somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছিনতাইকারীর সাথে একদিন

২৩ শে এপ্রিল, ২০১৪ রাত ১১:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বছর তিনেক আগে একবার ছিনতাইকারীর কবলে পরেছিলাম। কোচিং নামক ভর্তিবিদ্যালয়ের পাঠ চুকে গেছে। ঢাকার ঢাকনীর নিচে অলস সময় কাটাতে কাটাতে মোটামুটি ক্লান্ত। বিশুদ্ধ অক্সিজেনের লোভে দূষিত ফুসুফুস বাড়ি যাবার জন্য সময়ে অসময়ে তাগাদা দিচ্ছিল। অবশেষে এক শুভ দুপুরে বিশাল এক ব্যাগ হাতে ফার্মগেটে হাজির হলাম। কিন্তু দুপুরটা শুভ হল না। আধা ঘন্টার চেষ্টায় কোন বাস না পেয়ে অবশেষে মিরপুর-১ এর একটা মুড়ির টিনে উঠে ঝুলতে লাগলাম। চলন্ত মুড়ির টিন হালকা স্লো করে আমাকে কল্যাণপুরে নামিয়ে দিল। দেরী অনেক হয়ে গেছে। দ্রুত টিকেট কাউন্টারের দিকে হাঁটছি। সামন থেকে একজন হাক ছাড়ল –‘এই যে ব্যাগওয়ালা ভাই! পেছনে আপনাকে ডাকছে’। কথাটা কানে তুললাম না। ‘ছোট ভাই দাঁড়াও! এতক্ষণ ধরে যে ডাকছি শুনতে পাওনা?’ পেছন ফিরে দেখি আমার সেই অনুসন্ধানকারী একজন চেলা সহ আক্রমনাত্নক ভঙ্গী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

- দেখে শুনে পথ চলতে পার না? আমার পায়ে পারা দিয়ে আসলে কেন?
- সরি ভাইয়া। বুঝতে পারিনি
- আমি যে পায়ে দুঃখ পেলাম তার কি হবে?

দুঃখপ্রাপ্তের দুঃখ প্রশমনের জন্য তৎক্ষণাৎ কোন উপায় খুঁজে পেলাম না। তাই হতভম্ভ হয়ে ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

- ছোট ভাই থাক কোথায়?
- ফার্মগেটে

বড় ভাইয়ের চেলা বুক ফুলিয়ে সামনে এসে সিনেমার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, - ‘বড় ভাইকে চেন?’
কনফিডেন্সের সাথে ডানে বায়ে মাথা নাড়ালাম।
ভাই মনে হয় হালকা অপমানিত হলেন।
‘আমাকে কোথাও দেখনি? পেপার-পত্রিকা? রেডিও- টেলিভিশন কোথাও না?
কনফিডেন্স লেভেল আরেকধাপ বাড়িয়ে পরিষ্কার কন্ঠে বললাম- ‘নাহ!’
ভাই রেগে গেলেন- ‘গতবার বাংলা কলেজে পাঁচটা মার্ডার হইছিল মনে আছে? মার্ডার গুলা আমি করছিলাম!’
হাসি পেল। কষ্ট করে হাসি চেপে কৃত্রিম বিস্ময় নিয়ে বললাম- ‘ও... জানতাম না তো!’

কই থেকে যেন একটা কোর্ট-টাই পড়া ভদ্রলোক এগিয়ে এল। বড় ভাইকে সালাম দিয়ে কন্ঠ দিয়ে উদ্বেগ স্প্রে করল- ‘ভাই কোন সমস্যা? কিছু করতে হবে?’
‘আরে না। ছোট ভাইয়ের সাথে কথা বলছি’ – ভাই বিষয়টাকে বাতাসে উড়িয়ে দিলেন!

