somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

যুলকারনাইন
আমার কি দোষ,আমি তো মানুষ !!

বছরের প্রথম গল্পঃ "এ রাত এখনো অনেক বাকি"

৩১ শে ডিসেম্বর, ২০১৪ রাত ১১:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


A.
পায়ে ঠান্ডা তরলজাতীয় কিছু লাগতেই সড়াৎ করে হাঁটু মুড়ে ফেললাম। পায়ে লেগে আছে সেই তরল। হাত লাগিয়ে দেখি গাঢ় লাল রক্ত। নিচে চেয়ে দেখি চেয়ারের নিচ থেকে শুরু করে দরজা পর্যন্ত পুরো ফ্লোর জুড়ে রক্ত। বিছানার পাশে লাল টকটকে সেই রক্তের সাগরে নিথর দুটি নরনারীর দেহ পড়ে আছে। পুরুষের হাত বাঁধা দেহে বুকের কাছে ছুরি আটকে আছে,নারীদেহটি উপুড় করা। পুরো পেটটাই যেন কেটে ফেলেছে গেঞ্জি আর শর্টস পরিহিত শরীরটির।


জীবনে চোখের সামনে এত রক্ত আগে কখনো দেখিনি। এমনিতেই সামান্য হাত কাটলে মাথা চক্কর দেয় আমার। এখন এত রক্ত আর দুই মৃতদেহ দেখে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আমার সারা শরীর হিম হয়ে যাচ্ছে। পা যত মুছে ফেলার চেষ্টা করি রক্ত ততই চেয়ারে লেগে যাচ্ছে। হাতের আঙ্গুলের ফাঁক গলে রক্ত কবজি গড়িয়ে চলে যাচ্ছে নিচের দিকে।
অতঃপর আমি বেহুঁশ হয়ে গেলাম।

B.
ঘুম ভেঙ্গে গেল সাথে সাথেই। কিছুক্ষণ দম মেরে শুয়ে থেকে বুঝার চেষ্টা করলাম কোথায় আছি। ডান পাশে দেয়ালে ঝুলছে ক্যালেন্ডার,সিলিংয়ে ঘুরছে চারপাখার ফ্যান। সেই ফ্যানের বাতাসে ক্যালেন্ডারের পাতা উড়ছে। মাথার উপরে জানালার ফাঁক গলে আসছে সোডিয়াম বাতির আলো। হয়তো নিচে গণিমিয়া স্বভাবসুলভ ঝিমুচ্ছে। বা’পাশে এটাসড টয়লেটের দরজা খোলা,আজকেও লাগাতে ভুলে গেছি। টেবিলে ল্যাপটপের পাওয়ার বাটনটা মিটমিট করছে। ব্যাটারীটা এবার না গেলেই নয়।
নিজের রুমে বিছানায় শুয়ে আছি আমি।
ঘড়িতে বাজছে ২টা ৩৭ এম।

C.
দো’তালা থেকে সিড়ি বেয়ে নিচে নামবার আর জো নেই। সিড়িতে গিজগিজ করছে মানুষ। কম করে হলেও শ’খানেক। কিশোরী-তরুণী-মহিলা,পুরুষ আর তরুণ;একসাথে বলতে গেলে মানুষ বাদে আর কোন ভাল বিশেষণ পাইনা। সবাই বেরুতে চায়। এমন কি আমার পিছনে ধাক্কাধাক্কি করে ক্রমাগত বাড়তে থাকা ভীড়টাও বেরুতে চায় এই ভবন থেকে। আজকে কাজে না আসলে এ মাসের বেতন দেবে না তাই সবাই এসেছিল। এখন বেরিয়ে যেতে পারলেই বাঁচে। নিচে কলাপ্সিপল গেটটা কেন যে খুলছে না।
হঠাৎ মনে হল চোখের সামনে দেয়ালটা দুলে উঠলো। এরপর মনে হল অনেক নিচে কোথাও তলিয়ে যাচ্ছি। চারিদিকে প্রচন্ড ভয়ার্ত চিৎকার আর আর্তনাদ এর শব্দ।
তাহলে কি পিলারগুলো সব একসাথে ধ্বসে গেল !!


