সোস্যাল মিডিয়ায় ছদ্মনাম.......
সোস্যাল মিডিয়ায় নিজ নিজ ভাবনা ও মতামত প্রকাশের অবাধ সুযোগ রয়েছে। সহজেই সবার সাথে শেয়ার করা যাচ্ছে। লেখকের সাথে পাঠকের তাৎক্ষনিক যোগাযোগের চমৎকার সুযোগ থাকে।
ব্লগাররা লিখেন ভালো। কিন্তু একটা বিষয় আমি বুঝতে পারছি না, ব্লগারদের অনেকেই আমার মতো ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন। কেন করেছে তারা এই কাজ? তারা কী তাদের মতামত, চিন্তা প্রকাশে ভয় পায়? নাকি আরেকজনের পোস্ট-এ হাবিজাবি লেখার জন্য ছদ্মনাম ব্যবহার করছে।
ব্লগ আর ফেসবুকে একেকটা আজিব নাম দেখে মাঝে মাঝেই অবাক লাগে। কখনো নামের দিকে তাকিয়ে না হেসে পারা যায়না, আবার কোনো কোনো নাম বমির উদ্রেক হয়। এই যেমন কয়েকটা আইডি চোখে বাধে- 'পায়খানার বদনা', 'হস্ত মৈথুন', 'পণ্ডিত চোদনা শংকর', 'পাজি পোলা', 'মৈথুনান্দ' নামের আইডি গুলো। এমন অনেক নাম যতটা মজা দেয় তার চাইতে বেশী বমির উদ্রেক করে।
হোকনা ছদ্মনাম, তাইবলে তাতে শিক্ষিত মানুষের অসুস্থ রুচির প্রকাশ করতে আমাদের বিবেক বাধা দেয়না! তাহলে কেন আমাদের শিক্ষা দীক্ষা? ছদ্মনামও সুন্দর শৈল্পিক অর্থবোধক হতে পারে। কিন্তু নোংরা অশ্লীল অরুচিকর নাম ধারণ করে আমরা নিজেদেরকে কি প্রমাণিত করতে চাই?
ছদ্মনাম ব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখা। শুধুমাত্র লেখকেরাই ছদ্মনাম ব্যবহার করেন না, গ্র্যাফিটি শিল্পী, প্রতিবাদী আন্দোলনকারী অথবা সন্ত্রাসবাদী, এমনকি কম্পিউটার হ্যাকারেরাও ব্যবহার করেন। লেখক শিল্পীরা অনেক সময় নিজেদের জাতিগত পরিচয় গোপন রাখার জন্য মঞ্চনাম ব্যবহার করেন। সংগীতশিল্পী কে মল্লিক, অভিনেতা দিলীপকুমারদের পিতৃদত্ত নাম কী তা অনেকেই জানি না। শুধু গুণী মানুষরাই নয়, অতি সাধারণ মানুষেরাও অপরাধ সংঘটিত করে অন্য নামে অন্য কোথাও গা ঢাকা দিয়ে থাকে এবং তারা ছদ্ম নামেই জীবন কাটিয়ে দেয়। ধর্মীয় কারণেও অনেককে ছদ্মনামে পরিচিত হতে হয়।অনেকে ধর্মের স্পর্শকাতর বিষয়ে অথবা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লেখার জন্যেও ছদ্মনাম ব্যবহার করে থাকে। তবে ইন্টারনেট জগতে বাংলা ব্লগগুলির বেশকিছু ব্লগে ছদ্মনামের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। কোনো কোনো ধর্মীয় সংঘের সদস্যদের ধর্মীয় নাম এবং কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃবৃন্দের ব্যবহৃত "ক্যাডার নাম" এর উদাহরণ। যেমন- ট্রটস্কি ও স্তালিন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার একাধিক ব্যক্তি একক ছদ্মনামের আড়ালেও লিখে থাকেন। যেমন -- এলারি কুইন বা নিকোলাস বরবাকি।
সাহিত্যাংগনে ছদ্মনাম গ্রহণের প্রথাটি সুপ্রচলিত। কৈশোরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর "ভানুসিংহ" ছদ্মনাম নিয়েছিলেন। বিশিষ্ট লেখক রাজশেখর বসু স্বনামে অনুবাদ সাহিত্য, প্রবন্ধ ইত্যাদি রচনা করলেও, তাঁর প্রসিদ্ধ শ্লেষাত্মক গল্পগুলি লিখতেন "পরশুরাম" ছদ্মনামে। লেখক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় তাঁর শংকর ছদ্মনামেই সর্বাধিক পরিচিত। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা সিরিজের বিখ্যাত চরিত্র লালমোহন গাঙ্গুলি "জটায়ু" ছদ্মনামে সর্বজন বিদিত। ব্রিটিশ ব্যঙ্গ সাহিত্যিক হেক্টর হিউজ মনরো লিখতেন “সাকি” ছদ্মনামে। উইলিয়াম সিডনি পোর্টার হলেন আমাদের সেই সুপরিচিত এবং বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক ও হেনরি।
