somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

হায় শহীদ মিনার!

০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ দুপুর ১২:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হায় শহীদ মিনার!

"আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কী ভুলিতে পারি"-অবিস্মরণীয় এই গান গাইতে গাইতে একুশের ভোরে নগ্ন পায়ে প্রভাতফেরিতে অংশ নেয়নি এমন বাঙ্গালি খুঁজে পাওয়া ভার। একুশে ভোরের এই অনুভূতিটাই ভিন্ন। একাধারে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সীমাহীন গর্ব, অন্যদিকে ভাই হারানোর গভীর বেদনা। বাঙ্গালী মনের এই অনুভূতি আর ভাষা আন্দোলন তাৎপর্যকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে শহীদ মিনার। প্রতি ফেব্রুয়ারিতে মানুষের ঢল নামে এখানে। ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় গোটা চত্বর কিন্তু সারাবছর কেমন থাকে এই মিনার?

শহীদ মিনারের বর্তমান অবস্থা নিজের চোখে দেখার পরও বিশ্বাস হতে চায় না। তবু এক অপ্রিয় সত্যকে বিশ্বাস করতে হয়। ভাষা আন্দোলনের গৌরব গাঁথার প্রতীক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবসে ভাষাবীরদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতে ফুলের মালা হাতে আসেন দেশের দিন মজুর থেকে প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত-সব ধরনের মানুষ। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কী ভুলিতে পারি গাইতে গাইতে প্রভাত ফেরীতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয় শিশু থেকে বৃদ্ধ। দেখলে গর্বে বুক ভরে যায়। শহীদ মিনারে ফুল দিতে আসেন বিদেশী কূটনীতিকরাও। ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় গোটা আঙিনা। ভাই হারানোর গভীর বেদনায় মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সীমাহীন গর্বে প্রতিবছর দিনটিকে স্মরণ করে প্রতিটি বাঙ্গালী।

একুশের চেতনাকে ঘিরে বিকশিত হয়েছে দেশের শিল্প সাহিত্য। বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে একুশে ফেব্রুয়ারি এবং তার আগে প্রস্তুতির দু'দিন ও পরের দু'দিন এই পাঁচদিন বাদ দিলে বছরের অবশিষ্ট ৩৬০ দিন কেমন থাকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার! ঝরাপাতা, চীনাবাদামের খোসা, পোড়া বিড়ি সিগারেট, পলিথিনের ছেঁড়া ব্যাগ, চানাচুর-চিপ্সের খালি প্যাকেট, ছেঁড়া ঠোঙ্গা, কাকের পায়খানা, ব্যবরুত কন্ডম, ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয় মিনার চত্বর। পরিচর্যাহীন বিবর্ণ পোলিও রোগীর মত শহীদ মিনার।

দেখা গেল, শহীদ মিনারের পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করে জুতা পায়ে মিনারের মূল বেদীতে উঠে এক ভদ্র লোক(!) তার ছেলেকে সাইকেল চালনা শেখাচ্ছে। বেদীর উপর এখানে ওখানে ঘুমিয়ে আছে বেশ কয়েকজন ছিন্নমুল মানুষ। মূলবেদীর দেয়ালে বসে ঝালমুড়ি খাচ্ছে কেউ কেউ। মুড়ি ছিটিয়ে কাক জড়ো করছে এক সুবেশী মেয়ে আর তার ছেলে বন্ধু। একদিকে আপত্তিকর ভঙ্গিতে বসা প্রেমিক যুগল। একজন পাহাড়াদার ছাড়া শহীদ মিনার পরিচ্ছন্ন রাখা ও পবিত্রতা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত গণপূর্ত অধিদপ্তরের কোন একদিনও খুঁজে পাওয়া যায়না। শহীদ মিনার সংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে রয়েছে হযরত তেলশাহর মাজার। আগে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে মাজার থেকে শহীদ মিনারে আসার পথ বিচ্ছিন্ন ছিল।

কাঁটাতারের বেড়া কবে যে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে তা কেউ বলতে পারে না। অভিযোগ পাওয়া যায়, নৈশ প্রহরী ও আলোর ব্যবস্থা না থাকায় রাতের শহীদ মিনার চত্বর আরো নোংরা, আরো কদর্য এমনকি ভীতিপ্রদ হয়ে ওঠে।

তেলশাহ মাজারের সাথে পথ উন্মুক্ত থাকায় শহীদ মিনার চত্বরে রাতের আঁধারে গাঁজার আসর বসে, হেরোইন ও ফেনসিডিল সেবীদের আড্ডা জমে, ভাসমান পতিতারা খদ্দের নিয়ে মূল বেদীতে উঠে আসে, আশপাশের ফুটপাথের বাসিন্দারা এবং নিশাচর মানুষ মলমূত্র ত্যাগ করে। একজন ঝালমুড়ি ওয়ালা জানান, দিনের চাইতে সন্ধ্যার পর বেচা-কেনা ভাল হয়। তবে রাতে এখানে যে সব কু-কাণ্ড ঘটে তা বলতে রুচিতে বাধে। মাঝে মাঝে টহল পুলিশ এসে বখরা নিয়ে চলে যায়।

