কোথায় আমার হারিয়ে যাওয়া ঝর্না কলম.....
আমাদের ছোটবেলার সোনালী স্মৃতি গুলোর মধ্যে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে 'ঝর্না কলম'। ১৯৮০ সাল নাগাদও আমি এই কলম নিয়মিত ব্যবহার করতাম। তখন খুব পরিচিত ছিলো হিরো, ইয়ুথ, পাইলট, ট্রিনিটি এবং বেশী দামী ব্রান্ডের পার্কার, শেফার্স ইত্যাদি।
লিখতে লিখতে কলমের নিব খারাপ হয়ে গেলে বা ভেঙ্গে গেলে, নতুন কলম না কিনে শুধু নিব আলাদা কিনতে পাওয়া যেত। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবন থেকে উধাও হয়ে যায় ঝর্না কলম। লেখার কাজে ডট/বল পেন ও জেল পেন এর ব্যবহার বেড়ে যায়।
বিশ্বের প্রথম ঝর্ণা কলম আবিষ্কৃত হয় ৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে, মিশরে। মিশরের সম্রাট মা’দ আল-মুয়িজ এমন একটি কলম এর কথা চিন্তা করলেন যা হাত এবং কাপড় কালিতে নষ্ট করবে না। আবিষ্কৃত এই কলমে আধুনিক কলমের মত কালি জমা থাকতো এবং মাধ্যাকর্ষণ বলের সাহায্যে সূক্ষ্ম নল চুয়ে কালি বের হতো। এ বিষয় কাদি আল-নুমান আল তামিমি (৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দ) এবং কিতাব লিস ওয়া ই-মুসাইয়ার্দ -তে এর বিশদ বর্ণনা রয়েছে।
ব্রিটিশ কোম্পানি ‘অরোরা’ ২০১৪ সালে ‘দায়ামান্তে’ নামের একটি কলম তৈরি করেছিল। কলমটির দাম ছিল ১০ লাখ ২৮ হাজার মার্কিন ডলার। ওই সময়কার হিসাবে বাংলাদেশি ১১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা! খবরটি ফলাও করে প্রচারও হয়েছিল বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
অরোরার পরে অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানি ‘টিবালডি’ নামে একটি কলম তৈরি করেছিল, যা সাংহাইয়ের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে নিলামে বিক্রি হয়েছিল। দাম উঠেছিল ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। তবে এমন দামি না হোক, এর কাছাকাছি দামের কলম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্রি হচ্ছে অহরহ-ই। কেননা কলমেও রয়েছে আভিজাত্য ও রুচিশীলতার বিষয়। অনেকে শখের বশেও ব্র্যান্ডের দামি কলম ব্যবহার করেন। ভালো ব্র্যান্ড ও নান্দনিক ডিজাইনের যে কোনো কলমই আভিজাত্য ও রুচিশীলতার পরিচয় তুলে ধরে। আপনার হাতে কলমটি যদি হয় কার্টিয়ার, ডুপন্ট, ওয়াটারম্যান কিংবা পার্কারের মতো নামিদামি কোনো ব্র্যান্ডের, তবেই আপনি নিজেকে একটু বেশীই গর্বিত ভাবতে পারেন।
উন্নত দেশের পাশাপাশি আমাদের দেশের অনেকেই সাধ্যমতো ব্র্যান্ডের কলম ব্যবহার করছেন। হীরা প্লাটিনাম আর স্বর্ণ খচিত না হোক হাজার দু’তিনের একটি ব্র্যান্ডের কলম অনেকের কাছেই এখন দেখা যায়। সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যাংকার, শিক্ষক, লেখক, গবেষক ও ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন এসব কলম কিনছেন। উন্নত দেশগুলোর মতো লাখ ডলারের না হোক ১০-২০ হাজার টাকা দামের কলম কিনেন এমন ব্যক্তি আমাদের দেশে অনেক। আশির দশক থেকেই এদেশে উন্নত ব্রান্ডের কলম আসে। বর্তমানে প্রায় সব ব্র্যান্ডের কলমই দেশে পাওয়া যায়। প্রতিটি ব্র্যান্ডেরই অনেকগুলো ডিজাইন ও মডেল রয়েছে। ডিজাইন ও মডেল ভেদে দামও ভিন্ন হয়। প্রায় সব ব্র্যান্ডেরই দেড় হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা দামের কলম ঢাকার বাজারে পাওয়া যায়। তবে বেশি বিক্রি হয় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা দামের কলমগুলো।
যেসব ব্র্যান্ড বাজারে পাওয়া যায় তার মধ্যে শেফার্স, পার্কার, ওয়াটারম্যান, মন্টব্লাঙ্ক ও কার্টিয়ার, ক্রোস ব্র্যান্ডের ৪/৫টি মডেল বেশি চলছে। মন্টব্লাঙ্ক, জার্মান ব্র্যান্ডের কলমের দাম সাধারণত ১৫ হাজার থেকে শুরু হয়ে কোটি টাকারও বেশী। কার্টিয়ার, ওয়াটারম্যান ফ্রান্স মেড, দাম ২০-৫০ হাজার টাকা, ডানহিল জার্মান/ ইংল্যান্ড, দাম ১০ হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা। ডুপন্ট (ফ্রান্স) ৮-১০ হাজার, ওয়াইসেল (ফ্রান্স) ১ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা, পার্কার (ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র) দুই হাজার থেকে লাখ টাকা, ক্রোস (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি) ২ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা, পাইলট, ইউনিবল (জাপান) ১০ টাকা-১ লাখ টাকা, জেব্রা (জাপান) ২০০ টাকা থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম। সব কলমেরই রিফিল পাওয়া যায় ২০০ থেকে ২৫০০ টাকায়।
এছাড়াও বেশ কিছু ব্র্যান্ড রয়েছে যার ক্রেতা সীমিত সংখ্যাক। এসব ব্র্যান্ডের কলম দোকানিরা রাখেন দু’এক পিস করে। তাদের ক্রেতাও দোকানিদের পরিচিত। এর মধ্যে ডিপ্লোমেট, ফেবার ক্যাসেল, ফেরারি, গ্রাফ-ভন-ফেবার, ইয়ার্ড ও লেড, ওয়ার্থার, ওয়াটারম্যান, ভিসকনটি, প্লাটিনাম, রট্রিং, পেলিকান ও ল্যামি। এসব কলমের দাম ২ হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত।
ঝর্ণা কলমে ড্রপার, কার্টিজ এবং পিস্টন এর মাধ্যমে কালি ভরার ব্যবস্থা আছে।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০২৪ দুপুর ২:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