সংবাদপত্র, পত্রিকা এবং অন্যান্য সাময়িক পত্রপত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই ছদ্মনামের ব্যবহার চালু হয়। ছদ্মনামের ব্যবহারের প্রাথমিক কারণ ছিল মতামত প্রকাশের জন্য রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রের রোষ থেকে আত্মরক্ষা। ছদ্মনাম ব্যবহারের প্রথম যুগে সবচেয়ে বিখ্যাত নাম ভলতেয়ার। ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি লেখক ফ্রাঙ্কোইস মেরি আরুয়েট এই ছদ্মনামটি ব্যবহার করতেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বহু মহিলা লেখক ছদ্মনাম হিসাবে ছেলেদের নাম ব্যবহার করতেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত মেরি অ্যান ইভান্স। ইনি জর্জ এলিয়ট ছদ্মনামে লিখতেন।
বিপ্লবের যুগেও অনেক বিপ্লবী ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ উপন্যাসে সব্যসাচী চরিত্রটিকে দেখেছি নানা ছদ্মনামে নানা ছদ্মবেশে নানা কর্মকাণ্ড করছেন।
সিনেমা জগতেও ছদ্মনামের আধিক্য দেখা যায়। দীপক চক্রবর্তীই পরবর্তীত হয়ে চলচ্চিত্রাভিনেতা চিরঞ্জীত। দীপক অধিকারীকে চিনি অভিনেতা দেব হিসাবে। গৌরাঙ্গ চক্রবর্তীই সুপারস্টার মিথুন (মিঠুন) চক্রবর্তী। চুমকি রায়- দেবশ্রী রায় নামে। সুচিত্রা সেন ছিল রমা সেন নামে। রীনা দাশগুপ্তই অভিনেত্রী অপর্ণা সেন। অরুণ চট্টোপাধ্যায়কে আমরা মহানায়ক উত্তমকুমার নামেই জানি। বলিউড অভিনেতা অক্ষয়কুমারের প্রকৃত নাম রাজীব ভাটিয়া। সঙ্গীতশিল্পী কুমার সানু এবং শানের আসল নাম যথাক্রমে কেদার ভট্টাচার্য এবং শান্তনু মুখার্জি। হলিউডের হার্টথ্রোব অভিনেত্রী নর্মা জাঁ মর্তেসকে চিনি মেরিলিন মনরো নামেই। কৃত্তিবাসীর ভাবানূদিত রামায়ণ থেকে জানতে পারি বাল্মীকির প্রকৃত নাম রত্নাকর। লঙ্কেশ্বর রাবণের প্রকৃত নাম দশগ্রীব। প্রাচীন গ্রন্থগুলি থেকে জানা যায় তার রাবণ নামটি স্বয়ং শিব দিয়েছিলেন। মহাভারতে পঞ্চপাণ্ডবেরা অর্থাৎ যুধিষ্ঠীর, ভীম, অর্জুন, নকুল এবং সহদেব যথাক্রমে কঙ্কভাতা, বল্লব, বৃহন্নলা, গ্রন্থীকা এবং তাঁতিপল ছদ্মনামে এক বছর অজ্ঞাতবাস কাটিয়েছিলেন। তাঁদের স্ত্রী দৌপদীর ছদ্মনাম ছিল সৈরান্ধ্রী।
একটি সুন্দর নামের সৌন্দর্য ও তাত্পর্য অপরিসীম। কিন্তু সোস্যাল মিডিয়ায়, বিশেষ করে ফেসবুক- ব্লগে ছদ্মনামের বিকৃত রুচির নামগুলো আমাদের মানসিক বৈকল্যের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। ব্লগে এখন ভালো লেখক আর লেখার অভাব প্রকট, পাঠকও নাই বললেই চলে। তার উপর এমনসব নোংরা অশ্লীল অরুচিকর নামের আইডি দেখে রুচিশীল মানুষ ফেসবুক -ব্লগ বিমুখ হতে বাধ্য।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ সকাল ৭:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