D.
আবার ঘুম ভেঙ্গে গেল দুঃস্বপ্নে। রুমের সবকিছু আগের মতই আছে। আমি শুধু গায়ের কাঁথাটা অষ্টপাশে পেঁচিয়ে ফেলেছি বেকায়দায়। কেমন জট পাকানো অবস্থা হয়েছিল। পা দিয়ে বিছানার চাদর ঠিক করার বৃথা চেষ্টা করতে করতে গায়ের নতুন করে কাঁথাটাকে জড়িয়ে নিলাম। পুরো মাথা ডেকে জবুথবু হয়ে শুয়ে আছি। ঘুমানোর চেষ্টা চলছে। রাত এখনো গভীর হচ্ছে।
ঘড়িতে এখন দু’টা চুয়াল্লিশ বাজে।

E.
জবুথবু বসে আছি এক চটপটি দোকানের আড়ালে। দূর থেকে বাঁশির শব্দ আর অনেকগুলো এলোমেলো টর্চের আলো ক্রমাগত সামনে এগিয়ে আসছে। আমি হাঁটু জড়িয়ে ধরে প্রাণপণ চেষ্টা করছি চটপটির এই ভ্যানের সাথে মিশে যেতে। জানিনা আমাকে দেখতে পেলে ওরা কি করবে,তবে অজানা কোন শংকায় বুকের ভেতরটা শুকিয়ে যাচ্ছে। সোনালী ব্যাংকের সিড়িতে অনেককেই মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেছি।
অনেকগুলো বুটজোড়ার আওয়াজ ক্রমান্বয়ে সামনে এগিয়ে আসছে। এলোমেলো টর্চের আলো দেখে বুঝা যায় ওরা খুব বেশি দূরে নেই। হঠাৎ হুইসেলের আওয়াজকে দমিয়ে খুব কাছেই দুটো কুকুর ডেকে উঠলো। ঠিক কেন জানি বলতে পারবো না, আমি আড়াল থেকে বেরিয়ে দৌঁড় লাগালাম।
পিছনে একসাথে অনেক গুলো কন্ঠস্বর “ঐতো ধর,ধর” বলে ধাওয়া করা শুরু করলো। আমিও জীবনবাজি রেখে দৌঁড়াচ্ছি। গায়ের পাঞ্জাবীটা যেন হাঁটুতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। আমি ছুটছি,পিছনে কুকুর।
হঠাৎ একসাথে কয়েকটা গুলি হলো।


F.
এবার ঘুম ভাঙ্গতেই উঠে বসলাম। ঘড়ির কাঁটায় এখন তিনটা এক। আজ কত তারিখ? ২২ ডিসেম্বর তো এই সেদিন গেল। বছরে কি আজকাল বৃহত্তম রাত দুইটা হওয়া শুরু হলো নাকি ?? আজকের রাতটা এত বড় কেন ??
টেবিলে রাখা পানিটুকু খেয়ে নিলাম। অন্য সময় নতুন করে পানি এনে রাখি। আজ আর অন্য রুমে যেতে মন চাইছে না। কি অন্ধকার ঐদিকে।

G.
বিস্তৃণ জলরাশি ভেদ করে এগিয়ে চলছে আমাদের ট্রলার। দুই পাশে সুন্দরীর বন নোনা জলের বুকে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। ট্রলারের শ্যালো ইঞ্জিনের বিকট শব্দ ছাড়া এই স্বপ্নের বাকি সব ঠিক আছে। কে যেন বলল আর কিছু দূর গেলে স্মরণখোলা। সামনের দিকে তাকিয়ে আছি,ট্রলার এগিয়ে চলছে। বাতাস কেটে কেটে যাচ্ছে শরীর দিয়ে। শরীরে কেমন তেল চিটচিটে ভাব।
ও কি !! সারা শরীরেই তো তেল। এত তেল এলো কোথা থেকে? যত ঝেড়ে ফেলি ততই যেন বাড়ছে। এত একটু আগী দুঃস্বপ্নে দেখা রক্তের মতই বাড়ন্ত।
কি বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা।


H.
গেঞ্জিটা সেঁটে আছে গায়ের সাথে। একেবারে ঘেমে নেয়ে উঠেছি। গায়ে থেকে খুলে খাটের সাথে মেলে দিলাম। গায়ে তো জ্বর ছিল না, এভাবে ঘেমে উঠলাম কেন !!
ধুত্তরি,রাতটাই বেজার কাটছে। উঠে টয়লেটে গেলাম। এবার মনে করে দরজাটা আটকিয়ে শুতে আসলাম। এখনো মাত্র রাত তিনটে সতেরো হতে চলল। ল্যাপটপটা অফ করে দেয়া হয়নি। উঠে অফ করে দিলাম। আজকের রাত কি শেষ হবে না ?
ডাক্তার বন্ধুটারে একটা কল দিয়ে দেখা যায়,সাউন্ড স্লিপের কোন থেরাপি জানা যায় নাকি। কিন্তু ব্যাটা তো কল-ই উঠায় না। থাক,এত রাতে বেচারাকে জ্বালাতন না করি।
কি আর করবো,কাঁথা মুড়ি দিয়ে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করা যাক।

