শীত পড়লে পরিযায়ী পাখিদের মতো তখন কাশ্মীরি শালওয়ালারা আসত। পিঠে বড় গাঁঠরি। তাতে থাকত অপূর্ব নকশা করা অনেকগুলো শাল। নানা দামের। নানা রংয়ের।
তখন সব শালওয়ালারই কিছু বাধা খরিদ্দার থাকত। প্রতি বছর ঢাকা কিংবা তার আশপাশে এসে সেই মানুষজনেরা প্রথম ঢুঁ মারত সেই সব বাড়িতে। আমরাও অপেক্ষা করতাম। কখন শীত আসবে। আসবেন সেই শালওয়ালা ভদ্রলোক। লম্বা। ছিপছিপে চেহারা। ফরসা। নাক-চোখ কাটা-কাটা। কাঁচাপাকা গোঁফ। উর্দু বাংলা মিশিয়ে কথা বলেন। আমাদের বাড়িতে যে ভদ্রলোক আসতেন তাঁর চেহারা ছিল অমনই।
আমাদের বৃহত্তর যৌথ পরিবারের তখন অনেক শালই কেনা হত তাঁর কাছ থেকে। কখনও দামি, কখনও অল্প দামি। আবার কিছু কেনা হোক বা না-হোক মানুষটা আসতেনই। বছরের পর-বছর আসার ফলে কীভাবে যেন এক আত্মীয়তা তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
ভদ্রলোক এলে বাড়িতে হালকা হইচই শুরু হত। গাঁঠরি রেখে তিনি বসতেন আমাদের বারান্দায়। পানি খেতে দিতেন। চা, ডিমের ওমলেট দিতেন। ভদ্রলোকও খোঁজখবর নিতেন আমাদের। আমরা নিতাম তাঁর পরিবারের খোঁজ। চাষবাস কেমন হয়েছে, কিভাবে উল সংগ্রহ করে সুতা তৈরি করে, শাল কার্পেট বানায়। আগের বার বলেছিলেন মায়ের শরীর ভাল নেই। মা এখন কেমন আছেন- ইত্যাদি!
প্রতি বছরই গল্পের ফাঁকে সেই ভদ্রলোক নিজের জোব্বার পকেট থেকে আমার জন্য বের করতে আনতেন এক মুঠো আখরোট। খোবানি। পেস্তা। তখন তো ওগুলো এত সহজে পাওয়া যেত না। দামও ছিল প্রচুর।
কুশল বিনিময়ের পর ভদ্রলোক গাঁঠরি খুলে বসতেন। দেখাতেন নতুন-নতুন শাল। সব চাইতে দামী শালের নাম ছিলো কাশ্মীরি তুষ। কখনও কার্পেট। শোনাতেন নানা গল্প। আমরা দেখতাম। কখনো কখনো কেনা হত না। বছর-বছর কি আর শাল লাগে? তবু তিনি আসতেন। দেখাতেন। গল্পগুজব করতেন।
তারপর শীত চলে গেলে পরিযায়ী পাখিদের মতো তিনিও ফিরে যেতেন কাশ্মীর। পরিবারের কাছে।
সেই আসা-যাওয়ার পিছনে বাণিজ্য কি ছিল না? নিশ্চয়ই ছিল। বহুবার এমনও হয়েছে, শাল কেনা শেষ। তবু মানুষটা খোসগল্প করে চলেছেন চাচা চাচীর সঙ্গে। বলছেন নিজের মেয়ের কথা। গ্রামের কথা।
এর পর এক সময় সেই শালওয়ালার আসা বন্ধ হল। কেন জানা হয়নি কারওই। হঠাৎ এক বছর থেকে তিনি আর আসতেন না। তখন তো অত ঠিকানা নেওয়ার চল ছিল না। ফোন-টোনেরও ব্যাপার ছিল না। আর আমরা যেন ধরেই নিয়েছিলাম মানুষটা বছরের পর-বছর আসবেনই। কিন্তু তা হল না। এক বছর শীতের কুয়াশায় তিনি যে সেই মিলিয়ে গেলেন, তারপর আর কখনও তাঁকে আমরা দেখিনি।
এখন শীত এলে ছোটবেলার খেজুর রসের মতো মনে পড়ে সেই মানুষটাকে। মুখে হাসি। আমাকে দেখলে জড়িয়ে ধরতেন। তারপর পকেট থেকে এক মুঠো আখরোট বের করে হাতে ধরিয়ে দিতেন। উর্দুতে বলতেন, "তুমি খুব লম্বা হইয়ে গিয়েছ।"
বয়স বাড়ার পর এখন আরও বেশি করে বুঝতে পারি, ভালবাসার চেয়ে বড় আর কিছু হয় না। মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক তার মূলে তো ওই ভালবাসাই। তাই পড়ে পাওয়া চোদ্দা আনার মতো এই সব ভালবাসা জুড়ে-জুড়ে এগিয়ে চলে আমাদের জীবন। যে জীবন দোয়েলের। ফড়িংয়ের। মনে হয় জীবনে এর চেয়ে বেশি আর কিছু পাওয়ার নেই। পাওয়ার থাকে না।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০২৪ দুপুর ২:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


