
ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীর ভারতের অন্যতম শাসক ছিলেন মোগল সম্রাটরা। মোগল সম্রাট আকবরের পুত্র জাহাঙ্গীর। মোঘল রাজা-বাদশার কথা বললে সুরম্য রাজপ্রাসাদ, বিলাসব্যসন, সুরা-নর্তকী, যুদ্ধবিগ্রহ, সাম্রাজ্য বিস্তার ইত্যাদি ব্যাপারগুলোই আমাদের কাছে পরিচিত। সবক্ষেত্রে কিন্তু তা নয়। অনেকের মধ্যে থাকে আলাদা ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভা। এমনই এক সম্রাট ছিলেন জাহাঙ্গীর। অত্যধিক সুরাসক্তির জন্য দুর্ণাম ও বেগম নূরজাহানের প্রতি সীমাহীন আসক্তির জন্য অনেকে তাঁকে পছন্দ না করলেও কবিসুলভ মন, প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ-প্রেম, বিজ্ঞানমনস্কতা, অনুসন্ধিৎসা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে নৈসর্গিক ঘটনা পর্যবেক্ষণে আগ্রহ তাঁর চরিত্র ও ব্যক্তিত্বকে এক অসাধারণ মাত্রা দিয়েছিল। অদ্ভুত সব প্রাণী, নানারকম পাখি, গাছ-পালা ও ফুলের সৌন্দর্য ইত্যাদির এক উত্তম পর্যবেক্ষক ছিলেন তিনি, যার পরিচয় পাওয়া যায় স্বরচিত আত্মস্মৃতি 'তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী'(জাহাঙ্গীর নামা)-তে। তিনি জ্যোতিষ শাস্ত্রে আগ্রহী ছিলেন। গ্রহের বিচরণ, রাশিচক্রে অবস্থান বুঝতেন। তাঁর রাশি চিত্র সম্বলিত মুদ্রা এক অবিস্মরণীয় কীর্তি।
'তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী'-তে অনেক ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়, যেগুলির মধ্যে অন্যতম - এক বিরল উল্কাপাতের ঘটনা। তাঁর নিজের কথায়, "তখনকার একটি অদ্ভূত ঘটনা হচ্ছে, ১৬২১খ্রি. ৩০শে ফরওয়ার্দিন জলন্ধর পরগনার (পাঞ্জাবে) এক গ্রামে প্রাতঃকালে পূর্ব দিকে এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। শব্দ এতটাই ভয়ংকর যে তথাকার বাসিন্দারা সেই আতঙ্কসৃষ্টিকারী আওয়াজ শুনে অনেকেই অচৈতন্য হয়ে পড়েছিল। শব্দ ও কোলাহলের মধ্যে হঠাৎ আকাশ থেকে মাটিতে একটি আলোর পিন্ড পড়লো। খানিকক্ষণ পরে মানুষের আতঙ্ক ও ভীত-বিহ্বলতার ভাব কেটে গেল এবং তখন তারা ওখানকার প্রশাসক মহম্মদ সৈয়দের কাছে দ্রুত ঘটনাটা জানালেন। তিনি তখুনি ঘোড়া ছুটিয়ে স্থানটি দেখতে গেলেন। দৈর্ঘ্য প্রস্থে দশ-বারো গজ জায়গা পুড়ে সেখানে কোন সবুজ ঘাসের চিহ্ন ছিল না। তখনও আগুনের উত্তাপ অনুভব করা গিয়েছিল। তিনি জায়গাটিকে খনন করার হুকুম দিলেন। খুঁড়তে খুঁড়তে এক জায়গাতে একখন্ড তপ্ত লৌহ পাওয়া গেল। তা এত গরম ছিল যে মনে হল যে তখুনি বোধ হয় চুল্লি থেকে তোলা হয়েছে। আস্তে-ধীরে তা ঠান্ডা হলে তিনি সেটিকে স্বগৃহে নিয়ে একটি আবরণে মুড়ে সীল করে দরবারে নিয়ে আসেন। আমার সামনেই ওটাকে ওজন করতে বললাম। ওজন হয়েছিল ১৬০ তোলা (প্রায় ২ কেজি)। লোহার কারিগর ওস্তাদ দাউদকে হুকুম দিলাম তা দিয়ে একটি করে তলোয়ার, ছুরি/ছোরা তৈরী করতে। অন্য লোহার সঙ্গে মিশিয়ে এর গুনাগুন পরীক্ষা করা হল। ইয়ামানী ও দক্ষিণী চমৎকার সব তলোয়ারের মতো একে বাকা ও সোজাও করা যায়। উৎকৃষ্ট তলোয়ারের মতোই এটিকে দিয়ে ভালো কাটা যায়। আমি একটির নাম দিলাম 'সমসীর-ই-কাতি'(ধারালো তলোয়ার); আর দ্বিতীয়টির নাম দেওয়া হোল 'বর্ক-শিরিস্ত'(বিদ্যুতের মতো)। রাজকবি বিবাদল খান এদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে একটি কবিতা রচনা করেন। তিনি সেটি আবৃত্তি করেছিলেনঃ-
"জাহাঙ্গীরশাহ দ্বারা পৃথিবী নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে,
তাঁর রাজত্বকালে কাঁচা লোহা বিদ্যুৎ থেকে
ভূপতিত হয়েছে।
তাঁর বিশ্ববন্দিত আদেশে সেই লৌহদ্বারা
নির্মিত হয়েছে
একটি ছোরা, ছুরিকা ও দুখানি খড়্গ।
তাতে রাজকীয় বিদ্যুৎ যেন ঝলকায়।'
তারিখ উৎকীর্ণ হয়েছিল হিজরী ১০৩০(১৬২০-২১ খ্রি.)।"
ছবি ও তথ্যসূত্রঃ তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী(জাহাঙ্গীর নামা)
উল্কাপাত ও জাহাঙ্গীরের ঐতিহাসিক ছোরা।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০২৪ রাত ৯:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



