খুব মনোযোগের সাথে পঞ্চম বারের মত একটা এফোর সাইজে শিট পড়ছে জিওন। কালো কালো ইংরেজি হরফের লেখাগুলোর মর্ম অনুধাবনের সম্ভবত এটা শেষ চেষ্টা। কাগজটার শুরুতেই মোটা হরফে লেখা আছে- ‘Question for the Degree of BSc Food Engineering ; Level-4, Semester-2 (Jul-Dec/2014)/Final Examination’ । প্রশ্নপত্রের এ অপ্রয়োজনীয় অংশটা এর আগে কোন দিনই পড়ে সময় নষ্ট করেনি জিওন। কিন্তু আজ জিওনের দৃষ্টি আটকে আছে এখানেই, নিচে নামছে না। নিচে নেমে যে কোন লাভ হবে না সেটা অনেক আগেই বুঝেছে সে। অনার্স লাইফের শেষ পরীক্ষা আজ। পরীক্ষা শেষ হলেই লাগেজ গুছাতে হবে জিওনকে। কয়েকজন বন্ধু মিলে কক্সবাজার যাবে। বেকার হওয়ার প্রথম দিনটা একটু ভিন্নভাবে সেলিব্রেট করার ইচ্ছা ওদের।
‘দেখি বাবা তোমার খাতাটা?’ জাবেদ স্যার খাতা সাইন করার জন্য স্যার এসেছেন। একগুচ্ছ সাদা দাড়ি আছে জাবেদ স্যারের। দেখলেই কেমন যেন সম্মান করতে ইচ্ছে করে। স্যারকে সালাম দিয়ে ভয়ে ভয়ে খাতাটা এগিয়ে দেয় জিওন।
‘আইডি লেখনি কেন? আইডি না লিখলে তো খাতা বাতিল হয়ে যাবে!’ জাবেদ স্যার উদ্বেগের সাথে খাতাটা এগিয়ে দেয়।
অস্ফুট একটা শব্দ বের হয় জিওনের মুখ থেকে- ‘যাক...!’
- ‘কিছু বললে?’
- ‘না স্যার। প্রশ্ন পেয়ে আর কিছু মনে ছিল না’
- ‘পাগল ছেলে! প্রশ্ন ভালো হয়েছে নিশ্চয়?’
- ‘জ্বি স্যার।’
স্যার আলতো করে পিঠ চাপড়িয়ে দেয় জিওনের। খচ কচ করে Montblanc ব্রান্ডের কলমটা দিয়ে আইডি লেখে জিওন। কলমটা গতকালই পৃথা গিফট করেছে ওকে। পৃথার প্রথম গিফটার উদ্দেশ্য এভাবে ব্যর্থ হচ্ছে বলে খারাপ লাগছে জিওনের।
জীবনে খারাপ পরীক্ষা কম দেয়নি জিওন। কিন্তু এমন পরিস্থিতি কোনদিনই হয়নি। ক্লাস সিক্সের প্রথম ইংলিশ পরীক্ষার কথা মনে পড়ছে ওর। পরীক্ষা দেয়ার আগেই জানত ফেল করবে সে। স্যার ক্লাসে সম্ভাব্য প্রশ্ন বলে দিতেন তবুও দলবেঁধে ফেইল করত সবাই। কিন্তু সেবার ৩৪ পেয়ে পাশ করেছিল জিওন। একাই। কিন্তু এবার বোধহয় সেটাও সম্ভব না।
স্যারের কোন দোষ নেই। স্যার ক্লাসে বলেই দিয়েছিলেন ‘এবার কিন্তু প্রশ্ন কঠিন হবে!’ মজা করে উত্তর দিয়েছিল জিওন-‘প্রশ্ন তো কঠিনই হয় স্যার! কাগজ কঠিন, প্রশ্নও কঠিন!’ উত্তর শুনে স্যার মুচকি হেসে বলেছিলেন- ‘প্রশ্ন ভালো হয়েছে। আশা করি তোমরা কেউ ফুল এন্সার করতে পারবে না!’ কথাটাকে সেদিন উড়িয়ে দিয়েছিল জিওন কিন্তু আজ এর মর্ম হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সে। ‘প্রশ্ন ভালো হয়েছে!’
না, প্রশ্ন ভালো হয়নি। কিন্তু তাতে তো ফুল এন্সার আটকানোর কথা না। লেখা শুরু করে জিওন। পৃথার দেয়া কলমাটার সঠিক ও পরিপূর্ণ ব্যাবহার যাকে বলে। এক থেকে সাত নম্বর পর্যন্ত নন স্টপ হিটে লিখে যায় সে। উত্তর না, প্রশ্ন! না, এ ফোর কাগজটি নকল করেনি জিওন। গত তিনদিন ধরে যা পড়েছিল সেগুলো থেকে একটা সুন্দর প্রশ্ন সাজিয়েছে সে। যে প্রশ্ন বোঝা যায়, লেখা যায় এবং লিখে পাশ করা যায়।
পরীক্ষা শেষ। কয়েকজনের মুখ ছাড়া সবার মুখ কালো। জিওন একে একে তানভির, পিয়াস এবং লেবিনের দিকে তাকায়। কালো কালো এবং কালো! Cox’s Bazar trip has been cancelled successfully! মানে কক্সবাজার যাওয়া বন্ধ। তবে জিওনকে এবার চিল্লায় যেতে হবে! চল্লিশ দিনের চিল্লা; বেকার হবার শেষ প্রচেষ্টা!
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে এপ্রিল, ২০১৪ রাত ৯:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



