানের সর্বোচ্চ অসামরিক পদক 'নিশান এ ইমতিয়াজ' এর পাশাপাশি পেয়েছেন ম্যাগসেসে আ্যওয়ার্ড ও লেনিন শান্তি পুরস্কার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে পল হ্যারিস ফেলো এবং ভারত সরকার গান্ধী শান্তি পুরস্কারে সম্মানিত করে। ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করে ইউনেস্কোও।
২০১৩ সালে ওয়াশিংটন পোস্ট তাকে "শ্রেষ্ঠ জীবিত মানবতাবাদি" বলে উল্লেখ করে।

২০১৬ সালের ৮ই জুলাই কিডনি ফেলিওরের কারনে মৃত্যুবরণ করেন বাস্তবের এই বজরঙ্গী ভাইজান। মৃত্যুর পর অঙ্গ দানের ইচ্ছা থাকলেও অসুস্থতার কারণে শুধুমাত্র তাঁর কর্নিয়া প্রতিস্থাপন সম্ভবপর হয়। পরদিন তাঁর জানাজায় পৃথিবীর সব রাস্ট্রের পক্ষে শেষ সম্মান জানাতে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন।
একনজরে আবদুল সাত্তার ইধিঃ
জন্মঃ ১ জানুয়ারি ১৯২৮,
বান্টভা, গুজরাট, ব্রিটিশ ভারত।
মৃত্যুঃ ৮ জুলাই ২০১৬ (বয়স ৮৮)
করাচি, সিন্ধু, পাকিস্তান
সমাধিঃ ইধি পল্লী, করাচি
জাতীয়তাঃ পাকিস্তানি
দাম্পত্য সঙ্গীঃ বিলকিস ইধি
সন্তানঃ ফয়সাল ইধি, কুতুব ইধি
পিতা-মাতাঃ
আবদুশ শাকুর ইধি (পিতা)
গুরবা ইধি (মাতা)

সম্মাননা ও পুরস্কারঃ
রামোন ম্যাগসেসে পুরস্কার (১৯৮৬)
লেনিন শান্তি পুরস্কার (১৯৮৮)
পল হ্যারিস ফেলো, রোটারী ইন্টারন্যাশনাল (১৯৯৩)
আর্মেনিয়ার ভূমিকম্পে সহায়তার জন্য সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে শান্তি পুরস্কার (১৯৯৮)
হামদান এওয়ার্ড (২০০০)
আন্তর্জাতিক বালজান পুরস্কার (২০০০)
শান্তি ও সম্প্রীতি পুরস্কার (২০০১), দিল্লি
শান্তি পুরস্কার (২০০৪), মুম্বাই
শান্তি পুরস্কার (২০০৫), হায়দ্রাবাদ
গান্ধী শান্তি পুরস্কার (২০০৭), দিল্লি
শান্তি পুরস্কার (২০০৮), সিউল
সম্মানসূচক ডক্টরেট, করাচির ইন্সটিটিউট অব বিজনেজ এডমিনিস্ট্রেশন (২০০৬)
ইউনেস্কো-মদনজিত সিং পুরস্কার (২০০০)
আহমদিয়া মুসলিম শান্তি পুরস্কার (২০১০)
জাতীয় পুরস্কার সম্পাদনা
সিলভার জুবিলী পদক, কলেজ অব ফিজিশিয়ান এন্ড সার্জনস পাকিস্তান (১৯৬২–১৯৮৭)
মুইজউর রহমান পুরস্কার (২০১৫)
উপমহাদেশের সমাজসেবী, সিন্ধু সরকার (১৯৮৯)
নিশান-ই-ইমতিয়াজ, পাকিস্তান সরকার (১৯৮৯)
নির্যাতিত মানুষের প্রতি কৃতিত্বপূর্ণ দায়িত্বের স্বীকৃতি, স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, পাকিস্তান সরকার (১৯৮৯) পাকিস্তান নাগরিক পুরস্কার, পাকিস্তান নাগরিক সমাজ (১৯৯২)সম্মাননা পদক,
পাকিস্তান সেনাবাহিনী খিদমত পুরস্কার, পাকিস্তান একাডেমি অব মেডিকেল সায়েন্স বাচা খান শান্তি পুরস্কার (১৯৯১)
স্মারক মুদ্রাঃ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবদুস সাত্তার ইধির স্মারক মুদ্রা বের করে।

সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ সকাল ৭:০৭
১৩টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রমজান ও সিয়াম সাধনা: আধুনিক স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানের আলোকে একটি সমন্বিত গবেষণা-বিশ্লেষণ, পর্ব-১

লিখেছেন নতুন নকিব, ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৭

রমজান ও সিয়াম সাধনা: আধুনিক স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানের আলোকে একটি সমন্বিত গবেষণা-বিশ্লেষণ, পর্ব-১

ছবি, অন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত।

ভূমিকা

রমজান মাসের ফরজ সিয়াম ইসলামের একটি মৌলিক ইবাদত। তবে সাম্প্রতিক দশকে এটি কেবল ধর্মীয় অনুশীলন হিসেবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় কন্যা আমার- ৮৮

লিখেছেন রাজীব নুর, ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:১৬



প্রিয় কন্যা আমার-
আজ তোমার জন্মদিন। হ্যা আজ ৩১ ডিসেম্বর তোমার জন্মদিন। আজ বিশেষ একটি দিন! এবার জন্মদিনে তুমি আছো তোমার নানা বাড়ি। আমি আজ ভীষন ব্যস্ত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

এভাবেই চলতে থাকবে...

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:১৭

[] কঃ
.
যাকে লাশ ধোয়ার জন্য খুঁজে নিয়ে আসা হয়, একদিন তাকে ধোয়ানোর জন্যও আরেক লাশ ধৌতকারীকে খোঁজা হবে।
এভাবেই চলতে থাকবে...
.
[] খঃ
.
যিনি যুঁৎসই কাফনের কাপড় পরাতে পারেন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইতিহাসের কাঁটাছেঁড়া ও পাঠ্যবইয়ের নতুন লড়াই

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৩৭



রহিমা বেগম তার মেয়ে সামিয়ার নতুন বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টাচ্ছিলেন। অষ্টম শ্রেণির বাংলা বই। গতবছর বড় ছেলে এই বইটাই পড়েছিল। কিন্তু এবারের বইটা দেখে তার চোখ কপালে উঠল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশ হায়েনাদের দখলে

লিখেছেন রাজীব নুর, ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৪৪



আমাদের দেশটা অনেক ছোট। কিন্তু জনসংখ্যা অনেক বেশি।
এই বিশাল জনশক্তি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলো। ১৯৫২ তে হলো ভাষা আন্দোলন। আর ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×