প্যাঁচের মধ্যেও এমন স্বাদ, এতো রস!
বিজ্ঞানী কি শুধু তাঁরাই যারা গবেষণাগারে মাইক্রোস্কোপ নিয়ে গবেষণা করেন? আচ্ছা কোন বিজ্ঞানী আবিষ্কার করলো এই আশ্চর্য পদ্ধতি? ঠিক কোন কোন জিনিস কতক্ষন মেখে রাখার পর ছাঁকা তেলে ভেজে রসে ডোবালে এক আশ্চর্য বস্তুর সৃষ্টি হয়, যার ওপরটি মচমচে আর কামড় দিলেই ভিতর থেকে নিঃসৃত হয় মধু। গরম রসের সাথে ওই মুচমুচে স্বাদ সৃষ্টি করে এক আশ্চর্য অনুভূতি। ভাষায় যার প্রকাশ হয় না, শুধু আলতো কামড়ে অনুভব করতে হয় স্বর্গীয় স্বাদ।

সালাম জানাই সেই অজানা বিজ্ঞানীকে যিনি দুনিয়াকে দেখিয়ে দিয়েছেন প্যাঁচের মধ্যেও থাকতে পারে এমন স্বাদ, এতো রস!
জিলাপির প্যাচের মতোই জিলাপির জন্ম বা উৎপত্তিতেও আছে বিরাট প্যাচানো ইতিহাস। মূলত পশ্চিম এশিয়ায়, এবং সেখান থেকেই মুসলিম বণিকদের হাত ধরে এটি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারতীয়দের খাদ্যাভ্যাসে তুর্কি, ফারসি, আরব ও মধ্য এশীয় প্রভাবের কথা কারো অজানা নয়। তাই এটিও মোটেই আশ্চর্যজনক বিষয় নয় যে বর্তমানে বাংলাদেশ কিংবা পশ্চিমবঙ্গ, দুই বাংলার সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় মিষ্টিটিরও আগমন ঠিক একইভাবে।

ঐতিহাসিক অ্যাংলো-ভারতীয় শব্দকোষ 'হবসন-জবসন'- এ বলা হয়েছে, ভারতীয় শব্দ 'জালেবি' এসেছে আরবি শব্দ 'জুলেবিয়া' এবং ফারসি শব্দ 'জুলবিয়া' থেকে। বলার অপেক্ষা রাখে না, 'জালেবি' শব্দ থেকেই পরবর্তী সময়ে 'জিলাপি' শব্দটি এসেছে।
ভারতীয় উপমহাদেশে জিলাপির বয়স কম করে হলেও ৫০০ বছর। সম্ভবত মধ্যযুগে ফারসিভাষী তুর্কিরা ভারত আক্রমণ করার পরই কোনো একটা সময়ে জিলাপি চলে আসে এ অঞ্চলে। এবং বর্তমানে এখানেও, ঠিক পশ্চিম এশিয়ার মতোই, জিলাপির হরেক নাম রয়েছে। যেমন: জালেবি, জিলবি, জিলিপি, জিলেপি, জেলাপি, জেলাপির পাক, ইমরতি, জাহাঙ্গিরা ইত্যাদি।
ভারতীয় উপমহাদেশে এসে কিছু স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছে জিলাপি। পশ্চিম এশিয়ায় উদ্ভূত আদি জিলাপির সাথে ভারতীয় উপমহাদেশের জিলাপির কিছু বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যও রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার জালাবিয়াতে ময়দা, দুধ, দই দিয়ে একটু অন্যভাবে ফেটানো হতো। তার সাথে দেয়া হতো মধু ও গোলাপজলের সিরাপ। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে এসেই প্রথম জিলাপি হয়ে উঠেছে মুচমুচে, রঙিন এবং আঠালো। আমাদের বাংলাদেশেও জিলাপির কিছু নিজস্বতা গড়ে উঠেছে।
জিলাপি বর্তমানে বাংলাদেশের গণমানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। কূটবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মনকে যেমন এখানে জিলাপির প্যাঁচের রূপকে তুলে ধরা হয়, তেমনই হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিধানে জিলাপির তুলনা দেয়া হয়েছে নারীর মোহনীয় খোঁপার সঙ্গেও।
যতই নিত্যনতুন মিষ্টান্ন বা ডেজার্টের আগমন ঘটুক, তবু জিলাপির আবেদন হয়তো কোনোদিনই কমবে না। কারণ এখনো মেলায় গেলে, কিংবা রাস্তার পাশে গরম গরম জিলাপি দেখলে জিভে পানি চলে আসে। জিলাপি আমাদের স্মৃতিমেদুরতাকেও উসকে দেয়, মনে পড়িয়ে দেয় ছোটবেলায় জিলাপির লোভে জুম্মার নামাজ শেষে মিলাদ পড়তে বসে থাকার সেই দিনগুলোকে।
ছবিঃ পুরনো ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোডে জিলাপির দোকানের।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০২৪ রাত ৯:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



