somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

বাবাকে খুব মনে পড়ে…

১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাবাকে খুব মনে পড়ে…

বাবাকে হারিয়েছি ত্রিশ বছর আগে।
ত্রিশ বছর- একজন মানুষের জীবনের কত দীর্ঘ সময়!
এই সময়ে কত মানুষ এসেছে জীবনে, কত মানুষ চলে গেছে। কত সম্পর্ক বদলেছে, কত ঠিকানা বদলেছে, কত আনন্দ-কষ্ট পেরিয়ে এসেছি।
শুধু একজন মানুষকে আর ফিরে পাইনি-
আমার বাবাকে।

ছোটবেলায় মনে হতো, বাবা তো আছেনই।
বাবাই সবকিছুর সমাধান।
তখন বুঝিনি- একদিন এমন একটা দিন আসবে, যখন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের মানুষটিকেই আর কোথাও খুঁজে পাব না।

আমার বাবা ছিলেন বিমান বাহিনীর উর্ধতন কর্মকর্তা। দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, কঠোর শৃঙ্খলা- কিন্তু সন্তানের প্রতি ভালোবাসায় ছিলেন অসম্ভব কোমল।
আমি তখনও টিনএজ পূর্ণ করিনি।
সৎ মায়ের সংসারে টুকটাক মনোমালিন্য হতো। কিশোর বয়সের অভিমানও ছিল। একদিন পরিবারের কিছু দুঃখ-অভিযোগ নিয়ে বাবার কাছে গিয়ে অনেক কথা বলেছিলাম।
বাবা চুপ করে শুনেছিলেন।
তারপর কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন-
“Except for life-threatening diseases, all other issues are only as big as you make them.”
সেদিন কথাটার গভীরতা বুঝিনি।
আজ বুঝি।
জীবনে কত ছোট ছোট কষ্টকে আমরা বিশাল করে ফেলি!
কত মানুষের কথা মনে রেখে নিজের শান্তি নষ্ট করি!
কত অভিমান বুকের মধ্যে জমিয়ে রাখি!
বাবা সেদিনই বলে ছিলেন-
“জীবনকে কষ্টের চেয়ে বড় হতে দিও।”

আরেকদিন অভিমান করে বাবাকে বলেছিলাম-
“I don’t want to return home even after the college vacation. Will you mind if I stay in a hotel during the break?”
বাবা রাগ করেননি।
শুধু বলেছিলেন-
“I won’t mind, but if you don’t come home, a walkover will be given to your opponent. That’s what they want. Now, it’s your decision.”
কী আশ্চর্য মানুষ ছিলেন আমার বাবা!
তিনি আমাকে শুধু ঘরে ফিরতে বলেননি।
তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন- জীবনের লড়াই থেকে পালিয়ে যেও না।
কারণ তুমি সরে দাঁড়ালে, তোমার প্রতিপক্ষকে জয়ী হতে লড়াই করতেই হবে না।

আজ জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে এসে বাবার কথাগুলো নতুন করে বুঝি।
হিংসা দিয়ে মানুষ অন্যকে পোড়াতে চায়- শেষ পর্যন্ত নিজেই পোড়ে।
অহংকার দিয়ে অন্যকে ছোট করতে চায়- শেষ পর্যন্ত নিজের শূন্যতাই প্রকাশ পায়।
অভিমান করে মানুষ সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যায়- পরে বুঝতে পারে, হারানো সময় আর ফিরে আসে না।
আর সবচেয়ে কষ্টের সত্য-
যে মানুষটাকে খুব সহজেই ফোন করা যেত, একদিন সেই মানুষটির জন্য শুধু দোয়া করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।
বাবা, আপনাকে হারানোর পর এই কথাটা খুব ভালো করে শিখেছি।
আজ আমার অনেক কিছু বলার আছে আপনার কাছে।
কিন্তু আপনি শুনবেন না। আজ কোনো কঠিন সিদ্ধান্তের আগে আপনার পরামর্শ নিতে ইচ্ছে করে।
কিন্তু আপনি বলবেন না-
“Now, it’s your decision.”

জীবন পরিক্রমায় কখনো খুব ক্লান্ত হয়ে পড়লে মনে হয়, আপনার কাছে গিয়ে একটু বসি।
কিন্তু সেই ঘরটা আর নেই।
সেই চেয়ারটাও নেই।
সেই কণ্ঠস্বর নেই।
শুধু স্মৃতিটা আছে।
আর আছে মাথার ওপর অনুভব করা সেই হাতটা…
যে হাতটি ত্রিশ বছর আগে সরে গেছে, অথচ আজও আমার মাথার ওপর থেকে সরেনি।

বাবা, জানেন?
আপনার মৃত্যুর পর অনেকবার কেঁদেছি।
আবার অনেকবার কাঁদতে পারিনি।
সবার সামনে শক্ত থেকেছি।
কিন্তু একাকী খুব কেঁদেছি...
গভীর রাতে, সবাই যখন ঘুমিয়ে গেছে, তখন কখনো কখনো মনে হয়েছে-
আমি আবার সেই ছোট্ট ছেলেটা হয়ে গেছি।
বাবাকে ডাকতে ইচ্ছে করছে।
শুধু একবার।
“বাবা…”
কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসে না।
এই নীরবতাটাই বাবা হারানোর সবচেয়ে বড় কষ্ট!