একুশে ফেব্রুয়ারির একটি দিনকে কেন্দ্র করে পাঁচটি দিন পরিবেশ ভাল থাকলেও বছরের বাকি ৩৬০ দিন শহীদ মিনার চত্বরের পবিত্রতা বলতে কিছু থাকে না।

আমাদের উপস্থিতিতেই পুজো উপলক্ষে দুদিন আগে ঢাকায় আসা একটি ভারতীয় পরিবার এই শহীদ মিনার দেখতে এসেছিলেন। নোংরা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ঘুমন্ত মানুষ, দুরন্ত প্রেমিক প্রেমিকার নিলাজ চিত্র দেখে ভারতীয় পরিবারটি নীরবে দ্রুত শহীদ মিনার চত্বর ত্যাগ করে চলে যান।

অযত্ন-অবহেলার শিকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে যা দেখা গেছে, পীড়াদায়ক অনেক কথা বলা যায় না, লেখা যায় না। তবুও কবি আলাউদ্দিন আল আজাদের বিখ্যাত কবিতার ভাষায় বলতে চাইঃ

স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো
চারকোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো! যে-ভিত কখনো কোনো রাজন্য
পারেনি ভাঙতে
হীরের মুকুট নীল পরোয়ানা খোলা তলোয়ার
খুরের ঝটকা ধুলায় চূর্ণ যে পদ-প্রান্তে
যারা বুনি ধান
গুণ টানি, আর তুলি হাতিয়ার হাঁপর চালাই
সরল নায়ক আমরা জনতা সেই অনন্য।
ইটের মিনার
ভেঙেছে ভাঙুক! ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার আমরা জাগরী
চারকোটি পরিবার।

এ-কোন মৃত্যু ? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
শিয়রে যাহার ওঠেনা কান্না, ঝরেনা অশ্রু?
হিমালয় থেকে সাগর অবধি সহসা বরং
সকল বেদনা হয়ে ওঠে এক পতাকার রং
এ-কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
বিরহে যেখানে নেই হাহাকার? কেবল সেতার
হয় প্রপাতের মোহনীয় ধারা, অনেক কথার
পদাতিক ঋতু কলমেরে দেয় কবিতার কাল?
ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক। একটি মিনার গড়েছি আমরা
চারকোটি কারিগর
বেহালার সুরে, রাঙা হৃদয়ের বর্ণলেখায়।
পলাশের আর
রামধনুকের গভীর চোখের তারায় তারায়
দ্বীপ হয়ে ভাসে যাদের জীবন, যুগে যুগে সেই
শহীদের নাম
এঁকেছি প্রেমের ফেনিল শিলায়, তোমাদের নাম।
তাই আমাদের
হাজার মুঠির বজ্র শিখরে সূর্যের মতো জ্বলে শুধু এক
শপথের ভাস্কর।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০২৪ সকাল ১১:৪৮
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একান্ত ভাবনা

লিখেছেন মেহেদি হাসান শান্ত, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪০

একবার রিয়েক্টর ফিজিক্স ক্লাসে আমাদের একজন শিক্ষক বলেছিলেন, "এই দেশে আসলে সবাই সবার সঙ্গে বাটপারি করে।" কথাটা শুনে প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু যতদিন গেছে, চারপাশটা যতটুকু দেখেছি, ততই মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুর্ভিক্ষের আওয়াজ কি আমরা বাংলাদেশিরা শুনতে পাচ্ছি?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৪৩

মুচলেকা দিয়ে, গোপন সমঝোতা করে মীর জাফর কিংবা মীর কাসিমের মতো “কথিত ক্ষমতার” সিংহাসনে বসা যায় ঠিকই কিন্তু বসে বসে জনগণের সর্বনাশ দেখা ছাড়া তাদের বিশেষ কিছু করার থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সম্ভাবনার বন্দি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:১৮



বান্দরবান জেলা কারাগারের চারপাশে পনেরো ফুট উঁচু পাথর ও কংক্রিটের নিরেট প্রাচীর। তারও ওপরে পেঁচানো ধারালো কাঁটাতারের জাল।

বর্ষার কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে ৩ নম্বর ব্লকের সংকীর্ণ সেলে শান্ত হয়ে বসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাজার থেকে নৌকাবাইচ- এরপর কোথায়?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০

মাজার থেকে নৌকাবাইচ- এরপর কোথায়?
মাজার বিদ্বেষ, বাউলগান বিদ্বেষ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আপত্তি- এরপর কিছুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কলেমা লেখা পতাকা টানানো; আর এখন সিলেটের বিয়ানীবাজারে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে ঐতিহ্যবাহী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাবিতে "মব সায়েন্স" পড়তে হলে কী কী যোগ্যতা লাগে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:১৮



- রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তৌহিদী জনতার ব্যবহার করা জানতে হবে।

- রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও মবকে থামাতে না পারলে সেটাকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা না বলে "জনতার শক্তি" বলতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×