সুযোগটা কাজে লাগালাম। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বললাম,- ‘আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগল। বাসের দেরী হয়ে যাচ্ছে। আমি যাই’

- বাসা কই তোমার?
- রংপুরে।
- পথে ঘাটে অনেক বিপদ আপদ হতে পারে। আমার ফোন নাম্বারটা রাখ। বিপদে পড়লে ফোন দিও

বুঝলাম বড় ভাই আমার ফোন দেখতে চায়। ব্যাগ খুলে কাগজ বের করার অপচেষ্টা চালালাম।

- কাগজ খোঁজ কেন? সাথে ফোন নেই?
- না ভাই!
- ঐ মিথ্যা বলিস ক্যান? পকেটে ওটা কি?

আমার মিথ্যা বলার প্রতিভায় নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। পকেট থেকে আমার মহামূল্যবান নোকিয়া-১৬০০ সেটখানা বের করলাম। বড় আবার রেগে গেছেন। আমার হাতটা ধরে ওনার কোমরে রাখা পিস্তলটা স্পর্শ করিয়ে বললেন, -‘আমার সামনে মিথ্যা বললি ক্যান? আমি যদি এখন ঠুস করে তোর খুলিটা উড়িয়ে দেই কেউ তোকে বাঁচাতে আসবে?

আশেপাশের মানুষ গুলোর দিকে তাকালাম। বড় ভাইয়ের চেলা ছাড়া কেউ আমার দিকে তাকিয়ে নেই। একটু ভয়ে ভয়ে বললাম- ‘সরি ভাই!’

- পকেটে কয় টাকা আছে বের কর!

পকেট ঝেড়ে ঝুড়ে যা পেলাম বের করলাম। বড় ভাই অভয় দিলেন – ‘তুই আমাকে যে রকম ভাবছিস আমি তেমন কেউ না। আমি তোর টাকা ফোন কিছুই নেব না। তোর টাকা তুই গোণ’।

টাকা গুণলাম। মোটেই ৮৩০ টাকা!

- তোর ব্যাগে আরো টাকা আছে।

ব্যাগটা এগিয়ে দিয়ে বললাম,- ‘বিশ্বাস না হয় তো চেক করে দেখেন!’

- তোর বিশ্বাস নেই। শুরুতেই মিথ্যে বলেছিস! দে টাকা আর ফোনটা আমার হাতে দে।

বড় ভাইয়ের আদেশ সাথে সাথে পালন করলাম।

- তুই যে এতক্ষণ আমার সাথে বেয়াদবী করলি এজন্য যদি আমি এগুলো আমার কাছে রেখে দেই তোর কোন আপত্তি আছে?
- আপত্তি থাকবে কেন? আপনি বড় ভাই হিসেবে রাখতেই পারেন। কিন্তু ভাইয়া সিমগুলো যে আমার দরকারী। অ্যাডমিশনের জরুরী কিছু মেসেজ আছে!

ফোনের পেছনে তিনটি ও ভিতরে একটি সিম ছিল। বড়ভাই ফোন খুলে রীতিমত অবাক হলেন। শাসনের দৃষ্টিতে কড়মড় করে তাকিয়ে সিমগুলো আমার হাতে দিলেন।

ভাই কথা শুনছেন! ঝোপ বুঝে আরেকটা কোপ দিলাম,- ‘ভাইয়া আমার কাছে তো কোন টাকা নেই। বাড়ি যাব কি করে?’

ভাই পড়লেন বিপদে। একডজন সাঙ্গ পাঙ্গর দিকে তাকিয়ে হাতের টাকাটা আরেকবার গুনলেন।
তারপর আমার হাতে হাতে দশটাকার তিনটে নোট গুজে দিয়ে বললেন, -‘সোজা কাউন্টারে চলে যা। পেছনে তাকাবি না। তাকালে পায়ে গুলি করে দেব। মনে রাখবি তোর পেছনে আমার সতেরটা ছেলে যাবে। কতটা ছেলে যাবে?’

- সতেরটা!

আমিও সুবোধ বালকের মত সোজা কাউন্টারে চলে এলাম। ভাই মিথ্যে বলেন নি! সত্যিই আমার বিশ্বাস নেই! ব্যাগ খুলে টাকা বের করে টিকেট করলাম। তারপর...

তারপর আর কি? ছিনতাই শেষ, আমার গল্পও শেষ!
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×