প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আপনাকে মনে করি।
বলতে ইচ্ছে করে-
বাবা, আপনার ছেলে এখনও আপনার শেখানো পথেই হাঁটার চেষ্টা করছে।
সবসময় পারিনি।
ভুল করেছি।
হোঁচট খেয়েছি।
কখনো ভেঙেও পড়েছি।
কিন্তু আপনার শেখানো কথাগুলো আমাকে বারবার উঠিয়েছে। আজ যদি আপনি একবার ফিরে আসতেন-
হয়তো কিছুই বলতাম না।
শুধু আপনার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতাম।

বাবা,
আপনি চলে যাওয়ার সময় আমি জানতাম না- একদিন আপনাকে এতটা প্রয়োজন হবে। তখন বুঝিনি, বাবাকে হারানো মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়-
নিজের শৈশবের একটা বড় অংশকে হারানো।
নিজের নিরাপদ আশ্রয়টাকে হারানো। পৃথিবীতে নিজের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানুষটিকে হারানো।
ত্রিশ বছর হয়ে গেল।
তবু আজও মনে হয়-
আপনি যদি আর একবার ফিরে আসতেন!
আর একবার যদি বলতে পারতাম-
“বাবা, আপনার কথাগুলো তখন বুঝিনি।
আজ বুঝি।
খুব বুঝি।”
তারপর আপনার বুকে মুখ লুকিয়ে একটু কাঁদতাম।
অনেকক্ষণ কাঁদতাম।
কারণ বয়স যত বাড়ে, তত বুঝতে পারি-
বাবার কাছে ফিরে গিয়ে কাঁদার মতো নিরাপদ জায়গা পৃথিবীতে আর কোথাও নেই।

বাবা,
আপনি নেই-
আপনার শিক্ষা আছে।
আপনার কণ্ঠ নেই-
তবু আপনার কথাগুলো আজও আমার ভেতরে বাজে।
আপনার হাত নেই-
তবু সেই হাতের স্পর্শ আজও অনুভব করি।
আর আমার হৃদয়ের সবচেয়ে নরম জায়গাটুকুতে-
আজও আপনি বেঁচে আছেন, বাবা।
আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুন-
সেই অনন্ত জগতে।
আপনাকে প্রতিদিন মনে করি-
খুব।
অসম্ভব রকমের খুব।

হে আল্লাহ,
আমার বাবার জীবনের সব ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিন।
তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন।
তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ স্থান দান করুন।
রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগীরা।
“হে আমার রব, তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।”
আমিন।


(বাবার একত্রিশতম মৃত্যু দিবস উপলক্ষে পুরনো লেখা- যতসামান্য পুনর্লিখন)
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৬
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রবাদ প্রবচন ও আলী ভাইয়া, জী এস ভাইয়া, খায়রুলভাইয়া ও সত্যপথিকভাইয়াদের পোস্ট..... এই আমি অপ্সরা

লিখেছেন অপ্‌সরা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২২


এই অপ্সরা শুধু একটা নিকই না। জীবনের একটা অংশের নাম। জীবনটা শুরু হয়েছিলো যবে থেকে তার পর ৫/৬ বছর থেকেই জীবনের নানা ক্ষনের নানা মানের উদ্দেশ্য বিধেয় ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ গত কয়েক বছর ধরে অতিমাত্রায় স্বার্থপর হয়ে গেছে! আগেই কি ভালো ছিলাম?

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৬



মানুষ গত কয়েক বছর ধরে অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক বা স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে! আগে এমনটা দেখা গেলেও গত কয়েক বছর এটা অতি বেশিমাত্রায় দেখা যাচ্ছে। কেন??

দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশি খারাপ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Somewhereinblog.net: বাঁধ ভাঙ্গার আওয়াজ থেকে ডিজিটাল পাবলিশিং এ পরিনত করে সাবলম্বি করার লক্ষ্যে একটি খসড়া প্রস্তাবনা ।

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৯


একজন নিয়মিত ব্লগার হিসেবে প্রতিদিনই লক্ষ্য করি, Somewhereinblog.net (সামু) বাংলা সাহিত্য, অভিজ্ঞতা ও তথ্যভিত্তিক লেখার এক বিশাল আর্কাইভে পরিণত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি কঠিন বাস্তবতাও সামনে এসেছে সোশ্যাল মিডিয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

অটো কে বন্ধ করা যাবে না।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫১




অনেক দিন আগের কথা। ২০১৫ সালের ঘটনা। তখন আমি মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়ায় থাকি এবং অনার্সে পড়াশোনা করি। পড়তাম পাশের উপজেলা সোনারগাঁওয়ের সোনারগাঁও সরকারি কলেজে। প্রতিদিন কলেজে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ ডেভেলপমেন্টে করণীয় কি?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬



গত কয়েক বছর ধরে সামহোয়্যারইন ব্লগ সহ দেশের সকল পত্রিকা ও টিভি চ্যানলে রাজনৈতিক লেখা বেশি আসছে যা সকলের কাছে ভালো লাগার বিষয় না। রাজনীতি ভালো লাগবে শুধুমাত্র জেনজি’দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×