somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

কাশ্মীরি শালওয়ালা.......

০২ রা জানুয়ারি, ২০২২ সন্ধ্যা ৭:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শীত পড়লে পরিযায়ী পাখিদের মতো তখন কাশ্মীরি শালওয়ালারা আসত। পিঠে বড় গাঁঠরি। তাতে থাকত অপূর্ব নকশা করা অনেকগুলো শাল। নানা দামের। নানা রংয়ের।

তখন সব শালওয়ালারই কিছু বাধা খরিদ্দার থাকত। প্রতি বছর ঢাকা কিংবা তার আশপাশে এসে সেই মানুষজনেরা প্রথম ঢুঁ মারত সেই সব বাড়িতে। আমরাও অপেক্ষা করতাম। কখন শীত আসবে। আসবেন সেই শালওয়ালা ভদ্রলোক। লম্বা। ছিপছিপে চেহারা। ফরসা। নাক-চোখ কাটা-কাটা। কাঁচাপাকা গোঁফ। উর্দু বাংলা মিশিয়ে কথা বলেন। আমাদের বাড়িতে যে ভদ্রলোক আসতেন তাঁর চেহারা ছিল অমনই।

আমাদের বৃহত্তর যৌথ পরিবারের তখন অনেক শালই কেনা হত তাঁর কাছ থেকে। কখনও দামি, কখনও অল্প দামি। আবার কিছু কেনা হোক বা না-হোক মানুষটা আসতেনই। বছরের পর-বছর আসার ফলে কীভাবে যেন এক আত্মীয়তা তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
ভদ্রলোক এলে বাড়িতে হালকা হইচই শুরু হত। গাঁঠরি রেখে তিনি বসতেন আমাদের বারান্দায়। পানি খেতে দিতেন। চা, ডিমের ওমলেট দিতেন। ভদ্রলোকও খোঁজখবর নিতেন আমাদের। আমরা নিতাম তাঁর পরিবারের খোঁজ। চাষবাস কেমন হয়েছে, কিভাবে উল সংগ্রহ করে সুতা তৈরি করে, শাল কার্পেট বানায়। আগের বার বলেছিলেন মায়ের শরীর ভাল নেই। মা এখন কেমন আছেন- ইত্যাদি!

প্রতি বছরই গল্পের ফাঁকে সেই ভদ্রলোক নিজের জোব্বার পকেট থেকে আমার জন্য বের করতে আনতেন এক মুঠো আখরোট। খোবানি। পেস্তা। তখন তো ওগুলো এত সহজে পাওয়া যেত না। দামও ছিল প্রচুর।

কুশল বিনিময়ের পর ভদ্রলোক গাঁঠরি খুলে বসতেন। দেখাতেন নতুন-নতুন শাল। সব চাইতে দামী শালের নাম ছিলো কাশ্মীরি তুষ। কখনও কার্পেট। শোনাতেন নানা গল্প। আমরা দেখতাম। কখনো কখনো কেনা হত না। বছর-বছর কি আর শাল লাগে? তবু তিনি আসতেন। দেখাতেন। গল্পগুজব করতেন।
তারপর শীত চলে গেলে পরিযায়ী পাখিদের মতো তিনিও ফিরে যেতেন কাশ্মীর। পরিবারের কাছে।
সেই আসা-যাওয়ার পিছনে বাণিজ্য কি ছিল না? নিশ্চয়ই ছিল। বহুবার এমনও হয়েছে, শাল কেনা শেষ। তবু মানুষটা খোসগল্প করে চলেছেন চাচা চাচীর সঙ্গে। বলছেন নিজের মেয়ের কথা। গ্রামের কথা।

এর পর এক সময় সেই শালওয়ালার আসা বন্ধ হল। কেন জানা হয়নি কারওই। হঠাৎ এক বছর থেকে তিনি আর আসতেন না। তখন তো অত ঠিকানা নেওয়ার চল ছিল না। ফোন-টোনেরও ব্যাপার ছিল না। আর আমরা যেন ধরেই নিয়েছিলাম মানুষটা বছরের পর-বছর আসবেনই। কিন্তু তা হল না। এক বছর শীতের কুয়াশায় তিনি যে সেই মিলিয়ে গেলেন, তারপর আর কখনও তাঁকে আমরা দেখিনি।

এখন শীত এলে ছোটবেলার খেজুর রসের মতো মনে পড়ে সেই মানুষটাকে। মুখে হাসি। আমাকে দেখলে জড়িয়ে ধরতেন। তারপর পকেট থেকে এক মুঠো আখরোট বের করে হাতে ধরিয়ে দিতেন। উর্দুতে বলতেন, "তুমি খুব লম্বা হইয়ে গিয়েছ।"

বয়স বাড়ার পর এখন আরও বেশি করে বুঝতে পারি, ভালবাসার চেয়ে বড় আর কিছু হয় না। মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক তার মূলে তো ওই ভালবাসাই। তাই পড়ে পাওয়া চোদ্দা আনার মতো এই সব ভালবাসা জুড়ে-জুড়ে এগিয়ে চলে আমাদের জীবন। যে জীবন দোয়েলের। ফড়িংয়ের। মনে হয় জীবনে এর চেয়ে বেশি আর কিছু পাওয়ার নেই। পাওয়ার থাকে না।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০২৪ দুপুর ২:০৫
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"তোমরা জানাযা করে দ্রুত লাশ দাফন কর।"

লিখেছেন এমএলজি, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ৭:৩০

রাসূল (সাঃ) বলেছেন, "তোমরা জানাযা করে দ্রুত লাশ দাফন কর।" বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় এ কাজটি করা হয়নি বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যাচ্ছে।

বিষয়টি সত্য কিনা তা তদন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়া কেমন ছিলেন?

লিখেছেন নতুন নকিব, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ দুপুর ১২:০৪

ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়া কেমন ছিলেন?

ইয়াতিমদের সাথে ইফতার অনুষ্ঠানে বেগম খালেদা জিয়া, ছবি https://www.risingbd.com/ থেকে সংগৃহিত।

তিন-তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রীও তিনি। তাকেই তার বৈধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বছরশেষের ভাবনা

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ দুপুর ১২:৪৮


এসএসসি পাস করে তখন একাদশ শ্রেণিতে উঠেছি। সেই সময়ে, এখন গাজায় যেমন ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে, তখন বসনিয়া নামে ইউরোপের ছোট একটা দেশে এরকম এক গণহত্যা চলছিল। গাজার গণহত্যার সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

উৎসর্গ : জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP)

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ বিকাল ৫:৩৮



খিচুড়ি

হাঁস ছিল, সজারু, (ব্যাকরণ মানি না),
হয়ে গেল “হাঁসজারু” কেমনে তা জানি না।
বক কহে কচ্ছপে—“বাহবা কি ফুর্তি!
অতি খাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি।”
টিয়ামুখো গিরগিটি মনে ভারি শঙ্কা—
পোকা ছেড়ে শেষে কিগো খাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

খালেদা জিয়ার জানাজা

লিখেছেন অপু তানভীর, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ১১:৩৯

আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমার নানীর বোন মারা যান। নানীর বোন তখন নানাবাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন। সেইবারই আমি প্রথম কোনো মৃতদেহ সরাসরি দেখেছিলাম। রাতের বেলা যখন লাশ নিয়ে গ্রামের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×