I.
কি রে !! কই আমি !! হাঁটু আর শরীর নাড়াচাড়া করতে পারি না কেন !! এ কিসের ভেতর আমি বন্দি !! কে আমাকে এখানে আটকিয়েছে !!
মাথার উপরে তাকালে অনেক দূরে কোথাও আলো আছে মনে হয়। নিচে তো তাকাতে পারছি না। তবে কোথাও ব্যাঙ ডাকছে।
“বাঁচাও !! বাঁচাও !!”
আমার চিৎকার প্রতিধ্বনিত হয়ে আমার কাছেই ফিরে আসছে। কেউ কি শুনতে পাচ্ছে আমার সাহায্যের জন্য এই আকুতি। কেউ আসবে আমাকে এখান থেকে টেনে বের করতে ??
“বাঁচাও !! বাঁচাও !!”
এটাও কি কোন দুঃস্বপ্ন !! তাহলে এই স্বপ্ন ভাঙছে না কেন ??
তাহলে কি এ রাত এখনো অনেক বাকি ??

(সমাপ্ত)

সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জানুয়ারি, ২০১৫ রাত ১২:৪১
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কৈফিয়ত

লিখেছেন জটিল ভাই, ১১ ই আগস্ট, ২০২২ রাত ১:০০


(ছবি নেট হতে)

আউযুবিল্লাহিমিনাশশাইত্বোয়ানিররাজিম।
বিসমিল্লাহিররাহমানিররাহিম।
আসসালামুআলাইকুম।

উপরের মত করে সূচনা যাদের নিকটে বিরক্তিকর মনে হয়, তাদের নিকট ক্ষমা প্রার্থণা করে বলছি,

এভাবে শুরু করার ফলে আমার বিভিন্ন সুবিধা হয়ে থাকে। যেমন ঐ অংশটা লিখার... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাপিত জীবনঃ কি যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।

লিখেছেন জাদিদ, ১১ ই আগস্ট, ২০২২ রাত ১:১৪

১।
মেয়েকে রুমে একা রেখে বাথরুমে গিয়েছিলাম। দুই মিনিট পরে বের হতে গিয়ে দেখি দরজা বাইরে থেকে লক। পিলে চমকে উঠে খেয়াল করলাম পকেটে তো মোবাইলও নাই। আমি গেট নক... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বপ্নরচিত গল্পনাটক

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ১১ ই আগস্ট, ২০২২ রাত ১:৪৪

গত কয়েকদিন ইউটিউবে প্রচুর নাটক দেখেছি। বেশিরভাগই কমেডি ড্রামা, অল্প কিছু ছিল সামাজিক নাটক। নাটক দেখার পর মন জুড়ে আনন্দের রেশ জেগে থাকতো। সেই রেশ এভাবে স্বপ্নেও স্থান করে নিবে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেঘের অক্ষর, ইতিউতি এবং অন্যান্য

লিখেছেন জুনায়েদ বি রাহমান, ১১ ই আগস্ট, ২০২২ ভোর ৪:৩৫

'ইতিউতি'


সন্ধ্যাতারা কলি মেলেছে মোহনকান্দার আকাশে
বাতাসে লকডাউনের ভাপসা গন্ধ আর নিশিতা বড়ুয়ার বিরহী সঙ্গীত-

'বন্ধু তোমায় মনে পড়ে, বন্ধু তোমায় মনে পড়ে....'

রুমমেট ডুবে আছে বিরহী রোমান্টিসিজমে।

আমি পাঠ করছি অতন্দ্রিতার সংসারকাব্য- মেঘের স্মৃতিকথা...
করোনার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোটিপতি এবং বাংলাদেশীদের সুইস ব্যাংকের হিসাব।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১১ ই আগস্ট, ২০২২ বিকাল ৩:১৮



স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি আমানতকারী ছিল ৫ জন। ১৯৭৫ সালে তা ৪৭ জনে উন্নীত হয়। ১৯৮০ সালে কোটিপতি হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ৯৮টি। এরপর ১৯৯০ সালে ৯৪৩টি, ১৯৯৬... ...বাকিটুকু পড়ুন

×